সেবানন্দ পণ্ডা
আজ কলকাতায় প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় জল জমে গেছে। রাস্তা আর রাস্তা নেই; ওগুলো সব খাল বিল হয়ে গেছে। কলেজ স্ট্রিটে প্রচুর জল জমেছে, হাঁটু পর্যন্ত ডুবে আছে।
একটি ওলা জনাচারেক ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী প্যাসেঞ্জার নিয়ে যাচ্ছিল। ওলার ড্রাইভার বুঝতে পেরেছে আর যাওয়া যাবে না। এদিকে আগে থেকেই প্যাসেঞ্জার বুক করা হয়ে গেছে, সুতরাং একটা কিছু ফন্দি আঁটতে হবে।
তাহলে সে বাহানা দেখালো যে তার গাড়ি হঠাৎ খারাপ হয়ে গেছে। আর চলবে না। গাড়ির ভেতরে যে চারজন প্যাসেঞ্জার ছিল তারা তুমুল ঝগড়াঝাঁটি শুরু করে দিয়েছে।
“যাবে না মানে? ইয়ার্কি পেয়েছো? এরা এক একটা পাক্কা বদমাইশ। এইরকম বিপদে পড়লে এরা মানুষকে আরও বিপদে ফেলতে পছন্দ করে। একে তো এরা আমাদের রাজ্যের লোক নয়, অন্য রাজ্যের লোক। তাই এদের আমাদের উপর মায়া-মমতা কম। এরা শুধু পয়সা ইনকাম করতে জানে আর সুযোগ পেলে রাজ্যটার বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে।”
ঠিক আছে, বৃষ্টি বাদলার দিন। আবার রাতের বেলা। তোমাদের না হয় পয়সা বাড়িয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু আমাদেরকে নিয়ে যেতেই হবে।
প্রথমে অনুরোধ করা হলো। তারপর তাতে কাজ না হলে অনলাইনে কমপ্লেন করার ভয় দেখানো হলো। কিন্তু ভবি ভুলবার নয়। সে বারবার বলতে থাকলো, গাড়ি খারাপ হয়ে গেলে আমার কি করার থাকতে পারে।
তাদেরকে দেখানোর জন্য গাড়ি থেকে নেমে ড্রাইভার বনেট খুলল। এটা ওটা করলো। দু-তিনবার ঘ্যাঁগর ঘ্যাঁগর করলো। আবার পিছনের দিকে খুলল। ষ্টেপনি বার করল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। অর্থাৎ গাড়ি আর যাবেনা।
ড্রাইভার হাত জোড় করে বলল, “আপনারা যা করার করুন। প্রয়োজনে আমার পয়সা দিতেও হবে না, কিন্তু গাড়ি আমি চালাতে পারব না। কিছুতেই পারব না। একটা টায়ার চলে গেছে। ষ্টেপনিতে হাওয়া নেই। আর ইঞ্জিনও স্টার্ট নিচ্ছে না। অথচ আজকে গ্যারেজ থেকে গাড়ি বার করার সময় আমি প্রতিদিনের মতো আজকেও চেক করে বেরিয়েছি। ইঞ্জিন বিগড়ে গেলে আমার ই বা কি করার থাকতে পারে?”
ড্রাইভার বারবার স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করল। আবার বন্ধ করলো। আবার স্টার্ট দিল। কিন্তু গাড়ি স্টার্ট নিলোনা।
ভিতরে প্যাসেঞ্জাররা বারবার বলতে লাগলো, “কাছে পিঠে কোথাও কি সারানোর কোন ব্যবস্থা নেই? এটাতো কলকাতা, নিশ্চয়ই কাছে পিঠে মেকানিক পাওয়া যেতে পারে। তুমি ভাই একটু চেষ্টা করো না। প্লিজ।”
গাড়ির মধ্যে যে মহিলা প্যাসেঞ্জার ছিল, সে অনেকটা অনুরোধ করে বলবার চেষ্টা করেছিল। অন্যান্য প্যাসেঞ্জার কোন নরম কথার ধার ধারেনি। তারা বারবার কমপ্লেন করবে। তার ড্রাইভার লাইসেন্স ক্যানসেল করাবে। এমনকি ওলা কোম্পানিরও বাণিজ্য বেঙ্গল থেকে কিভাবে গুটিয়ে দিতে হয় সেটা তাদের জানা আছে।
ড্রাইভার কিন্তু তাদের কথায় কোন সাড়া দিচ্ছে না। কিন্তু ওই মহিলা প্যাসেঞ্জার যেহেতু বারবার অনুরোধ করে বলছিল, হয়তো সেই জন্য তার কথার দু-একটা উত্তর দিচ্ছিল। কিন্তু মোদ্দা কথা হল, গাড়ি আর চলবে না।
মহিলা প্যাসেঞ্জারটি হাতের মোবাইল সব সময় অন করা আছে। সে ভিডিও মোডে সবকিছু তুলে রাখছিল। এটা তার বরাবরের স্বভাব।
ড্রাইভার বলল, “আপনারা গাড়িতে বসলে বসে থাকুন। আমার সারাদিনে তেমন কিছু খাওয়ার জোটেনি। দেখছি তো চারপাশটা শুধুই অন্ধকার। আমি একটু খাবার সন্ধান করি।”
এই কথা শুনে সব প্যাসেঞ্জার হতাশ হয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। ড্রাইভার সত্যি সত্যিই গাড়িটা সেখানে ফেলে রেখে কোথাও গেল। হয়তো তার কথায় খাবার সন্ধানে।
