ধ্রুপদী সাহিত্য
শ্যামল কৃষ্ণ বসু
[ অযোধ্যাকান্ড ১ ]
| ১০ |
সত্য পথ
রাম দৃঢ়পদে এগিয়ে চলেছেন কোশল ভবনের দিকে। লক্ষন তাঁর অনুসারী। রাম স্থিতধী। তার মুখে কোন ভাবান্তর নেই। শান্ত দৃষ্টি। তিনি উৎসব মন্ডপের পাশ দিয়ে দ্রুতপদে চলেছেন। চারদিকে অভিষেকের বিপুল আয়োজন সম্ভার। রাম সেদিকে তাকিয়ে ও দেখলেন না। রাম দ্রুতপদে মাতা কৌশল্যার মহলে গিয়ে উপস্থিত হলেন।
কৌশল্যা তখন পূজার ঘরে। শ্বেতপট্টবস্ত্রে শুদ্ধাচারিনী হয়ে তিনি আজ পুত্রের মঙ্গল কামনায় বিষ্ণুর পূজা করছেন। ঘরে হোম যজ্ঞ হচ্ছে।পুরোহিতের মন্ত্র পাঠ, ঘৃতাগ্নির পবিত্র গন্ধ। পূর্নকুম্ভে শ্বেতপুষ্পের মালা । স্বর্ণপাত্রে নৈবেদ্য পায়েস।
রাম মাতা কৌশল্যার কাছে উপস্থিত হলেন। রামকে দেখে মায়ের মুখে দিব্য আভা ফুটে উঠল। পুত্রকে সাদরে কাছে ডাকলেন। হাতে পূজার প্রসাদ দিতে গেলেন। অঞ্জলি প্রসারিত করে রাম বললেন,‘মাতা নিবেদন করি এক দুঃসংবাদ। তোমার, লক্ষণের ও সীতার সমূহ বিপদ উপস্থিত হয়েছে !’
মাতা কৌশল্যা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন , ‘ বিপদ ? কিসের বিপদ রাম ?’
রাম অশ্রু অবরুদ্ধ কন্ঠে বলে ওঠেন, ‘ মাতা আপনাকে বলি, পিতা মহারাজ ভরতকে রাজত্ব দিয়েছেন আর আমাকে দিয়েছেন নির্বাসন দণ্ড সুদুর মহারণ্যে’।
তোমারে কহিতে কথা আমি ভীত হয়ি ।
প্রমাদ পাড়িল মাতা বিমাতা কৈকেয়ী ।।
বিমাতার বচনে আমায় যাইতে হইল বন ।
ভরতেরে রাজ্য দিতে বিমাতার মন ।। [ কৃত্তিবাস ]

কৌশল্যার বুকে যেন শেল বিদ্ধ হ’ল। তিনি কুঠারাঘাতে ছিন্ন শাল তরুর মত অথবা শাখী কদলীর মত ভূমিতে মূর্চ্ছিত হয়ে পড়লেন। হায় হায়, এ কি নিদারুণ সংবাদ পুত্র ? আমার রামের বনবাস? তবে এই যে এত উদ্যোগ, এত আয়োজন, এত যে আশা, এত আনন্দ, এ সবই কি তবে সব বৃথা? হায়, রাম তবে রাজা হবে না? তাকে যেতে হবে বনবাসে চোদ্দ বছরের জন্য?
কৌশল্যা বিলাপ করতে লাগলেন,‘হায় মহারাজ, এ আপনার কি বিচিত্র মতি ? কৈকেয়ী দুর্মতি রাক্ষসীর এত প্রিয় আপনি ? আপনার প্রানপ্রিয় ভার্যা কৈকেয়ী। আর সেই কৈকেয়ী কি না ঘটালেন এই রকম সর্বনাশ।’
রাম এইবার দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মাতা কৌশল্যাকে দুই বাহু বেস্টন করে সান্ত্বনা দেবার চেস্টা করেন। কিন্তু কোন সান্ত্বনার ভাষা তার মুখে আসে না।
কৌশল্যা রোদন করে বলতে থাকেন,‘ হায় রাম, তোমাকে কোলে ধরে আমার কপালে কি এত দুঃখ ছিল? এর থেকে বন্ধ্যা হওয়াও তো ভালো ছিল। হায় স্বামীন, আমি তোমার অনুরাগ ভালবাসাও কখনো পাইনি। ভেবেছিলাম পুত্রের মুখ দেখে শান্তি পাবো। কিন্তু রাজমহিষি হয়ে ও আমি আজও উপেক্ষিতা আজও অনাদৃতাই রয়ে গেলাম আপনার কাছে !’
শ্রীরাম বলেন,‘মাতা, এ যে দৈবের অঘটন। বিমাতার দোষ নহে বিধির লিখন। পিতৃ সেবা করেছেন বিমাতা বারে বার। দুই বর দিতে পিতা করেছিলেন অঙ্গীকার।’
আজি আমি রাজা হব সকলের আগে,
শুনিয়া বিমাতা সেই দুই বর মাগে ।।
এক বরে ভরতে করিতে দন্ড ধর ।
আর বরে বনবাস আমার চোদ্দ বৎসর ।। [কৃত্তিবাস ]
লক্ষণ আবার অসংযত হয়ে ওঠে। – ‘ না , না, রাঘব ! রাজ্য ত্যাগ করে আপনি বনে গমন করবেন এ হতে পারে না। এ অন্যায় আমি কিছুতেই সহ্য করব না। পিতার কিছু মাত্র ধর্মজ্ঞান থাকলে কেউ এমন দেবতুল্য পুত্রকে ত্যাগ করতে পারেনা। একজন কুটিলা স্ত্রী লোকের কথায় আপনি রাজ্য ত্যাগ করবেন না। অনার্য কৈকেয়ীর অনুবর্তী হয়ে পিতা যদি এমন শত্রুতা করেন তাহলে আমি তাকে বন্দী করব।’
কৌশলা এক্ষণে উগ্রভাবে বলে ওঠেন,‘লক্ষন, পুত্র আমার, তুমি ঠিক কথাই বলেছো ! রাম, তুমি অনুজ লক্ষণের কথা শুনলে ? যদি মনে করো তবে তাই করো। আমি বলছি। তবু এ ঘোর অন্যায় হতে দিও না।‘
কৌশল্যা বলেন রাম কি বলে লক্ষ্মণ।.
