অনুবাদকের কথা

অনুবাদকের কথা

অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা - তৃষ্ণা বসাক

১ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

২ : অনুবাদের অপযশ

৩ : অনুবাদ- ও  সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা

৪ : শাসকের ভাষা, শাসিতের ভাষা এবং অনুবাদকের অবস্থান

৫ : অনুবাদকের সংকট

৬ : সংস্কৃতির অনুবাদ

 ৭ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

৮ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

অনুবাদের স্বর্ণযুগ : মধ্যযুগ  

অনুবাদকের কথা

বিখ্যাত নেপালি অনুবাদক শমীক চক্রবর্তীর মুখোমুখি

অনুবাদের বাদ, বিবাদ ও সংবেদনা

তৃষ্ণা বসাক-  প্রথমেই জানতে চাইব আপনার শৈশব, পরিবার, স্কুল, গ্রাম, আর আপনার অনুবাদক হবার পেছনে কে বা কোন কোন ঘটনার প্রেরণা রয়েছে

শমীক চক্রবর্তী-   আমার বেড়ে ওঠা বেলঘরিয়ায়। পিনকোডে দু ডিজিটের কলিকাতা থাকলেও আমাদের ছোটবেলায় বেলঘরিয়া যেন মফস্‌সলই ছিল। শহরতলী পেরিয়ে মফস্‌সল যেমন হয়, তেমন– মাঠ-পুকুর-বিল-ঝোপজঙ্গল-ইট-টালির ঘরবাড়ি, পূব বাংলা থেকে আগতদের মধ্যবিত্ত পাড়া আর রিফিউজি কলোনি– আমার বেড়ে ওঠা আজও এই ‘পাঁজরায় পুষে রাখা চোরা মফস্‌সলে’। সেই সময় কলকাতা দূরে লাগত। ‘কলকাতা যেতে হবে’ যেদিন বলতো বড়রা, কী তোড়জোড় শুরু হত বাড়িতে! আর আমরা ছোটরা স্কুল-পাড়া-কোচিংক্লাসের অনুমোদিত ত্রিসীমানাটাকে ভেঙেচুরে পেরিয়ে টইটই সাইকেলে বাড়িকে লুকিয়ে সিসিআর ব্রিজ-যতীনদাস কলোনি-এড়েদার ঘাট অব্দি ঘুরে বেড়াতাম, ঢুকে যেতাম গাঙ্গুলিদের দালানে-বাগানে, টপকে যেতাম দেওয়ানপাড়া মাঠের পোড়োবাড়ির ভাঙা পাঁচিল… তারপর… তারপর একদিন লেভেল ক্রসিঙের গেট উঠে গেল, উড়ালপুল উড়ল রেললাইনের ওপর দিয়ে, ভৈরব গাঙ্গুলি কলেজের মাঠের পাশের দেওয়ালে ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’ লেখা স্লোগানের চুনের পোঁচটা মুছে গেল, আর ফিডার রোড দিয়ে হু হু করে ঢুকে পড়তে শুরু করল শহর কলকাতা। ধসে পড়ল আমাদের মফস্‌সল। …

                    ৪৬ সালে পূব বাংলার কুমিল্লার গ্রাম থেকে কর্মসূত্রে পাটনা এসে, পরে কলকাতার এই উপান্তে থিতু হয়েছিলেন আমার ঠাকুরদা। ঠাকুমার সাকিন ছিল আগরতলা। যশোরের কালিয়া থেকে টাটানগরে এসেছিলেন দাদু। মা সেখান এসেছে বিয়ে হয়ে। এই সব মিলিয়ে দেশভাগের বেদনা-মাখা পরিবেশে বড় হওয়া আমাদের। ট্রেনে দু’ স্টেশনের ডেলিপ্যাসেঞ্জারি করে রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন থেকে মাধ্যমিক, তারপর উচ্চ মাধ্যমিকে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের হোস্টেল জীবন পেরিয়ে, দেশে যখন মুক্ত অর্থনীতি ঢুকল, তখন আমিও ঢুকলাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। খানিক মুক্তচিন্তার দুনিয়ার। যাদবপুরে কারিগরি পড়তে গিয়ে সাথে রাজনৈতিক কাজকর্মে জুটে, সমাজ-কারিগরির কাজে যুক্ত হয়ে ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে অন্য কলকাতা, তারপর নানা শ্রমিক মহল্লা-জেলাশহর-গ্রাম হয়ে দক্ষিণবঙ্গের হুগলী-ইছামতী-অজয়-ময়ূরাক্ষীর অববাহিকা ছেড়ে কালান্তরে হুগলী-ইছামতী-অজয়-ময়ূরাক্ষীর অববাহিকা ছেড়ে মেচি-রঙ্গিত-তিস্তা-লিস-তোর্সা-সঙ্কোশের জনপদগুলো ক্রমশ হয়ে উঠল আমার সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্র। ছুটিতে কু-ঝিক-ঝিক কুয়াশাঘেরা দার্জিলিঙের বিস্ময়, সবুজ বন হলুদ পাখির ডুয়ার্স, চা বাগানের পটভূমিতে ফিল্মি কাঞ্ছি রে গান, আর ইতিউতি দেখা ‘বাহাদুর’ দারোয়ান– এটুকুই ছিল নেপালি ভাষা-সংস্কৃতির সাথে আমার যোগাযোগ। কিন্তু এবার পাহাড়-ডুয়ার্সের চা আর সিঙ্কোনা বাগান-গ্রাম-শহর-বাজার-বনবস্তি ঘোরাঘুরির সুবাদে ঠোক্কর খেতে খেতে শিখে গেলাম নেপালি ভাষা। কোনো সমাজের ভাষা না জেনে সেই সমাজে কাজ করা যায় কীভাবে? চিনতে-জানতে-বুঝতে শুরু করলাম ভারতীয় নেপালি জাতিসত্তাকে। আর তার মধ্যেই ‘বাঙাল’ আমি খুঁজে পেলাম এক আশ্চর্য সাদৃশ্য। অনুভব করছিলাম, বাঙালি সমাজ যেমন সীমানা দিয়ে ভাগ হওয়া, নেপালি সমাজও তাই। ভাষা একভাবে একাত্মতার সেতু বেঁধে রাখলেও দু’ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ আর তেমন ছাপ ফেলে না। কিন্তু ভাষা-সংস্কৃতি, শিকড়ের সুত্রে বাঙালদের মতোই দার্জিলিঙ তথা সারা ভারতের নেপালি সমাজে রয়েছে বিচ্ছেদ-যন্ত্রণার এক জটিল ছাপ।

                    আমা(দে)র কাজকর্মের ব্যস্ততার ফাঁকে, নেহাতই শখে বা কর্তব্যবোধে, কিছু নেপালি কবিতা-গল্প অনুবাদ করতে শুরু করলাম। সেই সূত্রেই জন্ম নেয় উপন্যাস অনুবাদের তাগিদ, এবং সাহস। পড়শির ভাষা এবং জনজীবনকে সহজে বুঝতে পারতে থাকার সুবাদে সরাসরি নেপালি থেকে বাংলা, বা তার বিপরীত অনুবাদের কিছু কাজ করতে থাকি, মাঝখানে কোনো তৃতীয় ভাষার হস্তক্ষেপ ছাড়াই। এটা এক ধরনের স্বস্তি দেয়, সহজ-স্বাভাবিক ভাবে করতে থাকি অনুবাদ, পড়শীর ভাষা একাকার হয়ে যায় আমার ভাষার সাথে। 

তৃষ্ণা বসাক-আমার পরের প্রশ্ন এই যে পরিবার ছাড়া কে বা কারা আপনাকে অনুবাদ করতে সবচেয়ে উৎসাহ দিয়েছেন?  নেপালি সাহিত্য আমাদের দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ সাহিত্য, সে ভাষায় অনেক মহান লেখক আছেনআপনার সবচেয়ে প্রিয় সাহিত্যিক কে এবং কেন তিনি প্রিয়? এখনো পর্যন্ত কাদের কাদের লেখা অনুবাদ করেছেন?

