নারী ও সমাজ : দেবীচেতনা থেকে বাস্তব জীবন

নারী ও সমাজ : দেবীচেতনা থেকে বাস্তব জীবন

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস

১ : সিন্ধু–সরস্বতী থেকে গঙ্গা

২ : সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার সমকালীন সর্বভারতীয় স্রোতধারা

৩ : বেদের বাণী থেকে পৌরাণিক ভারত

৪ : আরণ্যক থেকে বেদান্ত  : অন্তর্জগতের অভিযাত্রা

৫ : মৌর্য–গুপ্ত যুগ : ভারতীয় সভ্যতার আত্ম-অনুসন্ধান

৬ : গুপ্তোত্তর ভারত

৭ : ভারতে বসন্ত 

৮ : ধর্মরাজনীতি ও সম্রাট অশোক

৯ : সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ : উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মিলন

১০ : সংস্কৃত সাহিত্য : ভারতীয় চিন্তার ভাষা

১১ : ভারতের মন্দির : শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সম্মিলন

১২ : নৃত্য ও সংগীত : রস, তত্ত্ব ও ঐতিহ্য

আয়ুর্বেদ ও বিজ্ঞান : জীব রসায়নের দান

পুরাণ ও কাব্য : কল্পনার সাংস্কৃতিক বুনন

নারী ও সমাজ : দেবীচেতনা থেকে বাস্তব জীবন

ভারতীয় সভ্যতার নীরব অর্ধাংশ

ভারতীয় সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করি – এই সভ্যতা একদিকে নারীকে দেবী বলে পূজা করেছে, অন্যদিকে বহু যুগ ধরে তাঁকেই সমাজের কঠোর নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ রেখেছে।

এই দ্বৈততা কেবল সামাজিক বৈপরীত্য নয়; এটি ভারতীয় সংস্কৃতির গভীরতম মনস্তাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক সত্যগুলির একটি। কারণ ভারতীয় মননে নারী কখনও কেবল ব্যক্তি নন। তিনি একাধারে শক্তি, উর্বরতা, জননী , জ্ঞান, সম্পদ , গৃহের কেন্দ্র আবার কখনও নিয়ন্ত্রণ ও শুচিতার প্রতীক।

ভারতের প্রাচীনতম স্তোত্র থেকে মধ্যযুগের ভক্তিকাব্য, লোকগীতি থেকে আধুনিক নারীবাদী পুনর্ব্যাখ্যা – সবখানেই নারীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক বিস্তৃত সাংস্কৃতিক ভাষ্য।

যখন বৈদিক ঋষিকা গার্গী যাজ্ঞবল্ক্যকে ব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃতি সম্পর্কে প্রশ্ন করছেন, তখন ভারতীয় জ্ঞানতত্ত্বে নারী উপস্থিত এক জিজ্ঞাসু জ্ঞানপিপাসু হিসেবে। আবার যখন সীতা অগ্নিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হন, তখন নারী হয়ে ওঠেন সামাজিক নৈতিকতার পরীক্ষাক্ষেত্র। যখন দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেন, তখন তিনি মহাজাগতিক শক্তির রূপ; আর যখন কোনও গ্রামীণ নারী ব্রতকথা বলছেন, তখন তিনিই সংস্কৃতির স্মৃতি-সংরক্ষক। অতএব, ভারতীয় সমাজে নারীকে বোঝা মানে কেবল সামাজিক অবস্থান বিশ্লেষণ করা নয়; এটি এক বৃহত্তর সাংস্কৃতিক প্রতীকতত্ত্বকে অনুধাবন করা।

এই প্রবন্ধ সেই অনুসন্ধানেরই এক বিস্তৃত প্রচেষ্টা – যেখানে দেবীচেতনা, আর্য সমাজ, গৃহস্থধর্ম, পুরাণ, লোকসংস্কৃতি, ভক্তি আন্দোলন, সমাজসংস্কার ও আধুনিক নারীবাদ – সবকিছুকে এক সমন্বিত সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হবে।

১. বৈদিক সমাজে নারী : ভারতীয় সভ্যতার প্রাচীনতম সাহিত্য ঋগ্বেদে নারীর উপস্থিতি কেবল পারিবারিক ভূমিকায় সীমাবদ্ধ নয়। এখানে নারী- ঋষিকা, স্তোত্ররচয়িতা , তর্কসঙ্গী, যজ্ঞের অংশীদার। গার্গী, মৈত্রেয়ী, ঘোষা, লোপামুদ্রা – এই নামগুলি কেবল প্রতীকী নয়; এগুলি প্রমাণ করে যে বৈদিক সমাজের অন্তত একাংশে নারীর বৌদ্ধিক অংশগ্রহণ স্বীকৃত ছিল।

