সুরঞ্জিত সরকার
পঞ্চম পর্ব
সুমন্ত কল্যাণদার সাথে অতীশের ঘর থেকে একপ্রকার ব্যর্থ হয়ে দোতলায় মা পূর্ণার ঘরে ফিরে আসে। পূর্ণা তখন জানলার পাশে বসে উদাস মনে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
সুমন্ত একমনে বলতে লাগল, “মা, দাদু কিছুতেই চাবিটা দিল না। গলার মালায় আটকে রাখা ওই ছোট চাবিটার ওপর দাদুর মায়া যে এত গভীর, আমরা ভাবতেও পারিনি।”
পূর্ণা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমি জানতাম। তোদের দাদু জ্ঞানত ওই চাবিটা হাতছাড়া করবেন না। ওটা শুধু একটা ডায়েরির চাবি নয় রে, ওটা তাঁর অস্তিত্বের শেষ সুতো। একটা কাজ তোরা ঠিক করে করতে পারিস না!”
হতাশার সুরে সুমন্ত বলল, “তাহলে কি দাদুকে কোনোভাবে রাজি করা যাবে না? ডায়েরিটা না পড়লে আমরা জানতেই পারব না ঠাকুমা আসলে কী চেয়েছিল!”
” এই মুহূর্তে দাদুকে আর বিরক্ত করিস না। সময় হলে চাবিটা নিজেই তোদের হাতে আসবে। এখন বরং এই বাড়িটা আগলে রাখ, কারণ বাইরের চেয়েও ভেতরের বিপদ অনেক বেশি।”
পূর্ণার এই সতর্কবার্তা দুই ভাইয়ের মনে কৌতুহল কমানোর বদলে যেন আরও রহস্যের মেঘকে ঘনীভূত করল।
চিন্তিত মুখে কল্যাণ মামীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু দিদার ওই নীল ডায়েরিটা আমাদের খুলতেই হবে। দ্বিতীয়বার চেষ্টা করতেই হবে, তবে এবার একটু অন্যভাবে।”
“অন্যভাবে মানে? দাদু তো ঘুমালেও একদম কাঁচা ঘুম। পা টিপে টিপে গেলেও ঠিক টের পেয়ে যাবে।” হাসতে হাসতে সুমন্ত বলে উঠল।
বাইরে ধীরে ধীরে রোদের তাপ বাড়তে শুরু করেছে। ডাইনিং টেবিলে ধোঁয়া ওঠা লুচি আর আলুর দম নামিয়ে রাখলেন পূর্ণা।
“আসলে দাদুর শরীরটা এখন আর আগের মতো নেই, কিন্তু ইন্দ্রিয়গুলো বড্ড সজাগ। তবে মামীর কথাই ঠিক। দাদু যখন সকালে স্নান করতে যায়, তখন তো চশমা আর রুদ্রাক্ষের মালাটা বিছানার পাশের টেবিলে খুলে রাখেন।” লুচি ছিঁড়তে ছিঁড়তে কল্যাণ মামীর দিকে তাকাল।
“সেটা ঠিক, কিন্তু ওই সময়টা মাত্র দশ মিনিট। আর স্নানঘরে থাকাকালীন উনি বারবার বাইরে কান পেতে থাকেন। কোনো শব্দ হলেই হাঁক পাড়বেন।”
“মা, এবার তোমার সাহায্য লাগবে। সকালে যেটা হয়নি, এখুনি সেটা করতে হবে। দাদু তো এখন স্নানে যাবে, তুমি নিচে গিয়ে দাদুর ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে আমাদেরকে কাগজের খবর পড়ে শোনানো শুরু করবে।” সুমন্ত বলে উঠল।
কল্যাণ উৎসাহিত হয়ে পাশ থেকে সুমন্তর পিঠে হাত দিয়ে বলল, ” সাবাশ! ঠিক বলেছিস। মামী যখন খবরের কাগজ পড়বে, তখন বাইরের আওয়াজে আমাদের পায়ের শব্দ ঢাকা পড়ে যাবে। তুই দাদুকে স্নানঘরের জানলার ওপাশ থেকে কোনো গল্পে ব্যস্ত রাখবি, আর আমি ওই দশ মিনিটের মধ্যেই মালা থেকে চাবিটা খুলে নিয়ে তার বদলে ঠিক একই ওজনের অন্য একটা চাবি লাগিয়ে দেব।”
পূর্ণা কাঁপা গলায় বললেন, “যদি উনি টের পান? তোদের দাদু মানুষটা কিন্তু খুব জেদি!”
