আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল
( অন্তিম পর্ব )
বিতস্তা ঘোষাল
আলোর পথযাত্রী-৪
অনুবাদ পত্রিকার লেখা বাদে আমি তাঁর অনুবাদ পড়েই প্রস্তুতি নিয়েছি, তাঁর যে ছোটোবেলায় ফাতেহা দোয়াজ দাহাম, ঈদ-উল-ফিতর, ইদুজ্জোহা এই শব্দগুলি তাঁর ভালো লাগতো এবং শুনে তার মনে হয়েছিল হয়তো বা ঢাকের আওয়াজ, হয়তো বা চরকা বুড়ির চরকা কাটার আওয়াজ কিংবা ট্রেনে করে অনেক দূর দেশে যাওয়ার আওয়াজ৷ কারণ এই শব্দগুলির মানে তিনি জানতেন না৷ ‘সত্যিই তো মানে জানি না বলেই তো এই শব্দটা বিশুদ্ধ সঙ্গীতে পরিণত হয়েছে …….. বুদ্ধি গ্রাহ্য সংজ্ঞায় ওদের বন্দী করতে পারিনি, তাই আমার কাছে ওরা বিশুদ্ধ ছন্দ ঝংকার, বিমুর্ত ব্যঞ্জনা৷’ অজানা রাজ্য থেকে জানার রাজ্যে পদার্পণ-এর মধ্যেই তাঁর অনুবাদ কর্মের সূচনা৷ সাত বছর বয়স থেকেই লেখালেখি, প্রথম কবিতার বই ‘প্রথম প্রত্যয়'(১৯৫৯) কিন্তু ‘আমার মনে হয় তোমার প্রথম ভাবনাচিন্তার উৎসগুলির মাধ্যমেই অনুবাদচর্চা শুরু হয়ে গিয়েছে৷ সেই ভাবনা চিন্তাগুলো ছিল সুনীতি বাবুর সাথে সীতার আলোচনায়, বুদ্ধদেব বাবুর ‘কবিতাভবনে’ ইউরোপীয় সাহিত্যের আলোচনায়, সুকুমারী দেবীর কাছে সংস্কৃত – ইংরেজি পড়াশুনায় এবং সর্বোপরি ছোটবেলার আলেকজান্ডার দুমা, ভিক্টর উগো, স্যার ওয়াল্টার স্কট, চার্লস ডিকেন্স, লুইস ব্যারল, রবার্ট লুইস স্টিভেনসন, এইচ.জি. ওয়েলস, গ্রীম ভাই, অস্কার ওয়াইল্ড, জুল ভের্ন, আগাথা ক্রিস্টি প্রমুখ পাশ্চাত্যের সাহিত্যিকদের সাথে ছোটবেলায় পরিচয়ের মধ্য দিয়ে।’ – আমি একথা বলতেই বললেন, ‘ আমার কি কি অনুবাদ গ্রন্থ পড়েছ’?
আমি এক নিঃশ্বাসে চন্দ্রাবতীর রামায়ণ ইংরেজিতে অনুবাদ, শতেক বচন (কন্নড কবিতার অনুবাদ) ,উপমহাদেশের গল্প , হাইকু ৭৯ , আলবাট্রস, শার্লট পারকিনস গিলমার্ট এর কথা বলতেই বললেন, “চন্দ্রাবতীর রামায়ণের পাশাপাশি মোল্লা রামায়ণ নিয়েও লিখেছি। ভালো করে হোম ওয়ার্ক করে পাঠাবে।”
এই প্রসঙ্গে বলি, বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারীকবি চন্দ্রাবতীকে রামায়ণ রচনা নিয়ে গবেষণার কাজেই খুঁজে পেয়েছিলেন নবনীতা। একইভাবে মোল্লা নামে সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা তেলেগু ভাষার নারীকবির সাহিত্যকীর্তিও খুঁজে বের করেছিলেন তিনি। তারপর দুই নারীকবির লেখা রামায়ণের বিশ্লেষণ করেছিলেন।
স্ত্রীকে নির্বাসন দেওয়ার পর রামের কী হলো মোল্লা সেটি একটি মারাঠি গানে লিখেছেন। রামকে বিলাপ করতে দেখা যায়। কিসের বিলাপ তার? শালের খুঁটে চোখ মুছে রাম হাহাকার করেন :
‘সীতার মতো রানী আমি কোথায় পাই
আর কে তার মতো জল দিয়ে মেঝে ধোয়াবে?
কে আমাকে আমার ধুতি এনে দেবে?
সীতার মতো সুস্বাদু রান্না রেঁধে কে খাওয়াবে আমায়?
সীতা এখন বনবাসে, কে পেতে দেবে আমার রাজশয্যা?
