সকল কাঁটা ধন্য করে

সকল কাঁটা ধন্য করে

সৌপর্ণ পাল

     “এক্সকিউজ মি এটা ফাইন আর্টসের লাইন? না মানে ওটার ক্যাম্পাস তো জোড়াসাঁকোতে আর মেনষ্ট্রিম গুলো বি.টি রোডে একটু কনফার্ম হয়ে লাইনে দাঁড়াতে চাইছিলাম…”

 সোমলতা চোখ তুলে দেখলো সামনে ডেনিম জিন্স আর হোয়াইট টিশার্টে কি সুন্দর লাগছে ছেলেটাকে। আচ্ছা একেই কি লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট বলে? কে জানে! 

— “না এটা পলিটিকাল সাইন্সের লাইন। আপনি কোন সাবজেক্ট…?” 

–“মিউজিক”

— “ওহ্ আচ্ছা ওটা কিন্তু জোড়াসাঁকোতেই। জোড়া কেন, কোন সাঁকোই আজ আর নেই ওখানে।”

— “তা কেন? কবির সাথে আমাদের অদৃশ্য সাঁকো সব সময়েই আছে। বাইরে থেকে সে সব না দেখা দিলেই তো ভালো।”

— “তা ঠিক” মুচকি হাসে সোমলতা। সাথে যোগ করে

“তাহলে আপনি মেট্রো ধরে গিরীশ পার্ক চলে যান, ওখানে আপনার ফর্ম জমা হবে।”

— “সেকি এক্ষুনি আমায় সীতার পাতাল প্রবেশ করাবেন?”

  হেসে ফেলে সোমলতা। “আপনি তো ভারী সুন্দর করে কথা বলেন। তবে পরিচয়ের আদিতে কিন্তু নাম…”

— “আমি উজান, শুধু নামে নয় কাজেও স্রোতের বিপরীতে হাঁটি। তাই বাবার পৈতৃক ব্যবসা ছেড়ে সবার অমতে মিউজিক নিয়ে পড়তে এলাম। বাবা তো আমায় চাটার্ড অ্যাকাউন্টেড বানাতে বদ্ধ পরিকর ছিল।”

    একটু বেশি কথা বলে ছেলেটা।সোমলতার কেমন যেন উত্তম তনুজার ‘দেয়া নেয়া’ সিনেমার কথা মনে পরে যায়।

      সোমলতার জন্ম বেহালার মধ্যবিত্ত পরিবারে। রবি ঠাকুরের ভাষায় ‘সাধারণ মেয়ে’। “এমন শ্যামলা মেয়ে, বিয়ের জন্য এখন থেকেই টাকা জমাতে শুরু করো গো তোমরা …” এই কথাগুলো শুনতে শুনতে বড় হয়ে ওঠা মেয়েটা চোয়াল শক্ত করে শুধু পড়াশোনা করে গিয়েছে। নিজে টিউশন করে পলিটিক্যাল সাইন্স নিয়ে ভর্তি হয় রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। 

    এই ক্যাম্পাসেই ওদের নবীণবরণ উৎসবের দিন ছাতিম গাছের তলায় বসে, সোমলতার চোখে চোখ রেখে উজান গেয়েছিল, “কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি…”। সেই দুচোখে করুনা নয়, দয়া নয়, শুধুই মুগ্ধতা দেখেছিল সোমলতা।

      তারপর কখন যে মন দেওয়া নেওয়ার খেলা শুরু হয়ে গেল নিজেরাই বুঝতে পারেনি। উজান ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে গেয়েছিল,”কে প্রথম কাছে এসেছি, কে প্রথম ভালোবেসেছি… তুমি না আমি ?”

    সোমলতার সব দ্বিধা উজান কাটিয়ে দিয়েছে,”আচ্ছা ত্বকের মেলানিন কি শেষ কথা? তোমার মেধা, তোমার ধী, তোমার গুণ এসব কি তবে মূল্যহীন? আমি কিন্তু কোনো দিনই ফর্সা রাঙা টুকটুকে পাপা কি পরী, আসলে ন্যাকার ধাড়ী এমন স্বপ্ন দেখিনি।”

     সোমলতা হেসে ফেলে। তারপর চোখ নামিয়ে শঙ্খ ঘোষ আবৃত্তি করে

“হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয় সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়।

এ কথা খুব সহজ, কিন্তু কে না জানে সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়।”

     উজান এবার সোমলতার হাতটা নিজের করতলে শক্ত করে চেপে ধরে বলে, “ছেড়ে দেবো বলে তো এ হাত ধরিনি। আচ্ছা, আজ নয় সময় এর উত্তর দেবে।”

