৪ : আরণ্যক থেকে বেদান্ত  : অন্তর্জগতের অভিযাত্রা

৪ : আরণ্যক থেকে বেদান্ত  : অন্তর্জগতের অভিযাত্রা

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস

১ : সিন্ধু–সরস্বতী থেকে গঙ্গা

২ : সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার সমকালীন সর্বভারতীয় স্রোতধারা

৩ : বেদের বাণী থেকে পৌরাণিক ভারত

৪ : আরণ্যক থেকে বেদান্ত  : অন্তর্জগতের অভিযাত্রা

৫ : মৌর্য–গুপ্ত যুগ : ভারতীয় সভ্যতার আত্ম-অনুসন্ধান

৬ : গুপ্তোত্তর ভারত

৭ : ভারতে বসন্ত 

৮ : ধর্মরাজনীতি ও সম্রাট অশোক

৯ : সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ : উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মিলন

১০ : সংস্কৃত সাহিত্য : ভারতীয় চিন্তার ভাষা

১১ : ভারতের মন্দির : শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সম্মিলন

১২ : নৃত্য ও সংগীত : রস, তত্ত্ব ও ঐতিহ্য

আয়ুর্বেদ ও বিজ্ঞান : জীব রসায়নের দান

পুরাণ ও কাব্য : কল্পনার সাংস্কৃতিক বুনন

নারী ও সমাজ : দেবীচেতনা থেকে বাস্তব জীবন

লোকসংস্কৃতি : ভারতের আত্মার বহুস্বর

ভারতের উৎসব : ঋতুচক্র, কৃষি ও সমাজ

ভারতীয় ভাষার মহাযাত্রা

অন্তহীন বাঁশির সুর : ভারতীয় জনজীবনে শ্রীকৃষ্ণ

নবকুমার দাস 

ভারতীয় সভ্যতাকে কেবল আধ্যাত্মিক বা দার্শনিক সভ্যতা বলে চিহ্নিত করা এক ধরনের সরলীকরণ। কারণ এই সভ্যতা যতটা আত্মার কথা বলে, ততটাই বলে সমাজের কথা; যতটা নৈঃশব্দ্যের সাধনা, ততটাই ক্ষমতা, ভাষা ও সংস্কৃতির নির্মাণ। আরণ্যক থেকে উপনিষদ, উপনিষদ থেকে বেদান্ত—এই যাত্রাকে যদি আধুনিক সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণের চোখে দেখা যায়, তবে তা হয়ে ওঠে মানুষের আত্মপরিচয় নির্মাণের এক দীর্ঘ সামাজিক প্রক্রিয়া। এই যাত্রা কোনও বিমূর্ত চিন্তার ইতিহাস নয়। এটি গ্রাম থেকে অরণ্য, অরণ্য থেকে আশ্রম, আশ্রম থেকে বৌদ্ধিক পরিসরে মানুষের স্থানান্তরের ইতিহাস। অর্থাৎ, দর্শনের পাশাপাশি এটি সামাজিক অভিযোজনের দলিল।

ঋগ্বৈদিক সমাজ ছিল মূলত এক আচার নির্ভর সমাজ বা ritual-centered society। যজ্ঞ ছিল সামাজিক ক্ষমতার প্রধান ভাষা। যজ্ঞ পরিচালনার অধিকার ছিল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে; জ্ঞান ছিল বংশানুক্রমিক। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে একে বলা যায় প্রতীকী মূলধন symbolic capital-এর নিয়ন্ত্রণ।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আচারভিত্তিক সমাজে সংকট দেখা দেয়। যজ্ঞ যত জটিল হয়, ততই সাধারণ মানুষের কাছে তা দূরবর্তী হয়ে ওঠে। এখান থেকেই জন্ম নেয় এক সাংস্কৃতিক প্রশ্ন – এই আচার কি সত্যিই মুক্তির পথ, না কি এটি সামাজিক শ্রেণিবিভাজনের হাতিয়ার ? 

