সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি - ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া )

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

 রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে নাজিরা মহাবিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।রাজীব বরা সাহিত্যের বিভিন্ন বিভাগে নিজ প্রতিভার পরিচয় দানে সমর্থ হয়েছেন।তিনি একাধারে কবি,সমালোচক,গল্পকার,ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক।বর্তমান অসমিয়া কবিতার জগতে রাজীব বরা একটি অতি সুপরিচিত নাম।কাব্যগ্রন্থগুলি যথাক্রমে ‘তটিনী তীরর খেলা’,’ঢেউ’,’মানুহ চেরাই বাচি থকা নাযায়’,’মাউরর দিন’,এই ফালেও কবি আছে’।মৌলিক প্রবন্ধ সংকলন ছাড়াও সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘চিন্তা-পরিক্রমা’,’অসমিয়া আরু কথা সাহিত্যর আভাস’ ইত্যাদি।আলোচ্য উপন্যাস ‘সলিল সমাধি’ (‘জলজাহ’)মাখন হাজরিকা স্মৃতি উপন্যাস পান্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়। এছাড়াও শ্রীবরা বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ]

১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা পাঁচশত পঞ্চাশটির ও বেশি।সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিয়মিত ভাবে অসমিয়া গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করে চলেছেন।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত সংস্থা NEINADএর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য Distinguished Life Membership এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশটি।হোমেন বরগোহাঞির অসমিয়া উপন্যাস ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়) বাংলা অনুবাদের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন।

|১২|


লুকিয়ে রাখা সত্য


দামোদরকে উদ্ধার করার জন্য যাওয়া নৌকাটায় অন্য কেউ যাক না যাক ক’লাইয়ের যাওয়াটা মা আহিনী ভেতরে ভেতরে খুশি মনে মেনে নিতে পারে নি।বুধিরামের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নৌকায় উঠতে চলা ক’লাইকে মা ইশারায় বারণ করার চেষ্টা করেছিল।সেটা ক’লাইও দেখেছিল বুঝতে পেরেছিল যদিও খুব একটা গুরুত্ব দেয় নি।মায়ের স্বভাবটা সে আগে থেকেই জানে।তবে পাশেই থাকা বিমলার ইশারা দেখে তার মনোবল অনেকখানি বেড়ে গেল।মানুষটার চোখেমুখের এই ভাষা ক’লাই ভালোভাবে বুঝতে পারে।বাড়িতেও প্রায় সময়েই কাজ-কর্মে ওজর আপত্তি করা মায়ের কাছ থেকে আড়াল করার জন্য দুজনেই এভাবে সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করে।না হলে খারাপ ভালো প্রতিটি কাজ-কর্মে মায়ের ওজর-আপত্তির আর শেষ নেই।এই নিয়ে কথা বললে চিৎকার চেঁচামিচি করে হুলুস্থুল কাণ্ড করে।


