৬ : সংস্কৃতির অনুবাদ

৬ : সংস্কৃতির অনুবাদ

অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা - তৃষ্ণা বসাক

১ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

২ : অনুবাদের অপযশ

৩ : অনুবাদ- ও  সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা

৪ : শাসকের ভাষা, শাসিতের ভাষা এবং অনুবাদকের অবস্থান

৫ : অনুবাদকের সংকট

৬ : সংস্কৃতির অনুবাদ

তৃষ্ণা বসাক 

Eugene Nida

অনুবাদের বহু বিফলতার পাশাপাশি সাফল্যও কিন্তু কম নয়। খ্রিস্টধর্মের প্রসারের পেছনে অনুবাদের বিরাট একটা ভূমিকা আছে। বাইবেলের মূল ভাষা হিব্রু ও গ্রিক। এ ভাষা দুটিতে রচিত বাইবেল সহজপ্রাপ্য নয় এবং ভাষা দুটোও অত্যন্ত কঠিন। মধ্যযুগে খ্রিষ্টান সম্প্রদায় গ্রিকভাষা থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত বাইবেলের উপরেই নির্ভর করত। ল্যাটিন ভাষা কারো মাতৃভাষা ছিল না। শুধু ধর্মগুরুরা এ ভাষা চর্চা করতেন। ফলে বাইবেল সম্পর্কে খ্রিষ্টান জনগণ কিছুই জানত না। ধর্মগুরুরা জনগণের ভাষায় বাইবেল অনুবাদের ঘোর বিরোধিতা করতেন। খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতকের শেষদিকে প্রসিদ্ধ ধর্মগুরু ‘John Wycliffe’- জন উইকলিফ (১৩৩০-১৩৮৮) সর্বপ্রথম বাইবেলকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন। এ অপরাধে খ্রিষ্টান চার্চের পক্ষ থেকে তাঁকে এবং তাঁর অনূদিত বাইবেলের পাঠকদেরকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারার শাস্তি প্রদান করা হয়। উইকলিফের মৃত্যু হওয়ার কারণে চার্চের নির্দেশে তাঁর মৃতদেহ কবর থেকে তুলে আগুনে পুড়িয়ে ছাইগুলো নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তবে এতে অনুবাদকরা পিছিয়ে যান নি। অনুবাদকদের বিপুল তরঙ্গমালায় চড়ে পৃথিবীর নানা ভাষায় ছড়িয়ে পড়ে বাইবেল। কিন্তু সেই অনুবাদ যে সর্বত্র সমান হয়নি, তার অনেক নিদর্শন দেওয়া যায়।

পবিত্র বাইবেলের প্রথম বাক্য ‘‘In the beginning God created the heaven and the earth’’। কেরি: ‘‘আদিতে ঈশ্বর আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি করিলেন।’’ জুবিলী: ‘‘আদিতে যখন পরমেশ্বর আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকাজ শুরু করলেন।’’ বা-২০০০ ও মো.-০৬: ‘‘সৃষ্টির শুরুতেই ঈশ্বর/ আল্লাহ মহাকাশ ও পৃথিবী/ আসমান ও জমীন সৃষ্টি করলেন।’’ (আদিপুস্তক/ পয়দাশে ১/১)

