প্রাচীন পথ শুভ্র মেঘমালা

প্রাচীন পথ শুভ্র মেঘমালা

থিচ নাট হান (১৯২৬-২০২২) একাধারে বিশ্বখ্যাত ভিয়েতনামী জেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, লেখক, কবি এবং শান্তিকামী কর্মী। দলাই লামার পর তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী বৌদ্ধ আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

হান বিশ্বজুড়ে “মাইন্ডফুলনেস” (সচেতনতা) চর্চাকে জনপ্রিয় করেন। সমাজবিচ্ছিন্ন সন্ন্যাস নয়, বরং যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও সামাজিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অহিংস উপায়ে কাজ করার দর্শন যা “এনগেজড বুদ্ধিজম” নামে পরিচিত—তিনিই তার প্রবক্তা। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় অহিংস শান্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ায় ভিয়েতনাম সরকার তাঁকে প্রায় ৪০ বছর দেশছাড়া করে রাখে। তাঁর এই অনন্য শান্তি প্রচেষ্টার জন্য ১৯৬৭ সালে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছিলেন। পরবর্তী কালে তিনি ফ্রান্সে “প্লাম ভিলেজ” (Plum Village) নামের একটি বিখ্যাত আন্তর্জাতিক মঠ ও ধ্যান কেন্দ্র গড়ে তোলেন, যা বর্তমানে পশ্চিমে বৌদ্ধ চর্চার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। হ্যান একশোটিরও বেশি বই লিখেছেন। তাঁর সহজ ও কাব্যিক গদ্যে লেখা ‘ওল্ড পাথ হোয়াইট ক্লাউডস’, ‘দ্য মিরাকেল অফ মাইন্ডফুলনেস’ এবং ‘পিস ইজ এভরি স্টেপ’ বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় রয়েছে।

২০১৮ সালে তিনি ভিয়েতনামে ফিরে আসেন এবং ২০২২ সালে ৯৫ বছর বয়সে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

[ কবি, কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক,তিনটি পরিচয়েই সুপর্ণা বসুর সাহিত্যচর্চা বিস্তৃত। তাঁর লেখায় ব্যক্তিমানসের জটিলতা,জীবনবোধ,অনুভূতির সূক্ষ্মতা এবং মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়।দেশীয় সাহিত্যের পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যের প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ। অনুবাদের মাধ্যমে তিনি দুই ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে নির্মাণ করেছেন এক সৃজনশীল সেতুবন্ধ।

ইতিপূর্বে রোদ্দুর : The Sunshine-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে বিশিষ্ট ইরানি কথাসাহিত্যিক সাদেঘ হেদায়েতের কালজয়ী উপন্যাস The Blind Owl-এর তাঁর অনূদিত ‘এক দৃষ্টিহীন পেঁচা’। বিশ্বসাহিত্যের এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক আখ্যানকে বাংলা ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার এই প্রয়াস তাঁর অনুবাদ-নিষ্ঠা ও সাহিত্যবোধের পরিচায়ক। তিনি এই বছর রোদ্দুর সাহিত্য সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ]

ভূমিকা :  গৌতম বুদ্ধের জীবন ও দর্শন নিয়ে বহু চর্চা হলেও, ভিয়েতনামী জেন গুরু থিচ নাট হান-এর ‘ওল্ড পাথ হোয়াইট ক্লাউডস’ গ্রন্থটি এক অনন্য ব্যতিক্রম। অলৌকিকতা সরিয়ে, বুদ্ধকে এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে এক অত্যন্ত মানবিক ও সহজ মানুষ রূপে।