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই যেন আরণ্যকের আবির্ভাব। এবং আরণ্যক এর উদ্ভব মানেই ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সরে যাওয়া। তাই আরণ্যক কোনও নিছক দার্শনিক পাঠ নয়—এ এক প্রতিপাদ স্থান বা counter-space যা বৃহত্তর সভ্যতার জন্য জরুরি । নগর, রাজসভা ও যজ্ঞকেন্দ্র থেকে সরে এসে ঋষিরা অরণ্যে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। আধুনিক সাংস্কৃতিক তত্ত্বে একে বলা যায় withdrawal from hegemonic space বা আধিপত্যবাদী স্থান থেকে ফিরে যাওয়া ।

এখানে যজ্ঞের ব্যাখ্যা বদলে যায়। আচার আর বাহ্যিক নয়, তা হয়ে ওঠে অন্তর্লীন। এই রূপান্তর আসলে এক সামাজিক পুনর্বিন্যাস- ক্ষমতা চলে যায় দৃশ্যমান আচার থেকে ব্যক্তিগত সাধনায়, কর্তৃত্ব চলে যায় বংশানুক্রম থেকে অভিজ্ঞতায়। এইখানেই ভারতীয় সংস্কৃতি প্রথমবার বলে- জ্ঞান উত্তরাধিকার নয়, অনুশীলনের ফল। 

উল্লেখ করা দরকার যে উপনিষদ বস্তুতঃ এক সংলাপভিত্তিক সংস্কৃতি যা গ্রিক ডায়ালগের সঙ্গে তুলনীয়। উপনিষদকে যদি নৃতাত্ত্বিক চোখে দেখা যায়, তবে তা এক dialogic culture-এর নিদর্শন। এখানে গুরু সর্বজ্ঞ নন, শিষ্য নিঃশব্দ নয়। প্রশ্ন করাই শিক্ষার কেন্দ্রে। নচিকেতা, মৈত্রেয়ী, গার্গী—এই চরিত্রগুলি কেবল দার্শনিক নয়, তারা সাংস্কৃতিক প্রতীক। বিশেষত গার্গীর উপস্থিতি দেখায়, এই পরিসরে নারীর বৌদ্ধিক অংশগ্রহণ স্বীকৃত। উপনিষদীয় ঘোষণা- “নায়মাত্মা প্রবচনেন লভ্যঃ”- এই বাক্য আসলে শাস্ত্রকেন্দ্রিক জ্ঞানের বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। এটি বলে- জ্ঞান মানে কর্তৃত্ব নয়, উপলব্ধি।

উপনিষদের আত্মা–ব্রহ্ম তত্ত্বকে যদি সাংস্কৃতিক সমালোচনার চোখে দেখা যায়, তবে এটি এক radical humanism কারন এখানেই ঘোষণা করা হয় “অহং ব্রহ্মাস্মি” । এই ঘোষণা মানুষকে দেবতার অধীন কৃপাপ্রার্থী নয়, বরং চেতনার সহঅংশীদার করে তোলে। এটি সামাজিকভাবে বিপ্লবী—কারণ এতে জন্মভিত্তিক শ্রেণিবিভাজনের ভিত কেঁপে ওঠে। যদিও বাস্তবে তা পুরোপুরি ভাঙেনি, কিন্তু ধারণাগত স্তরে এটি ভারতীয় সংস্কৃতিকে এক গভীর মানবতাবাদী দিশা দেয়।

শঙ্করাচার্যের আগেই বেদান্ত ছিল এক বহুস্তরীয় মননচর্চার ক্ষেত্র বা plural intellectual field। একাধিক ব্যাখ্যা, একাধিক পথ- এই বহুস্বর ভারতীয় চিন্তার শক্তি। আধুনিক cultural critic-এর ভাষায়, এটি এক non-totalitarian knowledge system বা সর্বগ্রাসী নয় জ্ঞান ব্যবস্থা । শঙ্করাচার্য এই ধারাকে সুসংহত করেন, কিন্তু একক বা একমাত্র মত বলেন না । তাঁর অদ্বৈতবাদও এই বিতর্কের পরিসর খোলা রাখে। 

