জিজীবিষা
সুরঞ্জিত সরকার
একাদশ পর্ব
প্রতিদিনের মতো সুমন্ত কল্যাণপুরের সরকারি আবাসনের গেট পেরিয়ে নিজের অফিসের গাড়িতে উঠল। গাড়িটি যখন বাঁশবাগানের মোড় ঘুরছে, হঠাৎ পেছন থেকে দুটো কালো রঙের পালসার বাইক গর্জে উঠল। বাইক আরোহীদের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। তারা সুমন্তর চলন্ত গাড়ির সামনে একটি চলন্ত ট্রাক্টরের মতো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে গাড়িটিকে থামতে বাধ্য করল। চালক ব্রেক কষতেই চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল অচেনা লোকরা।
একজন আক্রমণকারী বড় একটি হাতুড়ি দিয়ে গাড়ির জানলার কাঁচ চুরমার করে দিল। সুমন্ত পালানোর চেষ্টা করার আগেই তার গলায় ঠেকানো হলো একটি ধারালো খঞ্জর, যার বাঁটে সেই অভিশপ্ত ত্রিশূল চিহ্ন খোদাই করা। লোকগুলোর চোখেমুখে খুনের নেশা। তারা সুমন্তর ল্যাপটপ ব্যাগ আর পকেট তন্নতন্ন করে খুঁজল সেই ডায়েরি আর মেডেলিনের সন্ধানে।
আক্রমণকারীদের নেতা, যে নিজেকে অবিনাশের ডান হাত বলে পরিচয় দিল, সে সুমন্তর কানের কাছে মুখ নিয়ে কর্কশ গলায় বলল, “সৌরীশ পুলিশ দিয়ে আমাদের ঘাঁটি ভেঙেছিস বলে ভেবেছিস পার পেয়ে যাবি? দাদুর ওই মেডেলিন আর ডায়েরির নকশা যদি আজ রাতের মধ্যে আমাদের হাতে না পৌঁছায়, তবে কল্যাণপুরে তোর বউ সুনীপা আর কৈপুকুরে তোর মা পূর্ণা—কাউকেই আমরা জ্যান্ত রাখব না। শিমুল কাকার আদেশ, সরকার বংশের একটা চারাও যেন অবশিষ্ট না থাকে।”
তারা সুমন্তর ফোনটা কেড়ে নিয়ে আছড়ে ভেঙে ফেলল যাতে সে পুলিশকে খবর দিতে না পারে। যাওয়ার সময় তারা গাড়ির টায়ারগুলো লিক করে দিয়ে গেল এবং একটি সাদা কাগজে রক্ত দিয়ে লেখা চিরকুট ফেলে দিয়ে গেল— “জিজীবিষা তোর মৃত্যু পরোয়ানা!”
আক্রমণকারীরা চলে যাওয়ার পর সুমন্ত কোনোমতে টাল সামলে উঠে দাঁড়াল। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা—সুনীপা আর মা। অবিনাশের জাল যে এতদূর বিস্তৃত, তা সে ভাবতে পারেনি। সে বুঝতে পারল, দাদুর সেই আদি শত্রু শিমুল সরকার এবার সরাসরি যুদ্ধে নেমেছে।
কথাটা যে শুধু ফাঁকা আওয়াজ ছিল না, তা হাড়কাঁপানো বাস্তব হয়ে ধরা দিল কুমারগঞ্জে কল্যাণের বাড়িতে। সুমন্তর ওপর হামলার প্রায় একই সময়ে, একদল অচেনা লোক বাইক নিয়ে কল্যাণের শান্ত পাড়ায় তাণ্ডব শুরু করল।
কল্যাণের মা পিউ তখন রান্নাঘরে ছিলেন। হঠাৎ সদর দরজায় সজোরে লাথি পড়ার শব্দে তিনি আঁতকে উঠলেন। কল্যাণ ড্রয়িং রুমে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল। দরজা খুলতেই দেখল তিনজন যমদূতের মতো লোক দাঁড়িয়ে, যাদের হাতে ভোজালি আর আগ্নেয়াস্ত্র। তাদের জামার হাতায় সেই অশুভ ‘ত্রিশূল’ চিহ্ন আঁকা।
