ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া )
রাজীব বরা
[ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে নাজিরা মহাবিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।রাজীব বরা সাহিত্যের বিভিন্ন বিভাগে নিজ প্রতিভার পরিচয় দানে সমর্থ হয়েছেন।তিনি একাধারে কবি,সমালোচক,গল্পকার,ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক।বর্তমান অসমিয়া কবিতার জগতে রাজীব বরা একটি অতি সুপরিচিত নাম।কাব্যগ্রন্থগুলি যথাক্রমে ‘তটিনী তীরর খেলা’,’ঢেউ’,’মানুহ চেরাই বাচি থকা নাযায়’,’মাউরর দিন’,এই ফালেও কবি আছে’।মৌলিক প্রবন্ধ সংকলন ছাড়াও সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘চিন্তা-পরিক্রমা’,’অসমিয়া আরু কথা সাহিত্যর আভাস’ ইত্যাদি।আলোচ্য উপন্যাস ‘সলিল সমাধি’ (‘জলজাহ’)মাখন হাজরিকা স্মৃতি উপন্যাস পান্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়। এছাড়াও শ্রীবরা বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ]
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ – বাসুদেব দাস
১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা পাঁচশত পঞ্চাশটির ও বেশি।সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিয়মিত ভাবে অসমিয়া গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করে চলেছেন।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত সংস্থা NEINADএর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য Distinguished Life Membership এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশটি।হোমেন বরগোহাঞির অসমিয়া উপন্যাস ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়) বাংলা অনুবাদের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন।
১৯
পরিচিত না অপরিচিত মুলুক
খেমকরণের চাঙঘর থেকে বেরিয়ে অনুমানের ওপর নির্ভর করে মানিকচরের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেওয়া নৌকাটা ভাটির দিকে গতি নিল। কিছুটা এগোতেই বলরাম নির্দেশ দিল–’বাঁদিকে দেখতে পাওয়া আলো গুলি সম্ভবত বাঁধের ওপরে থাকা লোকেদের চালার নিচটা হবে। সোজাসুজি যে আলো গুলি দেখা যাচ্ছে সেগুলি সম্ভবত আমাদের গ্রামের আগের আলিটার চালার নিচের আলো হবে। তাই একটু ডানদিকে ঘেঁষে নৌকাটাকে রাখার চেষ্টা করবি। সেই দিক দিয়ে গেলেই মানিকচর পেয়ে যাব বলে মনে হচ্ছে।’
ক’লাই কোনো মন্তব্য করল না । বুধিরামও উত্তর দিল না। শুধু দিকটার আভাস নিয়ে নৌকার হাল সোজা করে রাখল। জলের উপরে একটু একটু করে বেরিয়ে থাকা লুহিয়া ঘাসের ডগা ভেদ করে নৌকা এগিয়ে যেতে লাগল। সেখানে আশ্রয় নিয়ে থাকা পোকামাকড় মেন্থল লাইটের আলো দেখে ধেয়ে আসে। কোনো কোনো সময় ওদের ঝাঁকটা এত বেশি হয় যে জ্বলে উঠা মেন্থলটার চারপাশে থাকা কাচের ঘেরটা ঘিরে ধরে লাইটের আলোকে স্তিমিত করে ফেলে। তখন বলরাম লাইটটা সামনে তুলে ফুঁ দিতে হয় বা হাতে থাকা গামছাটা দিয়ে সাবধানে পোকাগুলিকে তাড়াতে হয়।