বিমাতার বাক্যে তুমি কেন যাবে বন ॥
অযশ রাখিল রাজা নারীর বচনে।
স্ত্রীবাধ্য পিতার বাক্যে কেন যাবে বনে।
স্ত্রীর বাক্যে যিনি পুত্রে পাঠান ‘কাননে।
এমন পিতার কথা না শুনিহ’ কাণে ॥ [কৃত্তিবাস]
লক্ষণ হুংকার দিয়ে বলে ওঠে, ‘ আজ আমি আমাদের বুদ্ধিভ্রষ্ট বিকল পিতাকে নিজ হাতে কারাগারে বন্দি করব এবং অনার্যা নারী কৈকেয়ীকে আমি সর্বসমক্ষে হত্যা করব।’
রাম তীব্রভাবে বলে ওঠেন,‘লক্ষ্মণ, লক্ষ্মণ , শান্ত হও। তোমার এই উগ্র অনার্য বুদ্ধি ত্যাগ করো। আমি অনুরোধ করছি আমি কোন হিংসা দেখতে চাই না। আমার প্রতি তোমার স্নেহ যে কত গভীর তাও জানি। কিন্তু ধর্মই সত্য। সত্য প্রতিষ্ঠিত ধর্মে। ভাই ,পিতার আজ্ঞা পালন করলে কারও ধর্ম’হানি হয় না। লক্ষ্মণ, আমি তোমার গভীর স্নেহ জানি, তোমার বিক্রমও জানি। কিন্তু যে ব্যক্তি ধর্মকে আশ্রয় করেছে সে পিতা মাতা বা ব্রাহ্মণকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গ করতে পারে না। অতএব তুমি তোমার অনার্য ক্ষত্রবুদ্ধি ত্যাগ কর।’
রাম কৃতাঞ্জলি হয়ে নতমস্তকে কৌশল্যাকে বললেন, মাতা, আমাকে বনে যেতে অনুমতি দিন । আমি পিতৃবাক্য পালন ক’রে আবার ফিরে আসব। আপনার, আমার, বৈদেহীর, লক্ষণের এবং মাতা সুমিত্রার শ্রেষ্ঠ ধর্ম এই, যে আমরা পিতার আজ্ঞানুবর্তী হব।’
লক্ষ্মণ ক্রুদ্ধ গজরাজের ন্যায় বিস্ফারিত নয়নে রয়েছেন দেখে রাম তাঁকে বললেন, সৌমিত্রি, ক্রোধ শোক অপমানবোধ এক্ষণে পরিহার কর। আমার অভিষেকের জন্য যেমন উদ্যোগী হয়েছিলে এখন অভিষেক নিবৃত্তির জন্য সেইরূপ চেষ্টা কর। আমার অভিষেকের সংবাদে যিনি পরিতপ্ত হয়েছেন সেই মাতা কৈকেয়ীর শঙ্কা যাতে দূর হয় তা করো। আমাদের পিতারও ভয় তবে দূর হোক। তুমি জান যে আমি মাতৃগণের ভেদ করি না। মাতা কৈকেয়ীও আমাকে নিজ পুত্রের সমান জ্ঞান করতেন। তথাপি তিনি উগ্রবাক্যে অভিষেক নিবারিত করেছেন ! লক্ষ্মণ দৈবই এর কারণ ! নতুবা এই সৎস্বভাবা গুণবতী মাতা কৈকেয়ী একজন সাধারন গ্রাম্যনারীর ন্যায় স্বামীর সমক্ষে আমাকে ক্লেশকর বাক্য কেনই বা বলবেন ? ভাই লক্ষ্মণ,কর্মফল ভিন্ন যার সম্বন্ধে আমাদের কোনও জ্ঞান নেই, সেই দৈবের সঙ্গে কে যুদ্ধ করবে? ‘
লক্ষ্মণ বললেন,‘ রাম, আপনার পরিবর্তে অন্যের অভিষেক? কি ভাবে সম্ভব? না, না, আমি এই লোক-নিন্দিত অসহনীয় বিষয় কিছুতেই সইতে পারছি না। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। যে ধর্ম আপনার বুদ্ধির দ্বৈধ উৎপাদন ক’রে আপনাকে মোহগ্রস্ত করেছে, সেই ধর্মকে আমি দ্বেষ করি, হ্যাঁ , আমি সেই ধর্মকে দ্বেষ করি । আপনি যাকে দৈব বলছেন তাতে আমার আস্থা নেই, না, কোনই আস্থা নেই। যিনি বিহ্বল যিনি বীর্যহীণ তিনি দৈবের অনুসরণ করুন। যারা বীর, যারা আত্মনির্ভরশীল তারা কখনোই দৈবের উপাসনা করে না। পুরুষকার দ্বারা দৈবকে যে বাধা দিতে সমর্থ সে দৈবক্রমে অকৃতার্থ হ’লেও অবসন্ন হয় না , সে কখনোই পরাভব মানে না । আজ সর্বলোকে দৈবের শক্তি ও পুরুষের পৌরুষ দেখবে, আজ দৈব ও মানুষের বলাবল প্রকট হবে। যারা তোমার রাজ্যাভিষেক দৈব কর্তৃক ব্যাহত দেখেছে আজ তারাই সেই দৈবকে আমার পৌরুষে পরাভূত দেখবে।’
রাম স্থির নেত্রে তাকিয়ে থাকেন অনুজ লক্ষ্মণের দিকে। এ এক শান্ত সৌম্য মূর্তি । সেই মূর্তিতে না কোন রাগ কিংবা কোন অভিমান না কোন দুঃখ না কোন দ্বেষ ।
নির্নিমেষ সেই মূর্তি দেখে অনুজ লক্ষন ভীষণ অবাক হয়ে বলেন,‘ রাম, আপনি আমার অগ্রজ। আপনি এই বিষম সংকটে এখনো স্থিতধী হয়ে রয়েছেন কি ভাবে? আমি বুঝতে পারছি না।’
রাম বললেন,‘ ভাই লক্ষ্মণ, আমরা কখনো পিতা-মাতার বাক্য লঙ্ঘন করতে পারি না এবং পারা উচিত ও নয়। পিতা আমাকে জন্ম দিয়েছেন। তিনি না হলে আমি এই পৃথিবীর রূপ রঙ রস সৌন্দর্য মহিমা প্রত্যক্ষ করতে পারতাম না। লক্ষন এই হতাশা, এই ক্ষোভ, এই রাগ বর্জন কর। কি হবে তোমার এই আক্ষেপে ? একজন না এক জন আমাদের ভাই, রাজা দশরথের একজন পুত্র ও তো রাজ সিংহাসনে আসীন হবেন এবং রাজ্য শাসন করবেন। না হয় সেই কয় বৎসর আমি বনবাসে ঋষিসঙ্গ লাভ করব। এই পৃথিবীর অনেক তীর্থ ভ্রমন করব।’
তারপর রাম করজোড়ে কৌশলাকে বললেন, ‘মা, তুমি আমার জননী। আমার পরম পুজ্যা। তুমি এই ক্রোধ ও শোক সংবরণ করো। ধৈর্য ধরো। অপমানকে হৃদয়ে স্থান দিও না। এ দৈব। এ ভবিতব্য। এজন্য কেহই বিন্দুমাত্র দোষী নয়। মাতা কৈকেয়ী পিতাকে বঞ্চনা করেছেন। এখন তুমিও কি মহারাজা দশরথ, যিনি তোমার স্বামী, আমার পরম পুজ্য পিতা, তাঁকে ত্যাগ করবে? নারীর পক্ষে সে যে অতি নিষ্ঠুর কাজ। এ কথা চিন্তা করাও পাপ। এ কাজ তুমি কখনোই করো না মা। পিতা তবে বাঁচবেন কি করে?’
