১০ : সংস্কৃত সাহিত্য : ভারতীয় চিন্তার ভাষা

১০ : সংস্কৃত সাহিত্য : ভারতীয় চিন্তার ভাষা

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস

১ : সিন্ধু–সরস্বতী থেকে গঙ্গা

২ : সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার সমকালীন সর্বভারতীয় স্রোতধারা

৩ : বেদের বাণী থেকে পৌরাণিক ভারত

৪ : আরণ্যক থেকে বেদান্ত  : অন্তর্জগতের অভিযাত্রা

৫ : মৌর্য–গুপ্ত যুগ : ভারতীয় সভ্যতার আত্ম-অনুসন্ধান

৬ : গুপ্তোত্তর ভারত

৭ : ভারতে বসন্ত 

৮ : ধর্মরাজনীতি ও সম্রাট অশোক

৯ : সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ : উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মিলন

১০ : সংস্কৃত সাহিত্য : ভারতীয় চিন্তার ভাষা

১১ : ভারতের মন্দির : শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সম্মিলন

১২ : নৃত্য ও সংগীত : রস, তত্ত্ব ও ঐতিহ্য

আয়ুর্বেদ ও বিজ্ঞান : জীব রসায়নের দান

পুরাণ ও কাব্য : কল্পনার সাংস্কৃতিক বুনন

ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসে কিছু ভাষা আছে যেগুলি কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; সেগুলি এক একটি মানসিক জগৎ, এক একটি সভ্যতার আত্মা। সংস্কৃত সেই বিরল ভাষাগুলির একটি।

এই ভাষার ধ্বনিতে জেগে আছে প্রাচীন বৈদিক ঋষিদের স্তোত্র, উপনিষদের গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান, মহাকাব্যের আখ্যান, নাট্যমঞ্চের রস, প্রেমের কাব্য, রাজনীতির নীতিশাস্ত্র এবং নন্দনতত্ত্বের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ।

সংস্কৃত ভাষা যেন ভারতীয় সভ্যতার এক দীর্ঘ নদী—যার উৎস ঋগ্বেদের প্রভাতে, যার প্রবাহ মহাভারত ও রামায়ণের মহাকাব্যে, এবং যার সুর কাব্য, নাটক ও দর্শনের নানা শাখায় ছড়িয়ে পড়েছে।

এই ঐতিহ্যের নির্মাতাদের মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণীয় কয়েকটি নাম, পাণিনি,কালিদাস, ভাস, শূদ্রক, ভবভূতি , মাঘ, বাণভট্ট, দণ্ডিন, আনন্দবর্ধন, মম্মট প্রমুখ। 

এই সব কবি ও তাত্ত্বিকের সম্মিলিত সাধনায় সংস্কৃত সাহিত্য হয়ে উঠেছে ভারতীয় নন্দনচিন্তার এক অনন্ত ভুবন।

সংস্কৃত ভাষার শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যের ভিত নির্মাণ করেছিলেন পাণিনি। তার গ্রন্থ অষ্টাধ্যায়ী কেবল একটি ব্যাকরণ নয়; এটি এক বিস্ময়কর বৌদ্ধিক স্থাপত্য। প্রায় চার হাজার সূত্রের মাধ্যমে তিনি ভাষার ধ্বনি, শব্দগঠন এবং ব্যাকরণিক নিয়মকে এমনভাবে বিন্যস্ত করেছেন যে তা আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীদেরও বিস্মিত করে। এর একটি বিখ্যাত সূত্র , “ইকো যণচি” বা এই সংক্ষিপ্ত সূত্রটি ধ্বনির পরিবর্তনের একটি সম্পূর্ণ নিয়ম নির্দেশ করে।

ভাষাবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন—পাণিনি যেন প্রাচীন ভারতের এক গণিতজ্ঞ, যিনি ভাষাকে একটি সুনির্দিষ্ট সূত্রব্যবস্থায় রূপ দিয়েছিলেন।

প্রকৃতি ও প্রেমের কবি : কালিদাস – সংস্কৃত কাব্যের সৌন্দর্য সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল মহাকবি কালিদাস-এর হাতে। কালিদাসের কাব্যে প্রকৃতি ও মানবচেতনা এক গভীর সুরে মিলিত হয়েছে। তার নাটক অভিজ্ঞানশকুন্তলম বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক হিসেবে স্বীকৃত। এই নাটকে রাজা দুষ্যন্ত ও শকুন্তলার প্রেমকাহিনি যেন বনভূমির স্নিগ্ধতার সঙ্গে মিশে গেছে। একটি বিখ্যাত পঙক্তি- “স্মরতি ন খলু সাক্ষাৎ প্রিয়ম্ অপ্যন্যদৃষ্টা।”