গল্পটি আবর্তিত হয়েছে বুদ্ধের নিজস্ব স্মৃতি এবং ‘স্বস্তি’ নামের এক রাখাল বালকের দৃষ্টিভঙ্গিতে, যে পরবর্তীতে তাঁর প্রধান শিষ্য হয়। রাজপুত্রের বিলাসিতা ত্যাগ, বোধিলাভ, জাতপ্রথার বিরুদ্ধে লড়াই এবং সঙ্ঘের টানাপোড়েন—সবটাই বইটিতে উঠে এসেছে অপূর্ব কাব্যিক গদ্যে। লেখক দেখিয়েছেন, বৌদ্ধ দর্শনের মূল কথা কঠোর সন্ন্যাস নয়, বরং বর্তমান মুহূর্তে সচেতনভাবে বেঁচে থাকা।

বাঁশবনের সবুজ ঝিরিঝিরি পাতার ছায়ায়, হাটুলমাটুল হয়ে বসে নিজের শ্বাস প্রশ্বাসের ওপর মনোসংযোগ করছিলেন তরুণ ভিক্ষু স্বস্তি। রাজগৃহের বেণুবন বিহারে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ধ্যান করছিলেন তিনি। তাঁর চারপাশে আরও কয়েকশো ভিক্ষু,কেউ বাঁশগাছের ছায়ায়, কেউ বা নিজেদের খড়ের ছাউনি দেওয়া কুটিরে বসে ধ্যানাভ‍্যাস করছিলেন।


মহান শিক্ষক গৌতম, যাঁকে মানুষ আদর করে ‘বুদ্ধ’ বলে ডাকত, প্রায় চারশো শিষ্যকে নিয়ে এই বিহারেই বাস করছিলেন সেই সময়। লোকজনের আনাগোনা যথেষ্ট হলেও বিহারটির পরিবেশ ছিল বেশ শান্ত। প্রায় চল্লিশ একর জমি নিয়ে বিহারটি তৈরি করা হয়েছিল।সেখানে মগধের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিয়ে আসা নানা প্রজাতির সুন্দর বাঁশগাছ রোপণ করা হয়েছিল। রাজধানী রাজগৃহ থেকে মাত্র তিরিশ মিনিটের হাঁটাপথ উত্তরে অবস্থিত এই বেণুবন বিহারটি সাত বছর আগে রাজা বিম্বিসার বুদ্ধ ও তাঁর ভিক্ষুসংঘকে দান করেছিলেন।

স্বস্তি চোখ দুটো একটু রগড়ে নিয়ে মৃদু হাসলেন। ধীরে ধীরে পা দুটো সোজা করতেই বুঝতে পারলেন, বেশ ব্যথা করছে। তাঁর বয়স এখন একুশ বছর। মাত্র তিন দিন আগে বুদ্ধের অন্যতম প্রবীণ শিষ্য শ্রদ্ধেয় সারিপুত্ত তাঁকে প্রব্রজ্যা দিয়েছেন। প্রব্রজ্যার অনুষ্ঠানে যদিও স্বস্তির ঘন বাদামি চুল কামিয়ে ফেলা হয়েছিল।তবু বুদ্ধের সংঘের একজন সদস্য হতে পেরে তার খুব আনন্দ হচ্ছিল। সংঘের অনেক ভিক্ষুই ছিলেন সম্ভ্রান্ত বংশের মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন,স্বয়ং বুদ্ধের ভাই শ্রদ্ধেয় নন্দ এবং দেবদত্ত, অনিরুদ্ধ ও আনন্দ। এই মানুষগুলির সঙ্গে স্বস্তির এখনও আনুষ্ঠানিক পরিচয় হয়নি, তবে দূর থেকে তিনি তাঁদের লক্ষ করেছিলেন। বিবর্ণ চীবর পরেও তাঁদের আভিজাত্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব সহজেই চোখে পড়ত।
‘এমন সম্ভ্রান্ত বংশের মানুষদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে আমার এখনও অনেক সময় লাগবে,’ মনে মনে ভাবলেন স্বস্তি।
অথচ স্বয়ং বুদ্ধ রাজপুত্র হয়েও তাঁর সঙ্গে যেন কোনও দূরত্ব বুঝতেই দিতেন না।