কৌশল্যা রামের স্নেহ বিগলিত কথাগুলি যেন সহ্য করতে অপারগ। তিনি ক্রন্দন করেই চলেছেন এবং বললেন ,‘রাম, রামাভদ্র, পুত্র আমার, তোমার কথায় আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। এই অনাচার দেখার আগে আমার কেন মৃত্যু হল না , হায় আমার কেন মৃত্যু হল না ! ‘
রাম বলে ওঠেন,‘ মাতা আমার কথা শুনুন। পিতার আদেশ পালন করাই আমার দৃঢ় সংকল্প । সেই আমার সত্য পথ।’
কৌশল্যা বিলাপ করতে থাকেন এবং বলেন,‘ রাম তোমার পিতৃ সত্য তোমার ধর্ম। কিন্তু আমি কি নিয়ে থাকব বলতে পারো রাম ? আমার স্বামী আমাকে করলেন হতমান। আমার পুত্র আজ কেন বনে যান ?’
রাম বললেন,’মহারাজ দশরথ, তিনি তোমার আমার দুজনেরই গুরু। তাঁকে সেবা করা এবং তাঁর আজ্ঞানুবর্তি হওয়াই তো আমাদের কর্তব্য। মা আমাকে বনে যেতে দাও। আর দেখো যেন পিতা মনে কোন কষ্ট না পান। আমি তোমার হাতে পিতার ভার দিয়ে গেলাম। আমি পিতৃসত্য পালন করতে বাধ্য। সেই আমার সত্যপথ।’
কৌশল্যা আজ অশান্ত। পুত্র বিচ্ছেদভার সেই হেতু এহেন অসন্মান অপমান এক মাতৃহৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। এই ক্ষোভ সহজে শান্ত হবার নয়।
রাম বললেন, ‘মাতা, অনুমতি কর, আমি এক্ষণে যাই তবে সীতা সমীপে। সেখানে না জানি তাঁকে প্রবোধ দিতে কত সময় লাগবে । তুমি পিতার কাছে থাক। আমাকে পিতৃসত্য পালন করতে দাও।’
এক্ষনে ক্রন্দনরতা কৌশল্যা বলেন,‘ যাও বাছা রাম। তুমি যেখানে ইচ্ছা যাও। তুমি তোমার সত্য পথে যাও। আমি তোমায় ধরে রাখতে পারলাম না। সীতা হয়ত তোমাকে বেঁধে রাখতে পারে। সীতার থেকে তুমি বিদায় নেবে কেমন করে পুত্র। হয়ত তার অনুরোধ তুমি শুনবে। আমার আশীর্বাদ রইল তোমার তরে। তুমি ফিরে আসবে সেই আশায় আমি বুক বেঁধে থাকব।
না জানি হইবে কবে দেখা তব সনে ?
চৌদ্দ বৎসর বনবাস থাকিহ কুশলে ।।
যে মন্ত্র পাইনু ধ্যানে দিব তব কানে ,
অস্ট লোকপাল রক্ষিবেন আমার ছাওয়ালে।। [স্বরচিত ]
পিতৃসত্য পালিতে রাম মহাবীর এইবার চলিবেন বনবাসে। তাই ধীরপদে রাম এক্ষণে অগ্রসর হলেন তাঁর প্রিয় পত্নী সীতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এইবার বনবাসে বিদায় নিতে। মনে মনে ভাবতে থাকেন কেমন করে সীতাকে তিনি বনবাসের কথা বলবেন ? ‘
।১১।
লক্ষ্মণের বন গমনের চিন্তা
লক্ষ্মণ তবে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। রাম যাবেন তাঁর সত্যপথে। তিনি বনবাসে যাবেন স্থিরনিশ্চয়। বৃদ্ধ পিতার অপারগ ভূমিকা, মাতা কৈকেয়ীর অনমনীয় জেদ, রামের অত্যন্ত অভিমান, এ সবের কোন সমীকরনই আর মিলিয়ে উঠতে পারেন না অনুজ লক্ষ্মণ। শুধু এক নীরব দর্শক হয়ে তাকিয়ে থাকেন অগ্রজের দিকে ।
রাম এইবার যেতে গিয়ে ও ফিরে দাঁড়ান এবং প্রাণপ্রিয় ভ্রাতা লক্ষ্মণকে তার মনের আশঙ্কা প্রকাশ করে বললেন, ‘লক্ষ্মণ এখন বনগমনের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাকে চির বল্কল অজীন ধারণ করতে হবে। সীতা বনবাসের কথা শুনলে অবাক হয়ে যাবেন। সীতা অশ্রুপাত করতে থাকবেন। সীতা আরো কয়েকদিন হয়ত অপেক্ষা করে যেতে বলবেন। এ কি কঠিন পরিস্থিতি। বিদায় নেওয়া কি এত সহজ ? জনকনন্দিনী তবে সহজে মেনে নেবেন কি না কে জানে আমার বনবাস? ‘
লক্ষ্মণ বুঝি এক আশার আলো দেখতে পেলেন। কিন্তু কি বলবে বুঝে উঠতে পারেন না। তবে অগ্রজের তরফে বনবাসী না হওয়ার কোন লক্ষন ও অনুমিত হয় না। পিতার বারণ, মাতার হাহাকার, অনুজ এর সনির্বন্ধ অনুরোধ যিনি এড়িয়ে যেতে পারেন তাঁর এক প্রতিজ্ঞাপালন শর্তে, তাঁর কাছে জনক নন্দিনীর আঁখিলোর কি কোনরকম মুল্য পাবে? কে জানে? সে মুখে যা বলে কাজে ও তাই করে। সে যে সত্যপথ আশ্রয়ী।
