শুভাশিস ঘোষ
সপ্তম পর্ব
বারো
দু’মাস হতে চলল, বাপের ঘর ছেড়ে নিশ্চিন্তপুরে শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে কাজলি। প্রহ্লাদেরও চোখের কোণে কালি। কঙ্কালসার চেহারায় সারাদিন তার চুপচাপ বসে থাকা দেখে গাঁয়ের লোক কত কথা বলে। হাজার লোকে হাজার কথা বললেও একটা বিষয়ে সবাই একমত—ভালো ওঝা না ডাকলে নিস্তার নেই গৌরের ব্যাটার।
কেবল লজিনে ধরেছে, কারও মতে বেম্বদত্যি। কেউ কেউ আবার বললে, গৌরের নিজের মাই চেপে বসে আছে ওর ঘাড়ে। ছেলেটাকে বুড়ি বড্ড ভালোবাসত গো। আর তার মরণকালেই কিনা ছেলেটাকে বুড়ির কাছে ঘেঁষতে দিত না গৌর। সংক্রামক ব্যাধির কাছে গেলে নাকি কচি ছেলের ক্ষতি হতে পারে। সেই শুনেই তো বুড়ি মনোকষ্টে মরল। এদ্দিন কিছু বলেনি, কিন্তু এখন তো আর ছাড়তে চাইছে না। বাব্বা! নিজের ধন, সুদে-আসলে সব শুষে নেবে। ঠ্যালা বুঝবে গৌরবদ্যি।
তবে যে যা-ই বলুক, গৌরবদ্যির এক রা। ওসব বাজে কথা রাখ। মানবদেহের সপ্তধাতু—রক্ত, রস, মাংস, মেদ, অস্থি, মজ্জা, শুক্র—পরীক্ষা করে, তিন দশা—বাত, পিত্ত, কফ—বিচার করে তবেই চিকিৎসা করতে হয়। সেটাই আয়ুর্বেদশাস্ত্রের বিধান। সেই বিধান অনুযায়ীই হচ্ছে প্রহ্লাদের চিকিৎসা। ওসব ওঝা-গুণিনের কেরামতি চলবে না এ বাড়িতে।
তবে আয়ুর্বেদ যে কী কেরামতিটা দেখাচ্ছে, গাঁয়ের লোক ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।
পল্লি উন্নয়ন সমিতির জনাতিনেক সদস্যকে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে কানাইচরণ। প্রতি রবিবার যেমনটা করে আর কী। কার ঘরের দেয়াল পড়ে গেছে, কিন্তু ছিটেবেড়া দেওয়ার পয়সা নেই; কার মেয়ের বিয়ে আটকে যাচ্ছে টাকার অভাবে; কার ধানি জমিতে কে গরু ছেড়ে দিয়ে বিবাদ বাধিয়েছে—এমন সব বিষয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই কাজ ওদের। এই ক’বছরে সমিতির কাজকর্ম গ্রামের মানুষের আস্থাও অর্জন করেছে বিস্তর। বিত্তশালীদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ওদের উদ্দেশ্য। আবার পাড়ায় বেরিয়ে নানান রকমের বিবাদ-বিসংবাদের মীমাংসা করাও এখন ওদের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।
“ও কাকা, বলি, প্রহ্লাদের কী হয়েছে গো? অসুস্থ ছেলেটা নাকি ঘরে পড়ে আছে? বলি, তুমি কবিরাজ মানুষ, আর তোমার ছেলের কী এমন ব্যামো হল যে চিকিৎসা হচ্ছে না?”
গৌরবদ্যির উঠোনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলল কানাইচরণ। সঙ্গীসাথীদের চোখেমুখেও বেশ সহানুভূতির ছাপ।
এমন অযাচিত উদ্বেগে যে খুব একটা খুশি হল না গৌর, তা বোঝা গেল তার কথায়। একটু কর্কশ স্বরেই বলল, “তোমাদের আবার মানুষের অসুখ-বিসুখের খবরও রাখতে হচ্ছে আজকাল?”
গৌরবদ্যির এমন আচরণ খুব একটা প্রত্যাশিত ছিল না কানাইচরণ বা সমিতির সদস্যদের কাছে। সবাই একটু মুখ চাওয়াচায়ি করে।
কানাই বলল, “না, গাঁয়ের লোকে তো নানান কথা বলছে। একেকজন একেক রকম বলে, তাই একটু খোঁজখবর করছিলাম আর কী। তা তুমি যদি অসন্তুষ্ট হও, তো থাক। আর কথা বাড়িয়ে লাভ কী?”
“আরে না না, অসন্তুষ্ট কেন হব? আমার কথা হল, ঘরে ঘরে তো জ্বরজারি, অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে। তা তোমরা কি সবার ঘরের খবর নিতে যাচ্ছ নাকি?”