স্বস্তি জাতিতে‘অস্পৃশ্য’।তৎকালীন ভারতীয় সমাজের বৈষম্যমূলক জাতিব্যবস্থায় যাঁদের স্থান ছিল সবচয়ে নীচে। দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি মহিষ চরিয়েছেন। অথচ গত দুই সপ্তাহ ধরে তিনি বিভিন্ন জাতির ভিক্ষুদের সঙ্গে একত্রে বাস করছেন এবং সাধনার অনুশীলন করছেন এবং সবাই তাঁর প্রতি অত্যন্ত সদয়। তাঁকে দেখলে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানায়, গভীর শ্রদ্ধায় প্রণাম করে। তবু স্বস্তি এখনও সম্পূর্ণ স্বচ্ছন্দ বোধ করতে পারেন না। তাঁর মনে হয়, সকলের সঙ্গে মিশে এই নতুন জীবনে পুরোপুরি সহজ হয়ে উঠতে হয়তো তাঁর কয়েক বছর লেগে যাবে।

হঠাৎ তাঁর অন্তরের গভীর থেকে কিই যেন এক আনন্দের অনুভূতি জেগে উঠল। তাঁর মনে পড়ে গেল রাহুলের কথা!বুদ্ধের আঠারো বছর বয়সি পুত্র।দশ বছর বয়স থেকেই রাহুল এই সংঘে শ্রমণ হিসেবে বাস করছিলেন। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই রাহুল আর স্বস্তির মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। ধ্যানের সময় কীভাবে নিজের শ্বাস প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দিতে হয়, তা স্বস্তিকে শিখিয়েছিলেন রাহুলই।রাহুল বুদ্ধের শিক্ষাগুলি খুব ভালোভাবে রপ্ত করতে পারতেন,যদিও তখনও তিনি পূর্ণ ভিক্ষু হননি। পূর্ণ উপসম্পদা গ্রহণের জন্য তাঁকে কুড়ি বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

স্বস্তির মনে পড়ছিল মাত্র দুসপ্তাহ আগে বুদ্ধ,স্বস্তিকে ভিক্ষু হওয়ার আমন্ত্রণ জানাতে তার উরুবেলা গ্রামে এসেছিলেন! গ্রামটি গয়ার কাছেই অবস্থিত। বুদ্ধ যখন স্বস্তির বাড়িতে পৌঁছলেন, তখন স্বস্তি আর তাঁর ভাই রূপক মহিষ চরাতে বাইরে গিয়েছিলেন। বাড়িতে ছিল তাঁর দুই বোন!ষোলো বছরের বালা এবং বারো বছরের ভীমা। বালাই প্রথম বুদ্ধকে চিনতে পেরেছিল।সে ত‍ৎক্ষণাৎ স্বস্তিকে খবর দেওয়ার জন্য ছুটে বাইরে যেতে গেলে বুদ্ধ তাকে মানা করেছিলেন।কারণ তাঁর সঙ্গে রাহুলসহ আরো ভিক্ষুরা রয়েছেন তাঁরাই নদীর ধারে গিয়ে স্বস্তিকে ডেকে আনতে পারবে।

বেলা যখন পড়ে আসছে তখন স্বস্তি আর তার ভাই রূপক তাদের নটা মহিষকে নিরঞ্জনা নদীতে ঘষেমেজে স্নান করাচ্ছিল। বুদ্ধকে দেখামাত্রই তারা ছুটে গিয়ে হাতের আঙুলের পদ্মমুদ্রায় তাঁকে প্রণাম জানাল।বুদ্ধ তাদের মধুর হেসে বললেন,’তোমরা কত বড় হয়ে গেছ!’

