জিজীবিষা
ধারাবাহিক উপন্যাস
সুরঞ্জিত সরকার
ত্রয়োদশ পর্ব
কৈপুকুরের সেই থমথমে রাতে পুলিশের জিপের আওয়াজ দূরে মিলিয়ে যেতেই সরকার বাড়ির সদর দরজায় একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল বটে কিন্তু মনের আতঙ্ক পুরোপুরি দূর হল না। বড়বাবু চলে যাওয়ার পর দাদু অতীশ ধীর পায়ে ভেতরে এসে বসলেন। বাকিরা তখন উৎকণ্ঠায় ড্রয়িংরুমে অপেক্ষারত।
একটা লম্বা শ্বাস ফেলে তিনি বললেন, “বড়বাবু বলে গেলেন আপাতত বিপদ কেটেছে। ত্রিশূল বাহিনীর কয়েকটা গুণ্ডাকে পুলিশ ধরেছে, কিন্তু আসল কালনাগিনী অবিনাশ আর তার ডানহাতরা অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পালিয়েছে।”
সুমন্ত গলা নামিয়ে বলল, “দেখেছ কল্যাণদা, পুলিশ যা বলছে সেটা যদি সত্যি হয়, তবে দাদু বড় বিপদে আছে। ওই অডিও রেকর্ডে শিমুল সরকার স্পষ্ট বলেছে, অতীশকে—মানে আমাদের দাদুকে সরাতে পারলেই মেহেদিপুরের সিন্দুকটা তাদের হবে।”
মা পূর্ণা ভীত কণ্ঠে বললেন, “তোরা আর ওসব নিয়ে মাথা ঘামাস নি তো বাবা। ভগবান যা রক্ষা করেছেন! মাদক আর মানুষ পাচারের মতো নোংরা কারবার যাদের, তারা মানুষ নয়, পিশাচ। পুলিশ তাদের কাজ করছে, তোরা এবার শান্ত হ।”
সুনীপা পূর্ণার হাত ধরে পাশ থেকে বলল, “মা ঠিকই বলছেন। কিন্তু দাদু, অবিনাশ যদি আবার ফিরে আসার চেষ্টা করে? ওই যে সাংকেতিক বার্তাটার কথা বড়বাবু বললেন, তার মানে তো ওদের শিকড় আরও গভীরে। আমাদের বাড়ির ওপর ওদের এই আক্রোশ কেন?”
“আক্রোশটা পুরনো জেদ থেকে সুনীপা। তবে আজ সুমন্ত আর কল্যাণের সাহসিকতা না থাকলে পুলিশের পক্ষে ওদের ধরা মুশকিল হতো। সরকার বাড়ির এই একতাটাই ওদের ভয়ের কারণ।” দাদু জবাব দিলেন।
“চিন্তা কোরো না সুনীপা। আজ রাতটা সাবধানে থাকতে হবে। পুলিশ টহল দিচ্ছে। আর অবিনাশের ওই চটকলের আড্ডার খবর যখন পাওয়া গেছে, তখন জাল গুটানো এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র।” এই বলে সুমন্ত তাঁর স্ত্রীকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু মন শান্ত হল না।
পূর্ণা সবাইকে থামিয়ে বলে উঠলেন,”এখন রাত অনেক হলো। তোরা খেয়ে দেয়ে একটু বিশ্রাম নে। বাবা, আপনিও চলুন। অনেক ধকল গেছে আজ আপনার ওপর দিয়ে।”
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ উচ্চারণ করতে করতে অতীশ নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন। সবাই যে যার শয়ন কক্ষে ঢুকে গেল। বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ ডাকছে, কিন্তু সরকার বাড়ির অন্দরে এক নতুন চিন্তার মেঘ জমেছে।
পরদিন সকালে চায়ের আড্ডায় যখন সবাই কৈপুকুরের রাতের ঘটনার রেশ কাটানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই পুলিশ সুপার সৌরীশদার ফোন এল সুমন্তর মোবাইলে। ফোনটা রেখে সুমন্তর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।
সুমন্ত সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “সৌরীশদা ফোন করেছিল। এক অদ্ভুত খবর আছে। গতরাতে ‘পূরবী ভবন’ থেকে পুলিশ কয়েকজন সাধুবাবাকে আটক করেছে।”
কল্যাণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “পূরবী ভবন? ওটা তো অনেকদিন ধরেই পুলিশের কব্জায় ছিল। সেখানে সাধু এল কোথা থেকে?”
দাদু অতীশ চোখ সরু করে বলল, ” আবার পূরবী ভবন… সত্যিই অভিশপ্ত বাড়িটা। অবিনাশের দলের সাথে কি ওই সাধুদের কোনো যোগ আছে সুমন্ত?”