লক্ষ্মণ বলে,‘ রাম,আমার অনুরোধ, আপনি বৈদেহীর মনে কোন দুঃখ দেবেন না। আমি আপনার সিদ্ধান্তকে আর একবার ভেবে দেখতে বলব। উত্তেজনার মাথায় সব সম্ভব অসম্ভব কথা মানুষ বুঝে উঠতে পারে না।’
রাম মুখে কিছু বললেন না। এক্ষনে তিনি চিন্তামগ্ন। লক্ষণের কথায় নীরবে মাথা নেড়ে সন্মতি জানিয়ে রাম এই বার নিজ ভবনের দিকে যেতে যেতে ভাবতে থাকেন সীতার কাছে কেমন করে এই সংবাদ পরিবেশন করবেন। কেমন করে সীতার কাছ থেকে বিদায় নেবেন। সীতাকে ত্যাগ করে এত দীর্ঘ সময়ের বনবাসই বা সে কেমন করে সম্ভব। সীতা কি সহজে যেতে দেবেন বনবাসে রামকে? একজন নারী স্বামী বিহনে এই বিশাল রাজপ্রাসাদের বিশাল মহলে কেমন করে কালাতিপাত করবেন একা একা? কেমন করে দীর্ঘ চোদ্দবৎসর স্বামীর জন্য অপেক্ষা করবেন সীতা ? কি বলবেন তিনি সীতাকে ? বনবাসের সংবাদে সীতা হয়তো শোকে মুর্চ্ছিতা হয়ে পড়বেন। অতঃ ?
রাম অনুভব করেন চরণ যেন চলতে চায় না ভবনের দিকে। হা সীতা ! লক্ষ্মণ রাঘবের দ্বিধান্বিত পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে মনে মনে নিরুদ্ধ শোককে সংবরন করার চেষ্টা করতে থাকে। কিছুই ভেবে উঠতে পারে না। কিছুই বলে উঠতে পারে না। নেহাত এক বিশ্রান্তিতে হতাশায় লক্ষ্মণ এক্ষনে প্রাঙ্গণের এক ধারে এক বৃক্ষ শাখে ঝোলান দোলনায় চোখ বুজে শুয়ে পড়েন। মনে মনে ভাবতে থাকেন এলোমেলো কত কথা।
অগ্রজ রাম বনবাসি হতে সংকল্প নিয়েছেন। কি অদ্ভুত। এ কেমন এক বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হল অযোধ্যার রাজ সিংহাসন ঘিরে ! পিতা দশরথ তাঁর এই প্রতিশ্রুত দুই বর তো মাতা কৈকেয়ীকে আগেই দিতে পারতেন। আজ এই রাজ্যাভিষেকের শুভমুহূর্তে এ কেমন এক অদ্ভুত অন্যায্য অনৈতিক ঘটনা সংঘটিত হয়ে গেলো অকস্মাৎ! এমন অবস্থা তো কাম্য ছিল না এমন সুখের রাজ্যে? কি হবে তবে এখন?
ভরত যদি সিংহাসনে বসেন তাহলে শত্রুঘ্ন অবশ্যই থাকবেন তাঁর সাথে। পিতা এবং তিন মাতাকে তারা দুজনেই দেখাশোনা করতে পারবে। তাঁরা কখনোই তাদের কর্তব্যে নিশ্চয়ই অবহেলা করবে না। তা হলে সেক্ষেত্রে সে নিজে যদি বনগমন করেন অগ্রজের সঙ্গে! – আহা, তেমন কি হয় না? হতে পারে না ? বাধা কোথায়? একা একা অগ্রজ যিনি বিচরন করবেন গহীন বনে, এ তো এক অসম্ভব কথা। ভাই হয়ে ভাইয়ের এই অসময়ে যদি কেউ সহায় না হয় তা হলে আর ধর্ম থাকে কেমনে ?
লক্ষ্মণ মনে মনে ভাবেন এই সঙ্কট মুহূর্তে তিনি ও রামের সঙ্গে বনে যাবেন। অন্তত যাওয়া উচিত।
যেমনই এ কথা মনে হওয়া, লক্ষ্মণ তড়িৎ বেগে উঠে বসেন এবং দ্রুতপদে এগিয়ে যান মাতা সুমিত্রাকে নিজ সিদ্ধান্ত জানাতে।
মাতা সুমিত্রা এখন বড় মা কৌশল্যাকে স্বান্তনা দিতে ব্যস্ত। এক্ষনে লক্ষ্মণ দেখতে পান ঊর্মিলা দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে। সে খুব উদ্বিগ্ন।
ঊর্মিলা লক্ষনের কাছে এসে উদগ্রীব ভাবে জিজ্ঞাসা করেন,‘ পিতা মহারাজ এ কি করলেন রামানুজ ? তিনি তার প্রিয় পুত্র রামকে বনবাসের আদেশ করলেন?‘
লক্ষ্মণ ভীষণ অস্থির চিত্তে বলে ওঠেন,‘ঊর্মিলা, রঘুকুলের আজ এক লজ্জাজনক দিন। এক ভীষণ ভীষণ দুঃসময়। রাম আমার অগ্রজ। তিনি বনবাসী হবেন বলে স্থির নিশ্চয় হয়েছেন। আমার মনে হয় ছোট ভাই হয়ে আমার অগ্রজ এর সাথে বন গমন করা উচিত এই মুহূর্তে। তুমি কি ব’ল ঊর্মিলা ?