শমীক চক্রবর্তী-আমার এইসব কাজকর্মের জন্য আমি পরিবারের সাথে কমই থাকি। পরিবার কলকাতায়, আর আমি শিলিগুড়ি বা পাহাড়ে কিংবা ডুয়ার্সে থাকি বেশি। তাই এই অনুবাদের কাজে পরিবার আলাদা করে উৎসাহ দিয়েছে এমনটা নয়, সহ্য এবং সাহায্য অবশ্যই করেছে। উৎসাহ প্রথমত দিয়েছেন আমার নেপালিভাষী বন্ধুরা, যাঁরা চেয়েছেন যে তাঁদের সাহিত্য পৌঁছে যাক বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে। আর কিছু বাংলাভাষী বন্ধুরাও আছেন, যাঁরা দার্জিলিং, ডুয়ার্স বা নেপালকে বেড়ানোর জায়গার বাইরে দেখতে চেয়েছেন মানুষের চোখ দিয়ে, জনসাহিত্যের চোখ দিয়ে। তার মধ্যে রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক কর্মীরা যেমন আছেন, তেমনই আছেন পায়ের তলায় সর্ষে যাঁদের, তাঁরাও।

                    নেপালি সাহিত্য যে সমৃদ্ধ, এবং ভাষাটাও যে রিচ– এই ধারণাটা আমার এসব কাজ করতে শুরু করার আগে একদমই ছিল না। এই অঞ্চলে আমা(দে)র কাজকর্ম (নেপালি পত্রিকা/ গান-নাটকের দল/ তথ্যচিত্র নির্মাণ)– এসব তখন সবে শুরু হয়েছে, একগুচ্ছ কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-সাংস্কৃতিক কর্মী বন্ধু হয়ে উঠেছে। তখনই একটা অদ্ভুত প্রোগ্রামের খবর পেলাম একদিন। কালিম্পংয়ে নাকি ‘সড়কমা কবিতা’ নামে প্রোগ্রাম হবে। রাস্তায় কবিতা পড়বে তরুণ প্রতিবাদী কবিরা। তারপর এভাবেই ক্রমশ প্রায় প্রত্যেক সপ্তাহান্তেই কোনো না কোনো ‘পুস্তক বিমোচন’, ‘গোষ্ঠী (আলোচনা সভা) -র খবর পেতে লাগলাম। বইপত্রের চর্চা, পত্রপত্রিকার চলন, নাটক-কবিতা– এসবের চর্চা জোরালোভাবেই ছিল গোটা সমাজটাতে। আগের চেয়ে কমে গেলেও এখনো ভালো মাত্রাতেই আছে, যা আমার কলকাত্তাইয়া চোখে সেভাবে আগে নজরে আসেনি। অন্য নানা কাজের সাথে এবার ক্রমশ ডুবতে লাগলাম নেপালি সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনেও।     

                    এদেশের নেপালি সাহিত্য বলতে মূলত দার্জিলিং বা ডুয়ার্স-তরাইয়ের কথা মাথায় এলেও, সিকিম বা আসামে ভালো মাত্রায়, এবং উত্তরাখণ্ড বা মণিপুর, মায় কলকাতা-দিল্লি-ব্যাঙ্গালোরেও জন্ম নিচ্ছে নেপালি সাহিত্য। আর বাংলার মতোই নেপালি সাহিত্যও যে অপার। তাই শুধু এদেশের নয়, নেপালের কথা ধরতেই হবে– এবং নেপালি সাহিত্য ভাণ্ডার কত সমৃদ্ধ, তার পরিচয়ও পাওয়া যাবে।

                    নেপালি সাহিত্য আমি প্রচুর পড়িনি। মানে ছোটবেলা থেকে পড়লে যেমন হয়, তেমনটা পড়িনি বলে সেভাবে প্রিয় সাহিত্যিক বেছে নেওয়া খুব কঠিন। এপারের দার্জিলিং-কালিম্পঙের কথা বলতে গেলে ইন্দ্রবাহাদুর রাইয়ের প্রথমদিকের লেখার বিষয়বস্তু বা জনজীবনকে ফুটিয়ে তোলার অভিনব শৈলী আমার খুব পছন্দের। পাশাপাশি পারিজাত (বিষ্ণুকুমারী ওয়াইবা)-ও বর্ণময়, মুগ্ধ হয়েছি তাঁর নানা লেখা পড়ে। এছাড়াও অসিত রাই, মৎস্যেন্দ্র প্রধান, অচ্ছে রাই রসিক, বদ্রীনারায়ণ প্রধান, ইন্দ্র সুন্দাস, রাজনারায়ণ প্রধান, লৈনসিংহ ওয়াংদেল, আসামের লীলবাহাদুর ছেত্রী, সিকিমের সানু লামা-র নাম নিতে হয়। সাম্প্রতিক অতীত বা সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে অনেকেই পছন্দের। তার মধ্যে ছুদেন কাবিমো, লেখনাথ ছেত্রীর নাম আলাদা করেই নিতে হয়। নেপালের নেপালি সাহিত্য তত বেশি পড়িনি। বিপি কোইরালা, কৃষ্ণ ধরাবাসী, ডায়মন্ড শামসের রাণাদের থেকে আজকের বুদ্ধিসাগর, নয়নরাজ পাণ্ডে, যুগ পাঠকরা পাঠকসমাজকে উপহার দিয়েছেন অসাধারণ সব সৃষ্টি।

                    এত কিছুর মধ্যে অনুবাদ অবশ্য অল্পই করেছি। নেপালি থেকে বাংলা অনুবাদের কাজে আমার হাতেখড়ি ২০১৪ সালে, সমসাময়িক নেপালি কবিদের কবিতার বাংলা অনুবাদ সংকলন ‘আজকের উত্তর’ দিয়ে। পত্রপত্রিকায় লেখালেখির পাশাপাশি তারপর বিক্ষিপ্তভাবে নানা কবিতা অনুবাদ করছিলাম। এনআরসি নিয়ে হইচই শুরু হলে পাহাড়ি চা বাগানের আদি বাসিন্দাদের সঙ্কট নিয়ে অনবদ্য ছোটগল্প লিখেছিলেন সহযোদ্ধা ছেওয়াং ইয়ঞ্জন, ‘আড়াই-সেরি বাটখারা’ নামে তা অনুবাদ করি, প্রকাশিত হয় অনীক পত্রিকায়। ছোটগল্প অনুবাদের সেই শুরু। পরে ফেসবুকের দেওয়ালে অনুবাদ করেছিলাম শামসের আলির বাঘবীর মামা, ইন্দ্রবাহাদুর রাইয়ের ‘জয়মায়া একাই কেবল …’ । ‘ভারতীয় সাহিত্যে নারী স্বর’ সংকলনের জন্য নারী চরিত্র ও বিষয়-প্রাধান্যের দুটি ছোটগল্প– গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন নিয়ে লেখা আফটারশক (সন্ধ্যা আচার্য), এবং চা বাগানের জীবন নিয়ে লেখা স্বপ্নার স্বপ্ন (কোমল কেরুঙ সুব্বা) অনুবাদ করি। আমার নেপালি থেকে বাংলায় উপন্যাস অনুবাদের শুরু ২০১৯ সালে, বাংলায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয় ছুদেন কাবিমোর উপন্যাস ফাৎসুঙ।  তারপর ইন্দ্রবাহাদুর রাইয়ের আজ রমিতা ছ, এবং নেপালের যুগ পাঠকের উর্গেনের ঘোড়া এবং তারও পরে নয়নরাজ পাণ্ডের উলার। এবং সম্প্রতি ছুদেন কাবিমোর নবতম উপন্যাস — উরমাল।

তৃষ্ণা বসাক-এই যে এত অনুবাদ করেছেন, এর পেছনে কি কোন বিশেষ পরিকল্পনা কাজ করেছে? মানে বলতে চাইছি, কেউ ঠিক করতে পারেন আমি শুধু নারীদের সাহিত্য অনুবাদ করব, বা দলিত সাহিত্য অনুবাদ করব, কারণ শুনতে পাই এর জন্য প্রকাশক পাওয়া একটু সহজতো আপনি কি বাজারে চলবে এমন কোন বিষয় বা লেখক অনুবাদের জন্যে এযাবত বেছেছেন? নাকি সেসব না ভেবে আপনার বিচারে যাঁরা মহান লেখক, তাঁদের লেখাই নির্বাচন করেছেন, যাঁদের অনুবাদ বাঙালি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত মনে হয়েছে? মোট কথা জানতে চাইছি, আপনার লেখক নির্বাচনের মাপকাঠি কী?

