অরণ্য, নদী ও নক্ষত্রের কথাশিল্পী : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

অরণ্য, নদী ও নক্ষত্রের কথাশিল্পী : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কিছু কিছু লেখক আছেন, যাঁদের কথা মনে পড়লে প্রথমেই কোনও নির্দিষ্ট চরিত্র, ঘটনা কিংবা মতাদর্শ মনে আসে না বরং মনে আসে একটি আবহ। একটি আলো। একটি পথ। একটি নদী। দূরে চলে যাওয়া রেলগাড়ির শব্দ। শরতের কাশবন। সন্ধ্যার আকাশে নিঃসঙ্গ একটি  তারা। কিংবা অরণ্যের ভিতর দিয়ে অজানা কোনও পথে এগিয়ে চলা মানুষের পায়ের শব্দ।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সেই বিরল কথাশিল্পীদের একজন, যাঁর সাহিত্যকে কেবল কাহিনির ভিতর দিয়ে সম্পূর্ণভাবে ধরা যায় না। তাঁর সাহিত্য পড়তে গেলে কাহিনির বাইরেও একটি বৃহত্তর জগতে প্রবেশ করতে হয় যেখানে মানুষ এবং প্রকৃতি পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; যেখানে দারিদ্র্য কেবল অভাব নয়, বিস্ময়েরও জন্ম দিতে পারে; যেখানে মৃত্যুর পাশে জীবন, নিঃসঙ্গতার পাশে সৌন্দর্য, ইতিহাসের পাশে ব্যক্তিমানুষ এবং বাস্তবতার পাশে অদৃশ্যের এক রহস্যময় উপস্থিতি সতত অনুভূত হয়।

বিভূতিভূষণকে আমরা বহুদিন ধরে বলেছি ‘গ্রামবাংলার রূপকার’। কথাটি সত্য, কিন্তু অসম্পূর্ণ। কারণ বিভূতিভূষণের বাংলা কেবল গ্রামবাংলা নয়। তাঁর বাংলা একদিকে নিশ্চিন্দিপুরের পথ, অন্যদিকে ভাগলপুরের অরণ্য; একদিকে ইছামতী নদী, অন্যদিকে আফ্রিকার অজানা পর্বত; একদিকে দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের দৈনন্দিন সংগ্রাম, অন্যদিকে মানুষের মৃত্যুর পরের অদৃশ্য যাত্রা; একদিকে হোটেলের রান্নাঘরে হাজারী ঠাকুরের স্বপ্ন, অন্যদিকে শঙ্করের আফ্রিকা-অভিযান। এই বিচিত্র জগতের মধ্যে একটি গভীর অন্তঃসলিলা প্রবাহ কাজ করে তা হল মানুষের অনন্তের দিকে যাত্রা।

সেই কারণেই বিভূতিভূষণের সাহিত্যকে শুধু প্রকৃতির সাহিত্য বললে ভুল হয়, শুধু গ্রামীণ জীবনের সাহিত্য বললেও ভুল হয়, শুধু মানবতাবাদের সাহিত্য বললেও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাঁর প্রকৃতি মানুষকে ঘিরে থাকে, মানুষের জীবন প্রকৃতির মধ্যে প্রবাহিত হয়, আর উভয়ের উপর দিয়ে চলে যায় সময়ের অদৃশ্য নদী।

আজ, তাঁর জন্মের ১৩২ বছর পরে, যখন পৃথিবী দ্রুত নগরায়িত হচ্ছে, নদী সংকুচিত হচ্ছে, অরণ্য পিছিয়ে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে এবং মানুষ নিজের তৈরি যন্ত্রসভ্যতার মধ্যে ক্রমশ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, তখন বিভূতিভূষণকে নতুন করে পড়ার প্রয়োজন আরও তীব্র হয়েছে। কারণ তিনি আমাদের শুধু একটি হারিয়ে যাওয়া বাংলাকে দেখাননি। তিনি শিখিয়েছেন যে প্রকৃতিকে দেখা মানে নিজের অস্তিত্বকেও নতুন করে দেখা।

জীবন থেকে সাহিত্য 

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১২ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪। তাঁর জন্মস্থান কল্যাণী-কাঁচরাপাড়ার নিকটবর্তী ঘোষপাড়া-মুরারিপুরে, মাতুলালয়ে। পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সংস্কৃতজ্ঞ এবং পুরাণকথক; তাঁর পাণ্ডিত্য ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিবোধ বিভূতিভূষণের শৈশবচেতনাকে নিঃসন্দেহে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। 

তাঁর শৈশব কোনও ঐশ্বর্যময় জীবনের মধ্যে কাটেনি। কিন্তু এই অভাবই তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিকে এক বিশেষ গভীরতা দিয়েছিল। তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন সাধারণ মানুষের জীবন – তার অনিশ্চয়তা- দোলাচল, অল্পে খুশির আনন্দ, সামাজিক সংকোচ, দারিদ্র্য, স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকার অসীম ক্ষমতা।

ছাত্রজীবনে তিনি মেধাবী ছিলেন। প্রবেশিকা ও আই.এ. পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং বি.এ. পরীক্ষাতেও তিনি যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দেন। এম.এ. এবং আইন পড়ার সুযোগ পেলেও তা অর্থ ও সুযোগের অভাবে শেষ করতে পারেননি। জীবিকার প্রয়োজনে পড়া ছেড়ে পড়াতে হয় অর্থাৎ তাঁকে সাময়িক শিক্ষকতার  পেশা বেছে নিতে হয়। পরে বিভিন্ন কাজের সূত্রে তিনি বাংলার নানা অঞ্চল, অসম, ত্রিপুরা ও আরাকান পর্যন্ত ঘুরেছেন। গোরক্ষিণী সভার প্রচারক হিসেবেও কিছুদিন কাজ করেছিলেন। পরে খেলাতচন্দ্র ঘোষের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভাগলপুরের জমিদারি-সম্পর্কিত কাজে প্রবেশ করেন। 