স্বস্তি নির্বাক হয়ে চেয়ে রইল বুদ্ধের শান্ত মৃদু হাস‍্যময় মুখের দিকে!তাঁর উজ্বল অন্তর্ভেদী চোখদুটির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে সে কেঁদে ফেলল!বুদ্ধ একটা গেরুয়া চীবর পরেছিলেন যেটি অনেকগুলি কাপড়ের টুকরো সেলাই করে তৈরি করা হয়েছিল যেন খানিকটা ধানখেতের নকশার মত লাগছিল।যেমন দশবছর আগে তিনি খালি পায়ে হাঁটতেন এখনো তাই।তাঁর সঙ্গে স্বস্তির প্রথম দেখার জায়গাটাও এখান থেকে খুব দূরে নয়।দশ বছর আগে তাঁরা নিরঞ্জনা নদীর তীর থেকে মাত্র দশ মিনিট পায়ে হাঁটা দূরত্বে, বোধিবৃক্ষের ছায়ায় ঘন্টার পর ঘন্টা একসঙ্গে কাটিয়েছে!
স্বস্তি দেখল,বুদ্ধের পিছনে একই রকম চীবর পরিহিত এবং নগ্নপদ, অন্তত বিশজন ভিক্ষু দাঁড়িয়ে আছেন।স্বস্তি খেয়াল করল তাঁদের চীবরের থেকে বুদ্ধের চীবর অন্তত হাত খানেক লম্বা!বুদ্ধের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন একজন নবীন ভিক্ষু প্রায় স্বস্তিরই বয়সী এবং তারদিকে হাস‍্যমুখে সরাসরি চেয়ে আছে।বুদ্ধের মুখ নরম হাসিতে ভরে উঠল তিনি স্বস্তি ও রূপকের মাথায় সস্নেহে হাত রাখলেন।
তাঁদের জানালেন, রাজগৃহে ফিরে যাওয়ার পথে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। যতক্ষণ স্বস্তি ও রূপক তাদের মহিষগুলিকে নিরঞ্জনায় স্নান করাবে ততক্ষণ তাঁরা সানন্দে অপেক্ষা করবেন।

ফিরে যাওয়ার আগে বুদ্ধ স্বস্তি ও রূপকের সঙ্গে তাঁর পুত্র রাহুলের পরিচয় করিয়ে দিলেন। এই সেই তরুণ শ্রমণ, যে স্বস্তির দিকে তাকিয়ে সুন্দর বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি হেসেছিল। রাহুল স্বস্তির চেয়ে তিন বছরের ছোট, অথচ দুজনের উচ্চতা একই। রাহুল একজন ‘সামণেরা’ অর্থাৎ নবীন শ্রমণ হলেও, তার পোশাক ছিল পূর্ণ ভিক্ষুদের মতোই।
স্বস্তি ও রূপকও শ্রমণের দলের সঙ্গে হাটতে লাগল।

রাহুল স্বস্তি ও রূপকের মাঝখানে হাঁটছিল। সে তার ভিক্ষাপাত্রটি রূপকের হাতে দিয়ে নিজের দুই নতুন বন্ধুর কাঁধে হাত রাখল। বাবার মুখে স্বস্তি ও তার পরিবারের কথা সে এত শুনেছে যে, তার মনে হচ্ছিল,ওদের সঙ্গে যেন তার আগে থেকেই পরিচয় রয়েছে। দুই ভাই রাহুলের ভালোবাসার উষ্ণতায় আপ্লুত হয়ে গেল।

ঘরে পৌঁছলে বুদ্ধ স্বস্তিকে ভিক্ষুসঙ্ঘে যোগ দিতে এবং তাঁর কাছে ধর্ম অধ্যয়ন করতে আমন্ত্রণ জানালেন।দশ বছর আগে, যখন স্বস্তির প্রথম বুদ্ধের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তখনই সে বুদ্ধের কাছে ধর্মশিক্ষা লাভের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। বুদ্ধও তাঁকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে সম্মত হয়েছিলেন। এখন স্বস্তির বয়স একুশ বছর। বুদ্ধ ফিরে এসেছেন!তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি ভোলেননি।