গার্গী : প্রশ্নের সাহস

বৃহদারণ্যক উপনিষদে গার্গী যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রশ্ন করেন –  “যেনাকাশঃ ওতশ্চ প্রোতশ্চ…”¹ এই প্রশ্ন মহাজগতের মৌলিক বাস্তবতা সম্পর্কে। গার্গীর উপস্থিতি দেখায়- দর্শনচর্চা কেবল পুরুষের ক্ষেত্র ছিল না।

এককথায় বলা যায় , “येनाकाशः ओतश्च प्रोतश्च…” উক্তিটি বৃহদারণ্যক উপনিষদের সেই ঐতিহাসিক পর্বের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে বিদুষী গার্গী বাচকনভি ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যকে গভীর দার্শনিক প্রশ্ন করেন।

রাজা জনকের সভায় গার্গী একের পর এক প্রশ্ন তুলছিলেন সৃষ্টির অন্তর্লীন ভিত্তি সম্পর্কে। তিনি জানতে চাইছিলেন – এই জগৎ কিসের উপর প্রতিষ্ঠিত ? জল কিসের উপর ? বায়ু কিসের উপর ? আকাশ কিসের উপর ? 

তখনই আসে সেই উপনিষদীয় ধারণা- “যার মধ্যে আকাশও ওতপ্রোতভাবে গাঁথা।”

গার্গীর প্রশ্ন আসলে দৃশ্যমান জগতের পেছনের চূড়ান্ত সত্যের অনুসন্ধান। তিনি শুধু পদার্থগত কারণ খুঁজছিলেন না; তিনি জানতে চাইছিলেন অস্তিত্বের অন্তঃস্থ চৈতন্য কী। যাজ্ঞবল্ক্য উত্তর দেন যে সবকিছু শেষ পর্যন্ত “অক্ষর ব্রহ্ম”-এর মধ্যে ওতপ্রোতভাবে অবস্থিত। যেমন বস্ত্রের মধ্যে সুতো অদৃশ্য থেকেও সমগ্র কাপড়কে ধারণ করে, তেমনি ব্রহ্ম সমগ্র বিশ্বজগতের অন্তর্লীন ভিত্তি। এই সংলাপের গুরুত্ব অসাধারণ কারণ- গার্গী এখানে কেবল একজন নারী নন, তিনি জিজ্ঞাসার প্রতীক। তিনি উপনিষদীয় দর্শনে “প্রশ্নের শক্তি”-র প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর প্রশ্নের মধ্যেই মেটাফিজিক্স-এর সূচনা – “What is the ground of Being?”

এই কারণে গার্গীকে ভারতীয় দর্শনের প্রথম দিককার মহান দার্শনিকদের অন্যতম বলা হয়। তাঁর অনুসন্ধান ছিল জগতের বাইরের নয়, জগতের অন্তরের সত্যকে স্পর্শ করার চেষ্টা।

মৈত্রেয়ী : সম্পদ না জ্ঞান ?

মৈত্রেয়ীর বিখ্যাত উক্তি, “যেনাহং নামৃতা স্যাম্ কিং অহং তেন কুর্যাম্”² অর্থাৎ—যা আমাকে অমরত্ব দেবে না, তা দিয়ে আমি কী করব ? এখানে নারী আত্মিক জিজ্ঞাসার অধিকারী। 

ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য সংসার ত্যাগের আগে তাঁর দুই স্ত্রী কাত্যায়নী ও মৈত্রেয়ীর মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে দিতে চাইলে মৈত্রেয়ী এই প্রশ্ন করেন। মূল সংস্কৃতটির অর্থ গভীরভাবে জানতে চায় – “যে সম্পদ আমাকে মৃত্যুকে অতিক্রম করার জ্ঞান দেবে না, আত্মার অমর সত্যে পৌঁছে দেবে না, সেই ধনসম্পদের মূল্যই বা কী?”