চার প্যাসেঞ্জারের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন মহিলা। তারা শেয়ারে যাওয়ার জন্য আলাদা আলাদা ভাবে ওলা গাড়ি বুক করে যাচ্ছিল। কেউ কেউ গাড়িতে উঠেছে হাওড়া স্টেশন থেকে, কেউ কেউ উঠেছে বড় বাজার থেকে। প্রত্যেকে কিন্তু যাবে ডায়মন্ড হারবার।
গাড়িতে যতক্ষণ তারা ছিল, তাদের মধ্যে কোন কথার আদান-প্রদান হয়নি। সবাই চুপচাপ বসেছিল। এখন পরস্পর পরস্পরের প্রতি তাকিয়ে কথাবার্তা চালাচালি করল। কারণ প্রয়োজন। আজকাল আর কেউ প্রয়োজন ছাড়া বাক্য খরচ করতে চায় না।
জানা গেল, তারা চারজনই ডায়মন্ড হারবারে যেতে চায়। প্রত্যেকেই সুশিক্ষিত। মহিলা যাত্রীটির পিএইচডি করা। সে মহিলা ইউনিভারসিটিতে চুক্তিভিত্তিক পড়ানোর কাজে জব পেয়েছে। আগামীকাল তাকে জয়েন করতে হবে। মাইনে বড়জোর ২৫ কি ৩০ হাজার টাকা।
তিনজন পুরুষ প্যাসেঞ্জারের মধ্যে একজন ডাক্তারি পাশ করেছে। তারও ডায়মন্ড হারবার হাসপাতালে চুক্তিভিত্তিক চিকিৎসক হিসাবে কাজে আগামীকাল যোগ দেয়ার কথা। বাকি দুজন প্যাসেঞ্জার এম টেক ও এম বি এ করা লোক। তবে তাদের ফিল্ড আলাদা। একজন কম্পিউটার ও ইনফরমেশন টেকনোলজির লোক এবং আর একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর লোক।
তাদেরও ওই ডায়মন্ড হারবারে অবস্থিত একটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে চুক্তিভিত্তিক পড়ানোর কাজে আগামীকাল যোগদান করতে যাচ্ছে। এরা দুজন ব্যাঙ্গালোর থেকে বিস্তর পড়াশোনা করে ডিগ্রি নিয়ে এসেছে।
আজকাল আর কেউ চাকরি পায় না। এই রাজ্যে নাকি এখন জব করে চাকরি করে না। চারদিকে জলে জলময়। প্রত্যেকের আবার ভারি ভারি লাগেজ। গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথে প্রত্যেকের পায়ের জুতো মোজা ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে।
মোবাইল ফোনের টর্চ ব্যবহার করে ফুটপাতে কোনভাবেই উঠে পড়তে পারল। যা কথাবার্তা হল সবই ওই ফুটপাতে দাঁড়িয়ে। ডায়মন্ড হারবারে যাওয়া দরকার কিন্তু সেটা কিভাবে সম্ভব, তারা কেউ সে উপায় বার করতে পারল না।
তারা প্রথমে ভাবল রাতে কোনভাবে কলকাতার কোন একটা হোটেলে থেকে গিয়ে রাত কাটিয়ে সকালে না হয় ডায়মন্ড হারবারে যাওয়া যাবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। একে তো প্রত্যেকের কাছে খুব বেশি পয়সা নেই। তারা সবাই বেকার। তার উপর এই ঝড় বৃষ্টির দিনে কাছে পিঠে কোথায় হোটেল পাওয়া যাবে সেটা খুঁজে পাওয়া ও দুষ্কর।
পাশ দিয়ে একটা হাতে টানা রিকশা ঠনঠন করে ঘন্টি বাজিয়ে যাচ্ছিল। তাকে ডেকে এই চার প্যাসেঞ্জার তাদের অবস্থার কথা বললো। এবং সাজেশন চাইলো ডায়মন্ড হারবারে কিভাবে যাওয়া যাবে।
রিক্সাওয়ালা জবাব দিল, “চিন্তা কি? কাছেই তো শিয়ালদা স্টেশন, আর সেখান থেকেই ট্রেনে করে ডায়মন্ড হারবারে চলে যান। আর ওখানে গিয়ে কিছু একটা ব্যবস্থা করুন।”
চারজনের কাছেই এই প্রস্তাবটা গ্রহণযোগ্য মনে হলো। তারা জানতে পারল, সেখান থেকে শিয়ালদা স্টেশন মাত্র পাঁচ থেকে সাত মিনিটের হাঁটা পথ। সেই রিকশায় তাদের চারজনের লাগেজ দিয়ে দেওয়া হলো। আর রিকশার পিছনে সবাই যেতে থাকলো, কিছু একটা উপায় তো হলো।
স্টেশনে পৌঁছে দেখল, তখনো ডায়মন্ড হারবার যাবার লাস্ট লোকাল ছেড়ে যায়নি। সকলে টিকিট কেটে ডায়মন্ড হারবার লোকালে চেপে বসলো। তারা চারজনেই একই বগিতে বসে গল্প করতে করতে যাত্রা করছিল। কিন্তু ওই মহিলা প্যাসেঞ্জার সবসময়ই তার হাতে মোবাইল দিয়ে ভিডিও করে যাচ্ছিল। এটা নাকি তার বরাবরেরই শখ।