ঊর্মিলা লক্ষনের মুখের দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। কিন্তু ওদিকে আবার কান্নার রোল উঠেছে। ক্ষনে ক্ষনে হাহাকার উঠছে রাজ প্রাসাদের অলিন্দে অলিন্দে অঙ্গনে অঙ্গনে কক্ষে কক্ষে ।
ঊর্মিলা ভাবনার কোন অবসর পায় না। ‘বনগমন’ সে কি রকম বিষয় তা যেন বোধের মধ্যে আসে না। সীতা দিদির ও না কি বন গমনের যোগ আছে শুনেছিল পিতৃগৃহে। বনগমন তো বানপ্রস্থের অঙ্গ। সে তো অন্য রকম ব্যাপার। সে তো বয়েসকালে পুত্রদের হাতে সংসারের ভার দিয়ে বনে যাওয়া। কিন্তু এখন রাঘবের বনগমন, সে কেমন ব্যাপার? অগ্রজ রাম যাবেন বনবাসে। সীতা দিদি কি রাঘবের পথ রোধ করে দাড়াবেন না ? কে জানে কি হতে চলেছে আজ ? আবার সৌমিত্রি ও বনগমনের কথা তুললেন। সে কি কারন ?
| ১২ |
সীতার সংকল্প
সীতা দেবার্চনা শেষ করে সালংকারা হয়ে হৃষ্ট চিত্তে স্বামীর আগমনের প্রতীক্ষা করছিলেন। আজ শ্রী রামচন্দ্রের অভিষেক। রাজা হবেন রাম। সীতা হবেন তার একমাত্র মহিষী। অযোধ্যার ইক্ষ্বাকু বংশের ছত্রছায়ায় সম্রাজ্ঞী হয়ে সিংহাসনে আসীন হবেন দেবী সীতা।
রাম আসবেন চতুরশ্বযুক্ত রথের পশ্চাতে কৃষ্ণগিরিতুল্য হস্তির পিঠে শ্বেতছত্র শোভায়মান হয়ে কাঞ্চনময় সিংহাসনে বসে। সঙ্গে থাকবে শতশলাকাময় রাজ ছত্র। হংসশুভ্র চামর। স্তুতি পাঠকগণ তাঁর চতুর্পার্শ্বে এবং বেদ পাঠরত বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ সেই সাথে।
রাম ভবনদ্বারে এসে নামবেন। সীতা প্রত্যক্ষ করেন সেই অকল্পনীয় দৃশ্য। রাম এসে তার সামনে দাঁড়াবেন। তিনি এগিয়ে এসে তাঁর হাত ধরবেন।
রাম বলবেন,‘এসো সীতা, আমরা আজ সিংহাসনে আসীন হব। তুমি রাজলক্ষ্মী সৌভাগ্যলক্ষ্মী হয়ে আমার বামপার্শ্বে সিংহাসনে অযোধ্যার রানী হয়ে শোভিত হবে। আমরা এই রাজ্যের প্রজাগনকে পুত্রবৎ স্নেহে পালন করব। রাজ্যবাসী আমাদের জয়গান করবেন। রাজা দশরথ, রানী কৌশল্যা তাদের প্রিয়পুত্র এবং পুত্রবধূকে দেখে আনন্দ পাবেন। তারা আশীর্বাদ করবেন।’
সীতা যেন দেখতে পাচ্ছেন সেই অনিন্দ্যকান্তি যুবরাজ রামকে মিথিলার রাজপ্রাসাদে প্রবাদপ্রতিম হরধনুকে যিনি অতি অনায়াসে বামহাতে তুলে নিয়ে তাতে জ্যা রোপন করে মাথার ওপরে তুলে দেবগন এবং পিতা এবং গুরু সকলকে বন্দনা শেষে এক চমৎকার টান মেরে সমস্ত পৃথিবী এবং দেবগন তথা মনুষ্যগন এবং ভূত সমুদয়গণকে চমৎকৃত করে হরধনুভঙ্গ করলেন। সে ছিল এক অলৌকিক দৃশ্য। সে ছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনা। স্বর্গের দেবগন পুষ্পবৃষ্টি করেছিলেন ।
অতঃ সীতা তার গলায় বরমাল্য দিলেন। আজ এতদবৎসর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও সেই শৌর্যময় দৃশ্য এখনো সীতা তার মনের মনিকোঠায় সাজিয়ে রেখেছেন।
এমন সময় রামকে অধোবদনে এবং বিষন্ন চিত্তে মত্ত সিংহের ন্যায় ভবনে প্রবেশ করতে দেখে সীতা এগিয়ে যান রামের কাছে। -‘এ কি রাঘব ! আপনি একা ? কি হয়েছে ? প্রভু, শুভ দিনে তোমাকে উদবিগ্ন দেখছি কেন ? আপনার শ্বেতছত্র,হংসশুভ্র চামর, স্তুতিপাঠক বন্দী এবং বেদজ্ঞ ব্রাহ্মনগন তোমার সঙ্গে নেই কেন ? তোমার অগ্রে কোথায় সেই চতুরশ্ব রথ, কৃষ্ণগিরিতুল্য হস্তী এবং কাঞ্চনময় সিংহাসন ? সেই রাজসম্ভার কেন এল না আপনার সঙ্গে ? অভিষেকের সময়ে তোমাকে নিরানন্দ দেখছি কেন ?’
রাম ফুল্লকুসুমসম সীতাকে ঠিক কি ভাবে এমন কঠিন সংবাদ জ্ঞাপন করবেন তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না। তীব্র অন্তরদহন রামকে বেদনাহত করে তুলেছে। এক দীর্ঘ সময়ের জন্য এক নিষ্ঠুর বিদায় গাঁথার ভাবনা তাঁর মনকে বিষাদময় করে তুলেছে।
সীতা আবার বলে ওঠেন, ’ রাঘব, আপনি তো পিতামহারাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন কেকয়মহলে ! কিন্তু আপনাকে তবে এমন উদ্ভ্রান্ত দেখছি কেন এখন ? নাথ, কোন কি দুঃসংবাদ ? আপনাকে আমি এ কি রকম হতমান , বিশুষ্ক বদন , উদ্ভ্রান্ত মন এবং বেদনাহত চিত্ত দেখতে পাচ্ছি ? কি হয়েছে আপনার ?