অর্থাৎ প্রেমের স্মৃতি কখনও কখনও উপস্থিতির থেকেও গভীর হয়ে ওঠে—এই অনুভূতিই এখানে ধরা পড়েছে। কালিদাসের আরেকটি কাব্য মেঘদূত যেন এক স্বপ্নময় ভ্রমণ। নির্বাসিত এক যক্ষ মেঘকে দূত করে প্রিয়তমার কাছে বার্তা পাঠায়—আর সেই মেঘ ভারতবর্ষের আকাশ পেরিয়ে এক কাব্যিক ভূগোল আঁকে। 

নাট্যমঞ্চে জীবনের প্রতিচ্ছবি : ভাস ও শূদ্রক – সংস্কৃত নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে ভাস একটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ নাম। তার নাটক স্বপ্নবাসবদত্তা রাজনীতি, প্রেম এবং নাটকীয় উত্তেজনার এক সুন্দর সমন্বয়। কিন্তু সংস্কৃত নাট্যসাহিত্যে এক অসাধারণ বাস্তবতা এনে দেন শূদ্রক। তার বিখ্যাত নাটক মৃচ্ছকটিক—বাংলায় যার অর্থ “মাটির ছোট্ট গাড়ি”—ভারতীয় নাট্যসাহিত্যে এক ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। এই নাটকে রাজা বা দেবতার গল্প নয়; এখানে রয়েছে নগরজীবনের গল্প। দরিদ্র ব্রাহ্মণ চরুদত্ত এবং গণিকা বসন্তসেনার প্রেমকাহিনি এক মানবিক আবেগের নাট্যমঞ্চ হয়ে উঠেছে। এখানে বাজারের কোলাহল আছে, সমাজের বৈষম্য আছে, আবার মানবিক সহমর্মিতাও আছে। এই কারণেই অনেক গবেষক মনে করেন, মৃচ্ছকটিক ভারতীয় নাট্যসাহিত্যের প্রথম সামাজিক নাটক।

করুণতার মহাকাব্য : ভবভূতি – সংস্কৃত নাট্যধারায় আরেক উজ্জ্বল নাম ভবভূতি। তার নাটক উত্তররামচরিত রাম ও সীতার বিচ্ছেদের কাহিনি নিয়ে রচিত। এই নাটকে করুণ রসের গভীরতা এতটাই স্পর্শকাতর যে ভবভূতিকে প্রায়ই “করুণ রসের কবি” বলা হয়। তার বিখ্যাত উক্তি, “উত্তরেষু চ রম্যেষু ভূয়ঃ স্যাদপি কাব্যতঃ।” অর্থাৎ—সম্ভবত ভবিষ্যতের যুগেই আমার কাব্যের প্রকৃত মূল্য বোঝা যাবে।

অলংকার ও শব্দের মহিমা : মাঘ – সংস্কৃত মহাকাব্যের ইতিহাসে মাঘ একটি উজ্জ্বল নাম। তার কাব্য শিশুপালবধ অলংকারের জটিলতা ও শব্দের সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। সংস্কৃত সাহিত্যজগতে একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, “উপমা কালিদাসস্য, ভারবেরর্থগৌরবম্।/ দণ্ডিনঃ পদলালিত্যং, মাঘে সন্তি ত্রয়ো গুণাঃ।” অর্থাৎ—কালিদাসের উপমা, ভারবীর ভাবগাম্ভীর্য এবং দণ্ডিনের শব্দসৌন্দর্য—এই তিন গুণই মাঘের কাব্যে মিলিত হয়েছে।

গদ্যের কাব্যিক সৌন্দর্য : বাণভট্ট – সংস্কৃত সাহিত্যে গদ্যও কখনও কখনও কবিতার মতো সুরেলা হয়ে উঠেছে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী বাণভট্ট। তার কাদম্বরী এবং হর্ষচরিত সংস্কৃত গদ্যসাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। বাণভট্টের ভাষা দীর্ঘ বাক্যে বয়ে চলে, কিন্তু তার ভেতরে রয়েছে সঙ্গীতের মতো এক ছন্দ। —