বুদ্ধ বাইরে স্বস্তির কুঁড়েঘরের সামনে একটি ছোট টুলে ওপর বসেছিলেন। ভিক্ষুরা তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাটির দেওয়াল আর খড়ের ছাউনি দিয়ে তৈরি স্বস্তির ছোট্ট ঘরে এতজনের একসঙ্গে ঢোকার জায়গা ছিল না।
বালা স্বস্তিকে বলল, “দাদা, তুমি বুদ্ধের সঙ্গে চলে যাও। রূপক এখন সেই সময়ের তোমার চেয়েও শক্তিশালী, যখন তুমি প্রথম মহিষ চরানোর কাজ শুরু করেছিলে। আর আমিও এখন সংসারের দেখাশোনা করার জন‍্যে যথেষ্ট সক্ষম। গত দশ বছর ধরে তুমি আমাদের দেখাশোনা করেছ। এখন আমরা নিজেদের দায়িত্ব নিজেরাই সামলাতে পারব।”
বৃষ্টির জল ধরে রাখার পাত্রটির পাশে বসেছিল ভীমা।সে তার বড়দির দিকে মুখ তুলে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না।
স্বস্তি ভীমাকে দেখছিল। তার মিষ্টি ছোটোবোন। স্বস্তি যখন প্রথম বুদ্ধের সঙ্গে দেখা করেছিল, তখন বালার বয়স ছিল ছয় বছর, রূপকের তিন, আর ভীমা ছিল কোলের শিশু। বালা তখন পরিবারের জন্য রান্না করত, আর রূপক বালিতে খেলা করে বেড়াত।


তাদের বাবার মৃত্যুর ছয় মাস পরেই, ভীমার জন্ম দিতে গিয়েই তাদের মা মারা যান।স্বস্তির বয়স তখন মাত্র এগারো। সেই অল্প বয়সেই সে পরিবারের মাথা হয়ে উঠেছিল। মহিষ চরানোর কাজটিও জোগাড় করেছিল। স্বস্তি খুবই পরিশ্রমী। তার উপার্জনে পরিবারের সকলের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যেত। এমনকি ছোট্ট ভীমার জন্য সে বাড়িতে মহিষের দুধও নিয়ে আসতে পারত।
স্বস্তি যে তার মনের কথা জানতে চাইছে, তা বুঝতে পেরে ভীমা মৃদু হাসল। একটু ইতস্তত করে সে নিচু স্বরে বলল, “দাদা, তুমি বুদ্ধের সঙ্গে চলে যাও।” সে কান্না লুকোতে মুখ ফিরিয়ে রইল।ভীমা স্বস্তিকে বহুবার বলতে শুনেছিল বুদ্ধের কাছে শিক্ষাগ্রহনের ইচ্ছার কথা।সে সত‍্যিই চাইতো দাদার ইচ্ছা পূরণ হোক।কিন্তু যখন সেই মুহূর্তটা সত‍্যিই এসে পড়ল তখন সে তার মনখারাপ লুকোতে পারছিল না।এদিকে ভগবান বুদ্ধ তখনও সেই কুঁড়ে ঘরের সামনে একটি ছোট্ট টুলে বসে আছেন।

রূপক মহিষগুলিকে তাদের মালিক রম্ভু মহাশয়ের কাছে জমা করে গ্রাম থেকে ফিরল। ভীমার মুখে, “বুদ্ধের সঙ্গে চলে যাও,” কথাটা তার কানে গেছে।সে বুঝতে পারল,সেই সময় এসে গেছে। সে স্বস্তির দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ দাদা, তুমি বুদ্ধের সঙ্গে যাও।”


