বৈশাখের প্রথম দিনে…

বৈশাখের প্রথম দিনে…

বাগানের বড়ো বেলগাছটার সমস্ত পাতা ঝরিয়ে চৈত্রের দিন অবসানের ঘোষণা করল রাতের এক পশলা বৃষ্টি। মাটির সোঁদা গন্ধের সঙ্গে জুঁইয়ের গন্ধ মিশে বৈশাখ তার বার্তা শুনিয়ে দিয়ে গেল। পাড়ার মোড়ে চৈত্রের শেষ শনিবার মা শীতলা এসে ভক্তদের ভালোবাসায়, ভক্তিতে আপ্লুত হয়ে বিদায় নেওয়ার পর থেকেই গুনগুন করে গাইছি— “এসো হে বৈশাখ, এস এস…”

যবে থেকে বাহ্যিক জ্ঞান হয়েছে, তবে থেকেই দেখে এসেছি—১লা বৈশাখ দিনটা একটা বিশেষ দিন। চৈত্র মাসের সেলে হাতিবাগান বা দমদম নিউ মার্কেট ঘুরে ঘুরে মা নতুন ছিটকাপড় কিনে জামা বানাত আমাদের জন্য। বুকে, ঘাড়ে কুঁচি, হাতে আর গলায় লেসের বর্ডার দেওয়া একরকম জামা, আর সেই সঙ্গে নতুন জুতো পরে সেদিন যেন নিয়মের বাইরের এক অন্যরকম জীবনযাপন।

ভাষা সংসদ অনুবাদ পত্রিকার দপ্তরে সেদিন সকাল থেকেই নানা অনুষ্ঠান, লেখক-সমাগম। বাবা নতুন সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে সকাল আটটার মধ্যেই বেরিয়ে পড়তেন দপ্তরের উদ্দেশ্যে—সঙ্গে আমি আর বোন। সাহিত্যিক, অনুবাদক, পাঠকদের ভিড়ে সেদিন অফিসটা যেন অন্য এক রূপ নিত। ধূপের গন্ধ, ফুলের মালা, মাটির ভাঁড়ের দুধ-চা, মিষ্টি আর সিঙাড়ার সহাবস্থান—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মায়াজাল।

আমার কাজ ছিল—যতজন আসছেন, তাঁদের মাটির কলসী থেকে জল দেওয়া। বাবা বলতেন, “তুমি শুধু একটা শরীরকে জল দিচ্ছ ভেবো না। একটা আত্মা, যা যেকোনো মুহূর্তে পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হতে পারে—জল সেই আত্মা থেকে পরমাত্মায় পৌঁছনোর যোগসূত্র।” ছোটোবেলায় এত গভীর কথা বুঝতাম না, কিন্তু সেই অভ্যাস আজও রয়ে গেছে। বাড়িতে বা দপ্তরে কেউ এলেই আগে জল এগিয়ে দিই।

বাবা বিকেল হলেই আমাদের নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। তারপর দুধসাদা অ্যাম্বাসাডার গাড়িতে চড়ে পৌঁছে যেতাম আউট্রাম ঘাটে। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করে উঠত গঙ্গা। হাতে স্কুপ আইসক্রিম আর বেলুন—সেদিন আমরা প্রজাপতির মতো ঘুরে বেড়াতাম। রাতে কোনো এক রেস্তোরাঁয় খেয়ে বাড়ি ফেরা।

তখন জানতাম না—এই পয়লা বৈশাখ আসলে কিসের উৎসব। মনে মনে ভাবতাম, “এসো হে বৈশাখ…” গান দিয়েই বুঝি এর সূচনা। প্রভাতফেরিতে দল বেঁধে সেই গান গাইতে গাইতে, নাচতে নাচতে পাড়ার পথে ঘুরে বেড়াতাম। শেষে হাতে আসত মিষ্টি, শুকনো আলুর দম আর দুটো লুচির প্যাকেট। সেই স্বাদ, সেই আনন্দ—পরের বৈশাখ পর্যন্ত মনে গেঁথে থাকত।

আরও কিছুদিন পরে, যখন ইতিহাস পড়তে ভালো লাগছে, তখন একদিন বাবা বললেন—
“জানিস, এই উৎসবের সূচনা করেছিলেন কে? মোঘল সম্রাট জালালউদ্দিন মুহাম্মদ আকবর।”

