৯ : সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ : উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মিলন

৯ : সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ : উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মিলন

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস

১ : সিন্ধু–সরস্বতী থেকে গঙ্গা

২ : সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার সমকালীন সর্বভারতীয় স্রোতধারা

৩ : বেদের বাণী থেকে পৌরাণিক ভারত

৪ : আরণ্যক থেকে বেদান্ত  : অন্তর্জগতের অভিযাত্রা

৫ : মৌর্য–গুপ্ত যুগ : ভারতীয় সভ্যতার আত্ম-অনুসন্ধান

৬ : গুপ্তোত্তর ভারত

৭ : ভারতে বসন্ত 

৮ : ধর্মরাজনীতি ও সম্রাট অশোক

৯ : সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ : উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মিলন

১০ : সংস্কৃত সাহিত্য : ভারতীয় চিন্তার ভাষা

১১ : ভারতের মন্দির : শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সম্মিলন

১২ : নৃত্য ও সংগীত : রস, তত্ত্ব ও ঐতিহ্য

আয়ুর্বেদ ও বিজ্ঞান : জীব রসায়নের দান

পুরাণ ও কাব্য : কল্পনার সাংস্কৃতিক বুনন

দ্রাবিড় ও আর্য সংস্কৃতির বিনিময় — ইতিহাস, নৃতত্ত্ব ও সভ্যতার সংলাপ

নবকুমার দাস 

 ভারতের সংস্কৃতি- ৯

ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাস একরৈখিক নয়; এটি বহুস্রোতের সমবায়ে গঠিত একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রা। এই যাত্রার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের চলাচল, ভাষার বিনিময়, বিশ্বাসের রূপান্তর এবং সামাজিক অভিযোজনের এক অনন্ত প্রক্রিয়া। উত্তর ভারতের বৈদিক ঐতিহ্য এবং দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড় সাংস্কৃতিক ধারা—এই দুই বৃহৎ ঐতিহ্যের দীর্ঘ সংলাপ ভারতীয় সভ্যতার এক অনন্য ভিত্তি নির্মাণ করেছে। এই মিলন কোনও হঠাৎ সংঘটিত ঘটনা নয়; এটি বহু শতাব্দীর ক্রমবিবর্তনের ফল। ইতিহাসবিদদের মতে ভারতীয় সভ্যতার প্রকৃত শক্তি এখানেই—এটি বহিরাগতকে আত্মস্থ করে এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে নতুন রূপ সৃষ্টি করে।

ইতিহাসবিদ রমিলা থাপার লিখেছেন, “ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাস বুঝতে গেলে এটিকে “interaction of traditions” হিসেবে দেখতে হবে; এখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক স্তর পরস্পরের সঙ্গে ক্রমাগত সংলাপে লিপ্ত। এই প্রবন্ধে সেই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সংলাপের ইতিহাস অনুসন্ধান করা হবে, দ্রাবিড় ও আর্য সংস্কৃতির বিনিময় কীভাবে ভারতীয় সমাজকে নতুন আকার দিয়েছে।

দ্রাবিড় সভ্যতা বা দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন সমাজ সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হল তামিল সঙ্গম সাহিত্য। এই সাহিত্য প্রাচীন তামিলাকম অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক জীবন্ত দলিল। সঙ্গম যুগে দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল তিনটি রাজ্য, চোল রাজ্য, পাণ্ড্য রাজ্য, চের রাজ্য। সঙ্গম সাহিত্যের কবিরা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বর্ণনা করেছেন। সেখানে সমাজকে পাঁচটি ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে, কুরিঞ্জি (পাহাড়),মুল্লাই (অরণ্য),মারুতম (কৃষিভূমি),নেইথাল (উপকূল),পালাই (শুষ্ক অঞ্চল)। প্রতিটি অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত ছিল নির্দিষ্ট দেবতা, সামাজিক জীবনপদ্ধতি ও সাংস্কৃতিক প্রতীক। পাহাড়ি অঞ্চলের দেবতা ছিলেন মুরুগন- যিনি যুদ্ধ, বীরত্ব ও প্রেমের দেবতা হিসেবে পূজিত হতেন। এই ধর্মীয় কাঠামো মূলত একটি প্রকৃতিনির্ভর বিশ্বাসব্যবস্থা—যেখানে দেবতা ও পরিবেশের মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান।