শমীক চক্রবর্তী-না, ওভাবে কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ভালো জনসাহিত্য অনুবাদ করব, বা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, কিংবা নিপীড়িত-নিষ্পেষিত জনতার কথা ফুটে ওঠে এমন সাহিত্যসৃষ্টি অনুবাদ করব — এসব তাগিদ কাজ করেছে। টার্গেট ভাষার পাঠককে ভালো কিছু পড়াতে হবে, এই নিয়ে নিজের ভিতরের তাগিদটাই আসল পরিকল্পনাকারী। কিছু ক্ষেত্রে অনুরোধ শুনে কিছু অনুবাদ করে দিয়েছি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবশ্য পারিনি– সময়ের অভাবে, বা ইচ্ছে হয়নি বলেও। প্রকাশক পাওয়া সহজ হবে কি হবে না ভেবে অনুবাদের কাজে কখনোই এগোইনি। অমন হিসেব করে অনুবাদের কাজ করার লোকই নই আমি।

                    আসলে, ‘আজকের উত্তর’ কবিতা সংকলনটি অনুবাদের পর থেকেই মাথায় ঘুরঘুর করছিল গল্প-উপন্যাস অনুবাদের কথা। জনজীবনের প্রশস্ত প্রেক্ষাপটকে উপন্যাসই বেশী ভালোভাবে হাজির করতে পারে। কিন্তু মুশকিল হল, নেপালি সাহিত্য-সাগরে ডুব দিয়ে উপন্যাস বাছাই করা এক দুঃসাধ্য ব্যাপার, তত পড়া নেই আমার। অগত্যা বন্ধুদের শরণ নিলাম। কোনটা দিয়ে অনুবাদ শুরু করব জিগ্যেস করায় সিংহভাগ বন্ধুই ইন্দ্রবাহাদুর রাইয়ের আজ রমিতা ছ-র কথা বলল। ১৯৫৮ সালে লেখা মাস্টারপিস উপন্যাস। নেপালি বইটা জোগাড় করলাম এক বন্ধুর বইয়ের তাক থেকে। আহা! তাক লাগানো শৈলী– ভাষা-আঙ্গিক আর আলো-আঁধারি বুনে লেখা অনবদ্য উপন্যাস। কিন্তু শুরুতে পড়তে গিয়ে ঠোক্কর খাচ্ছিলাম। সেটা ২০১৮ সাল নাগাদ হবে। নেপালি পড়া, বা টাইপ করে লেখায় তখন আমি দিব্যি সড়গড়। বলার গতিও প্রায় সাবলীল হয়ে এসেছে। তবু হোঁচট খাচ্ছিলাম লেখনশৈলীর চড়াইউৎরাইয়ে, কাহিনীর আলোআঁধারিতে। হিল কার্ট রোডের সর্পিল পাকদণ্ডী বেয়ে জীপ আর টয়ট্রেনের লুকোচুরির প্রথম অনুচ্ছেদের অনবদ্য বর্ণনা অনুবাদ করতেই বোধহয় আমার কয়েক সপ্তাহ লেগেছিল।

                    ইতিমধ্যে ২০১৯ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত হয় নেপালি উপন্যাস ফাৎসুঙ। তখন পায়ে ইনফেকশনজনিত অসুস্থতার জন্য হাঁটাচলায় নিষেধাজ্ঞার দৌলতে মূল নেপালি উপন্যাসের মতই গড়গড়িয়ে বাংলায় অনুবাদ করে ফেললাম। মূল লেখক ছুদেন কাবিমো, লেপচা জনজাতির মানুষ, এবং অনুজপ্রতিম বন্ধু। ছুদেনের জন্ম কালিম্পং পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রাম মলবুঙে। ‘যুব সাহিত্য একাডেমি’ পুরস্কার পেয়েছেন আগেই। ফাৎসুঙ্-এর অর্থ লেপচা ভাষায় ‘মাটির কথা’। বইটা প্রকাশের সাথে-সাথেই নেপাল এবং ভারতের নেপালিভাষী পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক শোরগোল পড়ে যায়। একদিকে আড়ম্বরহীন কথ্য ভাষা তথা পাহাড়ের গ্রামীণ জীবন, আর অন্যদিকে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের কোরাসের ভেতর থেকে রঙবেরঙের স্বরগুলোকে সযত্নে স্পষ্ট করে তোলার জন্য খুব চর্চিত হতে থাকে ফাৎসুঙ্। আন্দোলনের প্রতি একদিকে মানুষের আবেগ, আর অন্যদিকে আবেগসর্বস্বতা; নেতাদের দৃঢ়তা এবং যুগপৎ হঠকারিতা; রাজ্যের ভেতরে সংখ্যাল্প গোর্খা জাতিসত্তার ভিতরে মিশে থাকা আরোই সংখ্যালঘু লেপচা জনজাতির চাপা অভিমান-— এ সবই ধরা পড়েছে কালিম্পং পাহাড়ের পটভূমিকায় লেখা এই উপন্যাসে। আটের দশকের মধ্যভাগে জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সংগ্রামে মানুষের ঝাঁপিয়ে পড়া, তথাকথিত ‘বামপন্থী’ শাসকদের দমনপীড়ন, অমন দূরবর্তী অঞ্চলে অতি-দক্ষিণপন্থীদের সক্রিয়তা, লড়াইয়ের শক্তির মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব– মোটের ওপর, আন্দোলনের প্রতি একদিকে সায়, এবং অন্যদিকে প্রশ্নচিহ্নের জেরে বিতর্কিত হয়ে ওঠে ‘ফাৎসুঙ্’। ইংরেজি, হিন্দিতে, এবং পরে সিন্ধিতেও অনূদিত হয়েছে ‘ফাৎসুঙ্’।