রাম বসে পড়েন এক চৌপায়ার উপরে। ইশারা করেন তিনি অতীব তৃষ্ণার্ত। তিনি জলপান করবেন।
সীতা এক্ষনে রাঘবকে ভৃঙ্গারে রক্ষিত পানীয় জল এগিয়ে দেন আপন হাতে। রাম তাকালেন দেবী সীতার দিকে এবং সীতার হস্তধৃত জল পাত্রকে ধরার ছলে সীতার হাত দুটিকে ধরে রাখলেন। কিছু তিনি বলতে চান।
সীতা অনুভব করেন এক অশনি সংকেত। এ কথা কাউকে বলে দিতে হয় না। অন্তর হতে অন্তরে সেই চিন্তা সেই বিষাদ আপনা হতেই ছড়িয়ে পড়ে।
সীতা এক্ষনে কম্পিত কলেবরে জিজ্ঞাসা করলেন,‘ কি সংবাদ রাঘব ? আজ শুভদিনে আপনাকে এমন উদবিগ্ন এমন ম্রিয়মান দেখছি কেন ? কোন কি দুঃসংবাদ ?’
রাম এবার পানীয় পাত্র হতে আশ্লেষে জল পান করে কিঞ্চিৎ সুস্থ হয়ে সীতার কথার উত্তর দিলেন,‘ সীতা আমি কি বলব তোমাকে। এ এক নিদারুন সংবাদ। হয়ত এই সংবাদ তোমার মন তোমার চিন্তা তোমার বোধকে নিদারুণ আঘাত করবে। কিন্তু এ সত্য এ অলঙ্ঘনীয় এ অচিন্ত্যনীয় এ এক অমোঘ আদেশ।’
সীতা অত্যন্ত অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ অমোঘ আদেশ ? অচিন্ত্যনীয় ? অলঙ্ঘনীয় ? নাথ , কি সে আদেশ ? কার আদেশ ?’
রাম অশ্রুসজল নেত্রে জানকীর দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে উচ্চারণ করে ওঠেন, ‘ জনকনন্দিনী কহি শুন , পূজনীয় পিতা আমাকে চতুর্দশ বৎসরের জন্য বনগমনের আদেশ দিয়েছেন এবং ভরতকে সিংহাসনের অধিকার দিয়েছেন।’
সীতা অবাক হয়ে যান এবং জিজ্ঞাসা করেন,‘ এ কি বার্তা কহিলেন রাঘব ? এ কি করে সম্ভব ? এ কি সত্য? ‘
রাম বলেন,‘হ্যাঁ সীতা, এ সত্য এবং অতীব সত্য। আমি নিজেও প্রথমে একথা বিশ্বাস করে উঠতে পারিনি। মাতা কৈকেয়ীর দুই বরের ফলশ্রুতি পিতার এই বিধান।’
সীতা বলেন, ‘ কি আশ্চর্য । কিন্তু সে কি আজ এই অভিষেকের ক্ষণে? এমন শুভআনন্দে কি মহারাজের এমন সিদ্ধান্ত নেবার সময়? না না, আমি কোনভাবেই বিশ্বাস করি না, এ আপনার পিতামহারাজের বিধান। আমার বিশ্বাস , এ আপনার বিমাতা কৈকেয়ীয় দুই বরের অনৈতিক দাবী।’
রাম বলেন,‘ সে কথাই সত্য জানকী। তবে সত্য এই যে আমাকে চতুর্দশ বৎসরের জন্য অনন্য প্রশ্ন হয়ে বন গমন করতে হবে সেই দণ্ডকারন্যে। আর ভরত আসীন হবে এই অযোধ্যার রাজ সিংহাসনে।’
সীতা শোকার্ত ভাবে বলে ওঠেন, ‘এ কি হল রাঘব। এমন তো হবার কথা ছিল না!‘
শ্রীরাম বলেন সীতা নিজ কর্ম দোষে,
বিমাতার বাক্যে আমি যাই বনবাসে ।। [কৃত্তিবাস ]
‘সীতা, যাহা সত্য তাঁকে তো মেনে নিতেই হবে আমাকে। ভ্রাতা লক্ষ্মণ বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল। আমি তাকে অনেক বুঝিয়ে নিরস্ত করেছি। মাতা কৌশল্যাকে ও স্বান্তনা দিয়ে শান্ত করে এসেছি। এক্ষনে আমি আমার বনবাসে গমণের আগে তোমার সঙ্গে সাক্ষাত করতে এসেছি বৈদেহী।’
সীতা রাঘবের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কোন কথা কি মনের মধ্যে ভেসে উঠল ? সে কি স্বপ্ন না সত্যি ?
রাম ভারাক্রান্ত মনে সীতাকে বলে ওঠেন,‘দেবী, আমি তোমায় কি বলব বুঝতে পারছি না। আমার বনবাসকালে তুমি আমার শোকার্তা মাতা কৌশল্যার সেবা করবে। কল্যানীয়া, তুমি ব্রত উপবাসে নিরত থাকবে। দেবার্চনা শেষে পিতা দশরথের পাদবন্দনা করবে। অন্য মাতৃগনকে ও নিত্যবন্দনা করবে। এক্ষনে তুমি আমার প্রান শক্তি। তোমার কাছে তাই আমার এই বিশেষ প্রার্থনা নিবেদন করলাম।’
জানকী বলেন সুখে হইয়া নিরাশ ,
স্বামী বিনা আমার কিসের গৃহবাস ।। [কৃত্তিবাস]
সীতা বলে ওঠেন,’রাঘব এ তো আপনার পুরুষোচিত বার্তা নয়। তোমার স্ত্রী সীতাকে তুমি এত তুচ্ছ এত অযোগ্য ভাবলে কি করে? এ কথা কোন সাব্ধি স্ত্রীর স্বকর্ণে ও শোনা উচিত নয়। কিংবা কোন নারী এমন প্রস্তাবে কখনই সুখী হতে পারে না। নারীর একমাত্র অবলম্বন তার স্বামী। আমি পতিব্রতা। তোমার দুঃখের অংশ ভাগিনি। আমি ও তোমার সঙ্গে বনে যেতে আদিস্ট। তোমার বনবাসে আমার ও বনবাস স্বামীন।’
তুমি সে পরম গুরু তুমি সে দেবতা ।
তুমি যাও যথা প্রভু আমি যাই তথা ।।
প্রাণ নাথ একা কেন হবে বনবাসী ।
