জিজীবিষা
ধারাবাহিক উপন্যাস
সুরঞ্জিত সরকার
পঞ্চদশ পর্ব
দেখতে দেখতে কৈপুকুরের বাড়িতে আরো একটা দিন অতিক্রান্ত। রহস্যের পর্দা ক্রমাগত জটিল হয়ে চলেছে। এদিকে সুমন্তর বন্ধুসম দাদা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৌরীশদা জানিয়েছে, “পূরবী ভবনে গোপন কুঠুরি অভিযানে ফরেনসিক টিম কেবল পুলিশকেই থাকতে দেবে। অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।”
দিন কয়েক পরে একদিন সকালে বড়বাবু সুমন্তকে ফোন করে জানালেন, “শুনুন সুমন্তবাবু, ফরেনসিক টিম পূরবী ভবনের সেই পুরনো কুঠুরি থেকে যা উদ্ধার করেছে, তা এক কথায় হাড়হিম করা। অতীশবাবু যখন রহমান ভাইয়ের থেকে এই বাড়ি কিনেছিলেন, তখন হয়তো তিনি ঘুণাক্ষরেও জানতেন না যে বাড়ির ঠিক নিচেই এক মৃত্যুপুরী লুকিয়ে আছে। কুঠুরি থেকে প্রচুর হাড়গোড় আর মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গেছে। বোঝাই যাচ্ছে, অবিনাশ আর তার দলবল পাচার বা খুনের পর এখানেই দেহগুলো লোপাট করত।”
ফোনের ওপার থেকে স্তম্ভিত কণ্ঠে সুমন্ত বলল, “তার মানে পূরবী ভবন আসলে অবিনাশের একটা গোপন টর্চার সেল ছিল? বড়বাবু, আমাদের অজান্তেই বাড়ির তলায় এত বড় অপরাধচক্র চলছিল ভেবেই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে! কিন্তু কিভাবে সম্ভব ”
কল্যাণ আবারও জোর গলায় জানাল, “বড়বাবু, এই কাটা মানিক আর বাকি দুজনকে কড়া রিমান্ডে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ওই কুঠুরির সাথে সীমান্তের মাদক পাচারের রুট নিশ্চয়ই যুক্ত।”
বড়বাবু জানালেন, “একদম ঠিক। আমরা তল্লাশি অভিযান আরও বাড়িয়েছি। এছাড়াও ইটের দেওয়ালের আড়ালে আধুনিক কিছু গ্যাজেট আর ওয়্যারলেস সেট লুকানো ছিল—যা প্রমাণ করে যে পুরনো এই কুঠুরিটিই ছিল অবিনাশের কন্ট্রোল রুম।
সুমন্ত জিজ্ঞেস করল, “আমি আর দাদা দাদুকে নিয়ে কি এখুনি থানায় যাব? দাদু হয়তো রহমান ভাইয়ের সময়কার কোনো পুরনো কথা মনে করতে পারেন যা এই তদন্তে গতি আনবে।”
বড়বাবু ফোনের ওপাশে কিছুক্ষণ চুপ থেকে সুমন্তর প্রস্তাবটা বিবেচনা করলেন। থানার পরিবেশ এখন বেশ উত্তপ্ত, কাটা মানিকের মতো দাগী অপরাধীকে জেরা করা হচ্ছে—এই অবস্থায় অতীশবাবুর মতো বয়স্ক মানুষকে নিয়ে আসা কতটা নিরাপদ, সেটাই তিনি ভাবছিলেন।
বড়বাবু গম্ভীর স্বরে জানালেন, “সুমন্তবাবু, অতীশবাবুকে এই মুহূর্তে থানায় আনাটা বোধহয় খুব একটা স্বস্তিদায়ক হবে না। কাটা মানিক আর তার সঙ্গীরা লকআপে থাকলেও, অবিনাশের কিছু লোক এখনো বাইরে ঘুরছে। তবে হ্যাঁ, দাদুর স্মৃতিশক্তি এখন আমাদের সবথেকে বড় অস্ত্র হতে পারে। রহমান ভাই যখন বাড়িটা বিক্রি করেছিলেন, তখন কোনো বিশেষ শর্ত বা বাড়ির নকশা নিয়ে কোনো আলাদা কথা হয়েছিল কি না, সেটা জানা খুব দরকার।”
এরপর সৌরীশদা ফোন করে জানাল, “সুমন্ত, তুই বরং দাদুকে নিয়ে বাড়িতেই থাক। একটা স্পেশাল অর্ডারে আমি বড়বাবুর সাথে ফরেনসিক টিমকে নিয়ে পূরবী ভবনের সেই কুঠুরিতে যাচ্ছি। তোরা দাদুর থেকে জানার চেষ্টা কর—রহমান ভাই কি কখনো ওই নিচের ঘরটার কথা উল্লেখ করেছিলেন? কিংবা বাড়ির পুরনো দলিলে কি কোনো গোপন কুঠুরির ম্যাপ ছিল?”