                    আজ রমিতা ছ-র অনুবাদ চলছিল শম্বুক গতিতে, উপন্যাসের বুনোট এবং উপস্থাপন শৈলীকে বাংলা অনুবাদেও প্রাঞ্জল রাখতে চাওয়ায় দ্রুত এগোতে পারছিলাম না আমি। অবশেষে, কোমর বাঁধলাম লকডাউনের সুযোগে। ধীরগতি কখন যে সাবলীল হয়ে এল, টেরই পাইনি, অথচ ভিজতে শুরু করেছি যেন, আই বি রাইয়ের আঁকা ক্যানভাসের অনাবিল পাহাড়ি কুয়াশায়। পাহাড়ের জীবন-সংগ্রাম-মন-মনস্তত্ত্বকে আরও গোড়া থেকে বোঝার এবং বোঝানোর চেষ্টা এই আজ রমিতা ছ। আজ যে জাতিসত্তা জোরালো আওয়াজ নিয়ে হাজির, আজ যে সমস্যাক্লিষ্ট চা বাগান প্রকট হয়েছে তার সমস্যা নিয়ে, আজ যে সুখদুঃখআনন্দবেদনার দার্জিলিঙ হাতছানি দেয়, সেসবেরই গোঁড়ার কথা যেন বিধৃত আছে এই উপন্যাসে। উপন্যাসের পটভূমি ’৪৭-এর আগে-পরের দার্জিলিঙ, যেখানে ছড়িয়ে রয়েছে ১৮১৫-র সুগৌলী সন্ধি থেকে শুরু করে দলবাহাদুর গিরির নেতৃত্বে পাহাড়ে কংগ্রেসি স্বেচ্ছাসেবকদের কাজকর্ম, চা বাগানে ভিটেমাটি উজাড় করা হট্টাবাহার প্রথা, ’৪৭-এর স্বাধীনতা এবং ওদিকে নেপালের রাণাশাহীর শাসন বা তার থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং ’৫১ সালে রাণা-শাসনের অবসান– ইত্যাদি। কেন্দ্রবিন্দুতে অবশ্য থেকে গেছে ভারতীয় নেপালি সমাজের আর্থসামাজিক দোলাচল-অসন্তুষ্টি-নিরাপত্তার অভাববোধ। চরাই-উৎরাইয়ের মধ্যে দিয়ে এই উপন্যাসের কাহিনী এগোয়, বাস্তবের ঘটনাক্রম এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের অনন্য ছন্দে। ১৯৫৮ সালে লেখা বলে মনেই হয় না, এত আধুনিক সেই লেখার ধরন। পড়লে বোঝা যায় কেন ক্লাসিক বলা হয় এই উপন্যাসকে। লেখক ইন্দ্র বহাদুর রাই (ইবরা) শিক্ষকতার পাশাপাশি সাহিত্য ও রাজনীতির নানা কর্মকাণ্ডের জন্য সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। দার্জিলিঙ পুরসভার ডেপুটি চেয়ারপার্সন থেকেছেন। নেপালি ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদায়ী ভূমিকা নিয়েছেন– রাজ্য এবং দেশে নেপালি ভাষা স্বীকৃতির জন্য লড়াই করেছেন, অন্যদের সাথে মিলে। এদিকে ’৭০ দশকের শেষে এঁদেরই উদ্যোগে দার্জিলিঙে গড়ে ওঠে ‘প্রান্ত পরিষদ’, যার হাত ধরে দানা বাঁধতে থাকে গোর্খা জাতিসত্তার অস্মিতা।

                    দার্জিলিঙের দু-দুখানা উপন্যাস অনুবাদের পর, আমার মনে যা উঁকি দিচ্ছিল, কিছু বন্ধুরাও সে কথা বলতে শুরু করল। ভাষাটা যখন রপ্ত হয়েইছে, তখন নেপালের উপন্যাসের দিকে হাত বাড়ানো যেতেই পারে। অতঃপর লকডাউনের অবসরে নেপালের সাহিত্যভাণ্ডারে খানাতল্লাশি শুরু করলাম, নেপালের ক্রান্তিকাল নিয়ে লেখা কোনো ভালো উপন্যাসের খোঁজে। বিস্তর হাতড়ানোর পর বেছে নিলাম উর্গেনের ঘোড়া। খোলাবাজার নীতির ঢক্কানিনাদ ও এন্ড-অফ-হিস্ট্রি-র ভ্রমে ভরা নব্বই দশক পার হতে না হতেই উত্তুরে হিমালয়ের নেপাল থেকে ভেসে এসেছিল এক অনাবিল দখিনাবাতাস। বিপ্লবকামী তৃষ্ণার্ত বিশ্ববাসীর হাতে এক গেলাস ঠাণ্ডা জল তুলে দেওয়ার বরাভয় সহ নতুন শতকের শুরুতে মাথা তুলেছিল সগরমাথার দেশ। দশক-দীর্ঘ জনযুদ্ধ পরিণত হয়েছিল জনসংগ্রামের প্লাবনে। দিনবদলের আশ্বাস ভরা স্যন্দীধারায় সিক্ত হচ্ছিলাম আমরা। লাল টুকটুকে দিন জিতে আনার সাহসী স্বপ্ন ভেসে বেড়াচ্ছিল পড়শি দেশের পাহাড়ে, পাদদেশে। দেশটার কোণায় কোণায়, পাহাড়ি শুঁড়িপথ থেকে শহরের রাজপথে বেপরোয়া লড়াই, বা জেলবন্দী নারীদের দুঃসাহসী জেলব্রেকের মতন ঘটনাই শুধু নয়, পার্টি-রাষ্ট্র-যুক্তফ্রন্ট নিয়ে নানা টাটকা তত্ত্বের সুবাতাসও বইছিল। দুর্গম পাহাড়ি জেলাগুলো থেকেও জন-আকাঙ্ক্ষার মন্দ্রধ্বনি ধ্বনিত হচ্ছিল লাল পতাকায়। কাতারে কাতারে মানুষ ধেয়ে যাচ্ছিল রাজধানীর দিকে। বহু শতাব্দীর রাণাশাহীর পতন আর সংবিধানসভা তথা পূর্ণাঙ্গ সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশ্বাসের সাথে শেষ হয় সেই উত্তাল পর্যায়। এই সবকিছুকে উপন্যাসের উপাদান হিসেবে রেখে, এক অনবদ্য আঙ্গিকে লেখক-সমাজকর্মী-সাংবাদিক যুগ পাঠক ২০১০ সালে লিখেছিলেন এই উপন্যাসটি। উপন্যাস আর বাস্তব, কল্পনা আর পরাবাস্তবের হাত ধরে এগিয়েছে কাহিনীর বুনন। লেখক নিজেও যুক্ত ছিলেন আন্দোলনের সাথে। উপন্যাসের মূল চরিত্র গেরিলা-যোদ্ধা তথা তামাংকন্যা মেহেন্দোর জীবনের চড়াই-উৎরাই বেয়ে গাঁথা হয়েছে নেপালের পার্বত্য জীবনচিত্র, বিপ্লবী সংগ্রামের বর্ণময় গতিপথ, যাতে মিশে আছে শ্রেণীমুক্তির প্রশ্ন, জাতিসত্তার অস্মিতা, এবং নারী জাগরণের আশ্চর্য বর্ণন। বিভিন্ন দলের বা দলহীন বহু বামপন্থী কর্মীও এই উপন্যাসটি থেকে তত্ত্ব আর তথ্য, এবং উৎসাহের রসদ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। আর নিছক সাহিত্য হিসেবেও বিপুল কদর আদায় করেছে এই উপন্যাসটি।

                    নেপালের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক নয়নরাজ পাণ্ডে-র লেখা উলার আকারে ছোট্ট নভেলা, কিন্তু গল্প বা লেখনশৈলীর দিক থেকে অনবদ্য। উপন্যাসটার বয়স ২৭ বছর হলেও এখনো তা নেপালে সমান জনপ্রিয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে ঢুকেছে এই বই, এবং কাঠমান্ডুর গ্রুপ থিয়েটার দল উলার-এর হাউসফুল নাটক শো করে চলেছে একের পর এক।রাজতন্ত্রবিরোধী লড়াইয়ের পর ১৯৯০ সালে যে গণতন্ত্র এল, তার চেহারা কিরকম ছিল? কতটা বদলালো টাঙাওয়ালা প্রেমলালদের জীবন? বা ‘বাঁদি’ জাতির গণিকা দ্রৌপদীর? গণতন্ত্রের ‘উৎসবে’ অপছন্দের প্রার্থী ভোটে জিতে গেলে, তার বিজয়মিছিলে যেতে হয় টাঙাওয়ালা প্রেমলালকে, যেখানে মরে যায় তার ঘুড়ী বাসন্তী। তারপর কী হল? ‘গণতন্ত্র’ তাকে দৌড় করিয়ে ছাড়ল ভারতসীমান্তের শহর নেপালগঞ্জ থেকে কাঠমান্ডু, এবং তারপর মন্ত্রীদের দরবার… ভোটে জয়ী শান্তিরাজা, পরাজিত রাজেন্দ্ররাজ, আর প্রেমলালকে নিয়ে গল্প লিখতে চাওয়া লেখক নিরাকার প্রসাদকে ঘিরে ক্ষুরধার ‘গণতন্ত্রের গল্প’ এই উলার। সাকুল্যে চার দিনে লেখা উপন্যাসটা একটানে পড়ে শেষ করা যায়, এবং ইচ্ছে জাগিয়ে দেয় নয়নরাজ পাণ্ডের অন্য উপন্যাস পড়ার। 

