ধারাবাহিক উপন্যাস
শ্যামলী রক্ষিত
ষষ্ঠ পর্ব
এক মাস যাবৎ মা বিছানায় পড়ে আছেন। উঠেবসতে পর্যন্ত পারছেন না। মুখে কোনো কথা বলছেন না। সে কিছু বললে শুধু একবার চোখ খুলে তাকান, আর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ে।
মালবিকা বুঝতে পারছিল, মায়ের খুব কষ্ট হচ্ছে। সে জানে, তার কথাই ভেবে মায়ের এই কান্না। তিন-চার দিন অবস্থা একদমই খারাপ। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। শক্ত কিছু খেতে পারছেন না—মালবিকা সামান্য ফলের রস খাইয়ে দিচ্ছে।
এইভাবে আর কতদিন? বুকটা টনটন করে ওঠে তার। মা বিছানায় শুয়ে থাকলেও তবু আছেন। কিন্তু আজ সকাল থেকে মায়ের নিথর দেহের পাশে বসে আছে সে। বসে বসে কত কথা যে ভাবছে!
তার জন্যই কি বাবা-মায়ের জীবনের সমস্ত হাসি, সমস্ত আনন্দ মুছে গেল? বাবা পাগলের মতো অনেক চেষ্টা করেছিলেন তার জন্য। যদি কোনো গরিব, লেখাপড়া-জানা, ভদ্র-সভ্য ছেলে পাওয়া যায়—বাড়ি-ঘর, টাকা-পয়সা, গয়নাগাটি যা আছে সব দিয়ে তাকে ঘরজামাই করবেন। বাবার সে কী টেনশন! হন্যে হয়ে খুঁজেছেন।
সবসময় বলতেন,
— “তোর একটা ব্যবস্থা কিছু করতেই হবে মা। তোর তো কোনো ভাইবোন নেই, দাদা নেই, দিদি নেই, মামা-মাসি-পিসি কেউ নেই। তোর শুধু বাবা-মা-ই সম্বল। তাই তোকে নিয়ে চিন্তার অন্ত নেই। আমরা চোখ বুজলে তোর কী হবে—এই ভেবে ভেবেই আমার রাতের ঘুম চলে গেছে!”
মালবিকা বলত,
— “এত টেনশন করছ কেন বাবা! তুমি তো এত চেষ্টা করলে! না হলে কী করা যাবে? তোমার হাতে তো কিছু নেই।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন,
— “কী আর করব মা! সত্যিই তো হাত-পা বাঁধা। কিন্তু শেষপরিণতিতে তোর কী হবে, সেটা ভেবেই বড় অস্থির লাগে।”
— “অত চিন্তা করো না বাবা। বাড়িটা আছে, ব্যাংকে টাকা রেখেছ—কোনো অসুবিধা হবে না।”
— “আমি কি দেখব মা! যতদিন বেঁচে আছি ততদিন ঠিক আছে। তারপর?”
— “ঈশ্বর আছেন বাবা। তিনি যা ভালো বুঝবেন তাই করবেন।”
কিন্তু সেই দুশ্চিন্তা করতে করতেই মানুষটা একদিন চলে গেলেন।
মালবিকা ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যতদিন বাবা বেঁচে ছিলেন, ততদিন তার কোনো হতাশা জাগেনি, কোনো অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা ছিল না। বাবা-মা দুজনেই তাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ তাঁদের নিজেদের মনে শান্তি ছিল না এক মুহূর্তের জন্যও।
দিন দিন বাবা প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পড়ছিলেন। বলতেন,
— “একেবারে একা থেকে কি কেউ বাঁচতে পারে? তোর জন্য একজন আপনজনও থাকবে না! কী করে বাঁচবি মা?”
মা-বাবা মনে করতেন, তার এই অবস্থার জন্য তারাই দায়ী। এক অদ্ভুত অপরাধবোধ তাঁদের তাড়িয়ে বেড়াত। মৃত্যুশয্যাতেও বাবা তার হাত ধরে বলেছিলেন,
— “আমাকে ক্ষমা করে দিস মা। আমি তোর অপদার্থ বাবা। সন্তানের সংসারজীবনের ব্যবস্থা করে দেওয়া বাবা-মায়ের কর্তব্য। আমি তা করতে পারলাম না…”
মালবিকার চোখ ভরে ওঠে। নিজেকে সামলাতে পারে না। আজকাল মাঝেমাঝেই খুব হতাশ লাগে তার। মনে হয়—আরও কঠিন, আরও ভয়ংকর দিন সামনে অপেক্ষা করছে।
সারাটা দিন একা একা মুখ বুজে বসে থাকতে হয়। কোথাও বেরোতে পারে না। বাড়ির ভেতর ভয়ংকর নীরবতা। ঘরে মা পড়ে আছেন যেন এক নিঃশব্দ, প্রাণহীন শরীর। মাঝে মাঝে শুধু চোখ খুলে তাকান—কিন্তু সেই চোখে কোনো চেনা দৃষ্টি নেই।
মালবিকা গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে মায়ের চোখের কোণ থেকে ধীরে ধীরে জল গড়িয়ে পড়ে—নির্জন পাহাড়ের বুকে নেমে আসা এক নিঃশব্দ ঝরনার মতো।
ডাক্তারবাবুকে বহুদিন ধরে আসতে বলছে, কিন্তু তিনি আর বাড়ি আসছেন না। ফোনে কথা শুনে যতটুকু সম্ভব চিকিৎসা করছেন। হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টাও করেছে—কোথাও বেড নেই।
এখন বাড়িতেই ভিডিও কলে চিকিৎসা চলছে। ডাক্তার বলেছেন—
“আর কিছু করার নেই। যতদিন আছেন, বাড়িতেই যত্ন নিন।”
টিভি খুললেই শুধু আতঙ্কের খবর। চারদিকে মৃত্যুর সংবাদ। মন আরও খারাপ হয়ে যায়। গান শোনার মনও নেই।
শুধু অপেক্ষা—দীপালী কবে আসবে! ও এলে দুটো কথা বলে একটু স্বস্তি পাওয়া যায়। কিন্তু আজ এখনও এল না কেন? কোনো বিপদে পড়ল নাকি?
বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে রইল মালবিকা—দীপালীর পথ চেয়ে।
(চলবে)