পথের দোসর হ’ব করে লও দাসী ।। [কৃত্তিবাস ]
রাম বলেন,‘ আর্য্যা, আমি তবে আমার মাতা পিতা এঁদের কার হাতে সমর্পণ করে বনবাসে গমন করব ? ‘
সীতা বলেন, ‘রাঘব ! আর্য্যপুত্র ! আপনি জানেন পিতা মাতা ভ্রাতা পুত্র ও পুত্রবধু এরা নিজের পুন্যফল ও ভাগ্য ভোগ করেন। কেবল এক পত্নী তাঁর পতির ভাগ্য পায়। স্বামী যে অবস্থায় থাকবেন সতী নারী ও সেই অবস্থার ফল ভোগকারী। আমি ও আপনার সঙ্গে জনহীন দুর্গমকান্ডারে বনবাসী হব। যেমন পিতার ভবনে তেমনি বনে ও আমি সুখে বাস করব। আমি গুরুজনদের আজ্ঞা নিয়েই তোমার সঙ্গে বনবাসী হব। তোমার বিরহে আমি জীবন ধারন করতে পারব না। আমি শুনেছি আমার ভাগ্য গননাকারী ব্রাহ্মনরা বলেছিলেন যে আমার ভাগ্যে বনবাস আছে। হে আর্য্য পুত্র তুমি চিন্তা করো না। আমি তোমার সঙ্গে বনবাসে আনন্দেই থাকব।’
রাম বলেন,’সীতা, না না, নিরস্ত হও । প্রিয়তমা তুমি বনবাসের কষ্ট সহ্য করতে পারবে না। লতাকন্টকে সমাকীর্ণ শ্বাপদ সরীসৃপাদি সংকুল অরন্যে বহু বিপদ। বহু কষ্ট। সীতা সেখানে তুমি থাকতে পারবে না। তুমি এইখানে এই অযোধ্যায় থেকে ধর্মাচরণ করো। জনহীন দুর্গমবনে হিংস্রজন্তু ভল্লুক শার্দূল আদি বড় ভয়ংকর। সেখানে রাক্ষসের উৎপাত আছে। সেখানে তোমার ভয় করবে। প্রান ওষ্ঠাগত হয়ে উঠবে।’
সীতা বলেন,’রাঘব, বৃথা আমাকে বিচলিত ক’রো না। আমি যেমন পিতার ভবনে ছিলাম, তেমনই বনে ও আমি পরম সুখে বাস করব। ত্রিলোকের ঐশ্বর্য আমি চাই না। আমি কেবল পতির সঙ্গ সুখই কামনা করব। সংযত ব্রহ্ম চারিনি হয়ে আমি তোমার সেবা করব। মধুগন্ধী বনে আমি তোমার সঙ্গে আনন্দে থাকব। তোমাকে ছেড়ে স্বর্গে বাস করতে ও আমার রুচি নেই। আমি তোমার সঙ্গে যাব।’
‘কিন্তু সে যে ঘোর অরন্য দেবী জানকী ! সেখানে আহার নেই,আশ্রয় নেই। সে কষ্টের জীবন তুমি কল্পনা ও করতে পারবে না সীতা। – রাম বললেন।
সীতা বলেন,‘রাঘব আপনি সঙ্গে থাকতে আমার কিসের ভয়? বনে আছে ফলমুল। আছে সেথা সুমিষ্ট ঝর্ণার জল। বৃক্ষমূলে আশ্রয় আছে। সেই মধুগন্ধ বনে তুমি আর আমি জলাশয়ে হংসমিথুনের শোভা দেখব। আমরা সেই জলে অবগাহন করব। সন্তরন করে পদ্মফুল তুলব। এর থেকে আনন্দের আর কি আছে? আমি বড় উৎফুল্ল বোধ করছি ।
রাম বললেন,‘ সীতা বনবাসের কষ্ট , সে যে ভীষণ কষ্ট। পথ চলতে তোমার পায়ে কাঁটা ফুটলে আমি কি করে সহ্য করব। অঝোরবর্ষার ধারাপাতে আমি কোথায় তোমায় আশ্রয় অন্বেষণ করব ? কঠিন রৌদ্রে তোমার পথশ্রমের ক্লান্তি আমি কি করে নিবারন করব ? অসমতল পথে তোমার চলার কষ্ট আমি কি করে লাঘব করব দেবী ?’
অন্তঃপুরে নানা ভোগে থাক মনঃ সুখে।
ফল মূল খাইয়া কেন ভ্রমিবে দন্ডকে ।।
তোমার সুসজ্জা শয্যা পালঙ্ক কোমল ।
কুশাঙ্কুরে বিদ্ধ হবে চরণ কোমল ।। [কৃত্তিবাস ]
সীতা বলেন, ‘রাঘব আপনি বনবাসের যে দোষ বললেন আমি আপনার স্নেহভাগিনী হয়ে তা আমি গুন বলেই গন্য করব। আমি আপনার স্ত্রী। আপনার সুখ দুঃখের অংশভাগিনি। আপনাকে ভক্তি করি। আমাকে আপনি আপনার সাথে বনবাসে নিশ্চয়ই নিয়ে চলুন। আমি আপনার সাথে বনে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।’
সীতাকে নিবৃত্ত করতে রাম অনেক অনুনয় করলেন। কিন্তু সীতা তাঁর সংকল্প ছাড়লেন না। বরং এক্ষনে তিনি রামকে এক তীব্রশ্লেষ দিয়ে বললেন, ‘আর্য্যপুত্র, আপনি কি মনে করেন আপনার স্ত্রীকে ! সে কি মাত্র সুখ বিলাসিনী ? সে কি শুধুই সোনার পালঙ্কে সুখনিদ্রা যাপন করতে কিংবা রাজার আলয়ে রাজভোগ খেয়ে সুখে থাকতে এসেছেন । সে কি আপনার স্ত্রী নয় ? তাঁর সন্মান কি আপনার হাতে নয় ? আপনার ভ্রাতা যখন রাজ্য অধিকার করবেন তখন সে কি আপনার অরক্ষিত স্ত্রী কে অধিকার করবেন না তা কি কখনো হয় ?’
রাম এক্ষনে সীতার কঠোর বাক্যে মুহ্যমান হয়ে পড়লেন এবং তৎক্ষনাৎ তাঁর হাত ধরে সান্ত্বনা দিয়ে বলে ওঠেন
‘দেবী, তোমার কঠিন বাক্য সংবরণ ক’র। আমি তোমাকে অরক্ষিত রাখার কথা চিন্তাও করি না। আমি তোমাকে ছেড়ে থাকার কথা ভাবতে ও চাই না । জনকনন্দিনী, আমি মাত্র দ্বিধান্বিত !’