তবে এবার লাইটের স্তিমিত আলো পোকা-মাকড়ের জন্য হয়নি। হয়তো লাইটের টেংকিতে হাওয়া কমে গেছে বা কেরোসিন গ্যাস হয়ে বাইরে বের হওয়া পাইপের নজেল জাম হয়েছে। মেন্থেলটা নিরাপদে ঘিরে থাকো গোলাকার মাইকোসোলারটার চারপাশেই থাকার খুঁটি গুলির একটাতে রশি লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখা নজেল পরিষ্কার করা ক্ষুদ্র পিনটা দিয়ে গ্যাস বের হওয়া পাইপটার ফুটোতে সে বার দুয়েক খোঁচাল। ধপধপ করে শব্দ করে জ্বলে নিভে লাইটের তীব্রতার আলো বেড়ে গেল। নৌকার গলুইয়ে লাইটটা রেখে এক হাত দিয়ে টেঙ্কিটা চেপে ধরে অন্য হাত দিয়ে বলরাম লাইটে পাম্প দিতে লাগল।
‘খুব বেশি পাম্প দিস না।সঙ্গে আর মেন্থল নেই।এটা যদি ছিঁড়ে যায় তাহলে মুশকিলে পড়ে যাব।–দামোদরের কথায় বলরাম সোজাসুজি উত্তর দিল না।তার নিজের বাড়িতেও একটা মেন্থল লাইট আছে। সেটা জ্বালিয়ে কত বছর যে রাতের বেলায় মাছ ধরতে গিয়েছে তার কোনো হিসেব নেই। গ্রামে বিয়ে-শাাদির অনুষ্ঠানেও মেন্থল লাইট জ্বালানোর দায়িত্ব তার ওপরে পড়ে। তাকে নির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অন্যান্যদের চেয়ে সে এই বিষয়ে অনেক বেশি জানে।
তাই সে অন্য একটি প্রসঙ্গ উত্থাপন করল।–আসার সময় টেংকিতে তেল ভর্তি ছিল। এখন কতটা আছে বুঝতে পারছি না। হয়তো অনেকটাই কমে গেছে। ঝাঁকালে টেঙ্কির ভেতরে আলোড়নের সৃষ্টি হবে। তা সত্ত্বেও কয়েক ঘন্টা চলা উচিত। অভিনয়ের সময় ফুল টেঙ্কি ভর্তি করলে সারা রাত চলে যায়।’বলেই সে লাইটটা তুলে টেঙ্কিটা কানের কাছে নিয়ে পুনরায় একবার ঝাঁকিয়ে দেখল।
গ্ৰামের ভাওনায় নামঘরের কাঠের বিমে রশি বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া মেন্থল লাইটই আলোর প্রধান উৎস। সভার আকার অনুসারে লাইটের সংখ্যা নিরূপণ করা হয়। গ্রামের অবস্থাপন্ন মানুষদের প্রায় বাড়িতেই মেন্থল লাইট আছে। বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে সেগুলি এনে জালানো হয়। পোশাকের সঙ্গে মেন্থল লাইট ভাড়ায় আনা হয়।
ব্রহ্মপুত্র এবং খাবলুর ওপারে বিদ্যুতের বাতি জ্বলে যদিও মাজুলীর গ্রামগুলিতে তখনও বিদ্যুতের সংযোগ হয়নি। গ্রামে প্রদীপের আলোই মূল এবং বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে,ভাওনায় মেন্থল লাইটই শেষ কথা। মিহি পাতলা সুতোয় তৈরি, জ্বালানো হলে ফড়িঙের মতো ঠুনকো হয়ে উঠা,না ফোলানো বেলুনের আকারের মেন্থেল্টা একটু নড়াচড়া করলে বা কোনোভাবে কোথাও আঘাত লাগলে ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় থাকে।এমনিতেও জলের মধ্যে।সঙ্গে একটা ও সংরক্ষণ করা নেই,তারমধ্যে যদি মেন্থেল ছিঁড়ে যায়,তাহলে দামোদরের উদ্ধার অভিযানও ব্যাহত হবে।আসার সময় তাড়াহুড়োর মধ্যে সঙ্গে একটা অতিরিক্ত মেন্থেল আনা হল না।বলরামও চিন্তিত হয়ে পড়ল।