এই জীবনপথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিভূতিভূষণ কোনও নির্দিষ্ট সাহিত্যিক পরিসরে বসে জীবনকে দেখেননি। তিনি জীবনের ভিতর দিয়ে হেঁটেছেন। শিক্ষকতা তাঁকে মানুষের কাছে নিয়ে গেছে। প্রচারের কাজ তাঁকে বিভিন্ন ভূখণ্ডের সঙ্গে পরিচিত করেছে। ভাগলপুর তাঁকে দিয়েছে অরণ্যের অভিজ্ঞতা। জমিদারি-সম্পর্কিত কাজ তাঁকে দেখিয়েছে ভূমি, মানুষ ও অর্থনীতির জটিল সম্পর্ক। আর ব্যক্তিগত দুঃখ তাঁকে শিখিয়েছে মৃত্যুর নৈঃশব্দ্য।

তাঁর প্রথম স্ত্রী গৌরীর অকালমৃত্যু তাঁর জীবনে গভীর আঘাত এনেছিল। ব্যক্তিগত বেদনা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যিক সংবেদনকে আরও অন্তর্মুখী করে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বিভূতিভূষণ কখনও নিজের ব্যক্তিগত দুঃখকে আত্মদয়ায় পরিণত করেননি। তাঁর বেদনা ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে অন্য মানুষের বেদনার দিকে। আত্মজৈবনিক সাহিত্য সার্বজনীন হয়ে উঠেছে। এইখানেই তাঁর মানবতাবাদের মূল সূত্রটি নিহিত থাকে ।

উপেক্ষিতা’ থেকে ‘পথের পাঁচালী

১৯২১ সালে প্রবাসী পত্রিকায় তাঁর ‘উপেক্ষিতা’ গল্পটি প্রকাশিত হয়। সেখান থেকেই তাঁর প্রকাশ্য সাহিত্যিক যাত্রার সূচনা। কিন্তু প্রকৃত বিস্ফোরণ এল পথের পাঁচালী-তে।

১৯২৫-এর কাছাকাছি ভাগলপুরে অবস্থানকালে তিনি উপন্যাসটি লেখা শুরু করেন এবং ১৯২৮ নাগাদ তা সম্পূর্ণ করেন। পরে বিচিত্রা পত্রিকায় এটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং ১৯২৯ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে পথের পাঁচালী একটি বাঁকবদলকারী ঘটনা। কারণ এখানে কোনও বৃহৎ রাজনৈতিক আন্দোলন নেই, নেই জমিদারবাড়ির নাটকীয়তা, নেই রোমান্টিক বীরত্বের প্রচলিত কাঠামো। আছে একটি দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবার – হরিহর, সর্বজয়া, দুর্গা, অপু এবং ইন্দির ঠাকরুন।তবু এই সামান্য সংসারই হয়ে উঠল মহাকাব্যিক। তিনি সাধারনত্বকে উদযাপন করেন।

কেন?

কারণ বিভূতিভূষণ প্রথমত কাহিনি বলেননি; তিনি জীবনের অভিজ্ঞতাকে তার নিজস্ব ছন্দে প্রবাহিত হতে দিয়েছেন। অপুর পৃথিবী ছোট। কিন্তু সেই ছোট পৃথিবীর ভিতরেই আকাশ অসীম। দুর্গার কাছে একটি বাগান, একটি আম, একটি রেলগাড়ি, একটি অজানা পথ – এই সবই বিস্ময়ের। অপুর কাছে পৃথিবী এখনও শেষ হয়ে যায়নি। তার সামনে রাস্তা আছে। দূরে মাঠ আছে। রেললাইন আছে। অজানা দেশ আছে। দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও এই শিশুমনের বিস্ময়ই পথের পাঁচালী-র প্রাণ। এখানেই বিভূতিভূষণের শিল্পের মৌলিক শক্তি। তিনি দারিদ্র্যকে কেবল সামাজিক সমস্যায় পরিণত করেননি। তিনি দেখিয়েছেন – অভাবের মধ্যেও মানুষের অনুভবের জগৎ দরিদ্র হয় না। এই উপলব্ধিই পথের পাঁচালী-কে নিছক গ্রামীণ উপন্যাসের সীমা অতিক্রম করায়।

অপু ও দুর্গার চোখ দিয়ে আমরা যে পৃথিবী দেখি, তা একই সঙ্গে নির্দিষ্ট এবং সর্বজনীন। নিশ্চিন্দিপুরের সেই গ্রাম আর কেবল একটি গ্রাম থাকে না; তা হয়ে ওঠে মানুষের শৈশবের প্রতীক। আর তাই দুর্গার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়। সেটি শৈশবের প্রথম মৃত্যু-অভিজ্ঞতা। প্রথমবার পৃথিবী তার কাছে নির্মম হয়ে ওঠে।

প্রকৃতি : দৃশ্য নয়, সহচর

লেখক বিভূতিভূষণকে প্রকৃতির কবি বলা হয়। কিন্তু তাঁর প্রকৃতিচেতনা রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিচেতনার পুনরাবৃত্তি নয়। রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি অনেক সময় মানবাত্মার সঙ্গে এক নান্দনিক ও দার্শনিক সংলাপ রচনা করে। বিভূতিভূষণের প্রকৃতি আরও দৈনন্দিন, আরও স্পর্শযোগ্য, আরও মাটির কাছাকাছি। ঘাস আছে। পোকা আছে। গাছের পাতা আছে। পাখি আছে। বৃষ্টির গন্ধ আছে। শুকনো পাতার শব্দ আছে। নদীর পাড় আছে। রাতের আকাশ আছে। এইসব ক্ষুদ্র জিনিস তাঁর কাছে কখনও তুচ্ছ নয়।

তিনি জানতেন – মানুষের সভ্যতার ইতিহাস যত বড়ই হোক, মানুষের অস্তিত্ব শেষ পর্যন্ত এই ছোট ছোট প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। এই কারণেই তাঁর প্রকৃতি কখনও নিছক পটভূমি বা ব্যাকগ্রাউণ্ড নয়। প্রকৃতি তাঁর সাহিত্যে একটি সক্রিয় চরিত্র। পথের পাঁচালী-তে প্রকৃতি অপুর শৈশবের সহচর।অপরাজিত-তে সেই প্রকৃতি ক্রমে দূরে সরে যায়। আরণ্যক-এ প্রকৃতি মানুষের সামনে এক নৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় ইছামতী-তে নদী ইতিহাসের সঙ্গী। আর অশনি সংকেত-এ প্রকৃতির উপস্থিতির ভিতরেই মানুষের খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষের নির্মমতা প্রতিধ্বনিত হয়। অর্থাৎ বিভূতিভূষণের প্রকৃতি কোনও একরৈখিক সৌন্দর্যের প্রকৃতি নয়। সেখানে সৌন্দর্য আছে, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের ভিতরেই আছে ধ্বংসের সম্ভাবনা।