এখানে ইংরেজি ‘গড’ শব্দকে বাংলায় ঈশ্বর, পরমেশ্বর ও আল্লাহ বলা হয়েছে। মূল হিব্রুতে শব্দটা ‘এলোহিম’ (Elohim)। এলোহিম শব্দটা বহুবচন, এর অর্থ ঈশ্বরগণ। এর একবচন: ‘এল’ (El), যার অর্থ ঈশ্বর। একজনকে বোঝাতে বহুবচনের সর্বনামের ব্যবহার বিভিন্ন ভাষায় দেখা যায়। যেমন রাষ্ট্রপতির ঘোষণায় তিনি বলেন ‘আমরা, প্রেসিডেন্ট…’। অনেক সময় লেখক নিজের বক্তব্য বা মত বুঝাতে ‘আমি’ না বলে ‘আমরা’ বলেন। এভাবে যে কোনো ভাষায় ব্যক্তি নিজেকে বুঝাতে অনেক সময়ই বহুবচনের সর্বনাম ব্যবহার করে। তবে এক ব্যক্তিকে বুঝাতে নিজের নাম (proper noun) বা সাধারণ বিশেষ্য (common noun)-এর বহুবচন ব্যবহার কোনো ভাষাতেই পাওয়া যায় না। এখানে মূল অনুবাদ হওয়া দরকার ছিল: আদিতে ঈশ্বরগণ, পরমেশ্বরগণ….!

ইহুদি-খ্রিষ্টান পণ্ডিতরা বিভিন্নভাবে এর ব্যাখ্যা করেন। কেউ বলেন, সৃষ্টিকর্তার মর্যাদা বুঝাতে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো কোনো খ্রিষ্টান প্রচারক দাবি করেন, ঈশ্বরের ত্রিত্ব বা ত্রিত্ববাদ বুঝাতে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। বিরুদ্ধবাদীরা দাবি করেন যে, বহুবচন কখনোই ‘তিন’ বুঝায় না; বরং তেত্রিশ কোটিও বুঝাতে পারে। কাজেই বহুবচন দ্বারা তিন দাবি করা একেবারেই ভিত্তিহীন। এছাড়া ‘ত্রিত্ববাদে’ ঈশ্বর বহুজন বা তিনজন নন; বরং একজন। তাঁকে Gods, ঈশ্বরগণ, পরমেশ্বরগণ ইত্যাদি বলা যায় না। ঈশ্বর একাধিক বলে ধারণা করা খ্রিষ্টধর্মে কুফরী বলে গণ্য। কাজেই বাইবেলের এ ব্যবহার দ্বারা ত্রিত্ববাদ প্রমাণ করা যায় না; বরং ত্রিত্ববাদ খণ্ডন করা যায় এবং বহু-ঈশ্বরবাদ প্রমাণ করা যায়। সর্বাবস্থায় এক্ষেত্রে অনুবাদের সঙ্গতিপূর্ণ (Consistent) হবার  দাবি ছিল, অনুবাদেও বহুবচন ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় ব্যাখা বা টীকা লেখা।

বাইবেলের ব্যবহার থেকে বোঝা যায় যে, worship বলতে ‘সাজদা’ করা বুঝানো হয়েছে। আরবি বাইবেলে ‘worship ’ শব্দটার প্রতিশব্দ হিসেবে ‘সাজদা’ লেখা হয়েছে এবং ‘সার্ভ’ (serve) শব্দটার প্রতিশব্দ ‘ইবাদত’ বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে মূল হিব্রু শব্দটা আমরা জানতে পারছি না। তবে হিব্রু ও আরবি উভয়ই সেমিটিক ভাষা এবং প্রায় একই শব্দ ও বাক্যরীতি ব্যবহার করে। এতে প্রতীয়মান যে, মূল হিব্রু ভাষার ‘সাজদা’ বা তদর্থক শব্দকেই ইংরেজিতে ‘ worship ’ শব্দে অনুবাদ করা হয়েছে। বাংলা কেরির অনুবাদে শব্দটার অর্থ ‘প্রণিপাত’ লেখা হয়েছে। এতেও বোঝা যায় যে, মূল শব্দটা ‘সাজদা’ বা ‘প্রণিপাত’। এছাড়া বাইবেলে বিভিন্ন স্থানে bow down অর্থাৎ মাথা নোয়ানো বা সাজদা করা এবং worship বা ইবাদত করাকে সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এতে জানা যায় যে, বাইবেলের পরিভাষায় worship অর্থ সাজদা করা।