রাত ১১:৫২ মিনিটে ডায়মন্ড হারবার যাওয়ার লাস্ট লোকাল শিয়ালদা থেকে ছাড়বে। ঝড়-বৃষ্টির দিন। তাতে লাস্ট ট্রেন হয়তো ছাড়তে দেরি হচ্ছে। রাত বারোটা বাজলো, তাও ট্রেন ছাড়ার কোন লক্ষণ নেই।
এদিকে চারজনের সকলেই কথায় ব্যাপকভাবে ব্যস্ত। ফলে ট্রেন কখন ছাড়বে বা সময় কত হচ্ছে সেদিকে কারোরই কোন খেয়াল নেই। সাড়ে বারোটা বাজতে চলল, তখনও ট্রেন ছাড়েনি।
মেয়েটি অস্থির হয়ে উঠলো। সে সবাইকে তাড়া লাগালো। সচেতন হতে বলল, “আরেকি ব্যাপার, ট্রেনটা কেন ছাড়ছে না? এগার টা বাহান্নর ট্রেন, সাড়ে বারোটা বাজল। এটা একটু খোঁজ নিয়ে জানার দরকার।”
তার কথা শুনে সকলে একটু নড়েচড়ে বসলো। সত্যিই তো, ট্রেনটা কেন ছাড়ছেনা? এবারে একজন নেমে একে তাকে জিজ্ঞাসা করে জানল, বালিগঞ্জের কাছে তিল জলায় জল জমে যাওয়ার জন্য রেললাইন দেখা যাচ্ছে না। জমা জলে ডুবে গেছে। তাই ট্রেন ছাড়তে দেরি হচ্ছে। তবে জল কমতে শুরু করেছে, ট্রেন হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাড়বে।
সেই ট্রেন ছাড়তে ছাড়তে রাত একটা বেজে গেল। অর্থাৎ তারিখ বদলে গেল। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি। ট্রেনটি গড়িয়া পর্যন্ত আসার পরে দাঁড়িয়ে গেল। আর এগোতে পারল না কারণ ট্রেন লাইনের তার ছিড়ে গেছে।
ট্রেন যখন ই ছাড়ুক। ছাড়লেই হল। ওদের পৌঁছানো নিয়ে কথা। এই প্রজন্মের দিকে তাকালে একটা কথাই মনে হয়, এরা দরকার এ প্রচুর কথা বলতে পারে আবার প্রয়োজনে একেবারে চুপচাপ থাকতে পারে ঘন্টার পর ঘন্টা।
ট্রেনের বগির মধ্যে এই চারজন প্যাসেঞ্জারকে দেখে কে বলবে এদের এইমাত্র পরিচয়। কিছুক্ষণ আগে তো কোন কথাই ওদের মুখ দিয়ে বের হচ্ছিল না। আর এখন দেখো, ট্রেন চলছে কি না চলছে সে দিকে কোন খেয়ালই নেই। এরা এতটাই কথায় মত্ত। এদের কিন্তু খুব বেশি খিদে পায় না। খাওয়ারেরও তেমন চাহিদা নেই।
এক বোতল কোল্ডড্রিংকস আর এক প্যাকেট চিপস পেলেই এদের খাওয়া দাওয়া হয়ে যায়। তবে এরা মানে এদের মধ্যে অনেকেই সিগারেটের মধ্যে গাঁজা ঢুকিয়ে স্মোক করে। এবং এটাতে এরা খুবই পটু। এরা খুবই ফিগার সচেতন।
ড্রিংকস করলে মানে হার্ড ড্রিংকস পাছে ফিগার বেড়ে যায়। তাই এরা সেই অর্থে সেয়ানাও বটে। চারজনই খুবই কথা বার্তা বলছিল। তবে মহিলা প্যাসেঞ্জারটি হয়তো ভিডিও করছিল, সেই জন্যও হতে পারে মাঝে মাঝে জানলা দিয়ে এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছিল।
ওই চারজন প্যাসেঞ্জারের মধ্যে পুরুষ আর মহিলার এইটুকু শুধু তফাৎ লক্ষ্য করা গেছিল। আকাশে তখন মেঘ কেটে গেছে। বৃষ্টি অনেক আগেই থেমে গেছে। এখন আকাশ বেশ পরিষ্কার। বড় গামলার মত চাঁদ দেখা যাচ্ছে।
চাঁদের আলো ষ্টেশন টাকে স্নিগ্ধতায় মুড়ে দিয়েছে। আশে পাশে দুএকটা বিজ্ঞাপনের নিয়ন আলোও দেখা যাচ্ছে। তাতে রাতটাকে আরো মায়াবী লাগছে। স্টেশনে খুব বেশি লোকের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে না; কেবলমাত্র একজন মুড়িওয়ালা ও তার সাথে দুটো ছেলেকে ছোটাবোলা করতে দেখা যাচ্ছে।
মুড়িওয়ালা কাঁধে একটি মুড়ির টিন ও সেই টিনের চারপাশে গোল গোল করে কৌটোর মধ্যে নানা রকম মসলা পাতি দেওয়া আছে। আর ছেলে দুটো দু কাঁধে বড় বড় ব্যাগে করে ছোট ছোট বোতলে পানীয় জল সরবরাহ করছে।
তারা লক্ষ্য করল, ওই মুড়িওয়ালার নিজস্ব কোন নাম নেই। সবাই তাকে “দাদা বৌদি” বলেই ডাকছে। “দাদা বৌদির মুড়ি এদিকে আসো। এই দাদা বৌদির মুড়ি এদিকে আসো।” সাধারণত যারা মুড়ি বিক্রি করে অর্থাৎ মুড়িওয়ালা সে নিজেই হাঁক দিয়ে যায় “মুড়ি মুড়ি মসলা মুড়ি” বলে। কিন্তু এখানে দেখা গেল, প্যাসেঞ্জাররা সবাই ওকে “দাদা বৌদি” বলে ডাকছে।