‘অপরাজিত’ : বড় হয়ে ওঠার মূল্য

পথের পাঁচালী-র অপু যখন অপরাজিত-এ প্রবেশ করে, তখন তার সামনে পৃথিবী বদলে যায়। শৈশবের গ্রাম থেকে সে শিক্ষার জগতে প্রবেশ করে। শহর আসে। উচ্চশিক্ষা আসে। নতুন আকাঙ্ক্ষা আসে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আসে বিচ্ছিন্নতা। অপু যত বড় হয়, তার পৃথিবী তত বিস্তৃত হয়; অথচ তার অন্তর্গত একাকিত্বও তত বাড়ে। এই দ্বন্দ্ব অপরাজিত-এর কেন্দ্রে। মানুষ কি বড় হতে গিয়ে তার শিকড় হারায়? শিক্ষা কি মানুষকে মুক্ত করে, না তাকে নিজের পরিচিত পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে?স্বপ্ন কি মানুষের সামনে নতুন দরজা খুলে দেয়, নাকি পুরনো সম্পর্কের দরজা বন্ধ করে? অপুর জীবন এই প্রশ্নগুলির সহজ উত্তর দেয় না।

এইখানে অপরাজিত কেবল অপুর জীবনের দ্বিতীয় পর্ব নয়; এটি আধুনিকতার একটি অন্তর্গত সংকটের উপন্যাস। গ্রাম থেকে শহর, পরিবার থেকে ব্যক্তি, ঐতিহ্য থেকে আধুনিক শিক্ষা, পরিচিতি থেকে অজানাঅপু এই সমস্ত রূপান্তরের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যায়।

তাই অপু একদিকে বিভূতিভূষণের আত্মজৈবনিক প্রতিরূপ, অন্যদিকে বিশ শতকের ভারতীয় মধ্যবিত্ত যুবকের প্রতীক। পথের পাঁচালী ও অপরাজিত তাঁর ব্যক্তিগত জীবন থেকেও উপাদান গ্রহণ করেছে—এ তথ্য তাঁর জীবনীমূলক পাঠকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে। 

অরণ্যের কাছে মানুষের অপরাধবোধ

বিভূতিভূষণের সাহিত্যভুবনের সবচেয়ে জটিল ও আধুনিক রচনাগুলির একটি আরণ্যক। এখানে এসে তাঁর প্রকৃতিচেতনা এক নতুন মাত্রা লাভ করে। পথের পাঁচালী-তে প্রকৃতি ছিল শিশুর বিস্ময়ের জগৎ। আরণ্যক-এ প্রকৃতি মানুষের সভ্যতার মুখোমুখি দাঁড়ায়। 

সত্যচরণ যে কাজে অরণ্যে আসে, তার মধ্যে অর্থনৈতিক প্রয়োজন আছে। জমি বন্দোবস্ত, মানুষের বসতি, কৃষির বিস্তার – সবই আধুনিক অর্থনৈতিক ও সমাজ ব্যবস্থার অংশ। কিন্তু ধীরে ধীরে সে অনুভব করে, যে অরণ্যকে মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করছে, সেই অরণ্যই আসলে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবজগৎ। গাছ কাটা মানে কেবল কাঠ সংগ্রহ নয়। একটি জগতের বিলুপ্তি। এখানেই আরণ্যক আজকের পরিবেশচেতনার কাছে আশ্চর্যভাবে প্রাসঙ্গিক।

বিভূতিভূষণ আধুনিক পরিবেশবাদী ভাষা ব্যবহার করেননি। ‘ইকোলজি’, ‘বায়োডাইভার্সিটি’, ‘সাসটেইনেবিলিটি’ ইত্যাদি পরিভাষাগুলি তাঁর সময়ের সাহিত্যিক আলোচনায় আজকের অর্থে ছিল না।কিন্তু তিনি যে নৈতিক অস্বস্তি অনুভব করেছিলেন, আজকের পরিবেশবিজ্ঞান তারই অন্য ভাষ্য। মানুষ যখন অরণ্যকে সম্পদ হিসেবে দেখে, তখন অরণ্যের ভিতরে বসবাসকারী মানুষ, পশু, পাখি, বৃক্ষ, জল ও মাটির নিজস্ব অস্তিত্বকে সে অস্বীকার করে। আরণ্যক এই অস্বীকারের বিরুদ্ধে একটি নীরব সাহিত্যিক দলিল। তবে এটিকে সরল ‘প্রকৃতিপ্রেমের উপন্যাস’ বললে তার জটিলতা নষ্ট হয়। কারণ বিভূতিভূষণ জানেন – মানুষও বাঁচতে চায়। দরিদ্র মানুষ জমি চায়। কৃষক খাদ্য চায়। বসতি চায়। 

অতএব সংঘাতটি মানুষ বনাম প্রকৃতি নয়। সংঘাতটি মানুষের প্রয়োজন বনাম মানুষের সীমাহীন লোভ। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যই আরণ্যক-কে কালোত্তীর্ণ করে।

শঙ্কর : অপুর আর-এক অবতার

চাঁদের পাহাড়-এর শঙ্করকে যদি অপুর পাশে দাঁড় করানো যায়, একটি আশ্চর্য সাদৃশ্য দেখা যায়। অপু অজানার দিকে চেয়ে থাকে। শঙ্করও তাকিয়ে থাকে অজানার দিকে। অপু রেলগাড়ির শব্দে দূর পৃথিবীর ডাক শুনেছিল। শঙ্কর শুনেছিল অনেকদূরের আফ্রিকার ডাক। দুজনেরই ভিতরে আছে পরিচিত পৃথিবীর সীমানা অতিক্রম করার আকাঙ্ক্ষা। এই কারণেই চাঁদের পাহাড় কেবল কিশোর-রোমাঞ্চ নয়। এটি বাঙালি মধ্যবিত্তের কল্পনার ভূগোলকে বিস্তৃত করার কিংবা ইচ্ছাপূরণের উপন্যাস।                           

