বিশ্বসাহিত্যের ধারা - রঞ্জন চক্রবর্ত্তী
রঞ্জন চক্রবর্ত্তী
তৃতীয় ভাগ
জীবনীকার যেমন কোনও ব্যক্তির জীবনকথা অবলম্বনে ‘জীবনচরিত’ (‘Biography’) লেখেন, তেমনই কেউ নিজেই তাঁর জীবনকাহিনি লিখতে পারেন, যাকে বলা হয় ‘আত্মচরিত’ (‘Autobiography’)। স্যামুয়েল জনসন মনে করতেন জীবনচরিত আত্মকৃত হলেই ভাল। তবে অনেক সময় লেখক নিজের কথা লিখতে গিয়ে সংযম হারিয়ে ফেলেন, নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের জীবনবৃত্তান্তকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন না। অন্যদিকে আত্মচরিত লিখতে গিয়ে লেখক যদি বিনয় বা কুন্ঠার বশে তাঁর জীবনের অনেক অভিজ্ঞতাকে আড়ালে রাখেন তাহলেও জীবনবৃত্তান্ত সঠিক হয় না। আত্মচরিতের প্রাচীন উদাহরণ হিসেবে সন্ত অগাস্টাইনের ‘Confessions’-এর নাম করা যায়, যেটির রচনাকাল আনুমানিক ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।
আধুনিক আত্মচরিত রচনার শুরু অষ্টাদশ শতকের শেষে রচিত ফরাসি দার্শনিক রুশোর ‘Confessions’ দিয়ে। এ ছাড়া কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আত্মচরিত হল বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের ‘Autobiography’, গিবনের ‘Autobiography’, জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘Autobiography’, মহাত্মা গান্ধীর ‘My Experiments with Truth’ ইত্যাদি। বাংলায় এ ধরনের রচনার উদাহরণ নবীনচন্দ্র সেনের ‘আমার জীবন’, শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘আত্মচরিত’, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের ‘আমার সাহিত্য জীবন’ ইত্যাদি। কখনো কোনও কবি একটি দীর্ঘ কাব্যের রূপে আত্মচরিত লেখেন, যেমন উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘Prelude’। আবার কবি স্যামুয়েল টেলর কোলরিজের ‘Biograpia Literaria’ একটি আশ্চর্য আত্মজৈবনিক রচনা। তথ্যভার সরিয়ে রেখে সাহিত্যজীবন ও দার্শনিক উপলব্ধির এ এমন এক বিবরণ, যাতে প্রচলিত আত্মজীবনীর পূর্ণতা পাওয়া যায় না।
আত্মচরিতে উত্তম পুরুষের বয়ানে লেখক নিজেকেই উন্মোচিত করেন। তবে কাজটি মোটেই সহজ নয়। নিজের কৃতিত্বের কথা বিশদে লিখলে তা পাঠকের কাছে পীড়াদায়ক হয়ে উঠতে পারে, আবার নিজের দোষ-ত্রুটির কথা অকপটে স্বীকার করার মানসিকতাও সুলভ নয়। এ ছাড়া নিজের জীবনের অজস্র ঘটনা, নানা চরিত্র ও বিচিত্র অভিজ্ঞতাসমূহের মধ্যে থেকে গ্রহণ-বর্জন করতে গেলে আত্মজীবনীকারের বিবেচনা ও শিল্পজ্ঞান যথাযথ হওয়া দরকার। কেবলমাত্র কালানুক্রমিকভাবে জীবনের সমস্ত ঘটনা লিপিবদ্ধ করে গেলেই আত্মজীবনী সার্থক হয় না। প্রয়োজনে কালিক পারম্পর্য ভেঙে চরিতকথাকে প্রাসঙ্গিক ও আকর্ষণীয় মাত্রা দিতে হয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর আত্মস্মৃতিমূলক রচনা ‘জীবনস্মৃতিতে’ বলেছেন — “স্মৃতির পটে জীবনের ছবি কে আঁকিয়া যায় জানি না। কিন্তু যেই আঁকুক সে ছবিই আঁকে। অর্থাৎ যাহা কিছু ঘটিতেছে তাহার অবিকল নকল রাখিবার জন্য সে তুলি হাতে বসিয়া নাই। সে আপনার অভিরুচি অনুসারে কত কি বাদ দেয়, কত কি রাখে। কত বড়কে ছোট করে, ছোটকে বড় করিয় তোলে। সে আগের জিনিসকে পাছে ও পাছের জিনিসকে আগে সাজাইতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। বস্তুত তাহার কাজই ছবি আঁকা, ইতিহাস লেখা নয়।”