আক্রমণকারীরা কল্যাণকে সোফায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। একজন পিউ দেবীর চুলের মুঠি ধরে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরল। কর্কশ গলায় তাদের নেতা বলল, “তোর ওই বড় ছেলেটা খুব পুলিশ পুলিশ খেলছে না? অতীশ বুড়োর ওই চাবি আর নকশাটা যদি আজ সূর্যাস্তের আগে আমাদের কাছে না পৌঁছায়, তবে এই বাড়িতে রক্তের হোলি খেলা হবে।”
কল্যাণ প্রতিবাদ করার চেষ্টা করতেই তার কপালে পিস্তলের বাঁট দিয়ে আঘাত করা হলো। সে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতেই লোকটা ফিসফিস করে বলল, “অবিনাশ টোটোওয়ালার ক্ষমতা তোরা এখনও দেখিসনি। শিমুল কাকার আদেশ—এই জিজীবিষার ডায়েরি আমাদের চাই-ই চাই। আর যদি পুলিশকে এক পা-ও বাড়াতে দেখিস, তবে তোর মায়ের মাথাটা এই উঠোনে পড়ে থাকবে।”
যাওয়ার সময় তারা বাড়ির আসবাবপত্র ভেঙে তছনছ করে দিল। আয়নাগুলো চুরমার করে দিয়ে গেল—যেন ওটা কল্যাণের পরিবারের ভবিষ্যতের এক প্রতীক। তারা পকেট থেকে একটি লাল কালি মাখানো ত্রিশূল আঁকা নিশান পিউ দেবীর পায়ের কাছে ফেলে দিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল।
আক্রমণকারীরা চলে যাওয়ার পর কল্যাণ যন্ত্রণায় নীল হয়ে মা-কে জড়িয়ে ধরল। পিউ দেবী ও কল্যাণের স্ত্রী রুমা আতঙ্কে কাঁপছিল।সে বুঝতে পারল, অবিনাশের জাল শুধু কৈপুকুর বা কল্যাণপুর নয়, কুমারগঞ্জের এই ছোট্ট শান্ত ঘরেও পৌঁছে গেছে। শিমুল সরকার এবার মরণপণ লড়াইয়ে নেমেছে।
সুমন্ত ও কল্যাণের জন্য মুহূর্তটি ছিল চরম অগ্নিপরীক্ষার। কুমারগঞ্জে নিজের লণ্ডভণ্ড বাড়ির দাওয়ায় বসে রক্তাক্ত কপাল মুছে কল্যাণ কাঁপা হাতে সুমন্তর ভাঙা ফোনের বিকল্প নাম্বারে যোগাযোগ করল।
কল্যাণ ফোনে আর্তনাদ করে উঠল, “ভাই! ওরা কুমারগঞ্জে মায়ের ওপর চড়াও হয়েছিল। বাড়ির সব তছনছ করে দিয়েছে। আমাকে আর মা-কে শেষ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে গেল যদি ডায়েরি আর মেডেলিনটা ওদের না দিই।”
সুমন্ত ওপাশ থেকে যন্ত্রণায় ফুঁসে উঠে বলল, “একই কাণ্ড এখানেও হয়েছে কল্যাণদা! আমার অফিসের গাড়ি আটকে ওরা সুনীপা আর মায়ের প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। অবিনাশের জাল আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে।”
কল্যাণ শক্ত গলায় বলল, “নতি স্বীকার করলে ওরা আমাদের কাউকেই বাঁচিয়ে রাখবে না। শিমুল সরকারের রক্তে জিজীবিষার নেশা চেপেছে, ও সব প্রমাণ মুছে দিতে চায়। তুই এখনই কোনোমতে সৌরীশদাকে সবটা জানা। আমাদের দুই জায়গার লোকেশন আর ওই ত্রিশূল আঁকা চিরকুটগুলোর ছবি ওঁর হোয়াটসঅ্যাপে পাঠা।”