“ঠিক আছে কাকা। এ বিষয়ে আর আমরা কথা বলব না। তোমার ছেলে, তুমিই ভালো বুঝবে। তবে যদি কখনও মনে করো আমাদের কোনো সাহায্য লাগবে, আমরা আছি। দরকারে কলকাতার হাসপাতালেও নিয়ে যেতে পারি। আমার এক সহপাঠী তো ডাক্তারি পড়ছে, ক্যাম্বেলে আছে। দরকারে সেও সাহায্য করতে পারবে। দেখো, বলে গেলাম।”
কথাগুলো বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেল কানাইচরণ। পিছনে সঙ্গীসাথীরা।
গৌরের কাকা জীবনবদ্যি বসেছিল অশ্বত্থগাছের গোড়ায়। সমিতির ছোকরাদের দেখে কাঁধে রাখা গামছাটা দিয়ে একবার মুখটা মুছে নিয়ে বলল, “কী ব্যাপার গো বাপসকল? বলি, গৌরের ব্যাটার খোঁজখবর করছিলে নাকি?”
“না, তেমন কিছু না গো ঠাকুরদা। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, তাই একটু খোঁজ নিলাম। শুনছি তো নাকি প্রহ্লাদটা বিছানায় পড়ে আছে এক মাসেরও ওপর। তাই একটু দেখে গেলাম,” বলল কানাইচরণ।
জীবনবদ্যি হাতছানি দিয়ে ছেলের দলকে কাছে ডাকে। গলা নামিয়ে বলে, “অসুখ-টসুখ নয় রে বাপ, সাক্ষাৎ বেম্বদত্যি। আমি খুব জানি এসব। নিজে চোখে দেখেছি। এই তো সেদিন রাতে উঠতে হয়েছিল আমায়। পষ্ট বুঝলুম, পুকুর থেকে চান করে ঘাটে উঠল। ধূপধুনোর গন্ধে পাড়া মাতিয়ে দিল একদম। আমি তো একটা পেন্নাম ঠুকে তাড়াতাড়ি ঢুকে গেলুম ঘরে।”
কানাইচরণ আর সমিতির সদস্যরা যে তার কথা বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করল না, তা বুঝতে অসুবিধে হল না জীবনবদ্যির। তারা বললে, “ও ঠাকুরদা, ওসব কথা আজকাল আর কেউ বিশ্বাস করে না গো। ও তোমার ভ্রম। পেট গরম করলে অমনটা হয় গো।”
অনেকটা স্বগতোক্তির সুরে গৌরের কাকা বললে, “আমার সঙ্গে শুধু গৌরটা বিবাদ করে রেখেছে তাই। নাহলে আমারই তো রক্তের বাছা। আহা! কী কষ্টটাই না পাচ্ছে ছেলেটা। কোথায় একটা ভালো গুণিন-টুনিনের খোঁজ করবে, তা নয়, বদ্যিগিরি করছে।”
তবে লোকে যা-ই বলুক না কেন, প্রহ্লাদের অসুখটা যে কী, তা সবচেয়ে ভালো জানে সেই। কিশোরবয়সের কোমল মনে এমন প্রেমের জোয়ারে হাবুডুবু খাওয়াটা তো সেই সময়ে খুব স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। তাই সেই অব্যক্ত প্রেমের ব্যর্থ পরিণতি যে এমনটা হতে পারে, তা গাঁয়ের লোকের চিন্তাতেই আসেনি। তবে গৌর বা প্রহ্লাদের মা—কারও কাছেই রোগটা যে খুব অজানা ছিল, এমন কিন্তু নয়।
সেদিন দলবল নিয়ে গাঁয়ের অন্য দিকে এগিয়ে গেল কানাই। তবে দিন তিনেক পরে অবশ্য গৌর নিজেই ডেকে পাঠিয়েছিল কানাইচরণকে। রাত থাকতে থাকতে নৌকায় তুলে চড়িয়াল খালের বুক চিড়ে প্রহ্লাদকে নিয়ে তারা উঠেছিল ঠাকুরপুকুরে। সেখান থেকে মোটরগাড়ির ব্যবস্থা করে ক্যাম্বেল হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসার ব্যবস্থা হল। এক সপ্তাহ পরে রাঁচির হাসপাতালে পাঠিয়ে ভালো চিকিৎসার আয়োজন করল কানাইয়ের দলবল। মাস দুয়েক পরে একটু সুস্থ হলে ডাক্তার বলল, মধুপুরের দিকে কিছুদিন হাওয়া বদল করলে ভালো হয়। শেষমেশ শিমুলতলায় একটা বাগানবাড়িতে মাসখানেক দুজন সঙ্গীসহ প্রহ্লাদের মা আর প্রহ্লাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করল সেই পল্লি উন্নয়ন সমিতি। যদিও খরচখরচার দিকটা প্রায় গৌরই সামলেছিল। অল্প কিছু সমিতির তহবিল থেকে দিয়েছিল কানাইচরণ। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরতে অবশ্য কানাইচরণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে কার্পণ্য করেনি গৌরবদ্যি।