বিপন্ন দিনে তার শৈশবের সমবয়সী বুধিরাম যতটা সাহায্য করেছে সেটা অন্য কেউ করে নি।দামোদরের অবদান তাতে কম নয়।এই বিপদের সময় সেই উপকারের প্রতিদান দেবার উপযুক্ত সুযোগ এসেছে।সে কেন পিছিয়ে আসবে?দামোদর না হয়ে গ্রামের অন্য কেউ হলেও বোধহয় এরকম বিপদে সে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে ইতস্তত করত না।মানুষকে সাহায্য করা তো মানুষের ধর্ম।আত্মীয়-স্বজন হলে সাহায্য না করার প্রশ্নই উঠে না।না হলে গ্রাম তৈ্রি করে সবাই একসঙ্গে থাকার যুক্তি কোথায়?তবে সেও জানে স্বার্থ এবং সুযোগ-সুবিধা ছাড়া অনেকে এক পা ও এগোতে চায় না।তবে,সে তাদের মতো হতে চায় না।
নৌকাটা চলে যাবার পরেও আহিনী চালার নিচে এসে বিড়বিড় করতে লাগল-‘নিজে থেকে যে মরতে চলেছে তাকে অন্যে উদ্ধার করে আনার কী প্রয়োজন?অপমৃত্যুর জন্য সে তো নিজেই মরণ ফাঁদে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।এখন তার সঙ্গে আমাদের এটাও মরতে চলেছে।’
বিমলা কিছুই বলল না। বলতে গেলে ভীমরুলের চাকে ঢিল ছোঁড়ার মতো অবস্থা হবে। অগ্যতা সে চুপ করে রইল। ওদের চালার নিচে এসে একটা কাঠের টুকরোকে পিড়ি বানিয়ে বসে নিয়ে কাঞ্চনী বুড়ি তার শাশুড়ির কথায় সায় দেওয়ায় আহিনীর কথা বাড়ল। দুজনেই গল্প গুজব করতে লাগল। বিমলা চট করে অজুহাত দেখিয়ে বুধিরামদের চালাটার দিকে এগিয়ে গেল। এই সময় সোহাগী এবং মেয়েদের সঙ্গে কথা বলা, কাঁধে একটা সহানুভূতির হাত রাখা দরকার।
বাড়ির অমতে বিমলা কলাইয়ের কাছে পালিয়ে আসা–না, না, কলাই পালিয়ে আনা দিনটিতে কলাইর সঙ্গী হয়ে বুধিরাম গিয়েছিল। কলাইর রাগেশ্বর বাপটা বাড়িতে ঢুকতে না দেওয়ায় তাকে রাজি করিয়ে সংসার করার পথ খুলে দেওয়ার কাজটাও সম্ভব হয়েছিল দামোদরের জন্যই। শুধুমাত্র এটুকুই নয়, ওদের পরিবারটিকে গ্রামে এক ঘরে করে রাখা দিনগুলিতে জনগণের বাধা নিষেধ না মেনে ওদের সাহায্য করে দামোদরের পরিবারটিও সমাজের কোপ দৃষ্টিতে পড়েনি কি। মেয়ে চম্পা নিজের জীবনে এবং ওদেরও জীবনে ঘনিয়ে আনা বিপর্যয়ের গ্রাস থেকে উদ্ধার করেছিল বুধিরাম, দামোদর। তাই ওদের বিপদের সময় সাহায্য না করে দূরে সরে থাকাটা অপরাধ হবে নাকি? বিমলা কথাগুলি কলাইর মতো করে ভাবে।
মানুষের জীবনের প্রায় বিপদই কোনোরকম আভাস না দিয়ে চুপি চুপি চলে আসে। হঠাৎ দেখা দিয়ে জীবনে নানারকম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে।বিবশ করে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। এরকমই এক বিপদ ডেকে এনে নির্লজ্জ মুখটা নিয়ে শোবার বিছানায় মেয়ে চম্পা বিমলাকে বলেছিল–’মা আমার গত মাসে মাসিক হয় নি।’মানে? বিমলার বুকের স্পন্দন প্রায় থেমে যাচ্ছিল। বুকের ভেতরে হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে পড়েছিল। শোবার বিছানায় না হয়ে, দাঁড়িয়ে থাকলে হয়তো এতক্ষণে ধড়মড় করে ছিটকে পড়ত।