তারপর গোটা পরিবার পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে স্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর রূপক বুদ্ধের দিকে ফিরে বলল, “ভন্তে, আশা করি আপনি আমার দাদাকে আপনার কাছে থেকে শিক্ষা লাভ করার অনুমতি দেবেন। আমাদের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার মতো বয়স আমার হয়েছে।”
তারপর রূপক স্বস্তির দিকে ফিরে কান্না লুকিয়ে রেখে বলল, “কিন্তু দাদা, তুমি বুদ্ধকে জিজ্ঞাসা কোরো, মাঝেমধ্যে তুমি আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারবে কি না!”
স্বস্তির মনে তখন একই সঙ্গে ভয় ও আনন্দের ঢেউ উঠছিল। তার পেটের ভিতরটা কেমন জানি গুড়গুড় করছিল। এই প্রথম সে উরুবেলা ছেড়ে কোথাও যাচ্ছে। বুদ্ধ বলেছিলেন, রাজগৃহে পৌঁছোতে দশ দিন লাগবে। সাধারণত মানুষ আরও দ্রুত যাতায়াত করত, কিন্তু বুদ্ধ ও অন‍্যান‍্য ভিক্ষুরা খুব ধীরেসুস্থে হাঁটাচলা করতেন।

স্বস্তির হাঁটার গতি যত ধীর হয়ে এল, তার হৃদয়ও তত শান্ত হতে থাকল। সে সম্পূর্ণ হৃদয় দিয়ে নিজেকে বুদ্ধ, ধর্ম ও সঙ্ঘের মধ্যে ডুবিয়ে দিচ্ছিল। এটাই ছিল তার পথ।
শেষবারের মতো পরিচিত ভূমি ও মানুষগুলিকে দেখার জন্য সে পিছন ফিরে তাকাল। পৃথিবীর এই একটুকরো ভূখণ্ড আর এখানকার মানুষগুলিই ছিল তার এত দিনের একমাত্র পরিচিত জগৎ। সে দেখল, সুজাতা ও তার পরিবারের লোকেরা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে।শেষ পর্যন্ত যেন বনের গাছগুলির ছায়ার সঙ্গে মিশে যাওয়া কয়েকটি ক্ষুদ্র বিন্দু।

স্বস্তির মনে হচ্ছিল, বুদ্ধ যেন কেবল হাঁটার আনন্দ উপভোগ করার জন্যই হাঁটছেন!কোথাও পৌঁছোনোর কোনও তাড়া তাঁর নেই। অন্য ভিক্ষুদের ক্ষেত্রেও তাই! গন্তব্যে পৌঁছোনোর জন্যে কেউই ব‍্যস্ত নন। প্রত্যেকের পদক্ষেপ ছিল ধীর, সামঞ্জস‍্যপূর্ণ ও শান্ত। মনে হচ্ছিল, তাঁরা যেন সবাই মিলে পরমানন্দে বেড়াতে বেরিয়েছেন।কাউকেই কখনও ক্লান্ত বলে মনে হচ্ছিল না, অথচ বেশ দীর্ঘ পথ চলছিলেন তাঁরা।

( চলবে ) 

Author

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

 : ঊর্ণনাভ

ধারাবাহিক উপন্যাস শ্যামলী রক্ষিত ঊনবিংশতি অধ্যায়  যেদিন প্রথম তার গালের এই সাদা দাগের ছিটেটা দেখতে পেয়েছিল, সেদিনের কথাটা কোনোদিন ভুলবে না মালবিকা! বিকেলে জবজবে করে

Read More »

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

 : ঊর্ণনাভ

ধারাবাহিক উপন্যাস শ্যামলী রক্ষিত ঊনবিংশতি অধ্যায়  যেদিন প্রথম তার গালের এই সাদা দাগের ছিটেটা দেখতে পেয়েছিল, সেদিনের কথাটা কোনোদিন ভুলবে না মালবিকা! বিকেলে জবজবে করে

Read More »

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ  অষ্টম পর্ব চোদ্দো অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলেন গান্ধিজি। তাঁর সঙ্গে মতিলাল নেহেরু, চিত্তরঞ্জন দাশদের মতের মিল হল না। তাঁরা তৈরি করলেন স্বরাজ

Read More »