সীতা এক্ষনে ধীর বাক্যে বলে ওঠেন, ‘ রাঘব, আমি তো আপনার স্ত্রী। আমার সন্মান আপনার হাতে। আমার জীবন আপনার সাথে। আমি আপনাকে একা যেতে দিতে পারি না ওই ঘোর বনে দীর্ঘ চৌদ্দ বৎসরের বনবাসে ! আপনার অদর্শন আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারব না হে নাথ !’
রাম বলেন,‘ বৈদেহী, তুমি রাগ ক’রো না প্রিয়ে। আমি বনবাসে তোমাকে নিয়ে যেতে কোন দ্বিধা করতাম না যদি সেখানে কোন আশ্রয় অবলম্বন থাকত । আমি তবে তোমাকে নিশ্চয়ই অনুমতি দিতাম।’
জানকী কূপিত হয়ে বলে ওঠেন, ‘ না , রাঘব , আমি আপনার অনুমতি চাই না। এ আমার কর্তব্য। অবলা স্ত্রীকে রেখে কেন আপনি একাই বনে যেতে চান? তাঁর নিজের কি মন বলে কিছু নেই ? সে কি আপনার প্রাণ নয় ? স্ত্রী জাতি বলে আপনি আমাকে কি মাত্র অলীক কষ্টকল্পনায় ম্রিয়মান বলে মনে করছেন ?
রাম বলেন, ‘ না সীতে, আমি ভাবছি , বনের কুশ কাঁটা।
সীতা বলেন,’বনের কুশ কাঁটা আমি তৃণ জ্ঞান করব।’
তব সঙ্গে বেড়াইতে কুশ কাঁটা ফুটে ,
তৃণ হেন বাসি তুমি থাকিলে নিকটে ।। [কৃত্তিবাস]
রাম বলেন, ‘ সীতে গায়ে যদি লাগে ধুলা তবে ?’
সীতা বলেন,‘ তবে সে ধুলা আমি অগুরু চন্দন চুয়া ভেবে স্বান্তনা পাব।’
তব সঙ্গে থাকি যদি লাগে ধূলি গায় ।
অগুরু চন্দন চুয়া জ্ঞান করি তায় ।। [কৃত্তিবাস]
রাম বলেন, ’ প্রিয়ে , সেখানে নিতান্ত তরু ফল মূল !
তব সঙ্গে থাকি যদি পাই তরুমূল।
অন্য স্বর্গ গৃহ নহে তার সমতুল ।। [কৃত্তিবাস]
সীতা বলেন, ‘ হে স্বামীন, আপনার সঙ্গে সঙ্গে বনবাসী হয়ে সে ফলমূল খেয়ে আমি সুখে থাকব। আপনার দুঃখে আমি দুঃখি, আপনার সুখে আমি সুখি। আমরা একসাথে আহার করব। আমরা এক সাথে বিহার করব। অনেক তীর্থ দেখব। আমরা দেখব অনেক তপোবন। কত ঋষি মুনি বনে জীবন যাপন করেন। আমরা ও সেখানে এক গৃহকোন রচনা করে বনবাস যাপন করব। তেমন অমৃত আর কোথায় পাব রাঘব ! আর তেমন স্বর্গসুখ কি অন্য কোথা ও আছে বলে মনে করেন আপনি ?’
রাঘব বলেন,‘ সীতা আমি চমৎকৃত হলাম তোমার কথায়। তুমি সতী সাব্ধি নারী। তোমার কাছে অনেক কিছু শেখার আছে।’
সীতা বলেন,‘ রাঘব, পিতৃগৃহে আমি শুনেছিলাম আমার জীবনে আমাকে বনবাসে যেতে হবে। হে নাথ, যদি এই লিখন থেকে থাকে আমার কপালে, তাহাকে কি আপনি দূরে সরিয়ে রাখতে পারবেন ? এ তো দৈব ! হে নাথ , তবু যদি আপনি আমাকে একা এই অযোধ্যায় রেখে যান তবে আমি নিশ্চয়ই ত্যজিব জীবন।’
রাম বলেন,‘ প্রিয়ে জানকী, আমি বুঝতে পারলাম তোমার মন। এতক্ষন আমি তোমার পরীক্ষা করছিলাম। বেশ যদি তুমি তবে সেই ঘোরকান্তারে যেতেই চাও বনবাসের তরে , তবে তুমি তোমার রাজবেশ পরিত্যাগ করে এখন চীর ধারন করো। দেবী আমি তোমাকে ছেড়ে স্বর্গেও যেতে চাই না। এখন চলো তবে বনযাত্রার পূর্বে তুমি ব্রাহ্মণদের রত্ন আদি এবং ভিক্ষুকদের ভোজ্য ও বস্ত্র প্রদান কর। মহার্ঘভুষণ উত্তম বস্ত্র ইত্যাদি ভৃত্যগনকে দান করো।’
সীতা প্রফুল্ল মনে আপন গহনা আদি অন্য মহার্ঘ্য ভূষণ এবং যতেক উত্তম বস্ত্র আদি ব্রাহ্মণগন ও ভিক্ষুগনকে প্রদান করলেন।
রাম বললেন, ‘ চলো বৈদেহী এবার মাতা কৌশল্যার সাথে আমরা দেখা করে বনবাস যাত্রা করি।’
সীতা বলেন,‘নাথ, আমি আমাদের গৃহদেবতাকে প্রনাম করে যাই।’
সেই তখন ভবনে উপস্থিত কিংকর সমূহ এবং দ্বারপাল ও সশস্ত্র প্রহরাকারী অন্য সকলে মুহ্যমান হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন রাম এবং সীতার বনগমন এর শোকে।
সীতা গৃহদেবতাকে বন্দনা করলেন। গৃহের চারপাশে গন্ডী কাটলেন। সীতা সকল কিংকর সমূহ দ্বারপাল এবং সশস্ত্র প্রহরাকারী সকলকে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন। সকলের চোখে অশ্রুধারা। হায়রে সকলে নীরব তাঁরা। আনত নেত্রে কহেন সবে শুভগমনায় চ ।
এক্ষনে সীতা রাঘবের সঙ্গে সানন্দে অগ্রসর হলেন অযোধ্যার সকল গুরুজনেদের সঙ্গে সাক্ষাত করে বনবাসে্র পথে অগ্রসর হতে ।

( চলবে )