তার মানে গোবিন্দের সঙ্গে মেয়ের মেলামেশার পরিণতি এটা। তবে এরকম একটি ঘটনা ঘটার মধ্যে যে তাদের দোষ নেই তা কিন্তু নয়। ওদের বাড়ি থেকে মাত্র চারটি বাড়ি অতিক্রম করলেই লক্ষীরাম পাঠকের বাড়ি। তার ছেলেটি যে তাদের জীবনে এত বড়ো বিপদ ডেকে আনবে সে কথা বিমলা বিন্দুমাত্র ভাবতে পারেনি। কোনো রকম ভাবনা-চিন্তা না করে মেয়েটিকে যেন সেখানে ভোগের জন্য এগিয়ে দেওয়া হল। ওদেরও ভুল হয়েছে–শোধরাতে না পারা ভুল।
মাজুলীর একমাত্র কলেজটিতে এরাবারী গ্রাম থেকে পড়তে যাওয়া ছেলেগুলির মধ্যে সেই প্রথম। দাদু এবং ঠাকুরমার এবং মায়ের বাধা না মেনে চম্পাকেও গড়মূর হাই স্কুলে দুটো শ্রেণী পড়ানোর জন্য সেই অনুরোধ করেছিল। চম্পা কলাই এবং বিমলার একমাত্র মেয়ে–তার প্রতি স্নেহ বেশি,দুজনেই স্নেহের পাত্র।পড়াশোনার কাজে গোবিন্দ তাকে এটা ওটা দেখিয়ে দিত।তবে চম্পা পরে আধাতেই স্কুলের পাঠ চুকিয়ে দেয়।তথাপি আগের অজুহাতে ওদের বাড়িতে গোবিন্দের ঘনঘন যাওয়া আসা ছিল।সে আসে,চম্পার সঙ্গে বসে,কথা বলে।ওরাও খুব একটা সন্দেহ করে না।
ওদের মেলামেশা সম্বন্ধ বা সংযোগ যে এমন একটি পর্যায়ে পৌছাবে সেটা বিমলা ভাবতে পারেনি।সত্যিই কি ভাবতে পারেনি?একেবারে না ভাবার কথাটা সত্য নয়।ভেবেছিল।কিছু-কিছু ভেবেছিল।কখনও কখনও গোবিন্দকে জামাই হিসেবে পাওয়ার ইচ্ছাটাও বিমলার মনে কি দেখা দেয় নি?দেখা দিয়েছিল।এই স্বপ্নকে সাকার করে তোলারও তাঁর ইচ্ছা ছিল।
একরাতে শোবার বিছানায় বিমলা ক’লাইকে মনের ইচ্ছাটা বলে ফেলায় সে মুখ ভেঙ্গিয়ে উঠেছিল-‘দেখ,লক্ষ্মীরাম তার ছেলের জন্য আমাদের পরিবারের মেয়ে কখনও নেবে না।ছেলে যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে তাহলে ছেলেকেই বধ করবে।আমাদের মেয়েকেও দুটুকরো করে ফেলবে।মৌশালের বংশের সঙ্গে আমাদের বংশের নাকি শত যুগের শত্রুতা।মরার আগে পিতাও এই একই কথা বলে গেছেন।এই আশা ঝেড়ে ফেল।তার মধ্যে ছেলে কলেজে পড়াশোনা করেছে।এখানে তো চাকরির আকাল।একটা চাকরি জোগাড় করতে পারলে সে কোথায় চলে যাবে।তোকে সাবধান করে দিলাম।মেয়েকেও সাবধান করে দিবি।’
পরিবারদুটির মাঝখানের দীর্ঘকালীন শত্রুতার কথা সেও শুনেছে।তবে কারণটা কী সে আজও জানতে পারল না।
বিমলা সাবধান হয়েছিল।কুপির আলোতে সন্ধেবেলা গোবিন্দ এবং চম্পা একসঙ্গে বসে গল্প করাটা সে আড়চোখে লক্ষ্য করছিল।মেয়েকে সাবধানও করে দিয়েছিল।শেষপর্যন্ত তার ফল দাঁড়াল এই।
ঘটনার আকস্মিকতায় বিমলা চোখের সামনে ধোঁয়া দেখছিল।‘বদমাশ মেয়ে কোথাকার,সাবধান হতে পারলি না।এসমস্ত করার জন্য তোকে এত স্বাধীনতা দিয়েছিলাম।নিজে তো মরলিই আমাদেরও জীবনটাকে জীবন্মৃত করে তুললি।ডাক।ডাক।ওকে একবার ডাক।কিছু একটা করতে হবে।বিয়েটা দিয়ে দেবার ব্যবস্থা করতে হবে।’