ঘরের টান উপেক্ষা করে শঙ্কর আফ্রিকায় পাড়ি দেয়। পাহাড়, মরুভূমি, আগ্নেয়গিরি, বন্যপ্রাণী, বিপদ – সবকিছু তাকে ঘিরে ধরে। বিভূতিভূষণ নিজে আফ্রিকা ভ্রমণ করেননি; অথচ তাঁর কল্পনা সেই দূর মহাদেশকে বাংলা পাঠকের সামনে জীবন্ত করে তুলেছিল। এই ক্ষমতাই তাঁর কথাশিল্পের বিস্ময়কর দিক।শঙ্কর তাই কেবল অ্যাডভেঞ্চারের নায়ক নয়। সে অজানার দিকে মানুষের চিরন্তন অভিযাত্রার প্রতীক। স্বয়ম্ভূ যেন ! 

রান্নাঘরের মহাকাব্য

বিভূতিভূষণের সাহিত্যকে কেবল অরণ্য ও নদীর সঙ্গে যুক্ত করলে তাঁর সামাজিক দৃষ্টির একটি বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়। আদর্শ হিন্দু হোটেল-এর হাজারী ঠাকুর তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। হাজারীর স্বপ্ন বড় নয় – নিজের একটি হোটেল হবে। ভালো রান্না করবে। নিজের মতো করে বাঁচবে। কিন্তু এই ছোট্ট একটা স্বপ্নের ভিতরেই রয়েছে মানুষের আত্মমর্যাদার বোধ। বিভূতিভূষণ বুঝেছিলেন, মানুষের মহত্ত্ব তার সামাজিক অবস্থান দিয়ে নির্ধারিত হয় না। একজন দরিদ্র রাঁধুনিরও স্বপ্ন আছে। একজন সাধারণ  কর্মচারীরও আত্মসম্মান আছে। একজন সাধারণ মানুষেরও নিজের জীবনকে নিজের মতো করে নির্মাণ করার অধিকার আছে। এই দৃষ্টিই তাঁকে কেবল প্রকৃতির লেখক না করে মানুষের লেখক করে তোলে। তাঁর সাহিত্যিক গণতন্ত্রের মূল এখানেই – কেউ তাঁর কাছে অতিরিক্ত ছোট নয়।                                             

তালনবমী গল্পে দেখি  ভাদ্র মাসের এক টানা বর্ষণমুখর গ্রামীণ পরিবেশ। দরিদ্র ব্রাহ্মণ ক্ষুদিরাম ভটচাজের ঘরে চরম অভাব, টানা দুদিন ধরে উনুনে হাঁড়ি চড়েনি। তাঁর দুই নাবালক ছেলে – বারো বছরের নেপাল এবং দশ বছরের গোপাল তীব্র ক্ষুধায় ভুগছে। এমন সময় তারা জানতে পারে যে, গ্রামের ধনী জটি পিসিমাদের বাড়িতে আগামী মঙ্গলবার ‘তালনবমী’ ব্রত উপলক্ষ্যে এক বিশাল ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। ক্ষুধার্ত গোপাল বড় আশা করে যে তারা এই ভোজের আমন্ত্রণ পাবে। জটি পিসিমার বাড়ির পিঠের জন্য তালের প্রয়োজন জেনে নেপাল ও গোপাল প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি ও কাদা মাড়িয়ে ভোরবেলা দীঘির পাড় থেকে কুড়িয়ে আনা কালো হেড়ে তাল জটি পিসিমাকে দিয়ে আসে। গোপাল তার দাদাকে বারণ করে তালের বিনিময়ে কোনো পয়সা নিতে, কারণ তার সরল বিশ্বাস ছিল – পয়সা না নিলে পিসিমা খুশি হয়ে তাদের অবশ্যই নেমন্তন্ন করবেন। 

অবশেষে আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত মঙ্গলবার – তালনবমীর দিন। সকাল থেকে গোপাল চরম উদ্দীপনা নিয়ে দরজার মুখে কাঠের গুঁড়িতে বসে অপেক্ষা করতে থাকে, কখন জটি পিসিমার বাড়ি থেকে ডাক আসবে। বেলা বাড়ে, এবং সে দেখতে পায় গ্রামের একে একে সমস্ত মানুষ, ব্রাহ্মণ ও তাদের ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে জটি পিসিমার বাড়ির দিকে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের পরিবারে কোনো ডাক আসে না। গ্রামের অন্য এক বালকের মুখে গোপাল জানতে পারে যে, জটি পিসিমা সবাইকে বলেননি, বেছে বেছে বড়লোকদেরই নেমন্তন্ন করেছেন।

অপমানে ও অভিমানে দিশেহারা হয়ে পড়া ক্ষুধার্ত গোপাল শেষ পর্যন্ত এক স্বপ্ন দেখে – স্বপ্নে সে জটি পিসিমাদের বাড়ি গিয়ে পৌঁছায়, পিসিমা তাকে আদর করে পাত পেড়ে ক্ষীর, লুচি আর তালের বড়া খাওয়াচ্ছেন। কিন্তু স্বপ্নের সেই সুখাদ্যের স্বাদ মিলিয়ে যায় যখন তার ঘুম ভেঙে যায় এবং সে নিজেকে আবিষ্কার করে এক বৃষ্টির দিনে তাদের জীর্ণ ঘরের সেই চাদরে, বাইরে তখনও অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পড়ছে। তাদের নিমন্ত্রণ আর আসেনি।