এখানে “অমৃত” মানে শুধু শরীরের অমরত্ব নয়; উপনিষদের ভাষায় তা আত্মজ্ঞান, চিরসত্য, ব্রহ্মচেতনার উপলব্ধি। 

মৈত্রেয়ীর এই উক্তির মধ্যে ভারতীয় দর্শনের এক বিরাট মোড় লুকিয়ে আছে। তিনি ধন, গৃহ, ভোগ – এসব প্রত্যাখ্যান করে জানতে চান সেই জ্ঞান, যা মানুষকে সীমিত জীবন থেকে অসীম চেতনার দিকে নিয়ে যায়। এই সংলাপের অন্তর্নিহিত ভাব বোঝায় যে পার্থিব সম্পদ ক্ষণস্থায়ী। জ্ঞানই প্রকৃত মুক্তির পথ। আত্মজ্ঞান ছাড়া বাহ্যিক ঐশ্বর্য অসম্পূর্ণ। এই কারণেই মৈত্রেয়ী শুধু উপনিষদের একটি চরিত্র নন; তিনি জিজ্ঞাসা, বোধ ও আত্মসন্ধানের এক অনন্য প্রতীক। তাঁর প্রশ্ন আজও মানবসভ্যতার অন্যতম গভীর আধ্যাত্মিক প্রশ্ন হিসেবে ধ্বনিত হয়।

আর্য সমাজ ও গৃহস্থধর্ম : নারীর সামাজিক কেন্দ্রিকতা

বৈদিক সমাজে গৃহস্থাশ্রম ছিল সমাজের মূল ভিত্তি। এই গৃহস্থধর্মে নারী ছিলেন কেবল গৃহিণী নন; তিনি ছিলেন ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্র। “সহধর্মিণী” শব্দটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল স্ত্রী নয়; ধর্মীয় কর্মে সহযাত্রী। যজ্ঞে স্ত্রীর উপস্থিতি অপরিহার্য বিবেচিত হত। এই কারণে বহু ঐতিহাসিক মনে করেন – প্রাথমিক আর্য সমাজে নারীর অবস্থান তুলনামূলকভাবে সম্মানজনক ছিল³।

কিন্তু ধীরে ধীরে সমাজ জটিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পত্তি, বংশধারা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন সামনে আসে এবং তখনই নারীর উপর আরোপিত হতে থাকে শুচিতা, আনুগত্য ও গৃহাবদ্ধতার ধারণা। 

মনুস্মৃতি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কাঠামো

ভারতীয় সমাজের পিতৃতান্ত্রিক বিন্যাসের অন্যতম প্রধান পাঠ্য মনুস্মৃতি। এখানে নারীকে সম্মান করার কথা বলা হয়েছে,  “यत्र नार्यस्तु पूज्यन्ते रमन्ते तत्र देवताः”⁴ 

পূর্ণ শ্লোকটি হল : “यत्र नार्यस्तु पूज्यन्ते रमन्ते तत्र देवताः।/ यत्रैतास्तु न पूज्यन्ते सर्वास्तत्राफलाः क्रियाः॥”

অর্থাৎ , “যেখানে নারীদের সম্মান করা হয়, সেখানে দেবতারা আনন্দের সঙ্গে বিরাজ করেন; আর যেখানে তাঁদের সম্মান করা হয় না, সেখানে সমস্ত কর্মই নিষ্ফল হয়ে যায়।”

এখানে “পূজ্যন্তে ” শব্দটির অর্থ কেবল আনুষ্ঠানিক পূজা নয়; বরং মর্যাদা, সম্মান, স্নেহ ও সমঅধিকার।
শ্লোকটি মূলত এই কথাই বলছে যে, কোনো সমাজ বা পরিবারে নারীর মর্যাদা রক্ষিত না হলে সেই সমাজের ধর্ম, সংস্কৃতি বা আচার প্রকৃত অর্থে পূর্ণতা পায় না।

ভারতীয় সংস্কৃতির বহু ধারায় নারীকে শক্তি, জননী, বিদ্যা, সৃষ্টি, করুণা – এইসব মহত্তর প্রতীকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তাই এই শ্লোকটি শুধু সামাজিক নীতিবাক্য নয়; এটি এক সাংস্কৃতিক ও নৈতিক দর্শনও।

তবে আধুনিক পাঠে এই শ্লোককে কেবল আদর্শবাদী প্রশস্তি হিসেবে নয়, বাস্তব সামাজিক আচরণের মানদণ্ড হিসেবেও বিচার করা জরুরি। কারণ ইতিহাসে বহু সময় নারীসম্মানের বাণী উচ্চারিত হলেও বাস্তবে বৈষম্য ও নিপীড়নও পাশাপাশি চলেছে। ফলে এই শ্লোক আজও এক নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে 
সম্মান কি শুধু শব্দে, না সামাজিক কাঠামোতেও?