ইতিহাসবিদ কে এ নীলকান্ত শাস্ত্রী মনে করেন, দক্ষিণ ভারতের এই সমাজ ছিল মূলত আদিবাসী দলপতি (tribal chiefdom) থেকে রাজ্যব্যবস্থায় উত্তরণের এক রূপান্তর পর্যায়। অন্যদিকে উত্তর ভারতের প্রাচীনতম সাহিত্যিক দলিল হল ঋগ্বেদ।ঋগ্বেদের বহু স্তোত্রে একটি যাযাবর সমাজের কৃষিনির্ভর সমাজে রূপান্তরের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যেমন ঋগ্বেদের একটি বিখ্যাত মন্ত্র— “संगच्छध्वं संवदध्वं सं वो मनांसि जानताम्।” (ঋগ্বেদ ১০.১৯১.২) অর্থাৎ — একসঙ্গে চল, একসঙ্গে কথা বল, একসঙ্গে চিন্তা কর।

এই মন্ত্র সমাজের সম্মিলিত অস্তিত্বের ধারণাকে প্রতিফলিত করে। বৈদিক সমাজে ধীরে ধীরে একটি সামাজিক কাঠামো গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীকালে বর্ণব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত হয়। তবে এই কাঠামো স্থির ছিল না; বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্নভাবে এর রূপান্তর ঘটেছে। ভারতের ইতিহাসে আর্য ও দ্রাবিড় প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়েছে। একসময় মনে করা হত যে আর্যরা বাইরে থেকে এসে ভারতীয় উপমহাদেশে বসতি স্থাপন করেছিল। কিন্তু আধুনিক গবেষণা এই প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলেছে। ভাষাবিদ আসকো পারপোলা মনে করেন যে সিন্ধু সভ্যতার ভাষা সম্ভবত দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত ছিল।

অন্যদিকে ইতিহাসবিদ রমিলা থাপার বলে যে “আর্য” মূলত একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়, কোনও নির্দিষ্ট জাতিগত পরিচয় নয়। এই বিতর্কের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট—ভারতীয় সভ্যতা বহু সাংস্কৃতিক ধারার সম্মিলনে গড়ে উঠেছে। সাংস্কৃতিক বিনিময় প্রসঙ্গে ভারতের সামাজিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন সমাজবিজ্ঞানী এম. এন. শ্রীনিবাস। তিনি “Sanskritization” ধারণা প্রবর্তন করেন। তার মতে অনেক স্থানীয় সমাজ ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির আচার গ্রহণ করে সামাজিক মর্যাদা অর্জনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া একমুখী ছিল না।

দক্ষিণ ভারতের স্থানীয় সংস্কৃতিও বৈদিক ধর্মকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে—বিশেষত মন্দির পূজা, দেবী উপাসনা এবং ভক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে।  মজার বিষয় হল উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের ধর্মীয় রূপান্তর ঘটেছে। হয়েছে দেবতার মিলন। ভারতীয় ধর্মীয় ইতিহাসে দেবতাদের রূপান্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া। উদাহরণস্বরূপ শিব দেবতার বহু বৈশিষ্ট্য দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন লোকধর্মের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয় অরণ্যবাসী যোগী, পাহাড়ের অধিপতি এবং পশুপালকদের দেবতা—এই রূপগুলি দ্রাবিড় ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল খুঁজে দেয়। অন্যদিকে তামিল দেবতা মুরুগন পরবর্তীকালে স্কন্দ বা কার্তিকেয় নামে সর্বভারতীয় দেবতায় রূপান্তরিত হন। এই উদাহরণগুলি দেখায় যে ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতি মূলত একটি সমন্বয়মূলক প্রক্রিয়া।

একটি মত অনুযায়ী দক্ষিণ ভারতের ভক্তি আন্দোলন ভারতীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। নায়নার এবং আলভার সাধকেরা ধর্মকে নতুন ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন। তারা ঘোষণা করেছিলেন—ঈশ্বরের কাছে পৌঁছাতে জন্ম বা বর্ণ নয়, প্রয়োজন ভক্তি । এই ভাবনা মধ্যযুগীয় ভারতীয় সমাজে এক নতুন সামাজিক চেতনার জন্ম দেয়। পরবর্তীকালে এই ভক্তি ভাবনা উত্তর ভারতে ছড়িয়ে পড়ে এবং মীরাবাই, কবীর ও তুলসীদাসের মতো সাধকদের মাধ্যমে নতুন সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ধারার সৃষ্টি করে।