গল্পের মূল সুরটি বাঁধা রয়েছে চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শিশুর মনস্তত্ত্বের দ্বন্দ্বে। গোপাল ও নেপালের কাছে জটি পিসিমার বাড়ির ভোজ কোনো বিলাসিতা ছিল না, ছিল কয়েকদিনের অনাহার কাটানোর এক পরম আশ্বাস। পয়সা না নিয়ে তাল দেওয়ার মধ্যে অবুঝ গোপালের যে আত্মত্যাগ ও বিশ্বাসের জন্ম হয়েছিল, তা গ্রামীণ ধনীক শ্রেণীর কাছে সস্তা উপহাবে পরিণত হয়। বিভূতিভূষণ এখানে জটি পিসিমার চরিত্রের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ সমাজের এক নির্মম সত্যকে তুলে ধরেছেন। উৎসব বা ধর্মীয় আচার যেখানে সবাইকে মেলানোর কথা, সেখানেও অর্থনৈতিক শ্রেণীভেদ স্পষ্ট। গরিব ও ক্ষুধার্ত পরিবারটিকে অনায়াসে বাদ দিয়ে গ্রামের বিত্তবান ও প্রভাবশালীদের “বেছে বেছে” আমন্ত্রণ জানানো সমাজের চরম স্বার্থপরতা ও অসংবেদনশীলতাকে ফুটিয়ে তোলে। বিভূতিভূষণের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, এই গল্পেও প্রকৃতি এক জীবন্ত চরিত্র। ভাদ্রের একটানা বৃষ্টি এবং গুমোট আবহাওয়া একদিকে যেমন ক্ষুদিরামের ঘরের অভাবকে তীব্র করেছে, অন্যদিকে গোপালের মনের অবরুদ্ধ আশাকে আরও ঘনীভূত করেছে।

ছোটগল্পে ক্ষুদ্র জীবনের মহত্ত্ব

বিভূতিভূষণের ছোটগল্পের জগৎ তাঁর উপন্যাসের তুলনায় কম আলোচিত হলেও তা বাংলা সাহিত্যে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মেঘমল্লার, মৌরীফুল, যাত্রাবদল, জন্ম ও মৃত্যু, কিন্নরদল, তালনবমী, উপলখণ্ড, ক্ষণভঙ্গুর, অসাধারণ – এইসব সংকলনের গল্পে মানুষের জীবনের ক্ষুদ্র অথচ গভীর মুহূর্তগুলি ধরা পড়েছে। তাঁর গল্পে নাটকীয়তার চেয়ে অনুভব বড়।

বড় ঘটনা অনেক সময় অনুপস্থিত। কিন্তু একটি সম্পর্ক, একটি স্মৃতি, একটি অপেক্ষা, একটি মৃত্যু, একটি আকস্মিক সাক্ষাৎ ইত্যাদি সামান্য এটি তুচ্ছ ঘটনাই মানুষের অন্তর্লোককে উন্মুক্ত করে। এইখানে বিভূতিভূষণের গল্প বলার পদ্ধতি অত্যন্ত আধুনিক। তিনি পাঠককে সব কথা বলেন না। অনেক কিছু অনুভব করতে দেন। তাঁর গল্পে নীরবতারও একটি ভাষা আছে।

দিনলিপি : প্রকৃতির ভিতর আত্মজিজ্ঞাসা

বিভূতিভূষণের দিনলিপি-ধর্মী রচনাগুলি তাঁর সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব বোঝার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। স্মৃতির রেখা, তৃণাঙ্কুর, ঊর্মিমুখর, উৎকর্ণ প্রভৃতি রচনায় আমরা এমন এক বিভূতিভূষণকে পাই, যিনি বাইরের পৃথিবীকে দেখার পাশাপাশি নিজের ভিতরেও তাকাচ্ছেন। তাঁর ডায়েরি ও প্রকৃতি-ভিত্তিক লেখাগুলি তাঁর সাহিত্যিক মননের আর-এক দিক উন্মোচন করে। 

এখানে প্রকৃতি আর কেবল দৃশ্য নয়। একটি গাছ তাঁকে সময়ের কথা ভাবায়। একটি নদী তাঁকে অনিত্যতার কথা মনে করায়। একটি সন্ধ্যা তাঁকে মৃত্যুর কথা ভাবায়। একটি অরণ্য তাঁকে মানুষের সীমাবদ্ধতার কথা মনে করায়। অর্থাৎ প্রকৃতি তাঁর কাছে এক ধরনের দার্শনিক পাঠশালা। এইখানেই তাঁর সাহিত্যিক আধ্যাত্মিকতার উৎস। বিভূতিভূষণ প্রচারক নন। তিনি ধর্মীয় মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চান না। কিন্তু তাঁর লেখায় একটি গভীর আধ্যাত্মিক বিস্ময় আছে। 

মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী – এই সত্য তিনি জানেন। কিন্তু সেই ক্ষণস্থায়ী জীবনের ভিতরেই সৌন্দর্য আছে। এই উপলব্ধিই তাঁর সাহিত্যকে বিষণ্ণতার বদলে এক ধরনের শান্ত দীপ্তি দেয়।

‘ইছামতী’ : নদী যখন ইতিহাসের স্মৃতি

ইছামতী বিভূতিভূষণের পরিণত সাহিত্যবোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এখানে একটি নদী কেবল ভৌগোলিক সীমানা নয়; নদী হয়ে ওঠে জনজীবনের ধারক। নদীর সঙ্গে যুক্ত মানুষ, কৃষি, ধর্ম, সামাজিক সম্পর্ক, জাতপাত, অর্থনীতি, ঔপনিবেশিক শাসন – সবকিছু মিলে একটি বৃহত্তর ইতিহাস তৈরি হয়।এই ইতিহাস রাজাদের ইতিহাস নয়। এটি সাধারণ মানুষের ইতিহাস। বাংলার নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার ইতিহাস।

এই দৃষ্টিতে ইছামতীকে পড়লে দেখা যায়, বিভূতিভূষণের সাহিত্য ক্রমে ব্যক্তিমানুষের জীবন থেকে বৃহত্তর সামাজিক সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পথের পাঁচালী-তে পরিবার। অপরাজিত-তে ব্যক্তি ও শিক্ষা। আরণ্যক-এ মানুষ ও প্রকৃতি। ইছামতী-তে সমাজ ও ইতিহাস। এ যেন তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টির ক্রমবিস্তার। মৃত্যুর পর ইছামতী-র জন্যই তিনি ১৯৫১ সালে মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত হন। 

