নববর্ষ বরণের সাত সতেরো

নববর্ষ বরণের সাত সতেরো

রেখা রায়

আমরা বাঙালীরা দুটি নতুন বছর উদযাপন করি। একটি ইংরেজি নববর্ষ। অন‍্যটি বাংলা নববর্ষ। ইংরেজি নববর্ষ আসে রাত বারোটার পর জাহাজের ভোঁ, তোপের গুম গুম আর বাজীপটকার শব্দকে সঙ্গী করে, নতুন গুড়ের গন্ধ মেখে, মরশুমী ফুলে রঙিন হয়ে, হিমেল রাতে। বড় সরব তার উপস্থিতি…আমি এসেছি গোওওও…আমায় দ‍্যাখো…

অন‍্য দিকে বাংলা নতুন বছর আসে ভোরবেলা গঙ্গাস্নান সেরে, শুচি স্নিগ্ধ হয়ে, হাসিমুখে প্রথম আলোকে সঙ্গী করে, বেল জুঁইয়ের গন্ধ মেখে।
একটি আসে ১লা জানুয়ারীতে, অন‍্যটি ১লা বৈশাখে বা ১৫ এপ্রিল।

আমাদের ১লা বৈশাখ আসে সিদ্ধিদাতা গনেশ আর সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর পুজো দিয়ে। তারপর সারা বছর ভাইবোন মালা চন্দনে ধূপে আর সিঁদুরে পুজো পাবেন। তাঁদের ঠাঁই হবে দোকানের কুলুঙ্গিতে, গৃহস্থদের ঠাকুর ঘরে। দোকানে দোকানে হালখাতা খোলার ধুম। টাকা জমা দিয়ে মিষ্টির প‍্যাকেট নেয়া, সরবত বা কোল্ড ড্রিঙ্কস পান করা নতুন বছর বরণের অঙ্গ। কোথাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হয় ছোটদের মধ‍্যে।
১লা বৈশাখে শহরতলিতে গোষ্ঠমেলা বসে। মাটির পুতনা গড়া হয়। কোথাও কুমীর গড়া হয় দেখেছি। কলকাতার জেলেপাড়ার সঙ বিখ‍্যাত ছিল এই উপলক্ষ‍্যে। নতুন জামাকাপড় কেনা শুরু হয়ে যায় গোটা চৈত্র মাস জুড়ে। চৈত্র সেলের কী যে মহিমা, বছর শেষে বোঝা যায়। গ্রামেগঞ্জে এখনো বছরের শেষে ঝাঁপ, গাজন, চড়ক ইত‍্যাদি উৎসব পালন করা হয়। মানতের ভক্তরা দোরে দোরে মাধুকরীতে আসে। এখনো সঙ দেখা যায়। চৈত্রের শেষে বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা বাজারে এসে যায়। গৃহস্থের টেবিলে হাতের কাছে শোভা পায়।

★ অনেক পূর্বে মার্গ শীর্ষ হিসেবে অগ্রহায়ণকেই বছরের প্রথম মাস ধরা হত। অগ্র অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ, হায়ণ মানে ব্রীহি বা ধান জন্মায় যে মাসে। মহাজনরা এই সময় খাতক অর্থাৎ কৃষককে দাদন দিতেন এবং ঋণ শোধেরও কাল এটি। পুরোনো খাতা বাতিল হয়ে নতুন হালখাতা তৈরি হত। পরবর্তীকালে বিশাখা নক্ষত্রযুক্ত বৈশাখী পূর্ণিমা থেকে এল বৈশাখ। তবে কবে থেকে সেটা জানা যাচ্ছে না।

বিশ্বে প্রথম পঞ্জিকা সৃষ্টির গৌরব হল মিশরীয়দের। নীলনদের বন‍্যা আর সমকালীন আকাশের গ্রহনক্ষত্রাদির অবস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পঞ্জিকা তৈরি করেছিল তারা।
বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে সম্রাট আকবরের কথা বলেন অনেকে। তবে আকবরের রাজত্বের কয়েক শতক আগে দুটি শিব মন্দিরে “বঙ্গাব্দ” শব্দটি পাওয়া গেছে। অনুমান করা হয় সপ্তম শতাব্দীর রাজা শশাঙ্ক বাংলা পঞ্জিকার উদ্ভাবক। পরবর্তীকালে আকবর খাজনা ও রাজস্ব আদায়ের জন‍্য পরিবর্তন করেন। ১৫৫৬, ৫ নভেম্বর থেকে সেটি কার্যকর হতে থাকে।