                    এরপর নানা কাজ একসাথে শুরু করি, কোনটাই শেষ হচ্ছিল না। বাংলা অনুবাদের মধ্যে ২০২৫ এর শেষে বেরোল ছুদেন কাবিমোর ‘উরমাল’। শব্দটি এসেছে রুমাল থেকে। আদিবাসী চা শ্রমিকরা যে কাপড়কে ঝুলি বানিয়ে চা পাতার বোঝা সংগ্রহ করেন, তাকেই বলা হয় রুমাল বা অপভ্রংশে ‘উরমাল’। উপন্যাসটির পটভূমি ডুয়ার্সের চা বাগানগুলি সহ বিস্তীর্ণ এলাকা, যেখানকার আদিবাসী, নেপালি, রাভা, টোটো, কোচ-মেচ মানুষেরা বেঁচে আছেন তাঁদের প্রান্তিক জীবন আর মরীয়া জীবনসংগ্রাম নিয়ে। দার্জিলিং পাহাড়ের লেখক ছুদেন কাবিমো পাঁচ বছর ধরে ডুয়ার্সের আনাচেকানাচে ঘুরে উপন্যাসের রসদ সংগ্রহ করে যে উপন্যাসটি লিখেছেন, তা ভারতে এনে দিয়েছে বিরল সম্মান। নেপালের সর্বোচ্চ সাহিত্যসম্মান ‘মদন পুরস্কার’ বত্রিশ বছর বাদে ভারতে এসেছে, ‘উরমাল’-এর হাত ধরে। লেখক ছুদেন কাবিমো সংবেদনশীল কাব্যিক ভাষায় তুলে ধরেছেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে থাকা অশ্রুত কণ্ঠগুলোকে। এই উপন্যাসজুড়ে বহু চরিত্র এবং রঙবেরঙের কাহিনী ফুলের মালার মতো গাঁথা রয়েছে, যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে আরও অনেক গল্প, যার মধ্যে কিছু কয়েক দশকের পুরোনো, কিছু ব্রিটিশকালীন, আবার কিছু লোককথা থেকেও নেওয়া। কোলাজের আকারে লেখা এই অসাধারণ উপন্যাস তার গভীরতা, বিস্তার, শিল্পরূপ ও কাব্যিক ছন্দে অবশ্যই পাঠককে মুগ্ধ করবে।

তৃষ্ণা বসাক-এযাবত ঠিক কতগুলি অনুবাদ করেছেন? সবগুলিই কি প্রকাশিত হয়েছে?

শমীক চক্রবর্তী-এতক্ষণ নেপালি থেকে বাংলা অনুবাদের কথাই শুধু হচ্ছিল। বাংলা থেকে নেপালি অনুবাদও করেছি আমি। পাশাপাশি কিছু ইংরেজি থেকেও করেছি। সব মিলিয়ে তালিকাটা এরকম : আজকের উত্তর (সমকালীন নেপালি কবিতার অনুবাদ সংকলন, নেপালি -> বাংলা), ফাৎসুঙ (ছুদেন কাবিমো-র উপন্যাস, নেপালি->বাংলা), আজ রমিতা (ইন্দ্রবহাদুর রাই-এর উপন্যাস, নেপালি->বাংলা), টোকোলোশ (রোনাল্ড সেগাল-এর নভেলা, বাংলা/ইংরেজি->নেপালি), উর্গেনের ঘোড়া (যুগ পাঠক-এর উপন্যাস, নেপালি->বাংলা), নুনকো চিয়া (বিমল লামা-র বাংলা উপন্যাস নুন চা->নেপালি), উলার (নয়নরাজ পাণ্ডে-র নভেলা, নেপালি->বাংলা), ফুচ্চে গফাড়ি (নিকোলাই নোসভ-এর সচিত্র শিশুসাহিত্য, ইংরেজি->নেপালি), মার্ক্স : সহজ পাঠ (রিয়ুস-এর সচিত্র কমিক্স, ইংরেজি->বাংলা), কাশ্মীরি জাতীয়তাবাদের নানা মুখ (নন্দিতা হাকসার-এর নন-ফিকশন, ইংরেজি->বাংলা), বিউঝিরহেকো কঞ্চনজঙ্ঘা (সত্যেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার রচিত স্মৃতিকথা, বাংলা->নেপালি), উরমাল (ছুদেন কাবিমো-র উপন্যাস, নেপালি->বাংলা) — এখন পর্যন্ত এগুলো বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এর বাইরে আরও নানা অনুবাদ নানা পত্রপত্রিকায়, বা ইন্টারনেটে আছে। প্রকাশিত বই হিসেবে ধরলে, পাঁচটা উপন্যাস নেপালি থেকে বাংলা করেছি, নেপালি অনুবাদ করেছি দুটো উপন্যাস, এবং একটা স্মৃতিকথা। এছাড়া ইংরেজি থেকে বাংলা নন-ফিকশন একটা। একটা নেপালি থেকে বাংলা কবিতা সংকলন। আরেকটা দ্রুতই প্রকাশিত হবে। আর কিছু সচিত্র অনূদিত বই।   

                    এখন পর্যন্ত যে কাজগুলো শেষ হয়েছে, সবই প্রকাশিত হয়েছে। 

তৃষ্ণা বসাক-আপনার কোন অনুবাদটির জন্যে লোকে আপনাকে চিনেছে এবং কোন অনুবাদটি সবথেকে বাণিজ্য সফল?

শমীক চক্রবর্তী-এটার সঠিক উত্তর আমার জানা নেই। ‘আজকের উত্তর’ নামে কবিতা সংকলনটা ২০১৪ সালে বেরোয়। তখন এটা খানিক জনপ্রিয় হয় ঠিকই, তবে সম্ভবত ২০১৯ সালে ফাৎসুঙ বেরোনোর পরই অনুবাদক হিসেবে দেখে লোকে। তারপরই কয়েক মাসের মধ্যেই বেরোয় ‘আজ রমিতা’। আমি/আমরা ছোট প্রকাশনার পক্ষে, অত বড় প্রচার বা বিতরণের ক্ষমতা তাদের নেই। তবুও এই দুটো বই-ই দুটো সংস্করণ পেরিয়ে তিনটে বেরিয়েছে, হাজারের ওপর বিক্রি হয়ে গেছে। পরেরগুলোও হচ্ছে। পেশাদারভাবে এসব দেখিনি, তাই বাণিজ্য-সফলের সংজ্ঞাও ঠিক জানা নেই। তবে বন্ধু-পরিচিতের বৃত্তের বাইরেও বইগুলো পৌঁছচ্ছে দেখে সন্তুষ্টি তো পেয়েছি বটেই। ভাষার সাবলীলতা এবং বিষয়বস্তুর জন্য ফাৎসুঙ জনপ্রিয় হয়, আজ রমিতা ভাষাশৈলী এবং পুরনো দার্জিলিং শহর ও চা বাগানের জীবনের প্রতিচ্ছবি দেওয়ায় পছন্দের তালিকায় আসে, উর্গেনের ঘোড়া অনবদ্য কথনশৈলী আর নেপালের গ্রামজীবন ও সংগ্রামের বর্ণনার জন্য প্রশংসিত হয়, মেহেন্দোর চরিত্রচিত্রণে মুগ্ধ হয় অনেকেই। উলার ছোট্ট নভেলা, সহজপাঠ্য, সাবলীল। এই সমস্ত বইয়ের ব্যাপারেই সুন্দর রিভিউ পেয়েছি, পাঠকের মৌখিক সদর্থক ফিডব্যাক পেয়েছি অনেক।   

তৃষ্ণা বসাক-একটা কথা আছে যে Translation is nothing but a negotiation. নেপালি থেকে বাংলা অনুবাদে কি কথাটা খাটে? আপনি কি আক্ষরিক অনুবাদেই বিশ্বাসী? না অনুসৃজনে? আপনার অনুবাদের প্রসেসটা ঠিক কী রকম? প্রথমে আক্ষরিক অনুবাদ, তারপর ভাষাটিকে সুন্দর করার জন্যে অল্প হেরফের, নাকি অন্য কিছু?