এটা একটু ওই মহিলা প্যাসেঞ্জারকে অবাক করল। ফলে সে তার ভিডিও ক্যামেরাটি ওই মুড়িওয়ালার দিকে তাক করেই থাকলো।
মহিলা প্যাসেঞ্জারটি লক্ষ্য করল, মুড়িওয়ালার নিজস্ব কোন নাম নেই। তার নাম সবাই “দাদা বৌদি” বলেই ডাকছে। এবং ওই মুড়িওয়ালা ও ওই ডাকেই সাড়া দিচ্ছে। মহিলা প্যাসেঞ্জারটির তুড়ি মেরে একটা আওয়াজ করে।
বাকি তিনজন সহযাত্রীর মনোযোগ ঐ মুড়িওয়ালার উপর আকর্ষণ করতে বাধ্য করল। সকলে যে যার কথা থামিয়ে ওই মুড়িওয়ালা এবং তার সাথে থাকা দুটি ছেলের কাজকর্ম লক্ষ্য করতে থাকলো।
ভদ্রলোক নানা মাসলা মিশিয়ে মসলা মুড়ি তৈরি করতে থাকল এবং মুড়ি মাখা হয়ে গেলে ঠোঙায় করে একে একে সব প্যাসেঞ্জারের দিকে এগিয়ে দিচ্ছিল। কাউকে কোন দামের কথা বলেনি বা ওই বগিতে থাকা অন্যান্য প্যাসেঞ্জারও কেউ এখনো মুড়ি কত দামের সেটা জিজ্ঞেসও করেনি।
সবাই হাতে ধরে নিয়ে খেতে শুরু করে দিল। আর ছেলে দুটো তিনশ এম এলের ছোটো বোতলে করে জল এগিয়ে দিচ্ছিল। যে প্যাসেঞ্জার জল খেতে চাইছে, কেবলমাত্র তাদেরকে দিচ্ছে।
জলের বোতল এগিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে বলে দিচ্ছে, “এটা সিল করা বোতলের জল নয়। আমাদের ঘরের অ্যাকোয়াগার্ডের জল। আর প্রতিটি বোতলে একফোঁটা করে আপনাদের সামনে জিওলিন ঢেলে দিচ্ছি। যাদের খেতে ইচ্ছে, তারা খান। এর জন্য কোনো পয়সা দিতে হবে না। এত রাতে গাড়ি আটকে পড়েছে। অনেকেরই জলতেষ্টা পাচ্ছে। বাবা বললেন, এতরাতে কেউ জল দিতে এগিয়ে আসবেন না। আমাদের কাছাকাছি বাড়ি। তাই ঘর থেকে জল নিয়ে এসেছি।”
ছেলে দুটোর কথা ঐ মহিলা প্যাসেঞ্জারের মনটাকে বেশ আকর্ষণ করেছে। তার ইচ্ছে করছিল ও ছেলে দুটোর সাথে একটু কথা বলতে। কিন্তু সেটা হওয়ার নয়। তারা ঐ বগিতে জল দিয়ে আবার অন্য বগিতে চলে গেল।
এদিকে তার বাবার টিনে থাকা সব মুড়ি শেষ। চারটিমাত্র ঠোঙা ছিল ঐ চারজন প্যাসেঞ্জারকে এগিয়ে দিল। ঐ মুড়িওয়ালার ঠোঙাভর্তি মশলা মুড়ি দেওয়ার অ্যাপ্রোচটা এমন ছিল, তাছাড়া মশলা মুড়িটির একটা অন্যরকমের গন্ধ তাদেরকে এতটা তীব্রভাবে আকর্ষণ করছিল যে তারা খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাত এগিয়ে দিয়েছিল।
এবং অন্যান্যদের মত কত দাম ইত্যাদি না জেনে খেতে শুরু করে দিয়েছিল। মুড়িটার মুখে পড়তে একটা অন্যরকমের স্বাদে গন্ধে তাদেরকে মাতোয়ারা করে দিচ্ছিল। তাদের চারজনেরই একই মত, জীবনে অনেক জায়গায় মুড়ি খেয়েছে কিন্তু এই রকম মুড়ি জীবনে কোনোদিনই তারা খায়নি।
তাদের প্রত্যেকেরই মুড়িওয়ালার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল। আবার মুড়িটাও শেষ করতে চাইছিল। একসাথে কিভাবে দুটো কাজ হয়? তবে ভগবান একটা সুযোগও করে দিলেন। যেহেতু তার টিনের সব মুড়ি শেষ হয়ে গেছে, তাই একটা সিটে বসে মুড়ির টিনটাকে পাশে সরিয়ে রেখে পকেট থেকে টাকা গুলো বের করে একজায়গায় রেখে গুনতে শুরু করল।
যখন সে টাকা গুনছিল, তখন তার ছেলে দুটো এসে ইশারায় কাজ শেষ হয়ে গেছে বলে মুড়ির টিন নিয়ে চলে গেল। মুড়িওয়ালা লোকটি মুখে একটা হাসি দিয়ে ছেলেদুটিকে ইশারায় নিয়ে যেতে বলল।
শিয়ালদহের সাউথ সেকশানে দাদা বৌদির ঝালমুড়ি খুবই জনপ্রিয় একটি নাম। লোকেরা এই নামে ডাকতে ডাকতে তার আসল নামটাই ভুলে গেছে। সকলেই তাকে ও “দাদাবৌদি” বলে ডাকে।
ও দাদাবৌদি একটা দশটাকার দিয়ে যাও। স্কুলে যাওয়ার ছেলে-মেয়ে থেকে শুরু করে একদম বয়স্ক বয়স্করাও তাকে দাদাবৌদি বলে ডাকে। তার ঝালমুড়ি এতটাই বিখ্যাত যে প্যাসেঞ্জাররা অন্য কারোর থেকে মুড়ি খাবে না। তারা দাদাবৌদির ঝালমুড়ি ই চাই।
