একলা বৈশাখ : বাঙালির নববর্ষের রঙ্গরস

একলা বৈশাখ : বাঙালির নববর্ষের রঙ্গরস

বৈশাখ একলা। বড় নিঃসঙ্গ। বছরের শুরুর মাস—কিন্তু তার সাজগোজ দেখে মনে হয়, সে যেন সদ্য পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্র, মাথায় ঝাঁঝালো রোদ, গায়ে ধুলোর জামা, আর পকেটে লু-হাওয়ার চিঠি। বসন্তের রঙিন বিদায়ের পর সে আসে একটু রাগী, একটু রুক্ষ। তবে তাকে একেবারে অবহেলা করাও যায় না—কৃষ্ণচূড়া এসে কানে কানে বলে যায়, “দেখিস, তোরও দিন আসবে!” তাই বৈশাখ মাঝে মাঝে লজ্জা পেয়ে লাল হয়ে ওঠে।

কিন্তু এই একলা বৈশাখই বাঙালির কাছে নববর্ষের নায়ক! বাঙালি বড় বিচিত্র জাতি—রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে, বিদ্যুতের বিলের ভয়ে কাঁপতে কাঁপতেও সে নববর্ষে নতুন পাঞ্জাবি পরে, মুখে মিষ্টি হেসে বলে, “শুভ নববর্ষ!” যেন এই একদিনেই সমস্ত দুঃখ-দুর্দশা ‘রিস্টার্ট’ হয়ে যাবে।

সেকালে বৈশাখ মানেই ছিল একেবারে অন্য রকম গল্প। তখন ‘হালখাতা’ ছিল প্রধান অনুষ্ঠান। দোকানদাররা খাতা খুলে বসতেন, আর গ্রাহকেরা একটু লজ্জা, একটু ভয় আর একটু মিষ্টির আশায় হাজির হতেন। দেনা শোধের চেয়ে মিষ্টি খাওয়াটাই যেন বড় উদ্দেশ্য ছিল! দোকানদারও বুঝতেন—“বাঙালি এসেছে মানেই সন্দেশ চাইবে”—তাই আগেভাগেই প্রস্তুতি থাকত।

সকালবেলায় উঠেই নতুন জামা, তারপর পাড়ার মন্দিরে প্রণাম, বাড়িতে পান্তা-ইলিশ বা লুচি-আলুরদম—সব মিলিয়ে একেবারে পারিবারিক, আন্তরিক উৎসব। মোবাইল ছিল না, সেলফি ছিল না, তাই হাসিটাও ছিল একটু বেশি খাঁটি।

এখনকার বৈশাখ একটু আধুনিক হয়েছে। এখন ‘হালখাতা’ মানে শুধু খাতা নয়—সাথে ‘ফ্ল্যাট ২০% ডিসকাউন্ট’, ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান’! দোকানে ঢুকলেই মনে হয়, নববর্ষ নয়, যেন যুদ্ধ চলছে—কে কতটা অফার লুফে নিতে পারে!

সকালবেলা আর কেউ তাড়াতাড়ি ওঠে না—কারণ আগের রাতে “পয়লা বৈশাখ স্পেশাল লাইভ কনসার্ট” দেখে রাত ২টা পর্যন্ত জেগে থাকতে হয়েছে। তারপর ঘুম থেকে উঠে প্রথম কাজ—“শুভ নববর্ষ” লিখে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট। বাস্তবে কাউকে প্রণাম না করলেও ভার্চুয়াল প্রণামে কোনো কার্পণ্য নেই!

নতুন জামা পরে ছবি তোলা এখন একপ্রকার ধর্মীয় আচার। খাবার খাওয়ার আগে তার ছবি—“#PoilaBoishakh #BengaliFood #Tradition”—এই সব হ্যাশট্যাগ না দিলে যেন নববর্ষই অসম্পূর্ণ।

বাঙালি বড় অদ্ভুত। সে একদিকে খুব আবেগপ্রবণ—নববর্ষ মানেই তার কাছে নতুন সূচনা, নতুন স্বপ্ন। আবার অন্যদিকে সে ভীষণ আলস্যপ্রিয়—নতুন বছরের রেজোলিউশন করে, কিন্তু ১৫ই বৈশাখেই ভুলে যায়!

সে বলবে, “এবার থেকে নিয়মিত ব্যায়াম করব”—কিন্তু রোদ একটু বাড়লেই বলে, “বৈশাখে আবার ব্যায়াম! শরীর খারাপ হয়ে যাবে!”
সে বলবে, “কম খাওয়া উচিত”—কিন্তু পান্তা-ইলিশ, মিষ্টি, ফিরনি দেখে সব প্রতিজ্ঞা গঙ্গায় ভাসায়।

একলা বৈশাখ, কিন্তু বাঙালি একা নয়

আসলে বৈশাখ যতই একলা হোক, বাঙালি তাকে একা থাকতে দেয় না। সে তাকে গান দিয়ে, কবিতা দিয়ে, খাবার দিয়ে, হাসি দিয়ে ভরিয়ে তোলে।
রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজে – “এসো হে বৈশাখ” আর বাঙালি মনে মনে ভাবে, “এসো ঠিকই, তবে একটু কম গরম নিয়ে এসো!”

শেষ পর্যন্ত বৈশাখ বুঝে যায় – সে যতই রুক্ষ হোক, এই বাঙালির কাছে সে প্রিয়। কারণ বাঙালি জানে, নতুন বছর মানে শুধু ক্যালেন্ডার বদলানো নয় -মনের ভেতরে একটু নতুন আলো জ্বালানো।

তাই বৈশাখ আর একলা থাকে না -সে হয়ে ওঠে বাঙালির হাসি, রসিকতা আর চিরন্তন আশার সঙ্গী।

শুভ নববর্ষ!

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ – শ্যামলকৃষ্ণ বসু ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম চরণ [ আদিকান্ড ২

Read More »

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ – শ্যামলকৃষ্ণ বসু ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম চরণ [ আদিকান্ড ২

Read More »

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা

Read More »

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা

Read More »