এখন প্রশ্ন হল আকবর পরিবর্তন করলেন কেন? বলা হয় যে…চাঁদের ওপর নির্ভর করে হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে চলত মোগল সাম্রাজ‍্য। কিন্তু কৃষিকাজ মিলত না চাঁদের হিসেবে। খাজনা দিতে অসুবিধে হত কৃষকদের। তাই তাদের কথা ভেবে আকবর পঞ্জিকা সংস্কারের ভার দেন জ‍্যোতির্বিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে। তিনি সৌর সন ও হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে বাংলা সনের নিয়ম তৈরি করেন। সেটাই কার্যকর হয়। বছরের নাম হয় “ফসলি সন”। পরে বঙ্গাব্দ করা হয়। চৈত্রের মধ‍্যে খাজনা মিটিয়ে দিতে হত। কৃষকদের জন‍্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতেন এবং তাদের মধ‍্যে মিষ্টি বিতরণ করতেন আকবর। হালখাতার প্রচলনও তখন থেকেই।

নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের দেশ ভারতবর্ষে ১৫ এপ্রিল সকলের নতুন বছরের শুরু নয়। অবাক লাগলেও এটাই সত‍্যি। কলকাতা হল ছোট ভারতবর্ষ। এখানেই আমরা লক্ষ‍্য করি নতুন বছরের নানা রকম আবাহনী, বছরের ভিন্ন ভিন্ন দিনে।
★ ভারতবর্ষে প্রথম চিনা উপনিবেশ গড়ে উঠেছে কলকাতার উপকণ্ঠে বজবজের আছিপুরে(দ.২৪ পরগণা)। চিন থেকে আনা দেবতা আমাদের ঘরের দেবতা হয়ে উঠেছেন। নাম হয়েছে খুদা খুদি। চিনাম‍্যান তলা নববর্ষে সেজে ওঠে ড্রাগন আর রঙিন কাগজের ফুলে। কলকাতায় চিনে পাড়াও এভাবেই সেজে ওঠে। ওদের নতুন বছরের শুভারম্ভ হয় তিথি অনুযায়ী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারীর মধ‍্যে। নববর্ষের নাম “য়ুয়ানদান”।

★ পার্সীরা ২১ মার্চ থেকে ২৩ মার্চের মধ‍্যে তিথি অনুযায়ী যে কোনো একদিন নতুন বছরের উৎসব পালন করেন। সাতটি “স” যুক্ত দ্রব‍্য দিয়ে সাজানো হয় তাদের “নওরোজ” ডালি। সিব, সির, সম্বাল, সারতি, সামুখ, সুমনল। আপেল,রসুন, লাল নীল ফুল, মধু, মাছ ইত‍্যাদি।

★ কাশ্মীরীরা ৩০ মার্চ “নভর” উৎসব পালন করেন। মিষ্টি বিতরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,আড্ডা আর হৈ হৈ-তে সব সম্প্রদায়ের মানুষের অবাধ আমন্ত্রণ।

★ অন্ধ্রের মানুষের নববর্ষ হল “যুগাডি”। শুধু অন্ধ্র নয়, তেলেঙ্গানা, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্রে যুগাডি পালন করা হয় এপ্রিলে, তিথি অনুযায়ী। এ বছর ১৩ এপ্রিল পালন করলেন তাঁরা। ব‍্যাপক খাওয়াদাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সারাদিনের শপথ…
১/খারাপ কথা বলব না
২/খারাপ জিনিস দেখব না
৩/খারাপ কথা শুনব না

★ তিথি মেনে আগস্টের ১৪, ১৫ বা ১৬ তারিখ নতুন বছর শুরু হয় কেরালিয়ানদের। এ দিন বাড়ির বয়স্ক মহিলারা কাকভোরে উঠে বাড়ির সকলকে বিছানা ছাড়তে বলেন। শশা, ফুল, কাঁঠাল, নারকেল, প্রদীপ, আয়না, সাদা রঙের নতুন কাপড় আর সোনার অলংকার দিয়ে গড়া হয় সমৃদ্ধির দেবতা “ভিসুকানি”-কে। বাড়ির সকলে চোখ বন্ধ করে বিছানা ছেড়ে ভিসুকানি দর্শন করে আগে। তারপর তাদের পারিবারিক উৎসব।

★ তামিল ভাষাভাষীদের নববর্ষ “পুথান্দু” আসে তিথি মেনে ১৩ বা ১৪ এপ্রিল। কেরালার “ভিসুকানি”-র সঙ্গে আচার অনুষ্ঠানের বেশ মিল আছে। তবে তারিখ আলাদা।