খুব দ্রুততার সাথে মুড়ি মেখে দেওয়ার তার জুড়ি নেই। আর তার মুড়ির স্বাদও খুব সুন্দর। একবার খাওয়ার পর দ্বিতীয় বার খাওয়ার ইচ্ছে হয়। কিন্তু হলে কি হবে ঐ ইচ্ছে ইচ্ছেতেই রেখে দিতে হবে। সে মিটবার কোনো সুযোগ থাকে না।
কারণ টা হল, দাদাবৌদি যে বগিতে ওঠে সে বগির প্রায় সব প্যাসেঞ্জারকে ঝালমুড়ি দিতে হয়। তারমানে সকলকে একরাউন্ড দিয়ে পয়সা গুছিয়ে নিতে নিতে অনেকেই তার গন্তব্য স্থলে পৌঁছে যায়। কেউ কেউ আবার পয়সা না দিয়ে চলে যায়।
কিন্তু পরেরদিন ঠিক মনে করে দিয়ে দেয়। দাদাবৌদিকে চাইতেই হয় না। চাইবে ই কি করে সে তো এমনিতেই ভুলে যায়। এত ভিড়ভাট্টায় কেউ পয়সা দিল, কেউ দিল না; সেগুলো মনে রাখলে মন দিয়ে মুড়ি মাখাটাই হবে না।
সেখানে একটু গলতি থেকে গেলে তো পরের দিন থেকে তার কাষ্টমার কমতে থাকবে। পয়সা না পাওয়া যায় না যাক, সে তার কাজটা থেকে মনোযোগ সরাতে পারবে না, কিছুতেই পারবে না।
সে প্রথম প্রথম পয়সার দিকে নজর দিত। কে পয়সা দিচ্ছে, কে দিচ্ছে না, সেদিকে খেয়াল দিতে গিয়ে মুড়ি মাখার দিকে ঠিকঠাক নজর দিতে পারতো না। দুদিকে মন দিলে কোন কাজ ই ভালো হয় না।
তাহলে পরের দিন দাদা বৌদির সাথে আলোচনা করল। এখন কি করা যায়? দাদা মুড়ি মাখার দিকে নজর দেবে নাকি কে টাকা পয়সা না দিয়ে মুড়ি খেয়ে পালাল সেদিকে নজর দেবে? নাকি দুটোতেই সমান সমান নজর রাখতে হবে?
বৌদির সাজেশন ছিল, টাকা পয়সার দিকে সকল ফেরিওয়ালারই নজর থাকে। কোয়ালিটির দিকে নজর কজনারই বা থাকে? একে ফেরিওয়ালা, তার আবার কোয়ালিটি? এ যেন জাঙ্গিয়ার বুক পকেট? কিন্তু দাদা-বৌদি মুড়ি হবে ইউনিক। সে কোয়ালিটির সাথে কোনোদিনই কম্প্রোমাইজ করবে না।
দাদা-বৌদির কথা এক্কেবারে বেদবাক্য বলে মনে করে। তাই হল। সেদিন থেকে কোয়ালিটির সাথে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। সে ঝালমুড়ির দাম ও কোনোদিন বাড়ায়নি। কাস্টমাররাই অনেক সময় বলেছে, “না, এটা চলছে না, এটা দশ টাকার জায়গায় পনেরো টাকা করতে হবে।”
আবার কিছুদিন পর বলেছে, “পনেরো টাকা নয়, কুড়ি টাকায় করতে হবে।” এখন তো ও ২৫ টাকায় ওটা বিক্রি করে। কিন্তু কোন বারেই নিজের থেকে দাম বাড়ায়নি। সব সময়ের জন্য দাম ঠিক করেছে কাস্টমার অর্থাৎ প্যাসেঞ্জার। কাস্টমারই তার ভগবান। সে অন্ততপক্ষে এই কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে।
মহিলা প্যাসেঞ্জারটি মুড়িওয়ালাকে পাশে বসিয়ে অনেক কিছু জানার চেষ্টা করল। আর বাকি তিনজন ওই গ্রুপের প্যাসেঞ্জারও এই আলোচনায় অংশ নিল। প্রত্যেকেই তাদের নিজেদের পরিচয় দিল এবং তারা যে এতকাল বেকার ছেলে, নতুন চাকরিতে জয়েন করতে যাচ্ছে, তথা তাদের দুরবস্থা, বাবা-মায়ের অনেক টাকা ধ্বংস করে বাইরে পড়াশোনা করে নিজের রাজ্যে ফিরে এসে ২৫ কি ৩০ হাজার টাকার জন্য ছুটতে হচ্ছে।
আর তার কি অবস্থা বৃষ্টি বাদলার দিন, জার্নির কষ্ট, খাওয়া দাওয়ার কষ্ট ইত্যাদি বলে মুড়িওয়ালা সম্পর্কে জানতে চাইল। যেহেতু ট্রেন চলতে দেরি আছে, তাই মুড়িওয়ালা ও খুব উৎসাহ নিয়ে তার নিজের কথা বলতে শুরু করলো।
মহিলা প্যাসেঞ্জারটি বলল, “আপনার সব কথা আমি ভিডিও রেকর্ডিং করে রাখছি, আপনার আপত্তি নেই তো?” মুড়িওয়ালা বললো, “আমার আবার কথা তার আবার আপত্তি? আপনারা প্রত্যেকেই শিক্ষিত কিন্তু খানিকটা ডিপ্রাইভড মানুষ। কাজেই যা ভালো মনে করবেন, তাই করবেন, এতে আমার বলার কি থাকতে পারে।”
অতিরিক্ত উহসাহ নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে মহিলা প্যাসেঞ্জারটি জিজ্ঞেস করে বসল, “আপনার এডুকেশন কতটা? মানে, কতদূর পড়াশোনা করে থেমেছেন?”