শমীক চক্রবর্তী-কিছু আপস-সমঝোতা তো করতেই হয়, মূল টেক্সটের ভাষা ও শৈলী অবিকল রেখে অন্য ভাষায় নিয়ে যেতে পারলে তো চিন্তাই ছিল না। কিন্তু উল্টোদিক থেকে ভাবলে অনুবাদের চ্যালেঞ্জ (এবং মজাও) তো এখানেই। নেপালি থেকে বাংলা, বা বাংলা থেকে নেপালিতেও তাই-ই। সবচেয়ে কম আপস করে কী করে ভাষা-বিষয়-শৈলী-প্রেক্ষাপটকে অন্য ভাষার পাঠকের মানসপটে প্রজেক্ট করা যায়– অনুবাদকের কাজ এবং এলেম তো এখানেই দেখানোর। এরকম কাজ করতে গিয়ে এসে পড়া স্বাভাবিক চ্যালেঞ্জগুলো তো ঠিকই আছে। একটা দুটো মুশকিলের উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন নেপালি লেখায় ব্যবহৃত প্রবাদ-প্রবচন, বা নানা কোলোকিয়াল বা স্ল্যাং-এর বাংলা করতে গিয়ে আমি অনেকবার সমস্যায় পড়েছি, উপায় হাতড়ে বের করেছি কিছু না কিছু। বা ধরুন উল্টো অনুবাদের ক্ষেত্রে, অর্থাৎ নেপালি অনুবাদ করার ক্ষেত্রে আমি নির্দিষ্ট দুটো বিষয়ে বেশ ঝামেলায় পড়েছিলাম। এক, নানা (অশ্রাব্য) গালাগালি-র ক্ষেত্রে মুশকিল হয়েছে। কেননা আমি নেপালি শিখেছি রাস্তাঘাটে-চাবাগানে-আড্ডায়। আমার সামনে লোকে গালাগালি দেওয়াটা এড়াতেই চায়। ফলে আমি নেপালি গালি জানতাম না। তারপর উপায়ান্তর না পেয়ে একদিন এক বিশ্বস্ত বন্ধুকে নিয়ে আলাদা করে বসে গালাগালির তালিকা বানাতে হল, কোনটা কোন পারিপার্শ্বিকে বলা যায়, সেই অনুযায়ী আলাদা আলাদা স্তরে রেখে। বা ধরুন, খুব ঘনিষ্ঠ প্রেমের অন্তরঙ্গতায় কথোপকথনের ভাষা কী হয়– নেপালির ক্ষেত্রে আমি তা জানতাম না। আমার সামনে তো তেমন অভিব্যক্তিগুলো সেই নিবিড়তায় ঘটে না। ফলে নানা ফিল্ম দেখে, বই পড়ে আমাকে এর সুরাহা করতে হয়েছে। তা, এহেন নানা বাধা পার করতে আনন্দও পেয়েছি বটে।

                    আমি অনুবাদ করার ক্ষেত্রে অনুসৃজনের বিরোধী। বরং আক্ষরিক অনুবাদ করে তারপর হেরফের করা, সাবলীলতা ও ভাষার স্বাভাবিক গতি ও বৈশিষ্ট্যগুলো জোড়ার জন্য। এই আনুগত্য রাখলেই লেখকের ভাষাশৈলীকে সম্মান করা যায়, এবং টার্গেট ভাষায় প্রতিফলিত করা যায় লেখকের স্টাইলকে। অনুবাদের ক্ষেত্রে এটা খুব জরুরি বলে মনে হয়। নাহলে আমি ওই লেখক / লেখা-কে পাঠকের কাছে পৌঁছব কী করে?

তৃষ্ণা বসাক- বাংলা থেকে নেপালি অনুবাদও কি করেন? যদি না করেন তবে কেন করেন না? এটাও তো দরকার

শমীক চক্রবর্তী-হ্যাঁ, করি তো। অনেকই করি। গল্প-উপন্যাস-কবিতা ছাড়াও নানা প্রবন্ধ বা অন্যান্য লেখাও নেপালি করেই চলতে হয়।

তৃষ্ণা বসাক-আপনি ট্রান্সলেটর্স ব্লক কে কীভাবে ডিল করেন? এমন কোন ড্রিম প্রজেক্ট আছে যা আপনি অনেক দিন ধরে করতে চাইছেন?

শমীক চক্রবর্তী-ওভাবে ট্রান্সলেটর্স ব্লক হয়নি। মানে সেরকম টের পাওয়ার মতো সময়ই পাইনি। এতরকম অন্যান্য কাজের ফাঁকে অনুবাদ করি যে ওই নিংড়ে বের করা সামান্য সময়টুকুকে কাজে লাগাতে না পারলে তা বিলাসিতা হয়ে যাবে বলে মনে হয়।

                    ড্রিম প্রজেক্ট বললে অনেকটা বড় শোনাবে, তবে নেপালি ছোট গল্পের একটা অ্যান্থলজি করতে চাই বাংলায়। আরও এক-দুটো ক্লাসিক অনুবাদ করতে চাই। এপার বা ওপারের নেপালি ভাষার।

                    বাংলা থেকে নেপালি করতে চাই কোনো কোনো পছন্দের বই। ধরুন পথের পাঁচালী, বা তিস্তাপাড়ের বৃত্তান্ত, কিংবা অক্ষয় মালবেরী। বা এরকম কত কিছু। এই পছন্দও অবশ্য পাল্টে পাল্টে যায়। ঝোঁকের মাথায় কোনও মুহূর্তে পছন্দের লেখা অনুবাদের খাতায় সাজিয়ে বসি। তারপর সিকি-আধা-পৌনে হয়ে পড়ে থাকে কতকিছু। নেপালি থেকে বাংলা, বাংলা থেকে নেপালি করার ইচ্ছে নিয়ে, দুদিকের পাঠকদের মুখগুলো মনে করে ওয়ার্ড ফাইলের বাঁদিক ভরে ওঠে। ডানদিকগুলো খালি-আধখালি। ১৯০৭ সালে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল রাজদরবারের গ্রন্থাগারে তালপাতায় লেখা মুনিদত্তের টীকার পুথি খুঁজে পান, যার মধ্যে ছিল চর্যাগীতিগুলো। বাংলা ভাষার প্রাচীনতম উদ্ধারকৃত সেই পুথি নেপাল রাজদরবারে কী করে পৌঁছল, সেই ইতিহাস জানা যায় না, কিন্তু যখন ভাবি এতটাই পুরনো এই দুই ভাষার সম্পর্ক, তখন মনে উশখুশ, হাত নিশপিশ শুরু হয়, পড়শি-সাহিত্যের আরশিনগর চেনাতে মন চায়।

তৃষ্ণা বসাক-আপনি ভারতীয় সাহিত্য থেকে অনুবাদ করেনআপনার কি মনে হয়, এই বহুভাষিক দেশে অনুবাদের ভূমিকা অনেকখানি? তার জন্যে কি যথেষ্ট অনুবাদক আছেন? অনুবাদকদের সম্মান ও সাম্মানিক এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর ঠিক কতটা অভাব আছে? কীভাবে তা উন্নত করা যায়?