‘সে আমাকে নিয়ে যাবে বলেছে।আজ তাকে সমস্ত কিছু খুলে বলেছি।আগামীকাল সে তোদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য আসার কথা আছে।তুই চিন্তা করিস না।আমার ওর ওপরে বিশ্বাস আছে।তুই শুয়ে থাক।’—চম্পা প্রবোধ দিয়ে বলা কথাগুলি অবশ্য বিমলাকে আশ্বস্ত করতে পারল না।
লক্ষ্মী্রাম পাঠকের তিনটি ছেলের মধ্যে গোবিন্দের ওপরের দুটি বিয়েশাদি করেনি।গোবিন্দেরও কলেজের শিক্ষা শেষ হতে বাকি আছে।এরকম স্থলে সত্যি সত্যি তার সঙ্গে চম্পার সংসার সম্ভব হয়ে উঠবে কি?বিমলার মনে উদয় হওয়া প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পায় না।
সেই রাতে তার চোখে ঘুম এলনা।সারারাত জ্বালাপোড়া করতে থাকা বুকটা মালিশ করতে করতেই ভোরের দিকে কাকের কলরব শুনে বিছানা থেকে নেমে এল।কবুতরের কূজন,উঠোনে চড়ুই পাখি এবং শালিকের কিচির মিচির শব্দে সে চাঙের ওপর থেকে নেমে এল।ঘরের কানাচে থাকা ঝাড়ুটা হাতে নিয়ে বারান্দা সংলগ্ন উঠোনটা ঝাড়ু দিতে লাগল।
ভাঁড়ারের চাঙ থেকে লাঙল-জোয়াল নামিয়ে কাঁধে নিয়ে গরু সহ মাঠে যেতে উদ্যত দেখে ক’লাইকে কিছু একটা বলতে গিয়েও বিমলা সঙ্কুচিত হয়ে পড়ল।কথাটা তাকে কীভাবে বলা যেতে পারে।সেই জন্য সময় এবং সুযোগের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।তবে শেষপর্যন্ত বলব বলব ভাবতে ভাবতে যদি হাত থেকে সময় বেরিয়ে যায়।চম্পা গোবিন্দ আসবে বলে বলা কথাটা মাথায় রেখে সে বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করল।
প্রতিদিন গোধূলিতে একপাক মারা গোবিন্দ সেদিন গোধূলি এল না।ছটফট করতে থাকা বিমলা বিছানায় শুতে গিয়েই চম্পার কাছে জবাবদিহি চাইল-‘সে এলনা যে?’চম্পাও আশ্চর্য হয়েছে।উৎকণ্ঠিত হয়েছে।হ্যাঁ,তাইতো ও তো আসার কথা ছিল।কাল একটা খবর নিতে হবে-চিন্তায় তার চোখের ঘুম বিদায় হল।
চম্পা তার কাছে খবরও পাঠিয়েছিল।তাকে কাছে পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল।
সে এলনা। একদিন দুদিন করে চার দিন পার হয়ে গেল। সঙ্গী সাথীদের একে ওকে জিজ্ঞেস করে গোবিন্দ কোথায় গেল তার কোনো খবর পাওয়া গেল না। পুরোনো দিনের শত্রুতার জন্য দুই পরিবারের মধ্যে খুব বেশি আসা যাওয়া ছিল না বলে লক্ষীরাম পাঠকের বাড়িতে গিয়ে খবর করার কোনো উপায় ছিল না। গোপনে খবর নিয়েও গোবিন্দের কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না।
কথাটা জানার পাঁচ দিনের দিন ধৈর্যচ্যুতি ঘটা বিমলা বিছানায় যাবার আগেই উঠোন পরিষ্কার করা ঝাড়ুটা দিয়ে চম্পার পিঠে দুই কোব মেরে ’ তোর জন্যই আজ আমাদের এই অবস্থা ‘ বলে চিৎকার করে উঠতে ক’লাই কথাটা জানতে পারল– বাড়িতে তার অজান্তে কিছু একটা ঘটেছে। গোবিন্দ এবং চম্পার সম্পর্কটা নিয়ে তারও মনে যে সন্দেহ দেখা দেয় নি তা নয়। কিন্তু দুজনের মেলামেশা যে এমন একটি পর্যায়ে পরিণত হবে সেটা সে কল্পনাও করতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত সেটাই ঘটল।