মুড়িওয়ালা বলল, “বুঝেছি, ঐ ডিপ্রাইভ্ড কথাটা বলার জন্য আপনার উৎসাহটা বেড়েছে। ঠিক আছে, তবে ঐ এডুকেশনাল কোয়ালিফিকেশন দিয়েই শুরু করি। আমার বাড়ি মেদিনীপুরের একটি গ্রামে। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগের কথা। তখন মেদিনীপুরের পূর্ব ও ছিল না, পশ্চিমও ছিল না। আমি ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে পাশ করে বসে আছি। আর আমার মিসেস তখন কেমিস্ট্র অনার্সে ফাইন্যাল পরীক্ষা দিয়ে দিয়েছে।
আমরা দুজনেই ভালোবাসা করে বিয়ে করে ফেললাম। ওটাই বিশাল অপরাধ হয়ে গেল। বিয়ে করেছি যেন কোন ক্রিমিনাল অফেন্স করেছি। তখন গ্রামের অবস্থা অবশ্য অনেকটা ওইরকমই ছিল। আমার নিজের বাড়ি এবং শশুর বাড়ি থেকে কেউই কাউকে মেনে নিতে পারল না। এমনকি আমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা গ্রামের তথাকথিত জমিদার হওয়ার জন্য আমাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনাও করল।
সেটা আমরা বুঝে গেছিলাম। আমরা সেই রাতেই দুজনেই কলকাতায় চলে এসেছিলাম। দুজনার কাঁধে দুটো ব্যাগ। ব্যাগে ছিল কিছু বইপত্র আর নিজেদের কোয়ালিফিকেশনের সার্টিফিকেটগুলি। এছাড়া আর কিছুই ছিল না। টাকা পয়সা তো দূরের কথা, আমার মিসেস বলেছিল বাড়ি থেকে গয়না পত্র ইত্যাদি এবং কিছু টাকা পয়সা নিয়ে আসবে। নিয়ে এসেও ছিল। আমি সেগুলো উনার হাত দিয়ে ফেরত দিয়ে আসতে বলেছিলাম।
যেখানে ওরা আমাদের মেনে নিতে পারেনি, সেখানে ওদের টাকা-পয়সা, গয়নাগাঁটি আমাদের কি কাজে লাগবে? আমরা ঠিক করলাম, পারি যদি নিজেদের হাতে কিছু করব। ওই সব পরের টাকা-পয়সা আমাদের কোন দরকার নেই। এইটা রাগ বলতে পারেন, আবার অভিমান বলতে পারেন। আমরা দুজনেই প্রায় কপর্দকহীন অবস্থায় কলকাতায় এসে পৌঁছালাম।
এবং সেই প্রথম আমাদের গ্রাম থেকে কলকাতায় আসা। আজকের দিনের মত সেদিনও এইরকম শহর জুড়ে বৃষ্টি। কলকাতার রাস্তাঘাট সব জলে জলময়। একে অজানা লোক, শহরের বিষয়বস্তু কিছু জানা নেই, তার উপর অন্ধকার রাত। ফুটপাত পর্যন্ত ডুবে গেছে।
আপনারা আজকে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, আমাদের অবস্থা ও অনেকটা সেরকমই ছিল। তফাৎটাই ছিল ওটা চল্লিশ বছর আগের কলকাতা। অন্ধকার রাত, সাথে মহিলা। দুটো যুবক যুবতী। হাতে কোন টাকা পয়সা নেই। তারা কি করতে পারে? এইরকম একটা অজানা, অচেনা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে।
আমরা দুজনেই খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম কিন্তু আমার মিসেস তখনো আমাকে সাহস যুগিয়ে যাচ্ছিল। বারবার বলে যাচ্ছিল কবি বলে গেছেন জানো না? “মেঘ দেখে কেউ করিস না ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।”
আমরা যে পরিস্থিতিতে থাকি না কেন অবশ্যই ঈশ্বর বাঁচার কোন বন্দোবস্ত করে গেছেন। আমরা স্কুলে এগুলো ভাব সম্প্রসারণ করেছি তার বাস্তবিক মূল্য কি আমরা সেদিন জলমগ্ন কলকাতায় দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করেছি।
দুর্ভাগ্যক্রমে বা সৌভাগ্যক্রমে আমরা কলকাতার একটা রেল লাইনের পাশে এসে অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে ঠেকেছিলাম, একটা গাছের তলায়। মাথার উপর একটা দোচালা করে প্লাস্টিক বাঁধা ছিল, তার তলায় আশ্রয় নিয়েছিলাম নিজেদের মাথা বাঁচানোর জন্য। তবে মাথা বাঁচানোর ও কিছু ছিল না, সবই তো ভিজে চুপসে গেছি।