নাস্তিক দর্শন বা প্রান্তিক কণ্ঠস্বর শুনি চার্বাক, বৌদ্ধ, জৈন দর্শনে – এগুলি কেবল দার্শনিক মতবাদ নয়, এগুলি counter-cultural movements বা প্রতিবাদী আন্দোলনের ঢেউ । এরা যজ্ঞ, আত্মা ও পরকালকে প্রশ্ন করে। সাংস্কৃতিক দৃষ্টিতে এগুলি মূলধারার সঙ্গে দরকষাকষির ভাষা। ভারতীয় সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য এখানেই—এই ভিন্নমতগুলিকে সম্পূর্ণ বর্জন করা হয়নি; বরং সংলাপের পরিসরে রাখা হয়েছে।

আধুনিক যুগে উপনিষদ নতুন করে পড়া হয়েছে—জাতীয়তাবাদী চিন্তায়, বিজ্ঞানচর্চায়, এমনকি শিল্পসাহিত্যে। রবীন্দ্রনাথ, অরবিন্দ, রাধাকৃষ্ণণ—তাঁরা উপনিষদকে কেবল ধর্মগ্রন্থ নয়, সাংস্কৃতিক উৎসমূল বা cultural resources হিসেবেও  দেখেছেন। আজ চেতনা, পরিচয় ও অস্তিত্ব নিয়ে যে প্রশ্নগুলি আমরা করছি—উপনিষদ সেখানে প্রাচীন হলেও অপ্রাসঙ্গিক নয়।

আরণ্যক থেকে বেদান্ত—এই যাত্রা আমাদের শেখায়, ভারতীয় সংস্কৃতি কোনও স্থির কাঠামো নয়। এটি এক চলমান সংলাপ, যেখানে আচার, দর্শন, সমাজ ও ব্যক্তিসত্তা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে।

এই সভ্যতার মূল শিক্ষা তাই একটাই- বিশ্বাস নয়, অনুসন্ধানই সংস্কৃতির প্রাণ।

সংক্ষিপ্ত তথ্যসূত্র : 1. Patrick Olivelle, The Upanishads 2.S. Radhakrishnan, Indian Philosophy 3.Romila Thapar, Cultural Pasts 4. N.K. Bose, Culture and Society in India 5.Wendy Doniger, The Hindus

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস

৩ : বেদের বাণী থেকে পৌরাণিক ভারত ৫ : মৌর্য–গুপ্ত যুগ : ভারতীয় সভ্যতার আত্ম-অনুসন্ধান

Author

  • Nabakumar Das

    নবকুমার দাস পেশায় রাজ্য সরকারের উপসচিব পর্যায়ের আধিকারিক। ডব্লিউ বি সি এস এক্সিকিউটিভ হলেও লেখালেখি তার দ্বিতীয় সত্তা, তার অন্যতম পরিচয়। মহাভারতের গূঢ় রহস্য থেকে শুরু করে কল্পবিজ্ঞান, রহস্য উপন্যাস, প্রবন্ধ, গদ্য পদ্য ও অনুবাদে পারঙ্গম নবকুমার রোদ্দুর পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

ভারতীয় ভাষায় অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ

অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা তৃষ্ণা বসাক মনে আছে নরেন্দ্র হিরোয়ানিকে? টেস্ট অভিষেকে ১৬ টা উইকেট নিয়ে হইচই ফেলে দেওয়া সেই উজ্জ্বল যুবা (সালটা ১৯৮৮

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

ভারতীয় ভাষায় অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ

অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা তৃষ্ণা বসাক মনে আছে নরেন্দ্র হিরোয়ানিকে? টেস্ট অভিষেকে ১৬ টা উইকেট নিয়ে হইচই ফেলে দেওয়া সেই উজ্জ্বল যুবা (সালটা ১৯৮৮

Read More »

কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ ষষ্ঠ পর্ব দশ সেযাত্রায় কীভাবে যে কানাইকে ঘরে ফিরিয়ে এনেছিল শম্ভুচরণ, তা সেই সময় ঠিক জানতাম না। কেউ না বললে আর জানবই বা

Read More »