কে জোগাবে চন্দনবাটা?
ভাই লক্ষ্মণ, বন্ধ করে দাও এই বিলাসপ্রাসাদ।’
যেভাবে বৃষ্টির জল পড়ে, ঠিক সেভাবে চোখের জল ফেলতে ফেলতে রাম পায়ের ধাক্কায় খাট উলটে দেন। সীতাকে বনবাসে পাঠিয়ে অনেক কিছু হারিয়েছেন তিনি। সীতা তাঁর কাজের লোক, রাঁধুনি, বিছানা পাতার লোক, দক্ষ গৃহকর্মী এবং রতিসুখদাত্রী। এসব হারানো এক বিরাট ক্ষতি, সন্দেহ নেই।
অন্যদিকে সীতা কীভাবে বনবাসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারও উল্লেখ আছে মারাঠি গানে। সীতার জন্য রথ এসে অপেক্ষা করছে। তিনি শেষ মুহূর্তেও কিছু দরকারি টুকিটাকি কাজ সেরে নিচ্ছেন।
গৃহকর্মীকে নির্দেশ দেন কাপড় শুকোনোর দড়ি থেকে রামের শাল সময়মতো তুলে আনতে এবং রাম যখন খাবেন পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে। গৃহকর্মীর হাতে একটুকরো সাবান দিয়ে সীতা বলেন, তা দিয়ে যেন রামের কাপড় কাচা হয়। মুদিখানার দোকানে প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন দোকানিকে। ভারীকে বলেন, প্রতিদিন নিয়ম করে রামের স্নানের জল ভরে রাখতে, তিলিকে বলেন রামের বাতিদানে তেল ভরে রাখতে। যখন রথ প্রায় চলতে শুরু করেছে, সে-সময়ও তিনি মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘আমার রামের কাচা পোশাক স্নানাগারে রাখা আছে তো?”
নবনীতার প্রিয় বিষয় রূপকথা। আদর্শ জীবন, আদর্শ মানুষ, আদর্শ সমাজ তৈরির সুযোগ আছে রূপকথায়। তাঁর রূপকথায় মেয়েরা কুশীলব। রানি এসে রাজাকে উদ্ধার করে। রূপকথায় পুরুষরাই চিরদিন মেয়েদের উদ্ধার করে। মেয়েদের বন্দি করে, পেটায়, কাটে আবার উদ্ধারও করে। পুরুষই তাদের কষ্ট দেয়, আবার তারাই উদ্ধার করে। মেয়েদের আসল চেহারা নেই, তারা শুধুই বন্দিনী। ছেলেদের তুলনায় প্যাসিভ। তাঁর রূপকথায় মেয়েদের পজিটিভ ও অ্যাকটিভ রোল তুলে ধরা হয়েছে। তারা উদ্ধার করে যুদ্ধ করে নয়, অস্ত্রবলে নয়, বুদ্ধির অস্ত্রবলে। ছোট থেকেই মেয়েদের বোঝানো দরকার তাদের মধ্যে শক্তি আছে। শুধু রূপ নয়, বুদ্ধি চাই। রূপবতী রাজকন্যা নয়, বুদ্ধিমতী রাজকন্যা চাই। বুদ্ধি, আবেগ, ভালোবাসা দিয়ে জয় করতে হবে।
আসলে তিনি ছিলেন এমন এক মেধাবী উচ্চ শিক্ষিত স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ভাবনায় বিশ্বাসী।তাই অনায়াসে বলেন- “বিশ্বের মহাকাব্য রচয়িতারা সবাই পুরুষ। তাঁরা নিজেদের কাব্যে বন্দনাও করেছেন পুরুষের, অস্ত্রধারী বীরদের। অপহৃত হওয়া, উদ্ধার হওয়া, জুয়ার পণ হওয়া, নির্যাতিত হওয়া বা অপমানিত হওয়া ছাড়া নারীর সেখানে বিশেষ কিছু করার নেই।তবে এই ধারণাটাকেই পাল্টাতে হবে। নইলে যতই আধুনিক হও কিছুই বদলাবে না।”
তিনি যে মেয়েদের এই বদল চেয়েছিলেন, তা নিজের জীবনেও বার বার করে দেখিয়েছেন। সে একা ট্রাকে করে অরুণাচল বা বিদেশ, অথবা মহাকুম্ভে- সব জায়গায় মনের জড়তা কাটিয়ে পৌঁছে গেছেন ভয়হীন হয়ে। কুম্ভমেলায় তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেওছেন। ভিড়ে হাঁটতে হাঁটতেই তিনি খেয়াল করেছেন, প্রবল জনারণ্যের সুযোগ নিয়ে একটি হাত তাঁকে ক্রমাগত উত্যক্ত করছে। ভাবছে তিনি নিরুপায়, তিনি বোধহয় আত্মরক্ষায় অপারগ। দু-একবার রাম-চিমটি কেটেও লাভ হল না। প্রবল স্নায়ুযুদ্ধ করতে করতে একসময় নবনীতা সেই মালিকের-নাম-না-জানা হাতটিকে খপ করে চেপে ধরলেন, এবং অনুচ্চ কিন্তু স্পষ্ট গলায় ইংরেজিতে বললেন, “যদি এবার চেঁচিয়ে উঠি, আপনি কিন্তু খুন হয়ে যাবেন। এই ভিড় আপনাকে এখুনি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবে।” বলে, হাতটি ছেড়ে দিলেন। ব্যাস, গণপ্রহারের ভয় দেখাতেই কাজ হলো, হাতের মালিক আর দুঃসাহস দেখাতে রাজি হলেন না। কথাটা যথাসাধ্য নিচু গলায় বললেও ভিড়ের মধ্যে দু-চারজন শুনেছেন, পাশ থেকে এক মহিলার কণ্ঠে হিন্দিতে ‘জানওয়ার’ জাতীয় শব্দ পাওয়া গেল। নবনীতা বুঝলেন, তিনি একা নন, অনেক মেয়েই এ জাতীয় অসভ্যতার শিকার।