কাব্যতত্ত্ব : ধ্বনি ও অলংকার – সংস্কৃত কাব্যতত্ত্বের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন দণ্ডিন, আনন্দবর্ধন এবং মম্মট। আনন্দবর্ধনের মতে, “কাব্যস্য আত্মা ধ্বনিঃ।” অর্থাৎ কাব্যের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত থাকে তার ইঙ্গিত বা ধ্বনির মধ্যে। এই তত্ত্বকে সুসংহত করেন মম্মট তার গ্রন্থ কাব্যপ্রকাশ-এ। 

রসতত্ত্ব ও আধুনিক শিল্প – ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের কেন্দ্রে রয়েছে রসতত্ত্ব। এই ধারণা দিয়েছিলেন ভারত মুনি। “বিভাবানুভাবব্যভিচারিসংযোগাদ্ রসনিষ্পত্তিঃ।” 

এই তত্ত্ব আজও নাটক, সাহিত্য এবং চলচ্চিত্র বিশ্লেষণে প্রাসঙ্গিক। আধুনিক চলচ্চিত্রে প্রেম, করুণা, বীরত্ব বা হাস্য – সবই এই প্রাচীন রসতত্ত্বের নতুন রূপ।

সংস্কৃত সাহিত্য ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একদা গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, জাভা এবং বালির বহু প্রাচীন শিলালিপি সংস্কৃত ভাষায় রচিত। এই অঞ্চলগুলিতে রামায়ণ ও মহাভারত স্থানীয় শিল্প ও নাট্যধারায় নতুন রূপ পেয়েছে। 

আবার উনিশ শতকের বাংলা নবজাগরণে সংস্কৃত সাহিত্যের প্রভাব ছিল গভীর। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংস্কৃত সাহিত্য থেকে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। বিশেষত রবীন্দ্রনাথের কবিতায় উপনিষদের দার্শনিক সুর স্পষ্টভাবে অনুরণিত হয়।

সুতরাং ভাষা, রস ও সভ্যতার অনন্ত প্রবাহের  সংস্কৃত সাহিত্য কেবল প্রাচীন ভারতের স্মৃতি নয়; এটি ভারতীয় সভ্যতার আত্মার এক দীর্ঘ প্রতিধ্বনি। পাণিনির ব্যাকরণ ভাষাকে দিয়েছে যুক্তির শৃঙ্খলা। কালিদাস কাব্যে দিয়েছেন প্রকৃতি ও প্রেমের সৌন্দর্য। শূদ্রক ও ভাস নাট্যমঞ্চে এনেছেন জীবনের বাস্তবতা। ভবভূতি আবেগকে দিয়েছেন গভীরতা। মাঘ ও বাণভট্ট ভাষাকে করেছেন অলংকারময়। আনন্দবর্ধন ও মম্মট কাব্যের অন্তর্লীন সৌন্দর্যকে ব্যাখ্যা করেছেন। এই সব মিলিয়ে সংস্কৃত সাহিত্য এক মহৎ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য- যেখানে ভাষা, দর্শন, শিল্প ও মানবচেতনা এক অনন্ত স্রোতে মিলিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র : 

১. পাণিনি — অষ্টাধ্যায়ী

২. কালিদাস — অভিজ্ঞানশকুন্তলম, মেঘদূত

৩. শূদ্রক — মৃচ্ছকটিক

৪. ভবভূতি — উত্তররামচরিত

৫. মাঘ — শিশুপালবধ

৬. বাণভট্ট — কাদম্বরী, হর্ষচরিত

৭. দণ্ডিন — কাব্যাদর্শ

৮. আনন্দবর্ধন — ধ্বন্যালোক

৯. মম্মট — কাব্যপ্রকাশ

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস

৯ : সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ : উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মিলন ১১ : ভারতের মন্দির : শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সম্মিলন

Author

  • Nabakumar Das

    নবকুমার দাস পেশায় রাজ্য সরকারের উপসচিব পর্যায়ের আধিকারিক। ডব্লিউ বি সি এস এক্সিকিউটিভ হলেও লেখালেখি তার দ্বিতীয় সত্তা, তার অন্যতম পরিচয়। মহাভারতের গূঢ় রহস্য থেকে শুরু করে কল্পবিজ্ঞান, রহস্য উপন্যাস, প্রবন্ধ, গদ্য পদ্য ও অনুবাদে পারঙ্গম নবকুমার রোদ্দুর পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

This entry is part 10 of 14 in the series ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ :

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

This entry is part 10 of 14 in the series ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ :

Read More »

অনুবাদের স্বর্ণযুগ : মধ্যযুগ  

This entry is part 10 of 14 in the series ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক ১ : অনুবাদের

Read More »