ভাষাবিজ্ঞানী মরিস এমেনো ভারতকে একটি “linguistic area” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।তার মতে ভারতের বিভিন্ন ভাষা—সংস্কৃত, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, বাংলা—দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ফলে একে অপরকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এই কারণেই ভারতীয় ভাষাগুলির মধ্যে বহু সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যেমন, ধ্বনি, ব্যাকরণ ও শব্দভাণ্ডারে।

উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের সাংস্কৃতিক মিলনের দৃশ্যমান প্রকাশ দেখা যায় মন্দির স্থাপত্যে। দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড় শৈলীর মহিমা দেখাদেখা যায় বৃহদেশ্বর মন্দির, মীনাক্ষী মন্দির ইত্যাদি ক্ষেত্রে। অন্যদিকে উত্তর ভারতের নাগর শৈলীর উদাহরণ খাজুরাহো মন্দিরসমূহ, কোনারকের সূর্য মন্দির ইত্যাদি। এই দুই শৈলী মিলেই ভারতীয় স্থাপত্যকে দিয়েছে বহুমাত্রিকতা।

নৃতাত্ত্বিকদের মতে ভারতীয় সভ্যতা একটি বহুস্বরের ঐতিহ্য (plural tradition) —যেখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পাশাপাশি সহাবস্থান করে। এই ঐতিহ্যের মধ্যে রয়েছে—বৈদিক সংস্কৃতি, দ্রাবিড় লোকধর্ম, বৌদ্ধ ও জৈন দর্শন, আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতি ইত্যাদি। এই বহুস্বরের সমন্বয়ই ভারতীয় সভ্যতার প্রকৃত শক্তি।

উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয়। এই শিক্ষা বলে যে সভ্যতা কখনও একক উৎস থেকে জন্ম নেয় না। এটি মানুষের চলাচল, ভাষার বিনিময় এবং বিশ্বাসের অভিযোজনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। দ্রাবিড় ও আর্য সংস্কৃতির দীর্ঘ সংলাপ ভারতীয় সমাজকে দিয়েছে—সহিষ্ণুতা, বহুত্ববাদ এবং সাংস্কৃতিক অভিযোজনের অসাধারণ ক্ষমতা।

এই কারণেই ভারতীয় সভ্যতা কেবল একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় নয়—এটি একটি চলমান সাংস্কৃতিক যাত্রা।

তথ্যসূত্র :

1. রমিলা থাপার — Early India

2. এম. এন. শ্রীনিবাস — Social Change in Modern India

3. মরিস এমেনো — India as a Linguistic Area

4. আসকো পারপোলা — The Roots of Hinduism

5. K. A. Nilakanta Sastri — History of South India

6. ঋগ্বেদ

7. Sangam Literature — Ettuthokai, Pattupattu

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস

৮ : ধর্মরাজনীতি ও সম্রাট অশোক ১০ : সংস্কৃত সাহিত্য : ভারতীয় চিন্তার ভাষা

Author

  • Nabakumar Das

    নবকুমার দাস পেশায় রাজ্য সরকারের উপসচিব পর্যায়ের আধিকারিক। ডব্লিউ বি সি এস এক্সিকিউটিভ হলেও লেখালেখি তার দ্বিতীয় সত্তা, তার অন্যতম পরিচয়। মহাভারতের গূঢ় রহস্য থেকে শুরু করে কল্পবিজ্ঞান, রহস্য উপন্যাস, প্রবন্ধ, গদ্য পদ্য ও অনুবাদে পারঙ্গম নবকুমার রোদ্দুর পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

আয়না

কুহেলী ব্যানার্জী একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি  ঘুরে বেড়াই বাতাসে। মানুষে মানুষে নিয়ত বিশ্বাসের  সংঘাত।  পথে ঘাটে সর্বত্র  ২১শে আইনের জয়জয়কার।  স্বার্থের পথে হাঁটে যারা  দিগভ্রষ্ট করার

Read More »

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন

This entry is part 9 of 14 in the series ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ :

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

আয়না

কুহেলী ব্যানার্জী একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি  ঘুরে বেড়াই বাতাসে। মানুষে মানুষে নিয়ত বিশ্বাসের  সংঘাত।  পথে ঘাটে সর্বত্র  ২১শে আইনের জয়জয়কার।  স্বার্থের পথে হাঁটে যারা  দিগভ্রষ্ট করার

Read More »

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন

This entry is part 9 of 14 in the series ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ :

Read More »

জীবনীসাহিত্য : গদ্যসাহিত্যের বিশেষ শাখা

This entry is part 9 of 14 in the series ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী ১ : বাস্তববাদ ও

Read More »