তেরো
সেই ফাল্গুনেই সানাই বেজে উঠল ঘোষালবাড়িতে। সে কী এলাহি আয়োজন! এ তল্লাটের বিয়েবাড়িতে এমন আয়োজন নাকি আগে দেখেনি কেউ। শোনা যায়, বাওয়ালির জমিদারবাড়ির ছেলে-মেয়েদের বিয়ের আয়োজন এমন হয়। দুনিয়ার লোক সে-সব কথা শুনিয়ে গেল আর শতাব্দীর স্মৃতিধারক হয়ে তার প্রতিটি ঘটনার স্মৃতি ধরে রাখলাম এই বুকে।
ব্যারিস্টার ছেলে শম্ভুচরণের বিয়ের পাকা কথা অনেক আগেই দিয়ে এসেছিল সত্যচরণ। পাত্রী সুতানুটির দীনবন্ধু ভট্টাচার্যের মেয়ে। কলকাতায় বিশাল নুনের গোলা মেয়ের বাপের। লোকে বলে, কলকাতায় নাকি অত বড়ো গোলা আর দ্বিতীয়টি নেই। যশোরে জমিদারিও আছে। যদিও এ জমিদারি এজমালি, ভাগিদার অনেক, তবু সে এস্টেটের আয়ের ধারেকাছে নাকি যশোরের আর কোনো জমিদারি নেই। এমন বংশের মেয়েকে পুত্রবধূ করে নিয়ে আসার আয়োজন করল সত্যচরণ।
বিয়ের এক সপ্তাহ আগে থেকেই ভিয়েন বসল ঘোষালবাড়িতে। বাগবাজারের সেরা কারিগরদের নিয়ে এসে ভিয়েন বসাল সত্যচরণের মামা অঘোরী ভট্টাচার্য। পয়ধির কারিগর এল মোল্লারচক থেকে। নামিদামি অতিথিদের জন্য বাইজি নাচের ব্যবস্থা হল। লক্ষ্ণৌ থেকে বাউজি এল। সানাইবাজিয়েরা এল আলিগড় থেকে। গন্ডা গন্ডা হ্যাজাক আর ডে-লাইটের আলোয় দিনরাত এক হয়ে গেল ঘোষালবাড়ির অন্দরমহল, বাগান, গোয়াল, আস্তাবল, পুকুর, ঘাট আর আমি। স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে প্রতিটি ঘটনা।
গাঁয়ের লোকের পাত পড়ল আইবুড়োভাত থেকেই। নহবতের সুর আর মানুষের কোলাহলে কান পাতাই দায় হয়ে উঠল কয়েক দিন। আত্মীয়স্বজন, জ্ঞাতিগুষ্টির উপস্থিতিতে এ বাড়ির চেহারাই বদলে গেল।
বাড়িতে নতুন বউয়ের আগমনে উৎসবের মেজাজ রয়ে গেল কয়েক সপ্তাহ জুড়ে। নতুন বউয়ের সঙ্গে সেজ দেওর অভয় আর ছোটো দেওর বিষ্ণুর ভাব জমে উঠল বেশ। কিন্তু কানাইচরণের সঙ্গে যেন ঠিকমতো সখ্য গড়ে উঠল না। সে নিয়ে অবশ্য বাড়ির কারওই খুব একটা মাথাব্যথা নেই। কারণ কানাই থাকেই বা কতক্ষণ বাড়িতে! বাড়িতে সে থাকলেও কাকপক্ষীও টের পায় না। নিজের ঘরে বইপত্রের মাঝেই কেটে যায় তার সময়। বাড়ির সাত-পাঁচে থাকে না কানাই। আগ্রহ নেই পারিবারিক ব্যবসাতে। পরিবারের উৎসব-অনুষ্ঠানেও নেই বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা।
এদিকে পাড়ার লোকের কানাঘুষোর বিরাম নেই। মহাজনি কারবারে ফুলেফেঁপে ওঠা সত্যচরণ এত দিলদরিয়া হয়ে উঠল কীভাবে? রহস্যটা কী? একসময় যে ছিল এক পয়সার মা-বাপ, সেই সত্যচরণ ছেলের বিয়েতে এমন এলাহি আয়োজন করল কী বুকের মাঝে পাথর চাপিয়ে, নাকি অন্য কোনো রহস্য আছে? সে আলোচনা বহুদিন ধরে চলেছিল বুইতা থেকে নিশ্চিন্তপুরে। রহস্যের সমাধানটা কিন্তু কেউ করতে পারেনি আজও।
(চলবে)