শমীক চক্রবর্তী-সে তো বটেই। অনুবাদের ভূমিকা তো এদেশে অপরিসীম। নানা বাস্তব কাজেও বটে, এবং সাহিত্য আদানপ্রদানের ক্ষেত্রেও। বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যেকার ভাষাগুলোর মধ্যে সাদৃশ্য থাকায় এই কাজটা আরও ব্যাপকভাবে হতে পারত। যেমন নেপালি আর বাংলা– দুটোই ইন্দো-এরিয়ান ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে, শব্দ-ভাষা-বাক্য গঠনের সাদৃশ্যও প্রচুর। তবু এই অনুবাদের কাজ তুলনায় খুব কম হয়। আমার খুব বেশি ধারণা নেই, এই অনুবাদ-অনুবাদকদের বৃত্তে ঘোরাঘুরিও কম, তবু আমার মনে হয় প্রয়োজনের তুলনায় অনুবাদক কমই আছেন।

                      অনুবাদকদের সম্মান ও সাম্মানিক এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছেন। আমি যেহেতু সাহিত্য অনুবাদের বেশিরভাগ কাজ নিজের পছন্দে করেছি, এবং আমাদের সমষ্টিগত উদ্যোগে চলা প্রকাশনা থেকেই বেশিরভাগ বেড়িয়েছে, তাই এই বিষয়গুলি সাধারণত কেমনভাবে চলে, সে সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। তবে প্রকাশক বা সরকারি/প্রাতিষ্ঠানিক জায়গা থেকে সাম্মানিক ও পরিকাঠামো বাড়ালে গোটা কাজটাই বিকশিত হবে, সবাই নানা অর্থে লাভবান হবে। প্রয়োজন এবং রসদের তুলনায় কাজ কম এবং অগোছালোভাবে চলে বলে মনে হয়।       

তৃষ্ণা বসাক-আপনি কি কোন চাকরি করেন না কেবল অনুবাদ? আপনার যে লড়াই তা কতখানি কঠিন ছিল?

শমীক চক্রবর্তী-না, চাকরি করি না, আমি সমাজকর্মী। শ্রমিক-অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের সপক্ষে রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজ করি। ছাত্রজীবন থেকেই এই কাজের সাথে যুক্ত আমি, এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর করার পর থেকেই সর্বক্ষণের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাজ করেছি। লেখালেখি, পত্রিকা প্রকাশ, তথ্যচিত্র নির্মাণের সাথে যুক্ত থেকেছি। এভাবে অনুবাদের কাজ শুরু করেছি অনেক পরে। এখন সাহিত্য অনুবাদের পাশাপাশি অন্যান্য টেকনিকাল অনুবাদ করি, পেইড জব হিসেবে। সাহিত্য অনুবাদটা এখনও নিছক ভালোলাগা হিসেবেই করি। কখনো রয়ালটি পেয়েও যাই, কাজের দাম পেলে কার না ভালো লাগে? তবে এটা আরও সিস্টেম্যাটিক করা প্রয়োজন, কাজের দাম পাওয়ার দিক থেকেও, এবং বাকি জীবনধারণের জন্যও এই সাহিত্য-অনুবাদের কাজ থেকে রোজগার প্রয়োজন। কেননা সময়ও দিচ্ছি এই কাজে, এবং সামগ্রিক খরচ ও মূল্যবৃদ্ধিও বেশ চড়া।  

তৃষ্ণা বসাক-আপনার কোন কোন অনুবাদ সম্মানিত হয়েছে এখনো পর্যন্ত?

শমীক চক্রবর্তী-বিমল লামা-র বাংলা উপন্যাস নুন চা নেপালিতে অনুবাদ করি — ‘নুনকো চিয়া’ নামে। এর জন্য ২০২২ সালে (মিরিক থেকে প্রদত্ত) শশীপ্রভা স্মৃতি পুরস্কার আমি এবং বিমল দা যুগ্মভাবে পাই। এছাড়া আর কোনও সম্মান পাইনি। আর বলতে গেলে, গত ২০২৪ সালের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারের অনুবাদ বিভাগে দুটো চূড়ান্ত তালিকায়– বাংলায় ‘আজ রমিতা’, এবং নেপালিতে ‘নুনকো চিয়া’– দুটোই দুদিক থেকে চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পায়। শেষত পুরস্কার অন্য দুটো বই পায়। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় ঠাঁই পাওয়ার এই স্বীকৃতিটা একটা সন্তুষ্টি দেয়, এবং তার বেশি কিছু না হওয়াই ভালো। আসলে, সম্মান-পুরস্কার– এসব নিয়ে আমার মনে অস্বস্তি, ভয়ই বেশি। কোনটা টোপ, কোনটা স্বজনপোষণ, আর কোনটা প্রকৃত সম্মান — এসব বোঝাই সমস্যা। যেটুকু কাজ করছি, ভালো লাগা এবং দায়িত্ববোধ থেকে করছি। আমার কাছে এটাই অনেক বড়।  

তৃষ্ণা বসাক- আপনার অনুবাদক জীবনে অনেক অসম্মান প্রত্যাখ্যান আছে, অসৎ প্রকাশক আছে, আবার  নিশ্চয় এমন কিছু ঘটনা আছে, যা আজো আপনার কাজের স্পৃহা জাগিয়ে রেখেছে? সেইরকম কিছু স্মরণীয় ঘটনা, পাঠকের ভালবাসার কথা জানতে চাই

শমীক চক্রবর্তী-আমার এরকম অভিজ্ঞতা খুব বেশি হয়নি। আসলে এই সাহিত্যের সার্কেলে, লেখক-অনুবাদক বৃত্তে বা প্রকাশনার জগতে আমার যাতায়াতই কম। ফলে এধরনের অভিজ্ঞতাও কম। অসম্মান-প্রত্যাখ্যান-প্রকাশকের অসততা কিছু দেখি-শুনি বটে, তবে গায়ে মাখি কম, এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করি এসব তিক্ততা। আর অনেকাংশে তা পারিও, কেননা আমি মূলত পড়ে থাকি রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলন-সংস্কারের নানা কাজে। বরং সদর্থক ফিডব্যাক বেশি পেয়েছি, বা সেরকম ঘটনাই বেশি মনে আছে। নানা অসাধারণ রিভিউ পেয়েছি, তার কতকগুলো তো অসাধারণ সাহিত্যগুণসম্পন্নও বটে। বাংলাভাষী পাঠকদের অনেকে নেপালি ভাষার সাহিত্যের সাথে পরিচিত হতে পেরে খুব আনন্দ ব্যক্ত করেছেন, নেপালিভাষী বন্ধুরা অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন– এই অভিজ্ঞতা আমার বারবার হয়েছে। আবার, দার্জিলিং পাহাড়ের জনজীবন ও গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন নিয়ে বিমল লামার লেখা ‘নুন চা’ উপন্যাস বা চল্লিশের দশকের চা শ্রমিক আন্দোলনের শুরুর যুগ নিয়ে লেখা সত্যেন্দ্রনারায়ণ মজুমদারের অনবদ্য স্মৃতিকথা ‘পটভূমি কাঞ্চনজঙ্ঘা’ যখন নেপালি করেছি, যাঁদের কাহিনী তাঁদের কাছে যখন ফিরিয়ে দিতে পেরেছি, সেই ভালো লাগাটা একদম অন্যরকম। নেপালিভাষী পাঠকরা খুব খুশি হয়েছেন, আপ্লুত বোধ করেছেন। অনেক ঘটনা আছে, তার মধ্যে একটা বলি। গ্লেসিয়াল লেক বার্স্ট করে তিস্তা ফ্ল্যাশ ফ্লাডে বিপর্যস্ত হয়েছিল গোটা তিস্তাপাড়। পাহাড়ে জায়গায় জায়গায় ধস, রাস্তা বন্ধ। তার মধ্যে গেইলখোলার পাড়ে বিধ্বস্ত গ্রামে ত্রাণ পৌঁছতে হবে বলে আমরা তড়িঘড়ি গাড়ি নিয়ে এগোচ্ছি। লিখুভীরের ধসটার ঠিক আগে পথ আটকালো পুলিশ। রাস্তা বন্ধ। কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের ত্রাণসামগ্রী ভর্তি গাড়িটার সামনের আসনে আমি বসে। হঠাৎ একজন তরুণ সিভিক পুলিস এগিয়ে এল। ‘আপনাকে যেন চিনি… (একটু ভেবে)… নুনকো চিয়া আপনার অনুবাদ না?… আমি পড়েছি’। আমি/আমরা অবাক। পথ করে দিলেন সিভিক পুলিস ভাই। ত্রাণের কাজে যাচ্ছেন যখন, ব্যবস্থা করে দেওয়া দরকার বলে অন্য সহকর্মীদের বোঝালেন তিনি। অনুবাদক হিসেবে এই সুবিধাটুকু তো পেলাম! 

