ধারাবাহিক উপন্যাস
শ্যামলী রক্ষিত
অষ্টাদশ অধ্যায়
বাবা যেদিন অফিস থেকে ফিরে এসে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল, সেদিনই আমার সারা মন বলেছিল, না, না, তা হয় না! এই রেলকলোনি ছেড়ে, এই মাঠঘাট, পথ ছেড়ে কোথাও যাব না আমি! বাবাকে নিজের মনের ইচ্ছার কথা বলেছিলাম।
— বাবা, আমি এখানেই থাকব। কলকাতায় যাব না, বাবা!
— কেন যাবি না মা? দেখবি, চল না, কলকাতা কী সুন্দর শহর! কত গাড়িঘোড়া, আলো! কত বেড়ানোর জায়গা! আর প্রচুর ভালো ভালো খাবার! নাচ, গান, নাটক—সবকিছুই কলকাতায় আছে!
— কিন্তু আমার ওসব কিছুই চাই না, বাবা! আমি তো কলকাতায় কিছুতেই যাব না, বাবা। এখানে পক্ষীরাজে চড়ে উঁচুনিচু পাহাড়ি নির্জন রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে চাই, বাবা! আমার দরকার নেই শহরের জনকোলাহল!
— ওরকম বায়না করিস না মা! এখানে মানুষের মনে অনেক সংস্কার। তোকে পদে পদে আঘাত পেতে হবে! মনোকষ্টে মরে যাবি, মা। আমি আর কত দিন থাকব বল! তোর তো একটা ব্যবস্থা করতে হবে কিছু! আত্মীয়পরিজনহীন আমাদের পৃথিবী। ভালোবেসে নিজের পছন্দমতো বিয়ে করেছি বলে জীবনে কম মাশুল দিতে হচ্ছে না! এত দিন কিছু মনে হয়নি, জানিস মা! কিন্তু তোর কাকার আচরণ আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। দিন দিন বয়স বাড়ছে! এই বয়সে কেন যে ঠাকুর এমন শাস্তি দিল, জানি না মা! আমাদের কোন পাপের জন্য যে তোর এই অসুখ হলো, জানি না! তোর জন্য দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম চলে গেছে আমাদের। আর কিছু ভালো লাগে না, মা! রাস্তায় বেরোলেই তোর এই অসুখের কথা! যেন কী অপরাধ করেছিস তুই! এখানে থাকলে প্রতিনিয়ত তোকে এই সব শুনতে হবে! দেখলিই তো, তোর নিজের কাকার কী আচরণ! ওরা তো এরকমটাই কিছু চেয়েছিল।
— তা কেন, বাবা! কাকা তো আস্তে আস্তে সম্পর্কটা অনেকখানিই ঠিক করে নিতে চেয়েছিল! তাই জন্যেই তো আবার আসা-যাওয়া শুরু করেছিল। আমার ভালোই লাগে, বাবা! কাকা এলে খুব আনন্দ হয়!
— সে তো জানি মা। তাই জন্যেই তো আবার এত দিন পর সব জ্বালাযন্ত্রণা ভুলে গিয়েছিলাম! নাহলে তুই তো দেখেছিস, যখন দাদু মারা গেছেন, খবর পেয়ে সোজা শ্মশানে গেছি! আবার সৎকার হয়ে গেলে শ্মশান থেকেই বাড়ি ফিরে এসেছি! নিজের জন্মভিটেতে কার না ঢুকতে মন চায়, বল?
— কিন্তু কেন যাওনি, বাবা? তুমি গেলে তো অন্তত ঠাকুমা খুশি হতেন।
এরপর অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল বাবা। বাইরে তখন শ্রাবণের বর্ষণমুখরিত অন্ধকার! শালগাছের মাথায় জোনাকির আলো দপদপ করে জ্বলছে, নিভছে! জঙ্গলভরেই যেন জোনাকির ঢল নেমেছে সেদিন!
বাবা বলল, — সব সুবিধেবাদী, স্বার্থপরের দল! কাকা এত দিন আসত নিজের স্বার্থে! তোর কাকার সম্বন্ধীর একটা গ্রুপ-ডি পোস্টে চাকরির জন্যে আসানসোল রিজিওন্যাল ম্যানেজারকে বলে সেই চাকরিটা তখন করে দিয়েছিলাম! তাই মাঝেমাঝে আসত! এখন আর দরকার নেই, তাই আসা-যাওয়াও তো কমিয়ে দিয়েছে!
শুনে খুব অবাক লাগছিল! ঠাকুমা-দাদু মারা যাওয়ার পর কাকা তাঁদের আদ্রার কোয়ার্টারে মাঝেমাঝেই আসতেন। বেশ ভালোই লাগত তার! বছর দুয়েক নিয়ম করে আসতেন কোয়ার্টারে। তারপর আসা-যাওয়া কমে গিয়েছিল। যখন আমার এই অসুখ দেখা দিল, কাকা সব শোনার সঙ্গে সঙ্গেই উঠে চলে গিয়েছিল! মা অনেকবার চা-জলখাবার খেয়ে যেতে বলেছিল। কিন্তু কাকা আর একটা মুহূর্তও থাকেনি।
বাবা বলেছিল, — ওকে জোর করো না, মমতা। যেতে দাও।
কাকা চলে যাওয়ার পর বাবা অনেকক্ষণ চেয়ারে নীরবে গুম হয়ে বসেছিল। কিছুক্ষণ পরে মা যখন বাবার মুখে কাকা চলে যাওয়ার আসল কারণটা জানতে পেরেছিল, তখন অন্ধকার ঘরের মধ্যে বসে হাউহাউ করে কেঁদেছিল মা।
পাশের ঘরে পড়তে পড়তে তখনই মনে হয়েছিল আমার, মরে যাওয়াই ভালো! আমি সত্যিই আত্মহত্যা করব একদিন। কিন্তু বাবা-মায়ের কথা ভেবে আর পেরে উঠিনি। মনে হয়েছে, নিজের কষ্ট শেষ করব বলেও ওই দুটো মানুষকে এত কষ্ট দেব? না, না, তা আমি পারব না! মা-বাবাকে এত কষ্ট দিতে পারব না! তাই আর মরা হয়নি!
এরপরও কতবার এমন কষ্টকর সংকটের মুখোমুখি হয়েছি সে। প্রতিবার মনে হয়েছে, মরে গিয়ে মুক্তি নেব এই জীবন থেকে! কিন্তু পারেনি! মরার প্রবল ইচ্ছা হলেও কোথায় যেন বেঁচে থাকার উদগ্র বাসনা এত দূর পর্যন্ত টেনে নিয়ে এসেছে তাকে।
ঠিক কীসের জন্য, সে জানে না! তবে অস্পষ্ট একটা স্বপ্নময় আঁকিবুকি ফুটে ওঠে মনের গহনে। আনমনে, একাকী হেঁটে চলে যায় সেই বনবীথিপথ পেরিয়ে কোনো অজানা প্রান্তরে—সে নিজেও জানে না।
সেই ঠিকানাহীন গন্তব্যের এই অবসম্ভাবী যাত্রাকে কেন সে বেঁধে রাখতে পারে না! সমস্ত অচরিতার্থ আক্ষেপের মুহূর্ত পেরিয়ে মহাকালের পারে তার সেই গতি! হাইড্রার টেন্টাকলের মতো এক পা ফেলে আর এক পা তোলে, নিঃশব্দ সেই গমনে বড় তৃপ্তি মালবিকার…

(চলবে)