মেন্থেলের আলো ওদেরকে প্রয়োজনীয় রাস্তা দেখাতে পারছে না।শুধু নিজে আলোকিত হয়েছে-দূরে দৃষ্টি যাচ্ছে না।তবে ভয়াবহ বন্যার রাতে অথৈ জলধিতে এইটুকু আলো যে সাহস দিচ্ছে না তা নয়।কিছুদূর আলোকিত করেছে।জলে ভেসে বেড়ানো সাপ-খোপের হাত থেকেও বাঁচায় সাহায্য করছে।সামনে থাকা কিছু একটায় নৌকাটা ধাক্কা খাওয়া থেকেও রক্ষা পেয়েছে।তাছাড়া এই আলোই ওদেরকে দূর থেকে সনাক্ত করায় সাহায্য করবে।বিশেষ করে দামোদর যদি দেখে।তার চোখে যদি এই চলমান আলোটা পড়ে।সে নিশ্চয় আওয়াজ দেবে।কথাটা মনে হতেই ক’লাই একটা আওয়াজ দিল-’দামোদর দাদা শুনতে পাচ্ছ?। দামোদর দাদা শুনতে পাচ্ছ? কোথায় আছ দাদা?’ আওয়াজ দিয়ে সে চুপ করে রইল। না, কোনো উত্তর এল না।
নৌকাটা এগিয়ে চলেছে। উলু খাগড়ার পাতার ধারে যাতে শরীর কেটে না যায় সেই জন্য তিন জনেই নৌকার বাঁ দিক থেকে সরে বসেছে। গামছা দিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা করলেও চরের ঘাস বনে থাকা পোকা মাকড় লাইটের চার পাশটা ঘিরে ধরেছে। এই অবস্থায় বোলতাকে ভীষণ ভয়। সাধারণত রাতের বেলা বোলতারা মানুষকে তাড়া করে না। তবে নৌকা যদি ওদের বাসস্থান মাড়িয়ে দেয় তাহলে আলোর উদ্দেশ্যে তেড়ে এলে কী হবে বলা যায় না।
চরে ঘাস কাটার সময় বোলতার কামড়ে তিনজন কতবার বিপদে পড়েছে তার আর লেখা জোখা নেই। কখনও বোলতার আক্রমণে নৌকা থেকে ঝাঁপ দিয়ে জলে ডুবে নিস্তার লাভ করেছে। বোলতার কামড়, শিঙ মাছের কাটা ফুটানো, এগুলি তো নদী তীরবর্তী জীবনের দৈনন্দিন ঘটনা, সেসব নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামানো চলে না। বোলতা কামড়ালে প্রতিকার হিসেবে খরিচার ঝোল বা টেঙাপানী মেখে ব্যথা কমানো যায়।
‘ধীরে ধীরে যা। নৌকাটা রাখ। নৌকাটা রাখ।– স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে ধীরগতিতে এগিয়ে যাওয়া নৌকাটা রাখার জন্য বলরাম ক’লাই় এবং বুধিরামকে সতর্ক করে দিল। হ্যাঁ সে ঠিকই দেখেছে – সামনে ওই যে জলে অর্ধেক ডুবে থাকা একটা জঙ্গল।
‘ পৌঁছে গেছি বলে মনে হচ্ছে।’- দাঁড় বৈঠা চালাতে থাকা ক’লাই ঘাড়টা ঘুরিয়ে নৌকার সামনের দিকে তাকাল এবং দামোদরের উদ্দেশ্যে একটা আওয়াজ দিল –’ দামোদর কাকা। ও দামোদর কাকা।’জঙ্গলে তার আওয়াজটা প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল।এবারও কোনো উত্তর পাওয়া গেল না।ঝোপঝাড়-জঙ্গল ভেদ করে এবং গাছপালার ফাঁক দিয়ে নৌকা এগিয়ে চলল।গোড়াগুলি তলিয়ে গিয়ে জলের উপরে বেরিয়ে থাকা গাছের ডাল গুলি মেন্থেল লাইটের আলোতে জ্বলজ্বল করে উঠল। জলের ওপরে ঝোপে অন্ধকার আলোর চলমান খেলা কিছু একটা অপার্থিব পরিবেশের সূচনা করা বলে মনে হতে লাগল। সেই ঝোপগুলির মাঝেমধ্যে জ্বলজ্বল করে উঠল দুই আড়াই হাত থেকে প্রায় পাঁচ হাত প্রস্থের কাঁটাওলা শিমুল গাছের গা।