অশনি সংকেত’ : দুর্ভিক্ষের ভিতর সভ্যতার মুখ

অশনি সংকেত তাঁর সাহিত্যভুবনের আর-এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এখানে ক্ষুধা শুধু ব্যক্তিগত দুর্দশা নয়; তা একটি সামাজিক ও সভ্যতাগত বিপর্যয়। দুর্ভিক্ষ মানুষের সামাজিক সম্পর্ককে বদলে দেয়। খাদ্যের মূল্য বদলে দেয় মানুষের নৈতিকতা। যে সমাজে মানুষ পরস্পরের পাশে দাঁড়াত, সেখানে খাদ্যের অভাব মানুষকে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অন্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে পারে। বিভূতিভূষণ এই পরিবর্তনকে দেখেছেন মানুষের খুব কাছে থেকে। তাঁর দৃষ্টি এখানে কোনও রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়। বরং মানুষের মুখ। ক্ষুধার মুখ। ভয়ের মুখ। অসহায়তার মুখ। এই কারণেই অশনি সংকেত আজও অস্বস্তিকর।

কারণ দুর্ভিক্ষ কোনও অতীতের ঘটনা মাত্র নয়। খাদ্য, পরিবেশ, যুদ্ধ, অর্থনীতি ও সামাজিক বৈষম্যের সম্পর্ক আজও পৃথিবীকে একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় – মানুষের সভ্যতা কতটা সভ্য?

বিভূতিভূষণ ও জীবনানন্দ : একই বাংলার দুই ভিন্ন আলো

বিভূতিভূষণ ও জীবনানন্দ দাশ – দুজনেই প্রকৃতির কবি/কথাশিল্পী হিসেবে পাঠকের কাছে ফিরে আসেন। কিন্তু তাঁদের প্রকৃতি এক নয়। জীবনানন্দের প্রকৃতি অনেক সময় স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা, ইতিহাস ও মৃত্যুচেতনার এক রহস্যময় ভূদৃশ্য। বিভূতিভূষণের প্রকৃতি তুলনায় অধিক প্রত্যক্ষ। তিনি প্রকৃতির মধ্যে হাঁটেন। জীবনানন্দ প্রকৃতির মধ্যে ফিরে যান – প্রায়শই স্মৃতির ভিতর দিয়ে। একজনের কাছে ধানের গন্ধ জীবনকে স্পর্শ করে।

অন্যজনের কাছে সেই ধানের ক্ষেত হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর স্মৃতি হয়ে ওঠে। তবু দুজনের ভিতর একটি গভীর মিল আছে। দুজনেই আধুনিকতার যান্ত্রিক গতির বাইরে অন্য এক সময়ের সন্ধান করেছেন। এই কারণেই তাঁদের প্রকৃতি আজও আমাদের কাছে এত জরুরি।

রবীন্দ্রনাথের পর : নিজের ভাষা নির্মাণ

বিভূতিভূষণ এমন এক সময়ে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করেন, যখন রবীন্দ্রনাথের প্রভাব বাংলা সাহিত্যে সর্বব্যাপী। তাঁর সমসাময়িকদের অনেকেই রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে মুক্তির চেষ্টা করেছিলেন। বিভূতিভূষণ সেই অর্থে বিদ্রোহী ছিলেন না। তিনি রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করেননি। কিন্তু অনুকরণও করেননি। তাঁর ভাষা ধীরে ধীরে নিজের স্বর খুঁজে নিয়েছে। এই স্বর অলংকারবহুল নয়। আবার নিছক কথ্যও নয়। এতে আছে পর্যবেক্ষণের নির্ভুলতা, অনুভবের কোমলতা এবং বর্ণনার বিস্তার। তাঁর গদ্য যেন হাঁটে। দৌড়ায় না। এই ‘ধীরতা’ তাঁর দুর্বলতা নয়; বরং শিল্পের অন্যতম শক্তি। আধুনিক পাঠকের দ্রুততার যুগে বিভূতিভূষণ আমাদের থামতে শেখান। একটি গাছের দিকে তাকাতে। একটি পাখির ডাক শুনতে। একটি শিশুর চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখতে।

মানুষকে ছোট না করার সাহিত্য

বিভূতিভূষণের সাহিত্যিক নৈতিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এটিই—তিনি তাঁর চরিত্রদের বিচার করতে তাড়াহুড়ো করেন না। তাঁর মানুষ ভুল করে। দুর্বল হয়। লোভী হয়। স্বার্থপর হয়। আবার ভালোবাসে। ত্যাগ করে। স্বপ্ন দেখে। মরে। 

এই মানুষকে তিনি কোনও একক নৈতিক সংজ্ঞায় আবদ্ধ করেন না। তাঁর সাহিত্য তাই মানবতাবাদী, কিন্তু সরল মানবতাবাদী নয়। তিনি মানুষকে ভালোবাসেন কারণ মানুষ নিখুঁত নয়। বরং মানুষের অসম্পূর্ণতার মধ্যেই তাঁর করুণা। এই দৃষ্টিই তাঁকে শরৎচন্দ্রের থেকে আলাদা করে। শরৎচন্দ্রের মানবিকতা অনেক সময় সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে আবেগময় প্রতিবাদে রূপ নেয়। বিভূতিভূষণের মানবিকতা অনেক সময় নীরব সহমর্মিতায়। তিনি চিৎকার করেন না। তিনি পাশে বসেন।

বিভূতিভূষণের সাহিত্যদর্শন : বিস্ময়ের পুনরুদ্ধার

বিভূতিভূষণের সাহিত্যকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করতে হলে ‘বিস্ময়’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। শিশু অপু বিস্মিত। শঙ্কর বিস্মিত। অরণ্যে সত্যচরণ বিস্মিত। নদীর ধারে তাঁর মানুষ বিস্মিত। লেখক নিজেও বিস্মিত। এই বিস্ময়ই তাঁর সাহিত্যকে জীবন্ত রাখে। আধুনিক মানুষ পৃথিবীকে অনেকটাই ‘জানা’ বলে ধরে নেয়। বিজ্ঞান তাকে অনেক কিছু জানিয়েছে। প্রযুক্তি তার দূরত্ব কমিয়েছে। নগর তাকে দ্রুত করেছে। কিন্তু বিভূতিভূষণ মনে করিয়ে দেন – জানা মানেই দেখা নয়। পৃথিবীকে সত্যিই দেখতে হলে এখনও থামতে হয়। আকাশের দিকে তাকাতে হয়। অরণ্যের ভিতর হাঁটতে হয়। নদীর শব্দ শুনতে হয়। শিশুর চোখ ধার করতে হয়। এই অর্থে বিভূতিভূষণ আধুনিকতার বিরোধী নন; তিনি আধুনিকতার অমানবিকতার বিরুদ্ধে।