যাত্রাপুস্তক/হিজরত ২০/৫ শ্লোকে ঈশ্বর ভিন্ন অন্য দেবতা বা প্রতিমার ইবাদত নিষেধ করে ঈশ্বর বলছেন: ‘‘Thou shalt not bow down thyself to them, nor serve them’’। কেরির অনুবাদ: ‘‘তুমি তাহাদের কাছে প্রণিপাত করিও না, এবং তাহাদের সেবা করিও না।’’ কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদ: ‘‘তোমরা তাদের পুজাও করবে না, তাদের সেবাও করবে না।’’ আরবি বাইবেল: ‘‘لا تسجد لهن ولا تعبدهن’’, অর্থাৎ ‘‘তোমরা তাদের সাজদাও করবে না, তাদের ইবাদতও করবে না।’’ একই কথা বলেছেন ঈশ্বর দ্বিতীয় বিবরণ ৫/৯ শ্লোকে এবং একই অনুবাদ করা হয়েছে আরবি ও বাংলায়।

এভাবে আমরা দেখছি যে, worship  বা ইবাদত এবং বাউ ডাউন (bow down) উভয় শব্দই আরবিতে সাজদা এবং বাংলায় প্রণিপাত, সাজদা/ সেজদা বা পূজা অনুবাদ করা হয়েছে। বাউ ডাউন (bow down) বা সাজদা করার আরেকটা বাইবেলীয় পরিভাষা (fell on his face) মুখের উপর পড়ে যাওয়া, উবুড় হয়ে পড়া বা মাটির উপর মুখ রাখা এবং (fell on the ground) মাটির উপর পড়ে যাওয়া। (দেখুন: আদিপুস্তক/পয়দায়েশ ১৭/৩; যিহোশূয়/ যোশুয়া ৫/১৪; ১ শমূয়েল ২০/৪১; ২ শমূয়েল ৯/৬; ১ রাজাবলি ১৮/৭; মথি ২৬/৩৯; মার্ক ৯/২০; ১৪/৩৫; লূক ৫/১২)

এ থেকে আমরা নিশ্চিত হই যে, বাইবেলের পরিভাষায় উবুড় হওয়া, মাটিতে পড়া, সাজদা করা, প্রণিপাত করা ও ইবাদত করা একই অর্থে ব্যবহৃত।