কী করা যায়? বিমলাকে যতটা গালিগালাজ করলে তার মন শান্ত হবে ততটা গালিগালাজ করেও সে কিন্তু শান্তি পেল না। তার ঘুম এলনা। এক একবার এমন কথাও মনে হল যেন চম্পাকে বিছানা থেকে ছেঁচড়ে তুলে এনে দু টুকরো করে কেটে ফেলবে। সেরকম একটি কাজ করার জন্য হাত দুটি উদ্যত হলেও সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল ।
হইচই করে প্রতিবেশীকে জানিয়ে রাস্তার কচু নিজের শরীরে ঘষে একটা পরিবেশ সৃষ্টি করতে তার ইচ্ছা হলনা । চম্পার এরকম অবিবেচকী কান্ডের জন্য ওরা মা-বাবা দুজনও প্রকারান্তরে সমানভাবে দায়ী নয় কি? সময় থাকতে সতর্ক করে দিলে এরকম হত না। গোবিন্দকে জামাই হিসেবে পাওয়ার বাসনা তার মনের সঙ্গো্পনে ছিল না বলে সে বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে কি? তবু অন্যের উপর দোষ চাপাতে পারলে আত্ম-অনুশোচনার ভাবটা কমে আসে। তাই মানুষ নিজে অপরাধী বলে জেনেও অন্যের গায়ে অপরাধের বোঝা ঠেলে দেয়, অন্যের উপরে রাগ দেখিয়ে নিজে শান্তি লাভ করে।
ভাতের টেবিলে বসতে গিয়ে অসাবধানতাবশত ঘটিটায় হোঁচট খেয়ে সেও বিমলার ওপরে মনের রাগ প্রকাশ করল। তাই এই ঘটনাটিতেও সে বিমলাকে আশ মিটিয়ে গালিগালাজ করল। তবে গোবিন্দের দিদি বিনু মায়ের অপমৃত্যুর ঘটনাটা মনে পড়ে যাওয়ায় মেয়েকে মারধর করার তার আর সাহস হয়নি।
বিনুমাইর রক্তবমিতে মাখামাখি হয়ে যাওয়া দেহটা মাঠের ঘাস বন থেকে কোলে করে তুলে এনে লক্ষীরাম পাঠকের বারান্দার বেঞ্চ থেকে শুইয়ে দেবার যন্ত্রণা জর্জর অভিজ্ঞতা সে ভুলতে পারেনি।ভুলতে পারেনি তাকে কোলে করে ঘরে নিয়ে আসার সময় হওয়া যন্ত্রণার কথা।কানে এখনও বেজে চলেছে সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলা কথাগুলি-কাকা আমি হয়তো বাঁচব না।ইঁদুর মারার ঔষধের ডিবেটায় থাকা পুরো বিষটাই আমি খেয়েছি।পারলে মহেনকে একটা খবর দেবেন।আমাকে একবার দেখে যাবে।’
তার দুধে আলতা রঙের মুখটা যন্ত্রনায় এতটাই লাল হয়ে উঠেছিল যে সন্ধ্যাচলের সূর্যটার চেয়েও তা বেশি লাল হয়ে উঠেছিল।ঠোঁটের পাশ দিয়ে বয়ে আসা রক্তবর্ণ সেই রঙকে এতটাই উজ্জ্বল করে তুলেছিল যে সেটা যেন কৃ্ষ্ণচূড়া জ্বালিয়ে দেওয়া একটুকরো আকাশ।না,না সেটা মহামায়া থানের বলিশালের নিচটা এবং সে যেন পূজারীর দায়ের এক কোপের আঘাতে মুণ্ড ছেদন হওয়া সাদা ছাগলীটার ছটফট করতে থাকা মুণ্ডহীন দেহ-রক্তে মাখামাখি হওয়া একটা শরীর।
বেঞ্চটাতে শুইয়ে দিতেই ভেতর থেকে দৌড়ে আসা বিনুমাইর মা তাকে দেখে যে চিৎকার করেছিল সমস্ত প্রতিবেশীদের কাঁপিয়ে তোলার জন্য সেটা ছিল যথেষ্ট । উঠোনের উদ্দেশ্যে স্রোত বয়ে চলা লোকদের লক্ষ্মীরামের ছেলেরা ঘিরে ধরেছিল, ভেতরে যেতে বারণ করেছিল। গ্রামের অন্যতম ধনী লোক হিসেবে পরিচিত পাঠকের বাড়িতে সাধারণ লোক সেই বাধা অতিক্রম করে যাবার সাহস করতে পারছিল না।