ঘাটশিলা : শেষ জীবনের আশ্রয়

ঘাটশিলা বিভূতিভূষণের সাহিত্যিক জীবনে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। উত্তর বিহারের অরণ্যজীবনের অভিজ্ঞতার পরে ঘাটশিলা ও গালুডির প্রকৃতি তাঁকে গভীরভাবে আকর্ষণ করেছিল। সেখানে তিনি বাড়ি করেছিলেন – গৌরীকুঞ্জ’, তাঁর প্রথম স্ত্রী গৌরীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে। 

এই স্থান তাঁর কাছে নিছক বসতবাড়ি ছিল না। এটি ছিল প্রত্যাবর্তনের স্থান। জীবনের ব্যস্ততা থেকে দূরে। শহর থেকে দূরে। সাহিত্যিক কোলাহল থেকে দূরে। প্রকৃতির কাছে। তাঁর শেষ জীবনের লেখালেখিতে এই প্রত্যাবর্তনের অনুভূতি ক্রমশ স্পষ্ট হয়। তিনি যেন বুঝেছিলেন – মানুষ যত দূরেই যাক, শেষ পর্যন্ত তাকে কোনও এক নদীর কাছে, কোনও এক অরণ্যের কাছে, কোনও এক পরিচিত আকাশের নীচে ফিরে আসতে হয়। 

১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর ঘাটশিলায় তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স তখন মাত্র ছাপ্পান্ন। কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার তার বহু গুণ দীর্ঘ।

সত্যজিৎ রায় : অন্য শিল্পমাধ্যমে বিভূতিভূষণের পুনর্জন্ম

বিভূতিভূষণের সাহিত্যকে বিশ্বপরিসরে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায়ের অবদান অনস্বীকার্য। পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়ে শুধু বাংলা নয়, ভারতীয় চলচ্চিত্রের ভাষাকেই বদলে দিয়েছিল। পরবর্তীকালে অপরাজিত এবং অশনি সংকেত অবলম্বনেও সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তবে চলচ্চিত্র ও উপন্যাস এক নয়। সত্যজিৎ রায় বিভূতিভূষণকে অনুবাদ করেননি; তিনি তাঁকে পুনর্নির্মাণ করেছেন। উপন্যাসের অন্তর্মুখী ভাষাকে তিনি দৃশ্যের ভাষায় রূপ দিয়েছেন। অপুর বিস্ময় ক্যামেরার বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে। দুর্গার দৌড়, রেলগাড়ির দৃশ্য, বৃষ্টির পৃথিবী – সবকিছু নতুন এক শিল্পভাষা পেয়েছে। কিন্তু মূল মানবিক স্পন্দনটি থেকে গেছে।

এইখানেই বিভূতিভূষণের শক্তি – তাঁর সাহিত্য অন্য শিল্পমাধ্যমেও নতুন জীবন পেতে পারে।

উত্তরসূরিদের মধ্যে বিভূতিভূষণের প্রতিধ্বনি

বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণের প্রভাব সরাসরি অনুকরণের মাধ্যমে যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি এসেছে দৃষ্টিভঙ্গির উত্তরাধিকার হিসেবে।  বুদ্ধদেব গুহর অরণ্য ও ভ্রমণকেন্দ্রিক সাহিত্যে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কের যে অন্তরঙ্গতা দেখা যায়, সেখানে বিভূতিভূষণের দূরবর্তী প্রতিধ্বনি শোনা যায়। 

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিস্তৃত জীবনভুবনেও মানুষ, ভূগোল, ইতিহাস ও যাত্রার যে সমন্বয়, তা বাংলা কথাসাহিত্যের সেই বৃহত্তর ঐতিহ্যের অংশ, যার এক শক্তিশালী ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন বিভূতিভূষণ।কিন্তু বিভূতিভূষণের প্রকৃত উত্তরাধিকার কোনও নির্দিষ্ট লেখকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

তিনি বাংলা সাহিত্যকে একটি দৃষ্টি দিয়েছেন – সাধারণ জীবনও মহৎ সাহিত্য হতে পারে। এই উপলব্ধি তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।

আজকের পৃথিবীতে বিভূতিভূষণ

আজ আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে শহর বাড়ছে, গ্রাম বদলে যাচ্ছে, নদী সংকুচিত হচ্ছে, অরণ্য পিছিয়ে যাচ্ছে।

প্রকৃতিকে আমরা প্রায়শই দেখি ‘সম্পদ’ হিসেবে। জমি- জল- কাঠ – খনিজ -উৎপাদন। কিন্তু প্রকৃতি যে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা- এই উপলব্ধি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে আরণ্যক নতুন করে পড়তে হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ে ইছামতী নতুন করে পড়তে হয়। দুর্ভিক্ষ, খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক বৈষম্যের সময়ে অশনি সংকেত নতুন করে পড়তে হয়। আর শিশুদের ক্রমশ স্ক্রিননির্ভর জীবনের মধ্যে পথের পাঁচালী পড়তে হয় অন্য কারণে। অপুর বিস্ময় ফিরিয়ে আনার জন্য। আজকের শিশুর পৃথিবীতে তথ্যের অভাব নেই। কিন্তু বিস্ময়ের অভাব আছে। বিভূতিভূষণ সেই বিস্ময়ের শিক্ষক।

কেন বিভূতিভূষণ আজও আমাদের

বিভূতিভূষণকে বারবার পড়ার কারণ তাঁর গল্প জানা নয়। আমরা পথের পাঁচালী-র গল্প জানি। অপুর কথা জানি। দুর্গার কথা জানি। শঙ্করের কথা জানি। হাজারী ঠাকুরের কথা জানি। তবু আবার পড়ি। কারণ গল্প একই থাকে, কিন্তু পাঠক বদলে যায়।