নিজেদের জন্য কোন দুঃখ হয়নি। দুজনেই ভিজে কাঁপছি। দুঃখ হচ্ছিল ব্যাগে থাকা বইগুলো ভিজে যাচ্ছে বলে। সময় সময় এরকমই হয়, তখন বইগুলো আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ জিনিস মনে হয়েছিল সোনা রুপার থেকেও।
এই গাছের তলায়, সেই দোচালা পলিথিনের তারপূলিনের তলায় আমরা কলকাতায় প্রথম রাত কাটিয়েছিলাম। সে রাত আমরা একদিনের জন্য ভুলতে পারিনি, আজ এই বয়সে পৌঁছে ও। আমাদের এখন বাড়ি হয়েছে, কিছুটা জায়গা জমি হয়েছে।
মিসেসের যত রকম গয়নাগাঁটি দরকার সবগুলোই হয়েছে। ছেলেদেরকে ভালো ভালো স্কুলে পড়াচ্ছি। কিন্তু সেই পলিথিনের তলায় রাত কাটানোর কথা এক মুহূর্তের জন্য আমরা দুজনে কেউই ভুলতে পারি না। সেটা আমাদের কাছে আমাদের রক্তকণিকার মত রক্ত স্রোতের মধ্যে আজও বহমান।
সকাল যখন হল, তখন দেখি আমরা যে গাছের তলায় যে পলিথিনের তলায় রাত কাটিয়েছিলাম, সেই গাছের তলায় একটি ছোট্ট মত মন্দির করে শিবলিঙ্গ স্থাপন করা হয়েছে। সেটা রেললাইনের পাশে একটা বস্তির মধ্যে।
ভোর হতেই দেখি অনেকে কাজের জন্য বেরোচ্ছেন। বিশেষ করে কাজের মাসি বা কাজের দিদি গোছের যারা, তারা একে একে প্রণাম করে, বিড় বিড় করে মুখে কি সব বলে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজের জন্য চলে যাচ্ছে।
আমরা চোখ দলতে দলতে এগুলো দেখছিলাম এবং একটু খানিক পরে ঘুমের ঘোর কেটে যাওয়ার পরে এমন একটা দৃশ্য দেখলাম যার জন্য আমাদের কোন প্রস্তুতি ছিল না। দেখলাম, ওই গাছের তলায় একদম পাশে যে বস্তি বাড়ি আছে, সেই বস্তি বাড়ির একজন খুবই বয়স্ক গোছের একজন লোক মারা গেছে।
তার জন্য অনেকেই জড়ো হয়েছে, কান্নাকাটি করছে। এবারে তার দেহকে পোড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। ওই বুড়োর একটি ছেলে ছাড়া আর কেউ ছিল না। আমরাও সেই বুড়োর দাহ করার কাজ করার জন্য যতটা পারি শারীরিক, মানসিক ও কিঞ্চিত হলেও আর্থিকভাবে সাহায্য করলাম।
এবং সেই ঘরটি আমাদের থাকার জন্য আপাতত আস্তানা হল। বস্তির অনেকেই আমাদের সদ্য বিবাহের কথা জেনে সাহায্য করলেন। আমাদের থাকতে দিলেন। পরের দিন থেকে আমি সেই মশলা মুড়ি বিক্রি করার কাজে হাত দিলাম।
ট্রেনে ট্রেনে ফেরি করে বেরোতাম। আর মশলা তৈরি থেকে শুরু করে আলু সিদ্ধ করা, পেঁয়াজ কাটা, আচার তৈরি করা ইত্যাদি কাজ আমার মিসেসই করে দিতেন। আর সময় হলে বস্তির যত ছেলেমেয়ে আছে, প্রত্যেকেরই পড়ানোর দায়িত্ব নিল আমার মিসেস।
মিসেস বস্তির মেয়েদের প্রত্যেকেরই স্বাক্ষর করাতে পেরেছিল, আর সকলকে নিয়ে একটি সেলফ হেল্প গ্রুপও তৈরি করেছিল। কালে কালে গাছের তলায় আমরা শিব মন্দির করেছিলাম। সেখানে ঘটা করে প্রতিবছর শিবের পূজা হত।
বস্তির প্রায় সকল মহিলা শিবরাত্রির ব্রত করতেন। আর আমাদের থাকার ঘরটা মাটির দেয়াল থেকে পাকা ইঁটের দেয়ালে রূপান্তরিত হয়েছিল। তার মাথায় ছিল টিনের ছাদ। সবই কিন্তু হয়েছে ওই মসলা মুড়ির দয়ায়।
আমার মিসেসের খুব ইচ্ছে ছিল এমএসসি ডিগ্রীটা কমপ্লিট করা। তিনি ওই বস্তিতে থেকেই পড়াশোনা করে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রিতে এমএসসি পাস করেন।
মশলামুড়ির যে মসলাগুলো ব্যবহার করা হয়, প্রত্যেকটি মসলা আমার মিসেস খুব যত্ন করে তৈরি করেন, রোদে শুকিয়ে হামান দিস্তা দিয়ে গুঁড়ো করে। আজও সেই হামানদিস্তাই ব্যবহার করা হয়। কোন মিক্সার গ্রাইন্ডার বা অন্য কিছু নয়।
এই মসলা রেসিপি আমার মিসেস এবং আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। আমরা দুজনে দুজনার কাছেই শপথ করেছি এই বিশেষ রেসিপির কথা আমরা তৃতীয় কাউকে জানাবো না। আজও পর্যন্ত আমরা বিজনেসের এই সিক্রেসি মেইনটেন করে আসছি।