কিন্তু একই গ্রন্থে নারীর স্বাধীনতা সীমিত করার নির্দেশও রয়েছে। এই দ্বৈততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ নারীকে পূজা করা হচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে তাঁকে নিয়ন্ত্রণও করা হচ্ছে। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এটি “symbolic elevation and social restriction”-এর একটি উদাহরণ।

দেবীচেতনা : শক্তির সাংস্কৃতিক নন্দনতত্ত্ব

ভারতীয় সংস্কৃতির সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলির একটি হল- এখানে ঈশ্বর কেবল পুরুষ নন; ঈশ্বরীও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গা, কালী, চণ্ডী, লক্ষ্মী, সরস্বতী – এই দেবীমূর্তিগুলি ভারতীয় মানসিক জগতে নারীকে এক মহাজাগতিক শক্তির আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

শক্তি : সৃষ্টির মৌলিক শক্তি

শাক্ত দর্শনে “শক্তি” ছাড়া “শিব” নিষ্ক্রিয়। “শিবঃ শক্ত্যা যুক্তো যদি ভবতি শক্তঃ প্রভবিতুং…”⁵ 

এই ধারণা ভারতীয় দার্শনিক ইতিহাসে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে নারী কেবল সহায়ক নন; তিনি সৃষ্টির গতিশীল শক্তি।

এই পংক্তিটি Saundarya Lahari-র প্রথম শ্লোকের অংশ। পূর্ণ শ্লোকটি হল—

“শিবঃ শক্ত্যা যুক্তো যদি ভবতি শক্তঃ প্রভবিতুং
ন চেদেবং দেবো ন খলু কুশলঃ স্পন্দিতুমপি…”

এর অর্থ অত্যন্ত গভীর ও তান্ত্রিক দর্শনসমৃদ্ধ। তন্ত্রমতে , “শক্তির সঙ্গে যুক্ত হলেই শিব সৃষ্টিশীল ও কার্যক্ষম হন; শক্তি ব্যতীত তিনি স্পন্দিত হতেও সক্ষম নন।”

এখানে “শিব” শুধুমাত্র দেবতা নন; তিনি চৈতন্য, নিরাকার পুরুষতত্ত্ব, নিস্তরঙ্গ মহাশূন্যের প্রতীক।
আর “শক্তি” হল সৃজন, গতি, প্রকৃতি, প্রাণশক্তি, মহামায়া।

অর্থাৎ , শক্তি ছাড়া চৈতন্য নিষ্ক্রিয়, আর চৈতন্য ছাড়া শক্তি দিশাহীন। এই দর্শনে সৃষ্টি কোনো একক শক্তির কাজ নয়; পুরুষ ও প্রকৃতি, চেতনা ও শক্তি – এই দুইয়ের মিলনেই বিশ্বজগতের উদ্ভব।

তাই তন্ত্রে শিব-শক্তিকে অবিচ্ছেদ্য ধরা হয়। অর্ধনারীশ্বর মূর্তিও সেই ঐক্যের প্রতীক – যেখানে নারী ও পুরুষ, স্থিতি ও গতি, ধ্যান ও সৃজন একই সত্তার দুই দিক। এই শ্লোক শুধু ধর্মীয় স্তোত্র নয়; এটি ভারতীয় দর্শনের এক গভীর metaphysical উপলব্ধি – সৃষ্টি মানেই দ্বৈত শক্তির সৃজনাত্মক সমন্বয়।

মাতৃকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ও লোকদেবী

নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায় ভারতের বহু অঞ্চলে স্থানীয় মাতৃদেবী উপাসনা বৈদিক দেবতাদের থেকেও প্রাচীন। গ্রামীণ সমাজে মনসা, শীতলা, মারিয়াম্মান, কামাখ্যা – এই দেবীরা উর্বরতা, রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রকৃতির শক্তির সঙ্গে যুক্ত। এই লোকদেবী উপাসনার মধ্যে কৃষিভিত্তিক সমাজের অভিজ্ঞতা ও ভয় প্রতিফলিত হয়।

রামায়ণ ও মহাভারতে নারীর দুই বিপরীত রূপ

সীতা : সহিষ্ণুতার নৈতিক প্রতিমা 

রামায়ণের সীতা ভারতীয় সমাজে আদর্শ নারীর প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাঁর ধৈর্য, আনুগত্য ও ত্যাগ – শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীত্বের মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু আধুনিক পাঠে প্রশ্ন ওঠে -এই আদর্শ কি নারীর স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করেছে ?