সম্রাট তাঁর দরবারের বিশিষ্ট জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন হিজরী চান্দ্র বর্ষপঞ্জিকে সৌর বর্ষপঞ্জিতে রূপান্তরিত করার। ৯৯২ হিজরী, অর্থাৎ ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে এই হিজরী সৌর বর্ষপঞ্জীর সূচনা হয়। তার আগে বঙ্গে প্রচলিত শকাব্দের প্রথম মাস ছিল চৈত্র। কিন্তু ৯৬৩ হিজরী সালের মুহাররম মাস পড়েছিল বৈশাখে, তাই বৈশাখকেই ধরা হয় বঙ্গাব্দের প্রথম মাস হিসেবে, আর ১লা বৈশাখ হয়ে ওঠে নববর্ষ।

মোঘল আমল থেকেই পয়লা বৈশাখে প্রজারা চৈত্রের শেষে খাজনা পরিশোধ করতেন, আর নববর্ষে জমিদাররা মিষ্টিমুখ করিয়ে আনন্দ করতেন। ব্যবসায়ীরা শুরু করেন ‘হালখাতা’। লাল কাপড়ে মোড়া নতুন খাতার ওপরে লেখা থাকত— “এলাহী ভরসা”—যার উৎস আকবরের ‘তারিখ-ই-এলাহী’।

বৈশাখ এলেই তাই স্মৃতি ভিড় করে। পয়লা তারিখে দপ্তরে পা রাখামাত্র নিজেকে বাবার মতো ভাবার চেষ্টা করি। রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, সারদা, অরবিন্দ, মা কালী, যিশু, মক্কা-মদিনা—সব ধর্মের প্রতীককে ফুলের মালা দিয়ে সর্বধর্ম সমন্বয়ের প্রয়াসে, লেখক-পাঠকের ভিড়ে মনে মনে বলি— “এসো প্রাণ, এসো।”

প্রথম সূর্যের আলোয় যেন মুছে যায় সব অশুভ।
তবু ফিরে পাই না ছোটোবেলার সেই উষ্ণতা—
লেখকদের প্রাণখোলা হাসি, পাঠকের সই চাওয়ার বিনীত আবদার।

তবুও এই বিশেষ দিনে ভাষা সংসদের দপ্তর সেজে ওঠে ফুল-মালায়, লেখকদের পদধূলিতে, ভালোবাসার স্পর্শে। তার আগের কয়েকদিন ধরে চলে ঘর গুছোনোর প্রস্তুতি। নানা দপ্তর থেকে আমন্ত্রণ এলেও কোথাও যাওয়া হয় না—কারণ, এখানে আমার অপেক্ষায় থাকেন বহু গুণীজন।

তাঁদের স্পর্শে মনে হয়—এইটুকুই তো পরম প্রাপ্তি।
বাকিটা সবই তুচ্ছ।

তাই আলাদা করে হালখাতা খুলে বসি না।
বরং জীবনের খাতায় লিখে রাখি সেই মুহূর্তগুলো—
যেগুলো সারা বছর ধরে একটু একটু করে জোগান দেয়
আরও বেশি ভালোবাসার।

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

যোগক্ষেমংবহামহ্যম

সেবানন্দ পণ্ডা আজ কলকাতায় প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় জল জমে গেছে। রাস্তা আর রাস্তা নেই; ওগুলো সব খাল বিল হয়ে গেছে। কলেজ স্ট্রিটে প্রচুর

Read More »

অবিভক্ত নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলার নববর্ষ উদযাপন

সুব্রত দাস অবিভক্ত নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলা থেকে আগত অধিবাসীদের বাংলা নববর্ষ উৎসব সবচেয়ে বড়ো উৎসব। সর্বজনীন দুর্গোৎসব শুরু হ‌ওয়ার আগে দুর্গা পূজা যেহেতু কতিপয়

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

যোগক্ষেমংবহামহ্যম

সেবানন্দ পণ্ডা আজ কলকাতায় প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় জল জমে গেছে। রাস্তা আর রাস্তা নেই; ওগুলো সব খাল বিল হয়ে গেছে। কলেজ স্ট্রিটে প্রচুর

Read More »

অবিভক্ত নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলার নববর্ষ উদযাপন

সুব্রত দাস অবিভক্ত নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলা থেকে আগত অধিবাসীদের বাংলা নববর্ষ উৎসব সবচেয়ে বড়ো উৎসব। সর্বজনীন দুর্গোৎসব শুরু হ‌ওয়ার আগে দুর্গা পূজা যেহেতু কতিপয়

Read More »

একলা বৈশাখ : বাঙালির নববর্ষের রঙ্গরস

নবকুমার দাস বৈশাখ একলা। বড় নিঃসঙ্গ। বছরের শুরুর মাস—কিন্তু তার সাজগোজ দেখে মনে হয়, সে যেন সদ্য পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্র, মাথায় ঝাঁঝালো রোদ, গায়ে

Read More »