সুমন্ত শুধু বলল, “টের পাবে না মা। জিজীবিষা তো দাদুর একার নয়, নীল ডায়েরির রহস্যটা জানার অধিকার আমাদেরও আছে। তুমি শুধু আমাদের একটু সময় দিও।”
প্রাতঃরাশের টেবিল থেকে তারা উঠে পড়ে এক নতুন কৌশলে দাদুর মুখোমুখি হওয়ার জন্য।
সকাল ১০টা। অতীশ রোজকার মতো তোয়ালে কাঁধে স্নানঘরের দিকে পা বাড়ালেন। এটাই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সুমন্ত ও কল্যাণ ইশারায় একে অপরকে সংকেত দিল।
পরিকল্পনা মতো পূর্ণা দাদুর ঘরের ঠিক বাইরের বারান্দায় একটি চেয়ার টেনে বসলেন। কাঁপা হাতে খবরের কাগজটা মেলে ধরে অস্বাভাবিক জোরে চোরা ভয় মিশ্রিত কন্ঠে আজকের হেডলাইনগুলো পড়তে শুরু করলেন। দাদুর কানে যাতে অন্য কোনো শব্দ না পৌঁছায়, এটাই ছিল তাঁর প্রধান কাজ।
সুমন্ত চট করে স্নানঘরের বাইরের জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দাদু ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই সে জানলার ওপাশ থেকে চিৎকার করে বলল, “দাদু, আজ কিন্তু দুপুরের মেনুতে তোমার প্রিয় ইলিশ মাছ হচ্ছে! মা কাল রাতেই আনিয়ে রেখেছে।”
ভেতর থেকে দাদুর গম্ভীর আওয়াজ এল, “হঠাৎ ইলিশ কেন রে? আজ কি কোনো বিশেষ তিথি?” সুমন্ত ইচ্ছে করেই কথা বাড়িয়ে দাদুকে ব্যস্ত রাখল যাতে ওনার পুরো মনোযোগ কথার দিকেই থাকে।
এই সুযোগে কল্যাণ বিড়ালের মতো পা ফেলে ঘরে ঢুকল। বিছানার পাশে টেবিলের ওপর দাদুর চশমা আর সেই রুদ্রাক্ষের মালাটা রাখা। চাবির রুপোলি ঝিলিক দেখে বুকটা ধক করে উঠল। পকেট থেকে একটা ছোট প্লায়ার্স বের করে অতি সাবধানে মালার কড়াটা আলগা করল। দাদুর স্নানঘরের ভেতর থেকে জল পড়ার শব্দ আর সুমন্তর অনর্গল বকবকানি ওর কানকে সতর্ক রাখছিল।
হঠাৎ সময়টা যেন থমকে গেল। দাদু ভেতর থেকে হাঁক দিলেন, “পূর্ণা, খবরের কাগজ পড়া থামালে কেন? ওই বাংলাদেশের বর্ডারের খবরটা পুরোটা পড় তো!”
পূর্ণা হকচকিয়ে গিয়ে আবার পড়া শুরু করলেন। কল্যাণের হাত তখন কাঁপছে। সে চাবিটা খুলে নিয়ে নিজের পকেটে রাখা হুবহু একই ওজনের একটা চাবি মালার সাথে গেঁথে দিল।
কাজ শেষ করে কল্যাণ এক মুহূর্ত দেরি না করে ঘরের থেকে বেরিয়ে ভারী পর্দাটার আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। ঠিক তার দু-মিনিট পরেই দাদু দরজা খুলে বেরিয়ে এল। ভিজে চুলে দাদু যখন টেবিল থেকে মালাটা তুলে গলায় পরল, কল্যাণের মনে হলো ওর হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু না, দাদু কিছুই বুঝতে পারল না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করতে লাগল।
কল্যাণ দ্রুত ইশারায় সুমন্তকে ওখান থেকে সরে যেতে বলল। নীল ডায়েরির চাবি এখন তাদের হাতের মুঠোয়।
দুই ভাই আর দেরি না করে সাইকেল নিয়ে সোজা পৌঁছাল ঠাকুমার স্মৃতিবিজড়িত সেই পুরনো পরিত্যক্ত রহস্যময় বাড়ি ‘পূরবী ভবন’-এ।
ঘরের জানলাগুলো বন্ধ থাকায় ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। সুমন্ত পকেট থেকে মোবাইলের টর্চ বের করে আলো ফেলল। কল্যাণ সোজা এগিয়ে গেল সেই ঘরটার কোণে, যেখানে বড় একজোড়া নীল রঙের ভারী মখমলের পর্দা ঝুলছে। পর্দার ওপর পুরু ধুলোর আস্তরণ জমে রঙটা প্রায় কালো হয়ে গেছে।
কল্যাণ হাত বাড়িয়ে পর্দাটা সজোরে সরিয়ে দিল। ঝরঝর করে ধুলো ঝরল ওদের গায়ে। পর্দার আড়ালে দেওয়ালের গায়ে একটা কাঠের পাল্লা ছিল, যেটা বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। সেই পাল্লাটা খুলতেই বেরিয়ে এল প্রাচীন আমলের একটা ভারী লোহার সিন্দুক। সিন্দুকের গায়ে খোদাই করা নকশা আর ঠিক মাঝখানে চাবি লাগানোর সেই পুরনো ছিদ্র।
সুমন্ত পকেট থেকে দাদুর মালা থেকে চুরি করা সেই ছোট রুপোলি চাবিটা বের করল। ওর হাত কাঁপছে উত্তেজনায়। সে ফিসফিস করে বলল, “দাদা, যদি এই চাবিতে না খোলে? যদি দাদু আগেই এটা বদলে দিয়ে থাকেন?”
কল্যাণ শান্ত গলায় বলল, “চেষ্টা তো কর। জিজীবিষার রহস্য আজ আমাদের জানতেই হবে।”
সুমন্ত চাবিটা সিন্দুকের ছিদ্রে ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে ঘোরাল। একটি যান্ত্রিক ‘ক্লিক’ শব্দ হলো এবং সিন্দুকের ভারী দরজাটা সামান্য আলগা হয়ে এল। ভেতর থেকে একটা ভ্যাপসা গন্ধ আর পুরনো কাগজের গন্ধ নাকে এল। টর্চের আলোয় তারা দেখতে পেল ভেতরে শুধু একটি নীল ডায়েরি নয়, বরং আরও কিছু পুরনো হাতে লেখা চিঠি আর একটা অদ্ভুত দর্শন তামার কবচ রাখা আছে।
ঠিক যখন কল্যাণ ডায়েরিটা হাতে নিতে যাবে, তখনই নিচতলার ঘরের দরজা খোলার এক বিকট আওয়াজ হলো। দুজনেই চমকে উঠল। এই জনমানবহীন বাড়িতে এই অসময়ে কে আসতে পারে? দাদু কি তবে টের পেয়ে পিছু নিয়েছে?