পবিত্র বাইবেলে অধিকাংশ স্থানে একমাত্র ঈশ্বরকে ‘worship’  করতে বলা হয়েছে। অন্য কোনো দেবতা, প্রতিমা বা বস্ত্তকে ‘worship’ করতে নিষেধ করা হয়েছে। (যাত্রাপুস্তক ২০/৫; ৩৪/১৪; দ্বিতীয় বিবরণ ৫/৯; ৩০/১৭; ২ রাজাবলি ১৭/৩৬; মথি ৪/১০…) কিন্তু এর বিপরীতে বাইবেলে অনেক স্থানে নবীরা বা বশ্বাসীরা ঈশ্বর ছাড়া অন্য ব্যক্তিকে worship (worship) এবং বাউ ডাউন (bow down/ fell on his face) করেছেন। আমরা দেখেছি যে, বাইবেলীয় পরিভাষায় worship অর্থ সাজদা বা ইবাদত করা এবং বাউ ডাউন, উপুড় হওয়া বা মুখের উপর পড়ার অর্থও সাজদা করা। অর্থাৎ তাঁরা ঈশ্বর ছাড়া অন্যদের সাজদা করতেন। এছাড়া তাঁরা অন্যদের সাজদা ও ইবাদত গ্রহণ করেছেন। উপুড় হওয়া এবং মুখের উপর পড়ে যাওয়ার কথা- অর্থাৎ সাজদা করার কথা তো অনেক স্থানেই বিদ্যমান। এছাড়া ঈশ্বর ছাড়া অন্যকে ‘worship’ অর্থাৎ ইবাদত করার কথাও বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে। ইংরেজি বাইবেলে এ সকল বিষয় খুবই সুস্পষ্ট। উইলিয়াম কেরির অনুবাদ অনেকটাই মূলাশ্রয়ী। সকল ক্ষেত্রেই worship শব্দটার অর্থ লেখা হয়েছে ‘প্রণিপাত করা’, অর্থাৎ সাজদা করা। কিন্তু ‘কিতাবুল মোকাদ্দস’ নামক বাংলা বাইবেলে এক্ষেত্রে অনেক হেরফের করা হয়েছে। একই শব্দ কখনো পূজা, কখনো সালাম, কখনো ‘সেজদা’ ইত্যাদি রকমারি অনুবাদ করা হয়েছে। এতে ইহুদি ও খ্রিষ্টান নবীরা ও ধার্মিকরা যে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের সাজদা করতেন তা পাঠক জানতে পারছেন না। বরং তারা জানছেন যে, তারা আল্লাহর সাজদা বা পূজা করতেন আর ফেরেশতা, নবী ও অন্যদেরকে ‘উবুড় হয়ে’ সালাম করতেন বা সম্মান দেখাতেন। অন্য সকল ফেরেশতা, নবী, বাদশাহ ও ধার্মিকের মতই যীশু খ্রিষ্টকেও সে যুগের ধার্মিক বা ভক্তরা এভাবে ‘সাজদা’ করে ‘সম্মান’ করতেন। কিন্তু কিতাবুল মোকাদ্দসে নবী, বাদশাহ, ধার্মিক বা ফেরেশতাদের ক্ষেত্রে  ‘worship’, ‘বাউ ডাউন’ বা ‘ফেল অন হিজ ফেস’ বলতে সালাম, সম্মান প্রদর্শন বা কদমবুছি শব্দ ব্যবহার করছেন।

(বাংলা হাদিস)

প্রতিটি ভাষার নিজস্ব দেশজ , কালজ, সাংস্কৃতিক স্বাদ আলাদা। সেইরকম প্রতিটি লেখকের আছে নিজস্ব শেড ও নুয়েন্স যার মানে নিজস্ব ব্যঞ্জনা, মূর্ছনা। বাংলার ইতু, পাঞ্জাবের বৈশাখী,  কেরালের ওনাম –এসব হচ্ছে টপিকাল সংস্কৃতি।  যেরকম কিনা পশ্চিমের হ্যালুইন। হিন্দি বলয়ের সাগাই, মেহেন্দি, সঙ্গীতের সঙ্গে বাঙ্গালির পাকা দেখা, আইবুড়োভাত মেলে না। সামাজিক ভাবে অনুকরণপ্রিয় বাঙালি এসবই আপন করতে চেষ্টা করছে। এমনকি হনুমান ও গণেশ পুজোকেওকিন্তু যখন সাহিত্যের অনুবাদ হবে, তখন প্রতিটি অঞ্চলের লোকজ ও দেশজ সৌরভ যাতে বজায় থাকে সে চেষ্টা অনুবাদককে করতে হবে।

‘অনুবাদ ও সংস্কৃতি বিষয়ে নিউমার্ক বলছেন যে, সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্যের কারণে সাংস্কৃতিক-পূর্বানুমান ও মূল্যবোধগুলো প্রতিটি সংস্কৃতির নির্দিষ্ট মানসিক বৈশিষ্ট্য তৈরি করে দেয়। এবং ধরে নেওয়া যায়, এ বৈশিষ্ট্যগুলো কোন কোন সংস্কৃতিতে খুব কাছাকাছি। তাই বলে দুটো ভিন্ন সংস্কৃতির মানসিক বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি  একরকম হয় এমন ঘটনা নিতান্ত বিরল। এই মানসিক বৈশিষ্ট্যগুলো নির্দিষ্ট সংস্কৃতির ভাষায় প্রতিফলিত হয়; আর ভাষা হচ্ছে এক ধরনের অদৃশ্য দেয়াল যা বিভিন্ন সংস্কৃতির কাছে পৃথিবীকে বিভিন্নভাবে দেখায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পশ্চিমা বিশ্বে ড্রাগন ভীষণ বিপজ্জনক প্রাণী অথচ প্রাচ্যদেশে সেটি সৌভাগ্যের প্রতীক। বাংলাদেশে কাউকে তুচ্ছার্থে ‘গরু’ বলা হলেও উত্তর আফ্রিকায় গরু সৌভাগ্যের প্রতীক।‘