বারান্দা থেকে বিনুমাইর অচেতন দেহটা নিয়ে ভেতরের মেঝেতে একটা পাটিতে কোনো একজন দাদা শুইয়ে দিয়েছিল।ক’লাইকে কাছে ডেকে নিয়ে লক্ষীরাম পাঠক বাড়িতে গিয়ে রক্ত বমি লেগে থাকা কাপড়চোপড় ধুয়ে নিতে বলেছিল। আগে থেকে পারিবারিক ঝগড়া থাকলেও মাঠের মধ্যে পড়ে থাকা মেয়েটিকে কুড়িয়ে এনে করা উপকারের জন্য বারবার তার প্রশংসা করছিল।
উঠোনে দল বেঁধে থাকা মানুষগুলিকে আশ্বাস দিয়ে পাঠক বলেছিল–’ডাক্তারের কাছে লোক পাঠিয়েছি। এখনই এসে পড়বে। চিন্তার কোনো কারণ নেই। বিনুমাই ঘুমিয়েছে। আপনারা এখন যান। যে যার বাড়িতে চলে যান।’
লোকগুলি চলে গিয়েছিল। অগ্যতা ক’লাইও চলে এসেছিল। অবশ্য সেদিন পাঠকের আচরণ গুলি তার আশ্চর্য বলে মনে হয়েছিল।
গ্রামের পথে পদুলির মোড়ে মোড়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে লোকগুলি দল বেঁধেছিল। পাঠকের বাড়ি থেকে কয়েকটা বাড়ি পরেই নিজেদের বাড়িতে পৌঁছাতে তাকে কয়েক জায়গায় দাঁড়াতে হয়েছিল। পথে অনেকে প্রশ্ন করেছিল–কী হল?ওকে কোথায় পেলি? তুই নাকি ওকে কোলে করে নিয়ে এসেছিস? ও কেন বিষ খেল? কেন ?কেন?
এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর তার কাছেও ছিল না। আন্দাজ করারও সুযোগ পেল না। পাঠক তাকে কৌশলে সরিয়ে দিল বলে মনে হল।সৌরাগুরি টিকার মাঠে চরে বেড়াতে দিয়ে আসা গরুগুলোকে আনতে গিয়ে পাশের ঘাসবন থেকে ভেসে আসা একটা গোঙ্গানির উৎসের খোঁজ করতে গিয়ে সে তাকে এই অবস্থায় পেয়েছিল।
ব্যাপারটা তার সখি মামনি জানত। গ্রামের সামনের দিকে থাকা জলাশয়টাতে স্নান করতে গিয়ে বিনুমা সেদিন সকাল বেলা ব্লাউজটা খুলে পিঠে কালো হয়ে থাকা চ্যালাকাঠের মারের দাগগুলি দেখিয়েছিল। রাতের বেলা পিতা গলা টিপে ধরে তাকে করা অত্যাচারের চিহ্নগুলিও দেখিয়েছিল।
বিনুমাই বলেছিল–’হ্যাঁ ,আমাকে আজই মহেনের সঙ্গে পালিয়ে যেতে হবে, তা না হলে আমাকে গলায় ফাঁস দিয়ে মরতে হবে। আমাদের পরিবারের কেউ ওদের বাড়িতে মেয়ে দিতে রাজি নয়। প্রয়োজন হলে আমাকে মেরে ফেলবে। সম্ভব হলে ওকে খবরটা দিবি। আমার পক্ষে দেখা করা সম্ভব নয়। তার বাড়িতে গিয়ে উঠতেও পারব না। সেই পরিবার ও আমাকে মেরে ফেলবে। দুজনকেই কোথাও চলে যেতে হবে। তার মধ্যে একটা বড়ো ঘটনা ঘটে গেল। এতদিন এখানে ওখানে গুজব শুনছিল যদিও পুরোনো বাগানের বেতের ঝোপে আমাদের দুজনকে পিতা হাতেনাতে ধরে ফেলল। সে পালিয়ে বাঁচল। আমার এই অবস্থা।’
মামণির মুখ থেকে এই বৃত্তান্ত শোনার পরে জনগণের আর বুঝতে বাকি রইল না কীসের থেকে কী হয়েছে। অনেকে প্রার্থনা করল–মেয়েটি যেন বেঁচে যায়। একেবারে দেবীর মতো সুন্দরী দেখতে।
রাত বেড়ে চলল। গ্রামের অনেকেই বালিশে মাথা রাখল যদিও উৎকর্ণ হয়ে রইল বরগুরি হাসপাতালের ডেউরী কম্পাউন্ডারের রাজদূত মোটরসাইকেলটা কখন রাস্তার কাদা ভেদ করে সশব্দে এগিয়ে আসে।