সুমন্ত কালক্ষেপ না করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৌরীশদাকে ফোন করল। সব শুনে সৌরীশদা গর্জে উঠলেন, “অবিনাশ আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা সীমা ছাড়িয়ে গেছে! ওরা ভেবেছে পুলিশ শুধু থানায় বসে থাকে? সুমন্ত, তুই আর তোর দাদা চিন্তা করিস না। আমি স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF) পাঠানোর ব্যবস্থা করছি তোদের দুই বাড়িতেই। সিভিল ড্রেসে পুলিশ থাকবে।”
সৌরীশদা নির্দেশ দিলেন, “তোরা দুই ভাই পরিবার নিয়ে এখনই কৈপুকুরের বাড়িতে চলে যা। ওখানে দাদু অতীশ বাবু আছেন, আর ওই বাড়িটা এখন একটা দুর্ভেদ্য দুর্গ। আমরা চারপাশ থেকে ঘেরাও করছি।” সুমন্ত আর কল্যাণ বুঝতে পারল, এবার আর পালানো নয়, মুখোমুখি যুদ্ধের সময় এসেছে।
সৌরীশদার নির্দেশে সুমন্ত আর দেরি না করে স্ত্রী সুনীপা এবং তাদের ছোট মেয়েকে নিয়ে নিজের গাড়িতে উঠল। সুনীপা আতঙ্কিত হলেও সুমন্তর দৃঢ়তা দেখে চুপ করে রইল। সুমন্ত গাড়ির ড্যাশবোর্ডে গুরুত্বপূর্ণ একটা ফাইল শক্ত করে চেপে ধরে স্টিয়ারিং ঘোরাল। সৌরীশদার পাঠানো একটি সাদা পোশাকের পুলিশের গাড়ি তাদের ছায়ার মতো অনুসরণ করতে শুরু করল।
কল্যাণ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে নিজের স্ত্রী রুমা ও তাঁদের কন্যাকে নিরাপদে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দিল। অন্যদিকে, বাবা, মা পিউ ও ভাইকে এক বিশ্বস্ত প্রতিবেশীর বাড়িতে আত্মগোপন করাল যাতে অবিনাশের লোকরা তাদের খুঁজে না পায়। বাড়ির সব জানলা-দরজা বন্ধ করে কল্যাণ বেরিয়ে এল একরাশ জেদ নিয়ে।
রাস্তার এক গোপন মোড়ে সুমন্ত ও কল্যাণের দেখা হলো। কল্যাণ নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে সুমন্তর গাড়িতে উঠে বসল। দুই ভাইয়ের চোখের ভাষা এখন এক—রক্তের বদলে রক্ত, আর অপমানের বদলে প্রতিশোধ। সুমন্ত গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল কৈপুকুরের দিকে।
কল্যাণ বলল, “ভাই, তোর সৌরীশদা ঠিকই বলেছেন, কৈপুকুরের ওই আদি বাড়িটাই আমাদের শেষ দুর্গ। ওখানেই দাদু আর ঠাকুমার আশীর্বাদ আমাদের বাঁচাবে।”
গাড়িতে যাওয়ার সময় সুমন্ত রিয়ার ভিউ মিররে দেখল, সেই পরিচিত নীল রঙের গাড়িটি যেন আবার তাদের পিছু নিয়েছে। অবিনাশের লোকরা সহজে ছাড়ার পাত্র নয়। তারা বুঝতে পেরেছে যে সরকার বংশের সব রত্ন এখন এক জায়গায় জড়ো হচ্ছে। সুমন্ত সৌরীশদাকে মেসেজ করল— “শত্রু পিছু নিয়েছে। আমরা হাইওয়েতে উঠছি।” কিছুক্ষন পর হাইওয়েতে নীল গাড়িটাকে আর দেখতে পাওয়া গেল না।
সৌরীশদা মেসেজ করে জানাল, “No tension. One pilot van is following your car. I’m sending you contact details of pilot van in charge. U may call in exigency”.