আমার দুই ছেলেকে আমরা ভালো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করাচ্ছি। প্রত্যেকের পিছনে মাসে গড়ে বার থেকে পনের হাজার টাকা করে খরচ হয়। আমরা গড়িয়ার কাঠিপোতা বলে একটি জায়গায় পাঁচ কাঠা জায়গা কিনেছি।
দু টাকার উপর তিনতলা বাড়ি করেছি, বাকি তিন কাঠায় আমরা এখনো চাষাবাদ করি। অনেকটা গোবিন্দভোগ চালের মতো দেখতে হবে এরকম ধান বুনি আমাদের নিজস্ব জায়গায়। সেই ধান থেকে আমরা ঢেঁকিতে করে চাল করি।
আমার মিসেস নিজের হাতে বালি দিয়ে সেই চাল থেকে মুড়ি ভাজে। এইটা কোন্ ধান সেটাও আমরা কাউকে বলিনি। অনেকটা গোবিন্দভোগের মত কিন্তু গোবিন্দভোগ নয়। তবে এর একটা ভিতরের সুগন্ধি আছে।
আমার মিসেস এই চালটি তার এক বান্ধবীর থেকে সংগ্রহ করেছে, যে কিনা এগরিকালচারে পিএইচডি করেছে।
আমার মিসেসের যত রকমের গয়নার শখ ছিল, সবগুলোই বানিয়ে দিতে পেরেছি। আমরা কোনো কাজ একা করি না। প্রত্যেকেটা কাজে আমার যেমন হাত আছে, আমার মিসেসেরও সেরকম হাত আছে।
ঐজন্য লোকে যখন দাদাবৌদির মুড়ি বলে ডাকে, অন্যান্যদের মতো “ও মশলামুড়ি দাদা” এদিকে আসুন বলে ডাকে না, তখন আমি খুব গর্বিত অনুভব করি।
তারা গল্প শেষ হলে তাদের মধ্যে একজন তার নাম জিজ্ঞেস করতে সে বলল, “আমার তো অন্য কোন নাম নেই। আমার নাম দাদা বৌদি। সকলেই তাই বলে চেনে।”
তাদের মধ্যে আর একজন জিজ্ঞেস করল, “আপনি হিন্দু না মুসলিম?” সে বলল, “আমি হিন্দুও নয়, আমি মুসলিম ও নয়; আমি দাদাবৌদি।” কথাটা শুনে তারা খানিকটা অবাক হয়ে গেল।
কিন্তু সে বলে চলল, “এতকাল হিন্দু মুসলিম বলে কেউ কোনো পরিচয় জানতে চায়নি। আর এখন নতুন করে পরিচয় দিয়ে আমি অকারণে কেন কিছু কাস্টমার কমাতে চাইবো? আমাকে কি পাগলা কুকুর কামড়েছে?”
তখন ওই মহিলা প্যাসেঞ্জারটি বলল, “আপনার দুই ছেলের কি আলাদা আলাদা পড়ার ঘর আছে নাকি একটি ঘরেই পড়াশোনা করে?” লোকটি বললো, “আমি তিনতলায় দুটো আলাদা আলাদা ঘর করেছি। দুজনের দুটো পড়ার ঘর।
বুঝতে পেরেছি, আপনি জানতে চাইছেন পড়ার ঘরে ওরা পড়াশোনা করে, নাকি ঝগড়াঝাঁটি করে। সেটি যাতে না করতে পারে, তাই আমরা দুজনের আলাদা পড়ার ঘরের বন্দোবস্ত করেছি।”
তখন ওই মহিলাটি আবার জানতে চাইল, “আপনারা কি কোন ঠাকুর ঘর নেই?” মুড়িওয়ালা বলল, “আছে তো।”
মেয়েটি বলল, “আছে? কোন ঠাকুর?” আসলে, সে কায়দা করেই জানতে চেয়েছিল, মুড়িওয়ালা হিন্দু কি মুসলিম। মুড়িওয়ালা উত্তর দিল, “আমাদের একটাই ঠাকুর ঘর এবং সেই ঠাকুরঘরে থাকেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাঙালির তো একটাই জীবন্ত ঠাকুর।”
বলেই দুহাত কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করল তার ঠাকুরের উদ্দেশ্যে।
ততক্ষণে মাইকে ঘোষণা করা হয়েছে ট্রেন ছেড়ে দেবে। লাইন ক্লিয়ার হয়ে গেছে। মুড়িওয়ালা তৎপরতার সাথে ট্রেন থেকে নেমে গেল।
নামার সময় চারটি প্যাসেঞ্জার একসাথে টাকা বার করে চিৎকার করে বলল, “আরেকটি তোমার টাকাটা নিয়ে যাও।” মুড়িওয়ালা নেমে যেতে যেতে বলল, “ওটা অন্য আরেকদিন দিয়ে যেও।”
ওরা আর একটা কথা চেঁচিয়ে জানতে চাইলো, “শুধু এটুকু বলে যান, আপনার সত্যিই কি কোনো আক্ষেপ নেই?” মুড়িওয়ালা বলল, “একটাই আক্ষেপ; আমাকে আমার ছেলেরা তাদের স্কুলের বন্ধুদের কাছে মুড়িওয়ালার ছেলে বলে লজ্জায় পরিচয় দিতে পারে না।”
ট্রেন ততক্ষণে এগিয়ে গেছে। শেষের কথাগুলো শুনতে পেল কিনা, কে জানে।