তৃষ্ণা বসাক-শমীক আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ কলকাতা বইমেলার আগে এতটা সময় আমাকে দেবার জন্যেশেষে জানতে চাই আপনার ঠিক কতগুলি অনুবাদের বই আসছে এই মেলায় এবং তাদের প্রকাশক কারা?

শমীক চক্রবর্তী-আপনাকেও ধন্যবাদ দিদি। এটা লিখে পাঠাতে এতটা দেরি হল যে কলকাতা বইমেলাও পেরিয়ে গেল। ঠিক কলকাতা বইমেলা ধরে নয়, এবারে তার আগে নভেম্বর-ডিসেম্বরের জেলা বইমেলাগুলোকে টার্গেট ধরে বইগুলো বের করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম আমরা। তাই দার্জিলিং আর কালিম্পঙের জেলা বইমেলা (যা পাহাড়ে হয়) মাথায় রেখে সত্যেন্দ্রনারায়ণ মজুমদারের স্মৃতিকথা ‘পটভূমি কাঞ্চনজঙ্ঘা’-র নেপালি অনুবাদ ‘বিউঝিরেকো কাঞ্চনজঙ্ঘা’ প্রথমে প্রকাশ করা হয়, এবং তা বেশ ভালো সাড়া ফেলে। তারপরই উত্তরের অন্যান্য জেলা মেলা টার্গেট করে বের করার চেষ্টা করি ‘উরমাল’, চা বাগান সহ ডুয়ার্সের প্রেক্ষাপটে লেখা ছুদেন কাবিমোর নেপালি উপন্যাসের বাংলা অনুবাদ। শিলিগুড়ির টুইন্স ক্যাফে-তে চা বাগানের সাহিত্য বিষয়ক আলোচনার সাথে সেটার বইপ্রকাশ করাও হয়, কিন্তু বিক্রিযোগ্য কপি ছেপে আসতে খানিক দেরি হয়, কলকাতা বইমেলার ক’দিন আগে বেরোয় সেটা। এই দুটো বই-ই বেরিয়েছে দার্জিলিংয়ের লালী গুরাস প্রকাশন থেকে। আমাদেরই নেপালি পত্রিকা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজকর্মের মঞ্চ লালী গুরাস-এর উদ্যোগে এই প্রকাশন শুরু হয় ২০২০ সালে।

তৃষ্ণা বসাক- তরুণ অনুবাদকদের জন্যে আপনি কিছু বলতে চান? কীভাবে তারা এগোতে পারে অনুবাদকে পেশা করে?

শমীক চক্রবর্তী-আমি যেহেতু অনুবাদের কাজ কোনো প্রথাগত উপায়ে শিখিনি, আমার পক্ষে এভাবে কিছু বলাটা ধৃষ্টতা হবে। যদিও ইদানীং অনেকেই যোগাযোগ করছেন, কথা বলছেন অনুবাদের উদ্যোগ নিয়ে, বা নেবেন বলে। আমার কেজো অভিজ্ঞতা শেয়ার করি তাঁদের সাথে, সাজেশন দিই, যথাসাধ্য সাহায্য করি। এটুকু বলতে পারি, অনুবাদের কাজ আরও হওয়ার দরকার। তা শুধু আদানপ্রদান বাড়ায় না, মন এবং জানাবোঝার দিগন্তটাও বাড়িয়ে দেয়। অনুবাদ মূল টেক্সটের প্রতি অনুগত থাকুক, টার্গেট ভাষায় সাবলীল হোক– এটুকুই দেখার। 

১৫ এর বাইরেও যদি কিছু বলার থাকে বলতে পারেন

২০০৮ সালে একটা ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানাতে দার্জিলিং এসে, সেবার শহর ছেড়ে পাহাড়ের বহু গ্রাম-বস্তিতে পৌঁছেছিলাম। বেড়ানোর বাইরে সেই প্রথম অন্যভাবে পাহাড়কে দেখা। সেবারই জানতে পারি, চুংথুং চা বাগানে মালিকের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ২০০৬ সালে বাগানের চা-পাতা ওজন করার ‘লিফশেড’-এ গলায় ফাঁস দিয়ে বাবুরাম দেওয়ানের আত্মহত্যার কথা। ভয়ানক অবাক হয়েছিলাম। বুঝেছিলাম, আমাদের চেনার বাইরেও অন্য এক দার্জিলিং আছে। চা বাগানে দুঃখের পাহাড় জমে আছে। সামাজিক বৈষম্যের কালশিটে দাগ সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। আর এই পুরো সমাজটা জাতীয় পরিচয়ের সংকটে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে রয়েছে। মূলত কলকাতা এবং দক্ষিণবঙ্গে বড় হওয়া আমার কাছে এই বিষয়গুলো নতুন ছিল। কিন্তু সামাজিক সাম্যের লড়াইয়ে যুক্ত থাকার কারণে এখানকার সমাজের প্রতিও আমি একাত্মতা অনুভব করতে শুরু করছিলাম।

এভাবেই ধীরে ধীরে দার্জিলিং-ডুয়ার্সের নেপালি সমাজের সাথে যুক্ত হয়ে গেছিলাম। এখানে সমাজকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করার পাশাপাশি নেপালি ভাষার প্রতি আগ্রহ বাড়তে শুরু করে। কোনো সমাজের ভাষা না জেনে সেই সমাজের জন্য কাজ করা যায় কীভাবে? শুরুতে আধকাঁচা নেপালি দিয়ে গল্প-আড্ডা, ভাঙা ভাষণ, কেজো তর্ক, হাসিঠাট্টা চলেই যেত। কোথাও মাঝপথে ছেড়ে দিলেও তেমন কিছু যেত-আসত না। বন্ধুরা ঠাট্টা করত, শেখাতও। সংগ্রামী সাথী বনতে থাকা শ্রমিকরা ‘মধেশকো মান্‌ছে’ বলে ছাড় দিয়ে দিত। কিন্তু আমি ছাড়িনি। ভালো কিছু পড়লে-শুনলেই আমার ‘ইধারকা মাল উধার’ করতে ইচ্ছে করে।

এভাবেই অনুবাদে আসা আমার। ফলে ‘অনুবাদ’ বিষয়ে গুছিয়ে বলাটা আমার পক্ষে মুশকিল। যেমন প্রশ্নগুলো ছিল, সেই অনুযায়ী বলার চেষ্টা করলাম। কাজটা প্রয়োজনীয়, করে চলব– এটুকু বলতে পারি। অনুবাদগুলো কাজে লাগলে, বা আমি এরকম অনুবাদের ব্যাপারে কাজে লাগলে ভালো লাগবে আমার।

অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা - তৃষ্ণা বসাক

অনুবাদের স্বর্ণযুগ : মধ্যযুগ  

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

অম্লান দত্ত – এক বিশ্ব মানব

This entry is part 10 of 10 in the series অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ :

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

অম্লান দত্ত – এক বিশ্ব মানব

This entry is part 10 of 10 in the series অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ :

Read More »

অনুবাদকের কথা

This entry is part 10 of 10 in the series অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক ১ : অনুবাদের

Read More »