বলরাম বলে উঠল-’ মানিকচরের কোথাও কোথাও দুই একটি শিমুল গাছ আছে। তবে এভাবে শিমুল গাছের জঙ্গল দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। এটা মানিকচর নয় নাকি? শিয়ালচরেও খরার সময় এসেছি। শিমুল গাছের এমন জঙ্গল দেখিনি। কোথায় এসে পৌঁছলাম। খেরকটীয়া পার হয়ে কোথাও চলে আসলাম নাকি? পথ ভুল করিনি তো? ‘দূরে তাকিয়ে সে কিছুই বুঝতে পারল না। টর্চ লাইটের অভাবটা সে পুনরায় একবার অনুভব করল।
জল প্রলয়ের সেই রাতে পথের আভাস নিতে পারার মতো কিছু পরিচিত চিহ্ন ছিল কি? যাত্রায় তিনজনেরই লক্ষ্য নিশ্চিত ছিল যদিও সেখানে উপনীত হওয়ার মতো পথের সন্ধান ছিল না। জলে বেরিয়ে থাকা ঝোপগুলির পাশ দিয়ে, কখনও মাঝখানের খালি অংশ দিয়ে নৌকাটা এগিয়ে নিয়ে যাবার সময় সাবধান হতে হচ্ছিল। সামনে কী আছে,ডাইনে কী বাঁয়ে কী ভালোভাবে না দেখে না জেনে তারা নৌকাটা এইভেবেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে–জঙ্গলের ও তো শেষ আছে। ঝোপের স্তব্ধতা ভেঙ্গে বলরাম চিৎকার করল– ‘দামোদর কাকা…।’ স্রোতে তার কণ্ঠস্বর ভেসে গেল না জঙ্গলের মধ্যে পথ হারাল সে বুঝতে পারল না। এবারও উত্তর এল না।
‘কথাটা লক্ষ্য করেছ, এই জঙ্গল মানিকচরের নয়।চল। ফিরে যাই। অন্য কোথাও এসে পৌঁছেছি বলে মনে হচ্ছে।’-বুধিরাম নিজেকে বলার মতো উচ্চারণ করা কথাগুলি কলাই এবং বলরামকেও চিন্তায় ফেলে দিল।’ ফিরে যাই চল’ কথাটা যেন তার নিজের কাছেই অস্পষ্ট হয়ে রইল। কোথায় গেলে বা ফিরে যাওয়া বোঝাবে– সেই ধারণাও অস্পষ্ট হয়ে রইল। কোথায় গেলে বা ফিরে আসা বোঝাবে– সেই ধারণাও অস্পষ্ট হয়ে রইল। জঙ্গল থেকে বেরোনোর পথ খুঁজে পেলে রক্ষা– সে মনে মনে ভাবল…’
হঠাৎ কিছু একটা আলোড়ন শুনে বলরাম নৌকার খোলে রাখা কোঁচটা নিয়ে জোরে খামচে ধরল। এমনিতেও তার জেলের হাত। দামোদরকে খুঁজে বেড়ালেও সে তার মৎস্য সন্ধানী চোখ দুটি সামলে রাখতে পারছে না। কোথাও যদি মাছ বেরোয় সে নিশ্চয় শিকার করবে।
অবশ্য এত ভয়ংকর জলে উজান উঠার অবকাশ নেই। তবু কোথাও যদি অন্য অজুহাতে মাছ বের হয়? জলে ডুবে থাকা ঝোপঝাড়, উইপোকার ঢিবিতে পোকামাকড় পতঙ্গ খাওয়ার জন্য মাছ আসার কথা বলরামের মতো জেলেরা জানে। নতুন জল এলে বাড়ির গোবরের ঢিপির কাছে কেঁচো -কুমটি খেতে আসা রাঘববোয়াল ভাঁড়ারের চাঙ থেকে কোঁচ দিয়ে খুঁচিয়ে ধরার অভিজ্ঞতাও তার আছে। এখন যদি সেরকম কোনো মাছ আসে তাকে সে অবহেলা করতে পারবে না।
নৌকাটা ধীরে ধীরে ছপ ছপ এবং আলোড়নের শব্দটার কাছাকাছি চলে এল। লাইটের আলোতে বলরাম ভালোভাবে দেখল– সেটা সাঁতরে যাওয়া কোনো একটা প্রাণী। প্রাণী মানে– জল থেকে বেরিয়ে থাকা নাক মুখ দেখে সেটা শিয়াল বলে মনে হল। তবে শিয়ালের মুখ এত বড়ো? নৌকার পাশ থেকে দ্রুত বেগে সাঁতরে চলে যেতে চাওয়া প্রাণীটার মাথার কিছু অংশ বেরিয়ে থাকা দেখে জলের নিচে থাকা অংশটার একটা আভাস পাওয়ার জন্য বলরাম কিছুটা ঝুঁকে তাকাল– এটা শিয়াল নয়।। তাহলে?