সূর্য যখন পাটে বসছে, তখন সুমন্তর গাড়ি কৈপুকুরের বাড়ির সামনে এসে ব্রেক কষল। দাদু অতীশ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন—হাতে সেই প্রাচীন পিতলের ঘণ্টা। তিনি জানতেন আজ রাতে রক্ত ঝরবে। মা পূর্ণা শাঁখ বাজিয়ে ছেলেদের ঘরে নিলেন, কিন্তু সেই শাঁখের আওয়াজ আজ যেন যুদ্ধের দামামা হয়ে বাজল।
সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে কৈপুকুরের সেই বাড়ির বারান্দায় এক অদ্ভুত গুমোট পরিবেশ। ডিম লাইটের ম্লান আলোয় সবাই গোল হয়ে বসেছে। থালায় মুড়ি, পেঁয়াজি আর গরম চপ—কিন্তু কারো মুখে রুচি নেই। সুমন্ত আর কল্যাণ যখন সারা দিনের সেই রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করল, ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে এল।
সুমন্ত চপটা হাতে নিয়ে কামড় না দিয়েই বলল, “মা, দাদু—আজ কল্যাণপুরে আমার অফিসের গাড়িটা যেভাবে ওরা আটকেছিল, মনে হচ্ছিল যমদূত সামনে দাঁড়িয়ে। অবিনাশের লোকরা সোজাসুজি হুমকি দিয়ে গেছে—ডায়েরি আর মেডেলিন না দিলে সুনীপা আর আমাদের মেয়েকে ওরা শেষ করে দেবে।” সুনীপা পাশে বসে ভয়ে সুমন্তর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
কল্যাণ মুড়ি চিবোতে চিবোতে যোগ করল, “ওদিকে কুমারগঞ্জেও একই দশা! মাকে ওরা হেনস্থা করেছে, ঘরের জিনিসপত্র তছনছ করে দিয়েছে। সৌরীশদাকে ফোন না করলে আজ হয়তো আমরা কেউ এখানে ফিরতে পারতাম না।”
অতীশ স্থির হয়ে শুনছিলেন। মুড়ির থালাটা সরিয়ে দিয়ে বললেন, “শিমুল আর তার ত্রিশূল বাহিনী এবার মরণকামড় দিচ্ছে রে। ওরা বুঝতে পেরেছে যে পুলিশ ওদের ওপার বাংলার মাদক আর দেহব্যবসার জালটা ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। এখন ওদের একটাই লক্ষ্য—সরকার বংশের সব প্রমাণ আর সম্পদ লোপাট করা।”
পূর্ণা চা দিয়ে যেতে যেতে সুমন্তর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এত কিছুর পরেও তোরা ওই অভিশপ্ত ডায়েরিটা সাথে রেখেছিস? তোর ঐ দাদাকে বলে ওটা পুলিশের কাছ থেকে নিয়ে ওদের দিয়ে দিলেই তো সব মিটে যায়!”
সুমন্ত রুখে দাঁড়িয়ে বলল, “না মা! ওটা শুধু এক টুকরো কাগজ নয়, ওটা আমাদের বংশের মান-মর্যাদা। দাদু শিখিয়েছেন জিজীবিষা মানে মাথা নত করে বেঁচে থাকা নয়, বরং লড়াই করে টিকে থাকা।”
দাদু হঠাৎ উঠে দেওয়ালের সেই পুরনো বাঁধানো আলমারিটা খুললেন। সেখান থেকে বের করলেন একটি লম্বা চামড়ার খাপ। খাপ খুলতেই ঝকঝক করে উঠল দাদুর সেই প্রাচীন ধারালো তরোয়াল। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, “আজ রাতে কৈপুকুরের এই বাড়িতে যদি কেউ অনধিকার প্রবেশ করে, তবে অতীশ সরকারের তরবারির উত্তর দিতে হবে। তোরা তৈরি থাক।”
বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাপিয়ে দূরের রাস্তায় কোনো এক দ্রুতগামী গাড়ির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।