বিশ বছর বয়সে পথের পাঁচালী পড়লে যে অপুকে দেখা যায়, পঞ্চাশ বছর বয়সে সেই অপু আর একই থাকে না। শৈশবে দুর্গার মৃত্যু যে বেদনা দেয়, পরিণত বয়সে তা অন্যরকম লাগে।  যুবক অবস্থায় অপরাজিত স্বাধীনতার গল্প মনে হয়। পরিণত বয়সে তা বিচ্ছেদের গল্প হয়ে ওঠে। আরণ্যক প্রথম পাঠে অরণ্যের সৌন্দর্য। পরে বুঝি – এটি অপরাধবোধের উপন্যাসও। ইছামতী প্রথমে নদীর উপন্যাস। পরে বোঝা যায় – এটি সময়ের উপন্যাস। এই পরিবর্তনশীল পাঠই মহান সাহিত্যের লক্ষণ।

অরণ্য, নদী ও নক্ষত্রের মানুষ

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৫০ সালে চলে গিয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্য তখনও তাঁকে সম্পূর্ণভাবে আবিষ্কার করেনি। পরবর্তী দশকগুলিতে তাঁর সাহিত্য নানা দিক থেকে পুনঃপঠিত হয়েছে। চলচ্চিত্র তাঁকে নতুন পাঠকের কাছে নিয়ে গেছে। গবেষণা তাঁর প্রকৃতিচেতনা, মানবতাবাদ, সমাজদর্শন, আত্মজৈবনিক উপাদান ও আধ্যাত্মিকতার নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছে। তবু বিভূতিভূষণকে কোনও একটি তত্ত্বে সম্পূর্ণ ধরা যায় না।

তিনি একইসঙ্গে অপুর শৈশব,দুর্গার মৃত্যু,হাজারীর স্বপ্ন,শঙ্করের অভিযান,সত্যচরণের অপরাধবোধ, ইছামতীর প্রবাহ, দুর্ভিক্ষের ক্ষুধা,অরণ্যের নিস্তব্ধতা,আর রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা এক মানুষের বিস্ময়। তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায়, জীবনকে বড় করে দেখার জন্য বড় ঘটনা দরকার হয় না।একটি ছোট গ্রাম যথেষ্ট।একটি নদী যথেষ্ট।একটি পথ যথেষ্ট।একটি শিশুর চোখ যথেষ্ট।একটি অরণ্যের ভিতর হাঁটা যথেষ্ট।আর একটি মানুষের অন্তরে যদি বিস্ময় বেঁচে থাকে, তবে পৃথিবী এখনও শেষ হয়ে যায়নি।এই কারণেই বিভূতিভূষণ কেবল ‘গ্রামবাংলার রূপকার’ নন।তিনি মানুষের অন্তহীন যাত্রার কথাশিল্পী।তাঁর মানুষ ঘর ছাড়ে, আবার ঘরে ফেরে।অরণ্য উজাড় হয়, আবার স্মৃতিতে অরণ্য ফিরে আসে।নদী তার গতিপথ বদলায়, কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে তার জল থেকে যায়।শৈশব চলে যায়, কিন্তু অপু থেকে যায়।দুর্গা চলে যায়, কিন্তু কাশবনের ভিতর তার ছুটে চলা থেকে যায়।শঙ্কর অজানার দিকে চলে যায়, কিন্তু তার অভিযাত্রার আকাঙ্ক্ষা আমাদের ভিতরেও জেগে থাকে।এই জেগে থাকাটিই বিভূতিভূষণের সাহিত্যিক অমরত্ব।

রাতের আকাশে আমরা যখন কোনও একলা তারার দিকে তাকাই, তখন হয়তো বুঝতে পারি না—কত দূরের কোনও এক সাহিত্যিক আমাদের সেই তাকিয়ে থাকার অভ্যাস শিখিয়ে দিয়েছেন।

তিনি বিভূতিভূষণ। অরণ্য, নদী ও নক্ষত্রের সেই কথাশিল্পী, যিনি আমাদের শিখিয়েছেন- পৃথিবীকে ভালোবাসা মানে শুধু পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখা নয়; তার ক্ষয়, তার দুঃখ, তার মানুষ এবং তার অনন্ত রহস্যের পাশে দাঁড়ানো।আর সেই কারণেই, এত বছর পরে, তাঁর লেখা খুললে এখনও মনে হয়- সামনে একটি পথ আছে। পথের পাশে কাশফুল দুলছে। দূরে নদী। তারও ওপারে অরণ্য। আর মাথার উপর অসংখ্য নক্ষত্র।মানুষটি হাঁটছে। আমরাও তার সঙ্গে হাঁটছি। পথ শেষ হয় না।

নির্বাচিত তথ্যসূত্র ও পাঠ-সহায়িকা

১. Banglapedia, “Bandyopadhyay, Bibhutibhushan” — জীবন, শিক্ষা, কর্মজীবন ও গ্রন্থপঞ্জির প্রাথমিক তথ্য। 

২. Banglapedia, “Pather Panchali” — ধারাবাহিক প্রকাশ, ১৯২৯-এর গ্রন্থপ্রকাশ, চরিত্র ও উপন্যাসের প্রেক্ষিত। 

৩. বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ও রচনাসংক্রান্ত প্রামাণ্য গ্রন্থতালিকা ও জীবনী-তথ্য। 

৪. পথের পাঁচালী ও ইছামতী-র গ্রামীণ সমাজ ও প্রকৃতিচেতনা নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণামূলক আলোচনা। 

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি ধারাবাহিক অনুবাদ

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি সলিল সমাধি ধারাবাহিক অনুবাদ

Read More »

২ : কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ একটি বাড়ির চোখ দিয়ে দেখা দুই শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের জীবন ও সময়ের নির্মম পরিবর্তনের কাহিনি পর্ব : দুই তিন রোজকার মতো সকাল-সকাল ঘোষালবাড়িতে

Read More »