(অনুবাদের কলা কৌশল, মোজাফফর হোসেন)

ছোটবেলায় যখন রাশিয়ান গল্পে বা অন্য দেশের গল্পে পরিজ বা সুরুয়া পেয়েছি, রসনা সিক্ত হয়ে উঠলেও বুঝে উঠতে পারিনি ওগুলো ঠিক কীরকম খাবার। পশ্চিম দেশের  বাচ্চারা মায়ের কাছ থেকে আলাদা শোয়, প্রত্যেকে প্রত্যেকের ঘরে আসার আগে অনুমতি নেয়, কিংবা বাচ্চারা বাড়ির কাজ করার জন্যে টাকা পায়- এগুলো বুঝতেও অসুবিধে হত।  বাইরে থেকে এলে অতিথির ছাতা রাখার, টুপি রাখার জায়গা অর্থাৎ আম্ব্রেলা স্ট্যান্ড বা হ্যাট স্ট্যান্ড রাখা গৃহ স্বামীর স্বাভাবিক শিষ্টতার মধ্যে পড়ে, যেমন আগেকার দিনে গ্রামে অতিথি এলেই তার জন্যে  নতুন, নিদেন পক্ষে কাচা গামছা আর হাত পা ধোবার এক ঘটি জল দাওয়ায় রাখা হত।  এই হচ্ছে সংস্কৃতির তফাত। মাসাইদের মধ্যে নিজের থুতু মাখিয়ে অতিথি আপ্যায়নের রীতি আছে। আমরা তেমনটা করতে চাইলে বিপদ আছে।

যখন সংস্কৃতি-বাহী  শব্দের (culture loaded words)  অনুবাদ করতে হয়, তখন তাদের  সাংস্কৃতিক তাৎপর্য  বুঝে সেইমত পরিকল্পনা করতে হয় অন্য ভাষায় তাদের নিয়ে যাওয়ার জন্যে। সেক্ষেত্রে সারফেস ট্রান্সলেশন না করে ভাষার ডিপ স্ট্রাকচারে চলে যেতে হবে।  ঐতিহ্যিক প্রথা, প্রবাদ বা ঐতিহাসিক প্রসঙ্গের অনুবাদের সমতুল শব্দ লক্ষ্য ভাষায় পাওয়া অসম্ভব , এটা জেনেই পথ খুঁজে নিতে হবে।

সেই পথ কী কী আছে?

১ Domestication and Foreignization ডোমেস্টিকেশন ও ফরেনাইজেশন। এক্ষেত্রে হয় উৎস ভাষার সংস্কৃতিবাহী শব্দটিকে লক্ষ্য ভাষার কোন শব্দ দিয়ে আপন করে নিতে হবে অথবা মূল শব্দটিকেই রাখতে হবে। ধরা যাক ইংরেজিতে আছে ফ্রেশ বাটার। আমরা তাকে বাংলায় ননী করতে পারি, কিংবা ফ্রেশ বাটারই রেখে দিতে পারি। টাটকা তোলা ননী আর প্যাকেটজাত বাজারের বাটার কিন্তু এক জিনিস নয়, এটা মাথায় রাখতে হবে।