এই মহাকুম্ভের অগণিত মানুষের মিলনমেলার মাঝে ত্রিবেণীসঙ্গমে ডুব দিলেন নবনীতা। অঞ্জলিতে জল নিয়ে বললেন, “তৃপ্ত হও হে আমার পূর্বপুরুষসকল, হে পূজনীয় মাতৃপিতৃগণ! তিন ভুবন জুড়ে তৃপ্ত হও তোমরা আমার ভালোবাসায়।”
নবনীতার জন্ম ১৯৩৮ খ্রি. ১৩ই জানুয়ারি দক্ষিণ কলকাতার, ৭২,হিন্দুস্থান পার্ক-এর ‘ভালো-বাসা’-য়৷ পিতা কবি-সাহিত্যিক-অনুবাদক নরেন্দ্র দেব এবং মাতা কবি-সাহিত্যিক রাধারাণী দেবী(ছদ্মনাম অপরাজিতা দেবী)৷
মা রাধারানী দেবীর কাছে তাঁর প্রথাগত শিক্ষায় হাতে খড়ি৷ প্রথম স্কুল গোখেল স্কুল৷ ১৯৫০-এ ১২ বছর বয়সে পিতা-মাতার সঙ্গে প্রথম ইউরোপ ভ্রমণ৷ প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজিতে স্নাতক, ১৯৫৮- যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যে স্নাতকোত্তর (প্রথম শ্রেণীতে প্রথম), ১৯৫৯-এ অমর্ত্য সেনের সঙ্গে বাগদান, ১৯৬০-এ অমর্ত্য সেনের সঙ্গে বিবাহ; ১৯৬১-তে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ডিস্টিংশন নিয়ে স্নাতকোত্তর, ১৯৬৩-তে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পি.এইচ.ডি; পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করেন বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও কেমব্রিজ-এর নিওনহ্যাম কলেজে; দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশন এর সিনিয়র ফেলো ছিলেন৷
১৯৭৫-২০০২ খ্রি. পর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপিকা ও বেশ কিছুকাল বিভাগীয় প্রধান৷ এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর৷ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল হাভার্ড, কর্নেল, কলম্বিয়া, স্মিথ কলেজ, চিকাগো, মেক্সিকো, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, মেলবোর্ন, জাপান; কানাডার টরেন্টো, ইয়ার্ক ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রভৃতি৷ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক আর্ট কলোনির সদস্য ছিলেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ইয়াতো এবং ম্যাকডাওয়েল, ইতালির বেলাজিও, জেরুজালেমের মিসক্যানট শা’এনিম৷
১৯৭৩-৭৯ খ্রি. আন্তর্জাতিক তুলনামূলক সাহিত্য সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত হন৷ ১৯৮৬-তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেস্টিভাল অব ইন্ডিয়ার ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন৷ ১৮৮৮-৮৯ সালে কলোরাডো কলেজে ‘ম্যাটেগচেয়ার অব ক্রিয়েটিভ রাইটিং অ্যান্ড কমপ্যারেটিভ লিটারেচার’ পদটি অলংকৃত করেন৷ ১৯৮৯-৯৪ সালে দ্য ইন্টারন্যাশানাল অ্যাসোসিয়েশন অফ সেমিওটিক অ্যান্ড স্ট্রাকচারাল স্টাডিজ-এ এক্সিকিউটিভ পদে যুক্ত হন৷ ১৯৯৬-৯৭ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাকাব্যের ওপর রাধাকৃষ্ণান স্মারক বক্তৃতা প্রদান করেন৷ এছাড়া ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশান্যাল কমপ্যারাটিভ লিটারেচার অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি; জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, সরস্বতী সম্মান, কবির সম্মান, রবীন্দ্র পুরস্কার-এর নির্বাচন কমিটির সদস্যা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সহ-সভাপতি এবং The Little Mgazine এর সাউথ এশিয়ান লিটারেচার অ্যাওয়ার্ড ফর দ্য মাস্টার্স এর জুরি প্রভৃতি৷ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে সম্মানিতা – গৌরীদেবী স্মৃতি পুরস্কার, ১৯৯২তে মহাদেবী ভার্মা পুরস্কার, জাতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৩-তে চেল্লি পুরস্কার, বিহারের ভাগলপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শরৎ পুরস্কার, প্রসাদ পুরস্কার, ১৯৯৯-তে সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার (নব-নীতা গ্রন্থের জন্য), ২০০০ -এ পদ্মশ্রী, ২০০৩-এ অকাদেমী লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, ২০০৩-০৪ -এ J.P. Naik Distinguished Fellow at the centre of Women’s Development Studies, New Delhi; ২০০৪-এ কমলকুমারী জাতীয় পুরস্কার, ২০০৮-এ বিদ্যাসাগর পুরস্কার, ২০১৭-তে মিস্টিক কলিঙ্গ লিটারেচার অ্যাওয়ার্ড এবং ২০১৮ সালে শিশু-সাহিত্যিক হিসাবে পুরস্কৃত প্রভৃতি৷
তাঁর এই ছোট্ট পরিচয়ের পালা সাঙ্গ করে ফিরে আসি আবার তাঁর কাছে যাওয়ার কথায়। একান্তর পত্রিকার সম্পাদক অরূপ আচার্য তাঁকে নিয়ে একটা সংখ্যা করেছেন। সেটি ‘সই’য়ের বৈঠকী আড্ডায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হবে।তিনি জানতেন, এমনিতে আমি কিছুতেই যাব না, অন্য দিকে অরূপদা অনুরোধ করলে আমি ফেলতে পারব না, তাই তাঁকেই নির্দেশ দিলেন আমাকে যেন সেদিন অনুবাদ ও তাঁকে নিয়ে বলার জন্য বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেদিন আর না করতে পারিনি। গেছিলাম ‘ভালোবাসা’য়। তখন তিনি খুব অসুস্থ। তার মধ্যেও সকলের সঙ্গে কথা বলছিলেন।বাবার কথাও উঠল। সেগুলো এতটাই ব্যক্তিগত, যে উল্লেখ করছি না, তবে সেদিন দেখলাম কোনো রাখডাক না করেই সকলের সামনেই বাবাকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত ভাবে বলে যাচ্ছেন।কবে কোন পত্রিকায় লেখা পাঠাতেন, বার বার রিজেক্ট হচ্ছিল,বাবার পরামর্শে কিভাবে কেন তা বাতিল হচ্ছে বুঝে নিজে পৌঁছে গেছিলেন সেই দপ্তরে- তাও বললেন।
তাঁর কাছে আরেকদিন গেছিলাম।তিনি নিজেই ডেকেছিলেন।কিন্তু আবার দেখলাম সেই আগের মতোই।ওপর থেকে ফেলে দেওয়া চিঠি।
আর দেখা হয়নি। তবে প্রায়শই মেসেজ করতেন। এমনকি শেষে যখন দিল্লিতে,হাসপাতালে- তখনও প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু লিখে পাঠাতেন মেসেজে।
অবশ্য তখন আমি আর সেই ইগো সর্বস্ব আগের মেয়েটি ছিলাম না। ভাবতাম এমন এক নারীরা যাঁরা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হন, তাঁদের কিছু তো ব্যতিক্রম থাকবেই।আর মানুষ তখনই এমন আচরণ করতে পারেন যখন তিনি অপর মানুষটিকে ভালোবাসেন।
আসলে জীবনের চাওয়া পাওয়ার দ্বন্দে বাহ্যিক জীবন আর অন্দরের জীবনকে এক করে ফেললেই ইগো আসে। না এলেই তখন তাঁর ভাষাতেই বলি- “…সৃষ্টির শেষ রহস্য, ভালোবাসার অমৃত।” সেই অমৃতটুকু নিয়েই পাঠকের মনে চিরস্থায়ী হোন রবীন্দ্রনাথের ‘নবনীতা।’