      দুজনেই প্রস্তুতি নেয় চাকরির পরীক্ষার জন্য। সোমলতার বাড়িতে পাত্র দেখা শুরু হয়। অনিচ্ছায় চায়ের ট্রে নিয়ে সেজেগুজে দাঁড়াতে হয়। শিক্ষিত পাত্রপক্ষ মিষ্টি মুখ করে মুখের উপর জানিয়ে দেয় “গায়ের রং তো ময়লা, পরে ফোন করে জানিয়ে দেবো।” সোমলতা হাত জোড় করে বলে “আপনাদের জানাতে হবে না, আমরা আগ্রহী হলে ফোন করে নেবো।” গজগজ করতে করতে চলে যায় পাত্রপক্ষ “ঔ তো রূপের ছিরি, মেয়ের দেমাক দ্যাখো.…” বাবা মাথা নিচু করে বসে থাকে। মা চোখের জল মুছতে মুছতে রান্নাঘরে চলে যায়। ঘাড়ের উপর আরো দুটো, ছোটো মেয়ে। একটা ইলেভেনে আর একটা সেভেনে। না চতুর্থবার আর বংশপ্রদীপের প্রত্যাশায় দুঃসাহস দেখাননি ওনারা। তিনটে কন্যা সন্তানের জনক জননী এটাই তো যথেষ্ট অপরাধ সবার কাছে মাথা নীচু করে থাকার জন্য।

    “হ্যালো, উজান একটা দারুন খবর আছে…” স্কুল সার্ভিস কমিশনে কোয়ালিফাই করেছে সোমলতা। সামনের মাসে সোমলতা যোগ দেবে পুরুলিয়া জেলার এক হাই সেকেন্ডারী স্কুলে। এতো দিনে বাবামায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারবে সোমলতা। তার এতদিনের লড়াই এবার সফল হতে চলেছে। উজানের এবারো হয়নি। এমনিতেই মিউজিকে ভ্যাকেন্সি কম। সোমলতা বলে, “তাতে কি , আমি তো আছি। আজ তুমি চাকরি পেলে যেভাবে ভাবতাম, আমি চাকরি পেলে তুমি তেমন করে ভাববে না বুঝি!” চোখের কোণদুটো চিকচিক করে ওঠে উজানের। বাড়িতে ব্যবসা দেখার জন্য নিত্যদিন অশান্তি শুরু হয়েছে। চারিদিকে এতো শপিং মল যে ওদের দোকানে আর আগের মতো রমরমা নেই। বাবার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। দাদা বসে দোকানে। বৌদির চাপে ভাইঝি ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি হয়েছে। দাদার অসহায়তা বোঝে। তাই আর ঐ দোকানে নতুন করে মাথা গলিয়ে অশান্তি বাড়াতে চায় না।

      চেষ্টা চালিয়ে যায় উজান। একটার পর একটা ফর্ম ফিলাপ করে, পরীক্ষা হয়, তারপর হাই কোর্টের স্হগিতাদেশ শোনা যায়। 

     “যদি তারে নাই চিনি গো, সে কি…সে কি আমায় নেবে চিনে এই নবফাল্গুনের দিনে, জানি নে জানি নে…” গুনগুন করে গাইতে গাইতে উজান খিচুড়ি রান্না করেছে। মাঝখানে কতগুলো বছর মিছিমিছি কেটে গেল। দেরি হলেও ও শেষ পর্যন্ত পেরেছে মেল ইগো জয় করে, নিজের সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে হাউজ হাসব্যান্ড হতে।

     জানলা দিয়ে তাকালো বাইরের দিকে। পুরুলিয়ায় পলাশ ফুটলে মনে হয় প্রকৃতি যেন আগুন রঙা রূপে সেজেছে। আজ তো শনিবারের হাফবেলা। সোমলতা স্কুল থেকে ফিরলেই দু’জনে খেতে বসবে, তখন না হয় গরম গরম ডিমের অমলেট ভেজে নেবে। পাশের বাড়ির রেডিও থেকে অমিতাভ জয়ার ‘অভিমান’ এর সুর ভেসে আসছে…

“তেরে মেরে মিলন কা এ রায়না

নায়া কোই গুল খিলায়েগি

তবি তো চঞ্চল হ্যয় তেরে নয়না

দেখো না, দেখো না

তেরে মেরে মিলন ক্য ইয়ে রয়না…”

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া )

Read More »

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ – শ্যামলকৃষ্ণ বসু ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া )

Read More »

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ – শ্যামলকৃষ্ণ বসু ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম

Read More »

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ – শ্যামলকৃষ্ণ বসু ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম

Read More »