“ঠিক আছে দাদা। দাদু বলছিলেন রহমান ভাই বাড়ি ছাড়ার সময় খুব আতঙ্কে ছিলেন। পরে জানতে পেরেছিলেন কিছু পারিবারিক অশান্তির জেরে ওনার প্রথম পক্ষের মেয়ে গায়ে আগুন দিয়ে ঐ বাড়িতে মারা গেছল। আমি দাদুকে শান্ত করে সবটা খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করছি। “
সুমন্ত আরও জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা পুলিশ কি ওই কুঠুরি থেকে পাওয়া হাড়গোড়গুলোর ফরেনসিক পরীক্ষার প্রাথমিক কোনো আভাস পেয়েছে? ওগুলো কি সাম্প্রতিক কারো?”
সৌরীশদা একটু চুপ থেকে বলল, “প্রাথমিকভাবে জানা গেছে কিছু হাড় অন্তত পাঁচ-ছয় বছরের পুরনো, যা কাটা মানিকের নিখোঁজ হওয়ার সময়ের সাথে মিলে যাচ্ছে। তবে সুমন্ত, তোরা সতর্ক থাকিস। দাদুকে বলিস পুরনো কোনো চাবি বা সিন্দুকের কথা মনে পড়ে কি না, যা হয়তো ওই কুঠুরির কোনো গোপন লকার খুলতে সাহায্য করবে।”
সুমন্ত দাদুকে একটা চেয়ারে বসিয়ে এক গ্লাস জল এগিয়ে দিল। দাদুর চোখেমুখে এখনো আতঙ্কের রেশ, পূরবী ভবনের নিচের সেই হাড়গোড় আর কুঠুরির খবর তাকে যেন অনেকটা ভেঙে দিয়েছে।
সুমন্ত দাদুর কাঁধে হাত রেখে নরম সুরে বলতে লাগল, “দাদু, একটু শান্ত হও। বড়বাবু আর সৌরীশদা ওখানে তদন্ত করছেন। কিন্তু একটা কথা খুব খটকা লাগছে—রহমান ভাই যখন তোমাকে এই বাড়িটা বিক্রি করেছিলেন, তিনি কি কোনোদিন ওই নিচের কুঠুরির কথা বলেছিলেন? তুমি তো বলেছিলে উনি তখন খুব ভয়ে ছিলেন।”
অতীশ কিছুটা আনমনা হয়ে উত্তর দিলেন, “ভয়… হ্যাঁ সুমন্ত, রহমান ভাইয়ের চোখে আমি ঘোর অন্ধকার দেখেছিলাম। বাড়িটার রেজিস্ট্রির কাগজে সই করার সময়ে ওনার হাত কাঁপছিল। তিনি শুধু একটা কথাই বারবার বলেছিলেন—’অতীশবাবু, এই বাড়িতে থাকাকালীন মাটির নিচে কখনো কিছু খোঁজার চেষ্টা করবেন না। ওপরের আকাশটা আপনার, কিন্তু নিচের মাটিটা অভিশপ্ত’। যদিও আমি কখনো এই কথাটা গুরুত্ব সহকারে ভাবিনি।”
সুমন্ত একটু উত্তেজিত হয়ে আরো জিজ্ঞেস করল, “উনি কি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি দাদু? কোনো চাবি বা কোনো বিশেষ দেওয়ালের কথা?”
দাদু ঘাড় নেড়ে জানাল, “না রে। তবে মনে পড়ছে, উনি বলেছিলেন অবিনাশের বাবা অর্থাৎ পুরনো সেই নায়েব লোকটা এই বাড়ির সব গোপন পথ জানত। রহমান ভাই একবার রাতে নীচ থেকে কান্নার আওয়াজ শুনেছিলেন, কিন্তু ভয়ে নিচে নামেননি। অবিনাশের পরিবারের জন্যই নাকি ওর প্রথমপক্ষের মেয়েটা গায়ে আগুন দিয়েছিল শুনেছিলাম। সত্য মিথ্যা অত বুঝতাম না। রহমান ভাই হয়তো মেয়ের শোকেই প্রাণ বাঁচাতে জলের দরে বাড়িটা আমাকে দিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন।”
সুনীপা পাশ থেকে এসে দাদুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তার মানে দাদু, অবিনাশের পরিবার রহমান সাহেবকেও ব্ল্যাকমেল করত? আর ওই কুঠুরিটা আসলে ওরাই ব্যবহার করত?”
দাদু উদাস ভাবে সুনীপার দিকে তাকিয়ে বলল, “হয়তো তাই। রহমান ভাই যাওয়ার আগে একটা পুরনো জং ধরা পেতলের কবজ আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ‘যদি কখনো বিপদ আসে, এটা সদর দরজার নিচের পৈঠায় ঠেকাবেন’। আমি তো তখন ওসব কুসংস্কার ভেবে গুরুত্ব দিইনি।”
সুমন্ত চমকে উঠে বলল, “পৈঠায় ঠেকাবেন? তার মানে ওটা কোনো ইলেকট্রনিক বা মেকানিক্যাল লিভারের চাবি হতে পারে! দাদু, সেই কবজটা কোথায় এখন?”
“ওটা বোধহয় এখনো আমার পুরনো কাঠের সিন্দুকে আছে। দাঁড়া, আমি দেখছি।” এই বলে দাদু কাঠের সিন্দুকের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল।
(চলবে )