২ Amplification and Footnotes পরিবর্ধন এবং ফুটনোট – অনেকসময় মূল শব্দটিকেই রেখে নিচে ফুটনোটে অনুবাদক শবটির ব্যাখ্যা দেন। এতে অন্য সংস্কৃতিকে বুঝতে সুবিধে হয়। যেমন সম্প্রতি ‘দলিত’ বলে একটি মলয়ালম গল্প (ই কে শিবার) অনুবাদের সময় একটি শব্দ পেয়েছিলাম।  শব্দটি হল নিলাভিলাক্কু। এটা অবিকল রেখে নিচে ফুটনোট ব্যবহার করলাম।- নিলাভিলাক্কু (নিলাম- মাটি, ভিলাক্কু- প্রদীপ)- নিলাভিলাক্কু তেলের বড় প্রদীপ দানি, যা মাটিতে বসানো থাকে, ও শুভ অনুষ্ঠানে জ্বালানো হয়) 

৩ Idiomatic Translation প্রবাদের অনুবাদ। ধরা যাক একটি বাংলা প্রবাদ- ‘ভাল কথা পড়েছে মনে আঁচাতে আঁচাতে, ঠাকুরঝিকে নিয়ে গেল নাচাতে নাচাতে’- এর সারফেস অর্থাৎ অপরের স্তরের  অনুবাদ করলে চলবে না। এই ছোট্ট দুই লাইনের মধ্যে ভরা আছে বাল্য বিবাহের অভিশাপ এবং সমাজে মেয়েদের জীবনের  মূল্যহীনতার কথা । নাবালিকা ননদ ও তার ছোট্ট বউদিদি স্নানে গেছে, সেখানে নদীর স্রোতে ননদ ভেসে গেছে আর সে কথা বেমালুম ভুলে গেছে বৌটি। খেয়ে উঠে  আঁচাতে আঁচাতে জল দেখে মনে পড়েছে ননদের ভেসে যাবার কথা। অনুবাদে সেই  গল্পটা উঠে আসতে হবে।   

৪ Contextual Adaptation বা প্রাসঙ্গিক অভিযোজন- অনুবাদককে এক্ষেত্রে উৎস ভাষার কথাবস্তুর সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গকে বিশ্লেষণ করতে হয় এবং সেইভাবে অনুবাদকে অভিযোজিত করতে হয়।

ব্রিটিশ বিয়েতে বরের সঙ্গে থাকে বেস্টম্যান। ইংরেজি  ভাষার কোন সাহিত্যে বিয়ের প্রসঙ্গ যখন তুর্কি ভাষায় অনুবাদ হয় , তখন দেখা যায় তুর্কি সংস্কৃতিতে বেস্টম্যন বলে কিছু নেই, আছে sağdüş and soldüş যারা বরের ডান দিকে ও বাঁ দিকে থাকে। তাই অভিযোজন করে বেস্টম্যানের বদলে sağdüş and soldüş করাই যায়।

একটি গ্রীষ্মপ্রধান দেশের মানুষের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় বরফ গলানো কখনই আইস ব্রেকিং-র যথাযথ ভাষান্তর নয়। একইরকম লোন উলফ, সোয়ান সঙ, হোয়াইট এলিফ্যান্ট  বা এলিফ্যান্ট ইন দা রুম- এসব বোঝা শক্ত।  আবার  ‘তোমার মুখে ফুল চন্দন পড়ুক’ বা হিন্দির ‘তেরে মু মে ঘি শক্কর’- র  আক্ষরিক ইংরেজি  অনুবাদ করতে গেলে কোন অভারতীয় অনুবাদক সমস্যায় পড়বেন।   তাই অভিযোজন জরুরি।

অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা - তৃষ্ণা বসাক

৫ : অনুবাদকের সংকট

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

১০ : জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারায় স্ট্রিট লিটারেচার

This entry is part 6 of 6 in the series অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী ১ : বাস্তববাদ ও

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

১০ : জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারায় স্ট্রিট লিটারেচার

This entry is part 6 of 6 in the series অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী ১ : বাস্তববাদ ও

Read More »