সেরকম শব্দ না শুনেই অনেক মানুষ একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। উৎকর্ণ হয়ে থেকেও কিছুই বুঝতে পারল না। রাত দুপুর হল। তিন প্রহর। চার প্রহর। একসময় ভোর হয়ে এল। কেউ কেউ যখন পাঠকের উঠোনে এসে হাজির হল তখন বিনুমাই ঘরে ছিল না।না ভাঙা চরে একটা মাটির ঢিপির নিচে চিরদিনের জন্য ঘুমিয়েছিল।
কী হল তাঁর?বাঁচল না?দেউরী ডাক্তার এসেছিলেন কি?না কি ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল?না এইসব প্রশ্নের উত্তর পরিবারের বাইরে আর কারোর জানার উপায় ছিল না।
মহেন প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিল।মাটির ঢিপিটার ওপরে সে প্রায় দিন-রাত পড়ে থাকত।অসংলগ্ন কথাবার্তা বলত-ওকে ওরা জেনেশুনে মেরে ফেলল।আমাকে একবারও দেখতে দিল না।মরবে বলে জেনেও ডাক্তার ডেকে আনল না।আমাদের বাড়িতেও আমি যাতে ওর কাছে যেতে না পারি সেইজন্য আমাকে বেঁধে রেখেছিল।পিতাদের পুরুষানুক্রমিক ঝগড়ার জন্য ওকে প্রাণ দিতে হল।বলিদান হল।আমি কাউকে সহজে ছেড়ে দেব না।সবকিছু জ্বালিয়ে দেব।জ্বালিয়ে দেব।সঙ্গী্রা প্রায়ই তাকে সেখান থেকে তুলে এনে বাড়িতে রেখে যেত।
তবে সে কাউকে জ্বালাতে পারেনি।নিজে জ্বলতে জ্বলতে শেষ হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছিল।আর একদিন সত্যি সত্যিই তাকে জ্বালানোর জন্য চিতায় ক’লাইকেও কাঠ দিতে হয়েছিল।
ঘটনাগুলি ক’লাইর মনে ক্ষিপ্র গতিতে আনাগোনা করতে থাকায় কোনফাঁকে নৌকার খুঁটি থেকে হাতটা সরে গেল সে বুঝতেই পারল না।দ্রুতপায়ে এগিয়ে যাওয়া গরুর পেছন পেছন ছেঁচড়ে যাওয়া লাঙলটা কুড়িয়ে নিয়ে সোজা হতে গিয়েই সে দেখতে পেল লাঙলের ফলা দ্বারা তৈরি সিঁথিতে কাঁচা রক্তের স্রোত।তারমানে কোনো একটি গরু লাঙলের ফলায় আহত হয়েছে।
গরুদুটিকে সামলে ধরে জোয়ালটা কাঁধ থেকে নামিয়ে কাছে রাখতেই তার মনে হল সাদা বলদটার ডানপায়ের ক্ষুরের পাশ থেকে দ্রুত গতিতে লাল রক্তের স্রোত বয়ে চলেছে।মাথার গামছাটা খুলে সে খুব যত্নের সঙ্গে গরুর কেটে যাওয়া পা বেঁধে দিল।মুহূর্তের মধ্যে গামছাটা লাল রক্তে বিচিত্রবর্ণ লাভ করে একটা ফুলে পরিণত হল।ঠিক যেন সেদিন দেখা বিনুমাইর রক্তে ভেজা গালটির মতো।না।না।সেটা তো চম্পার মুখ।চম্পা যদি সেরকম করে।সে আর অপেক্ষা করতে পারল না।সঙ্গে নিয়ে যাওয়া জরি দুটো দিয়ে গরু দুটিকে বেঁধে রেখে লাঙল-জোয়াল সেখানেই রেখে মিঠাই কবিরাজের উদ্দেশ্যে দ্রুত হেঁটে চলল।তার ঔষধ দরকার।রক্ত বন্ধ করার ঔষধ।

( চলবে )

সলিল সমাধি - ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া )

সলিল সমাধি

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

This entry is part 5 of 5 in the series সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস

Read More »