★ আমরা যেদিন ভাইফোঁটার উৎসব করি তার আগের দিন গুজরাটিরা পালন করেন “সাভান্ত” উৎসব। সকালে স্নান সেরে নতুন জামাকাপড় পরে মন্দিরে পুজো দেয়া সেদিনের প্রথম কাজ। তারপর আত্মীয়স্বজনদের বাড়ি যাওয়া আসা।
ব‍্যবসায়ীরা ঘর রঙ করেন এবং নতুন হালখাতা করেন।

★ অসমীয়ারা এবং পাঞ্জাবীরা ১লা বৈশাখেই নববর্ষের উৎসব পালন করেন। “রঙ্গালি বিহু”-তে অসমীয়ারা পরস্পরকে নতুন গামছা দিয়ে হৃদ‍্যতা জানান। পরিবেশ সচেতনতার পাঠ নেয়া ঐ দিন এঁদের একটি বিশেষ কাজ।

গুরু গোবিন্দ সিং হলেন শিখদের দশম গুরু। তিনি ১লা বৈশাখেই “খালসা” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গুরুদ্বারে গানবাজনা, কীর্তন, ভজন আর খাওয়াদাওয়া চলে ভালোরকম।

★ আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশে ১৪ এপ্রিল নববর্ষের উৎসব পালন করা হয়। সব সম্প্রদায়ের জন‍্য উন্মুক্ত নববর্ষের উৎসব। “ছায়ানট”-এর উৎসব এটি। রমনার বটমূল থেকে শুরু হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। রঙিন এবং বর্ণময় সে শোভাযাত্রা। জাতিসংঘ একে হেরিটেজ হিসেবে মেনে নিয়েছেন। ৯০-এর দশকে পান্তাভাতের সঙ্গে ইলিশ যুক্ত হয়ে নানা রকম ভর্তাসহযোগে সকাল থেকে হৈ হৈ রৈ রৈ চলে।
পূর্বে একটি পার্কে উৎসব হত অনাড়ম্বর ভাবে। ১৯৬৫ থেকে রমনা পার্কের বটতলা থেকে আনন্দময় শোভাযাত্রার শুরু হয়।

তবে একসময় লোকসংস্কৃতি ছিল বর্ষবরণের প্রধান অঙ্গ। মানুষে মানুষে মিলনে রচিত হত মহাযজ্ঞ। এখন বিশ্বায়নের খাতিরে সে হৃদ‍্যতা আজ আর নেই। লোকসংস্কৃতি অবহেলিত। বিদেশি খাবারের স্বাদ পেতে গৃহস্থ আজ রেস্তোরাঁভিমুখী। বাঙালি খাওয়াদাওয়াও অবহেলিত।

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

অবিভক্ত নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলার নববর্ষ উদযাপন

সুব্রত দাস অবিভক্ত নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলা থেকে আগত অধিবাসীদের বাংলা নববর্ষ উৎসব সবচেয়ে বড়ো উৎসব। সর্বজনীন দুর্গোৎসব শুরু হ‌ওয়ার আগে দুর্গা পূজা যেহেতু কতিপয়

Read More »

একলা বৈশাখ : বাঙালির নববর্ষের রঙ্গরস

নবকুমার দাস বৈশাখ একলা। বড় নিঃসঙ্গ। বছরের শুরুর মাস—কিন্তু তার সাজগোজ দেখে মনে হয়, সে যেন সদ্য পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্র, মাথায় ঝাঁঝালো রোদ, গায়ে

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

অবিভক্ত নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলার নববর্ষ উদযাপন

সুব্রত দাস অবিভক্ত নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলা থেকে আগত অধিবাসীদের বাংলা নববর্ষ উৎসব সবচেয়ে বড়ো উৎসব। সর্বজনীন দুর্গোৎসব শুরু হ‌ওয়ার আগে দুর্গা পূজা যেহেতু কতিপয়

Read More »

একলা বৈশাখ : বাঙালির নববর্ষের রঙ্গরস

নবকুমার দাস বৈশাখ একলা। বড় নিঃসঙ্গ। বছরের শুরুর মাস—কিন্তু তার সাজগোজ দেখে মনে হয়, সে যেন সদ্য পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্র, মাথায় ঝাঁঝালো রোদ, গায়ে

Read More »

পয়লা বৈশাখে

অভিজিৎ চৌধুরী আস্তে আস্তে মানুষ বুঝতে পারে তার খুব একটা বন্ধু নেই।অথচ সে যে পয়লা বৈশাখে শুরু করেছিল জীবনে তাতে দুজন বন্ধু ছিলই।অকৃত্রিম বন্ধু –

Read More »