দ্রৌপদী : প্রতিবাদ ও ন্যায়ের দাবিদার 

অন্যদিকে মহাভারতের দ্রৌপদী এক প্রতিবাদী চরিত্র। সভায় অপমানিত হওয়ার পর তাঁর প্রশ্ন -সমগ্র মহাকাব্যের নৈতিক ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দেয়। তিনি নীরব নন; তিনি প্রশ্ন করেন।

ভক্তি আন্দোলন : নারীর আত্মিক স্বাধীনতা

এরপর মধ্যযুগে ভক্তি আন্দোলন নারীর জন্য নতুন আধ্যাত্মিক পরিসর তৈরি করে। মীরাবাঈ কৃষ্ণপ্রেমকে সামাজিক নিয়মের ঊর্ধ্বে স্থান দেন। তামিল সাধিকা অন্ডাল ঈশ্বরকে প্রেমিকরূপে কল্পনা করেন। 

লালেস্বরী সমাজের গণ্ডি ভেঙে আত্মিক মুক্তির কথা বলেন। এই আন্দোলনে নারীর কণ্ঠ প্রথমবার এত স্পষ্টভাবে ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে।

বাংলার লোকসংস্কৃতিতে নারী

বাংলার ব্রতকথা, মঙ্গলকাব্য, বিবাহগীতি – এসবের কেন্দ্রে নারী। নারীরাই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই মৌখিক ঐতিহ্য বহন করেছেন। লোকসংস্কৃতিতে নারী কেবল অংশগ্রহণকারী নন; তিনি স্মৃতির ধারক।

ঔপনিবেশিক যুগ ও নারীপ্রশ্ন

ঊনবিংশ শতকে নারীশিক্ষা, বিধবাবিবাহ, সতীদাহ নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। রাজা র্যাম মোহন রায় সতীদাহের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ প্রচলনের জন্য সংগ্রাম করেন। এই সময় থেকেই নারী একটি আধুনিক রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হন।

আধুনিক ভারত : দেবীচেতনা থেকে অধিকারচেতনা

আজকের ভারতীয় সমাজে নারীচেতনা নতুন রূপ পাচ্ছে। নারী এখন – শিক্ষিত, কর্মক্ষেত্রে সক্রিয়, রাজনৈতিকভাবে সচেতন তবুও সমাজে সহিংসতা, বৈষম্য ও পিতৃতন্ত্র এখনও বিদ্যমান। এই কারণেই দেবীচেতনা ও বাস্তব জীবনের ব্যবধান আজও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

দেবী থেকে মানুষ, মানুষ থেকে শক্তি

ভারতীয় সভ্যতায় নারীকে কখনও কেবল মানুষ হিসেবে দেখা হয়নি। তাঁকে কখনও দেবী, কখনও জননী, কখনও শক্তি, কখনও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে। এই নির্মাণ একদিকে তাঁকে সাংস্কৃতিক মহিমা দিয়েছে, অন্যদিকে বাস্তব জীবনে বহু সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ করেছে।

তবুও ইতিহাসের প্রতিটি যুগে নারী নিজস্ব ভাষা খুঁজে নিয়েছেন- কখনও ঋষিকা হিসেবে, কখনও দেবী হিসেবে, কখনও কবি হিসেবে, কখনও প্রতিবাদী মানুষ হিসেবে। ভারতীয় সংস্কৃতির গভীরে তাই এক সত্য আজও ধ্বনিত হয় – নারী কেবল সমাজের অংশ নন; তিনি সমাজের আত্মা।

ফুটনোট : 1. Brihadaranyaka Upanishad, 3.8 , 2. Brihadaranyaka Upanishad, 2.4 , 3. Altekar, A. S. The Position of Women in Hindu Civilization , 4. Manusmriti, 3.56 , 5. Saundaryalahari, Verse 1

তথ্যসূত্র : ১.ঋকবেদ , ২. বৃহদারণ্যক উপনিষদ , ৩. রামায়ণ , ৪.মহাভারত , ৫.মনুস্মৃতি , ৬. দেবী মাহাত্ম্য ৬. Altekar, A. S. The Position of Women in Hindu Civilization , ৭. Chakravarti, Uma. Gendering Caste , ৮. Kinsley, David. Hindu Goddesses ; ৯. Thapar, Romila. Cultural Pasts

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস

পুরাণ ও কাব্য : কল্পনার সাংস্কৃতিক বুনন

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

নারী ও সমাজ : দেবীচেতনা থেকে বাস্তব জীবন

This entry is part 15 of 15 in the series ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ১ : সিন্ধু–সরস্বতী

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

নারী ও সমাজ : দেবীচেতনা থেকে বাস্তব জীবন

This entry is part 15 of 15 in the series ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ১ : সিন্ধু–সরস্বতী

Read More »