“সৌরীশদা বলল, ওদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। সন্দেহ করা হচ্ছে, ওই সাধুর বেশ আসলে একটা ছদ্মবেশ। সীমান্তের ওপার থেকে লোক ও মাদক পাচারের জন্য ওরা এই ধর্মীয় ছদ্মবরণ ব্যবহার করছিল। রাতারাতি সীল করা বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে ওরা ঢুকেছিল।” দাদুর দিকে তাকিয়ে সুমন্ত বলল।
সুনীপা ভয় মিশ্রিত কণ্ঠে সুমন্তর দিকে তাকিয়ে বলল, “তার মানে অবিনাশের জাল শুধু চটকল বা পাটগুদাম নয়, শহরের ভেতরেও ছড়িয়ে আছে? এই সাধুরাই কি তবে সাংকেতিক বার্তার আদান-প্রদান করত?”
মা পূর্ণা কপালে হাত ঠেকিয়ে গুনগুন করতে লাগলেন, “হে ঠাকুর! ধর্মের নামে এসব অধর্ম? পুলিশ তো সীল করে দিয়েছিল, তাও ওরা ঢুকল কী করে? নিশ্চয়ই ভেতরে ভেতরে কেউ ওদের সাহায্য করছে।”
কল্যাণ আবার জিজ্ঞেস করল, “সুমন্ত, এই সাধুদের আড্ডার সাথে কি সেই মাদক পাচারের কোনো যোগসূত্র পেয়েছে সৌরীশদা?”
“পুলিশের আগের অনুমান অনুযায়ী পূরবী ভবন একটা ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। শ্যামপুকুর থানার পুলিশ এদের কব্জায় নেওয়ায় একটা বড় লিঙ্ক পাওয়া যেতে পারে। সৌরীশদা আমাদের সাবধানে থাকতে বলেছে, কারণ এদের পেছনে শিমুল সরকার ছাড়াও আরও বড় কোনো মাথা থাকতে পারে।”
দাদু সুমন্তর দিকে তাকিয়ে বললেন, ” পুলিশ ঠিকই ধরেছে। এই সাধুদের মুখ খুললেই জানা যাবে অবিনাশ ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, শত্রুর হাত অনেক লম্বা। এটা চিন্তার বিষয় যে সীল করা বাড়িতে পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে ওই জটাধারী ভণ্ডগুলো ঢুকল কী করে?”
সুমন্ত উত্তেজিত স্বরে বলল, “সৌরীশদা ঠিক এটাই সন্দেহ করছে দাদু। বাড়ির পেছনের দিকের সেই ভাঙা পাঁচিলটা দিয়েই হয়তো ওরা যাতায়াত করছিল। শ্যামপুকুর থানার পুলিশ ওদের যখন কব্জায় নেয়, তখন ওদের ঝোলা থেকে গাঁজা আর কিছু বিদেশি মুদ্রাও পাওয়া গেছে।”
“তার মানে ওই সাধুরা আসলে অবিনাশের ‘কুরিয়ার’। সাধুর বেশে ঘুরলে কেউ সন্দেহ করবে না, আর অনায়াসে সীমান্ত পারাপার করা যাবে। “কল্যাণ পাশ থেকে যোগ করল।
মা পূর্ণা জানতে চাইলেন, “আমার শাশুড়ি মায়ের ঘরটাকে ওরা শেষ পর্যন্ত আড্ডাখানা বানালো! সুমন্ত বাবা, সৌরীশকে বল যেন ওদের ওপর কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পূরবী ভবনের চাবি তো পুলিশের কাছে ছিল, তাহলে পাহারা কোথায় ছিল?”
সুমন্ত বলল, “মা, সৌরীশদা বলছে ওখানে পাহারায় থাকা কনস্টেবলদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে ভেতর থেকে কেউ ওদের সাহায্য করেছে। আর অবিনাশের সেই ‘সাংকেতিক বার্তা’র সাথে এই সাধুদের একটা সরাসরি যোগ আছে।”
দাদু অতীশ নির্দেশ দিলেন, ” অশুভ শক্তির বিনাশ এবার সময়ের অপেক্ষা। সুমন্ত, তুই আর কল্যাণ একবার শ্যামপুকুর থানায় যা। সৌরীশকে বল আমি নিজে ওই সাধুদের মুখোমুখি হতে চাই। আমার বাড়ির অসম্মান আমি সইব না।”
কল্যাণ ঠিক আছে দাদু বলে জানাল, “আমরা এখনই বেরোচ্ছি। তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, অবিনাশ হয়তো এখনো এখানেই কোথাও ওত পেতে আছে। তোমরা অচেনা লোক এলে কিন্তু দরজা খুলো না। কিছু আঁচ পেলেই আমাদের ফোন কোরো।”
( চলবে )