‘বাঘ ! বাঘ !’অনুচ্চ কন্ঠে শব্দ দুটো উচ্চারণ করে বলরাম ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত হয়ে পড়ল। হ্যাঁ বাঘই। চোখের পাশে জ্বলজ্বল করতে থাকা আঁকবাঁক তার সেই ধারণাকে আরও দৃঢ় করল। ‘বাঘ ! বাঘ !’–বলরামের মুখে শব্দ দুটি শুনেই ক’লাই তার বৈঠা ফেলে রেখে লাফ দিয়ে এসে নৌকার মাঝখানে পড়ল। বলরাম এবার ফিসফিস করে বুধিরামকে বলল–’ নৌকা রাখ নৌকা রাখ। না হলে বাঘের মুখে গিয়ে পড়বি।’
আগে আগে সাঁতরে যেতে থাকা বাঘটা একসময় লাফ দিয়ে যেখানে গিয়ে উঠল সেটা শিমুল বনের মাঝখানের একটা উইয়ের ঢিবি। মেন্থল লাইটের আলোতে ওরা দেখতে পেল অনেকগুলি উইয়ের ঢিবির সমষ্টি। তার উঁচু অংশগুলি দখল করেছিল শিয়াল, বন বিড়াল ,হুলো বনবিড়াল এবং অন্যান্য অনেক প্রাণী। প্রায় পাশ দিয়ে যাওয়া নৌকাটি থেকে বলরামরা যত অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে ছিল হয়তো তার চেয়েও বেশি অবাক হয়ে জন্তুগুলি নৌকা থেকে বিচ্ছিরিত আলোর দিকে তাকিয়ে ছিল।আলোতে জ্বলজ্বল করে উজ্জ্বল হয়ে উঠা চোখ গুলিতে কী ছিল–হয়তো ভয়। সংশয়। তাতে ক্রোধ বা আক্রমণের চঞ্চলতা ছিল কি? সেটা বোঝা সম্ভব ছিল না।
উইয়ের ঢিবিতে উঠতে যেতেই বাঘ বাবাজিকে আগে থেকেই সেখানে জায়গা দখল করে বসে থাকা একটা শিয়াল দাঁত বের করে চেঁচিয়ে উঠল।তবে বাঘ বাবাজি তাতে কর্ণ পাত করল না।সে ভেজা শরীরটা কয়েকবার ঝাঁকিয়ে নিল–নাগকেশর ফুলের মতো গায়ের সাদাকালো ডোরাকাটা দাগগুলি স্পষ্ট হয়ে উঠল।
‘চিতাবাঘ’–বলরাম মুখের ভেতরে উচ্চারণ করল। বাঘকে শিয়াল ধমক দিতে দেখে সে বেশ মজা পেল। বিপাকে পড়লে বনের রাজাকেও শিয়াল চোটপাট করায় আশ্চর্যের কিছু নেই। বন্যার জল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কতক্ষণ ধরে উইঢিবির সেই জায়গাটা করায়ত্ত করতে শিয়ালকে বোধহয় অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছিল। তাহলেও যার গন্ধ পেলে মল ত্যাগের যন্ত্রণায় ফেউয়ে ধরার চেয়েও বেশি ভয়ে চিৎকার করতে হয় তার উপস্থিতি কীভাবে অস্বীকার করা যেতে পারে?
বাঘ বাবাজি ব্যতিব্যস্ত না হয়ে, আক্রমণাত্মক মনোভঙ্গি না নিয়ে ঢিবিটাতে উঠে নিজের জন্য কিছুটা জায়গা, স্থায়ী করে নিল। অন্য সময় হলে কী হত তা জানার উপায় নেই যদিও বাঘের গন্ধ পেলেই ফেউ ধরে শিয়াল পালানোর বৃত্তান্ত ক’লাইরা যে জানে না তা নয়। প্রাণ বাঁচানোর তাড়নায় পলায়নের পরিবর্তে শিয়াল আজ দাঁত বের করে বাঘের উদ্দেশ্যে গর্জন করে উঠাও আশ্চর্যের নয়।
মেন্থেল লাইটের আলোতে পড়ে শিয়ালের চোখের পাতা পিরপির করে নড়তে লাগল।
বিপদের সময় খাদ্য এবং খাদকের সহবস্থান নতুন কথা নয়। উচু আলিতে তৈরি করা চালার নিচে গরু আর মানুষের সহবস্থানের মতোই উইয়ের ঢিবিতেও সাপ,বেঙ, ছাগল একসঙ্গে দিনকাটায়। গতবছর বন্যায় আলোড়ন সৃষ্টি করা দিনে চোখে ছানি পড়া বিমলা জেঠা শুয়ে থাকার সময় পোষা বিড়ালের বাচ্চা মনে করে কেউটে সাপকে কাপড় দিয়ে বিছানায় শুইয়ে রেখেছিল না!না, সে রাতে জ্যেঠাকে সাপে কামড়ায় নি। পরে সাপ বলে জেনে হাত দিয়ে ছুঁড়ে ফেলার পরেও উল্টে তেড়ে এল না–এ কথা শুধু কলাই নয় গ্রামের প্রত্যেকেই জানে।
বলরাম বাঘটাকে ভালো করে দেখল। জল থেকে উঠে আসায় তার দশা ভেজা বিড়ালের মতো হয়েছে। ল্যাপ্টে থাকা লোমগুলিতে তাকে খুব দুর্বল দেখাচ্ছে। কোমরটা যেন নেই। অনেকদিন খেতে পায়নি বোধহয়।সাতটা ষাঁড়ের বল লাভ করা বুনো কচুর মতো ক্ষীণ কোমর কথাটার অর্থ সে বুঝতে পেরেছে। বনের রাজার সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা প্রাণীটার অসহায় অবস্থা দেখে বলরামের তার প্রতি করুণা জন্মাল।
(চলবে)