জীবনচরিতের আর একটি রূপ ‘দিনপঞ্জী’ বা ‘কড়চা’ (‘Diary’)। কখনও কখনও লেখক তাঁর জীবনের নানা ঘটনা দৈনন্দিন পরিক্রমার আকারে লিপিবদ্ধ করেন। এর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হল স্যামুয়েল পেপিজ-এর ‘Diary’। ১৬৬০ সালের ১লা জানুয়ারী থেকে শুরু করে ১৬৬৯ সালের ৩১ মে পর্যন্ত তিনি এই ডায়েরি লিখেছিলেন। মোট ছ’টি খণ্ডে এই ডায়েরি ম্যাগডালেনের গ্রন্থাগারে রাখা ছিল। কেমব্রিজের জনৈক ছাত্র জন স্মিথ ১৮১৫ সালে এই ডায়েরির পাঠোদ্ধার করে তা প্রকাশের উপযোগী করেন। একান্ত ব্যক্তিগত রচনা হিসাবে এর আকর্ষণ ও সাহিত্যমূল্য উপেক্ষা করার মত নয়। ঠিক এ ধরনের দিনপঞ্জী বাংলা ভাষায় তেমন নেই। তবে এই গোত্রের রচনা হিসাবে চারুচন্দ্র দত্তের ‘পুরনো কথা’, কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্যের ‘পুরাতন প্রসঙ্গ’, চন্দ্রশেখর বন্দোপাধ্যায়ের ‘গদাধর শর্মা ওরফে জটাধারীর রোজনামচা’, রবীন্দ্রনাথের ‘য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি : খসড়া’ প্রভৃতির নাম করা যায়।
‘দিনপঞ্জী’ বা ‘কড়চা’ অনেকটা আত্মজীবনীমূলক ও স্বগত আলাপনের ভঙ্গীতে লেখা হয়ে থাকে। রচনায় দিন, মাস, বছরের উল্লেখ থাকে এবং কালানুক্রমিকভাবে প্রতিদিনের ঘটনা বা ও অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ থাকে। ব্যক্তিগত দিনলিপির আকারে রচিত হলেও তাতে সমসাময়িক সমাজ ও পরিবেশের ছাপ পড়ে। খ্যাতিমান মানুষেরা অনেকেই ডায়েরিতে প্রাত্যহিক দিনলিপি বা টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতা লিখে রাখেন। কখনো কখনো ডায়েরির সেই খসড়া থেকে আত্মচরিত বা স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ জন্ম নেয়। তবে তেমনটা হতে গেলে ব্যক্তির দিনলিপিকে ভাষা, বর্ণনাশৈলী ও উপস্থাপনার গুণে সুখপাঠ্য হতে হয়। তাতে যথোচিত সাহিত্যগুণ আরোপিত হলে রচনা পাঠকের কাছে আদরণীয় হয়। উদাহরণ হিসাবে নাৎসি বাহিনির হাতে অত্যাচরিত পরিবারের একটি ছোট মেয়ে ‘অ্যানা ফ্রাঙ্কের ডায়েরী’-র কথা বলা যায়।
ডায়েরির প্রায় সমগোত্রীয় লঘুভার পঞ্জীকরণের রীতি হল ‘জার্নাল’। আত্মজৈবনিক রচনায় এ ধরনের রীতির প্রয়োগ লক্ষণীয়। ইংরেজিতে জেমস বসওয়েলের ‘জার্নাল’ ও বাংলায় শঙ্খ ঘোষের ‘জার্নাল’ এ ধরনের আঙ্গিকের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। আর এক ধরনের আত্মজীবনীমূলক রচনা হল ‘স্মৃতিকথা’ (‘Memoir’)। এতে লেখক তাঁর জীবন ও অভিজ্ঞতার বিবরণ তুলে ধরেন। লেখকের জীবনের কোনও বিশেষ অভিজ্ঞতাকে বা কোনও বিশেষ ঘটনাকে তুলে ধরতে কখনো দীর্ঘ প্রবন্ধ, কখনো উপন্যাসের বিন্যাসে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা হয়। ‘নেপোলিয়নের স্মৃতিকথা’ হল এই শ্রেণীর রচনা। বাংলায় এ ধরনের রচনার নিদর্শন হিসাবে বিদ্যাসাগরের ‘আত্মচরিত’, রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’, ভূপেন গাঙ্গুলীর ‘স্মৃতিকথা’ ইত্যাদির নাম করা যায়। ‘স্মৃতিকথামূলক উপন্যাস’ (memoir novel) সাহিত্যের একটি বিশেষ ধারা রূপে স্বীকৃত। জন ক্লীল্যাণ্ডের ‘Memoirs of a Woman of Pleasure’ (১৭৪৮) এবং উইলিয়াম মেকপীস থ্যাকারের ‘The Memoirs of Barry Lyndon’ এই শ্রেণীর রচনার নিদর্শন।



