ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া )
রাজীব বরা
[ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে নাজিরা মহাবিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।রাজীব বরা সাহিত্যের বিভিন্ন বিভাগে নিজ প্রতিভার পরিচয় দানে সমর্থ হয়েছেন।তিনি একাধারে কবি,সমালোচক,গল্পকার,ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক।বর্তমান অসমিয়া কবিতার জগতে রাজীব বরা একটি অতি সুপরিচিত নাম।কাব্যগ্রন্থগুলি যথাক্রমে ‘তটিনী তীরর খেলা’,’ঢেউ’,’মানুহ চেরাই বাচি থকা নাযায়’,’মাউরর দিন’,এই ফালেও কবি আছে’।মৌলিক প্রবন্ধ সংকলন ছাড়াও সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘চিন্তা-পরিক্রমা’,’অসমিয়া আরু কথা সাহিত্যর আভাস’ ইত্যাদি।আলোচ্য উপন্যাস ‘সলিল সমাধি’ (‘জলজাহ’)মাখন হাজরিকা স্মৃতি উপন্যাস পান্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়। এছাড়াও শ্রীবরা বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ]
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ – বাসুদেব দাস
১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা পাঁচশত পঞ্চাশটির ও বেশি।সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিয়মিত ভাবে অসমিয়া গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করে চলেছেন।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত সংস্থা NEINADএর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য Distinguished Life Membership এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশটি।হোমেন বরগোহাঞির অসমিয়া উপন্যাস ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়) বাংলা অনুবাদের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন।
(৪)
ঢোল বাজায় খোল বাজায় সেখানে গড়ে উঠে অনেককাল বর্তে ধ্বংস হওয়া বা বেঁচে থাকা সভ্যতা স্মরণ করায়,শেখায় নদী-নির্ভর মানুষের বন্যার সঙ্গে অম্ল-মধুর সম্পর্ক ,মানুষের প্রকৃ্তি নির্ভর জীবন প্রয়োজন।তাই নাকি বহু বিলুপ্ত সভ্যতারও অস্থি-মজ্জার সঙ্গে নদীর সম্পর্কের কথাও নতুন আবিষ্কারে আলোয় আসে।অবশ্য জলহীন মরুভূমিতেও মানুষ থাকে।তবে নদীমাতৃক জায়গায় থাকে প্রচুর মানুষ।প্রাকৃ্তিক উদারতা দেখিয়ে নদী হাত উজাড় করে দেয় এবং ধ্বংসের অছিলায় মানুষের বুক ভেঙ্গে কখনও দেওয়াটুকু কেড়েও নেয়।
নদীর তীরের মানুষের নদীর সঙ্গে সম্পর্ক দেওয়া-নেওয়া ,ভাঙ্গা-গড়ার,ছেড়েও ছাড়তে না পারার।অসমের মতো নদীমাতৃক জায়গার অগণিত মানুষ এই কথা জানে যদিও নদীদ্বীপ মাজুলির বাসিন্দা সেটা হাড়ে হাড়ে অনুভব করে।
শালমরার পাশে যোগীগাঁওয়ে মামার বাড়িতে কাটানো শৈশব-কৈশোরের দিনগুলিতে ব্রহ্মপুত্র ভিজিয়ে ডুবিয়ে ফেলার সময় নদীর সঙ্গে গড়ে উঠা সম্পর্ক যে ছেড়েও ছাড়তে না পারা সেটা দামোদরের ভালোভাবে বুঝতে পারার মতো বয়স হয়নি।তথাপি সে বুঝেছিল –বর্ষার দুর্যোগ,গ্রীষ্মের ভোগ।
তার মধ্যে ছিল প্রকৃ্তির কাছে চরম অসহায় মানুষের মরেও বেঁচে থাকার মোহ।কেবল মোহ কি,কোথাও কোনোভাবে প্রকৃ্তিকে বশ করতে পারা সন্তোষও ছিল নাকি? নাহলে বাঁধ বেঁধে নিয়ে ভিত নিরাপদ হল বলে ভেবে পুনরায় বিপদে পড়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
ঢোল বাজায় কোথায় রতনপুরে।
খোল বাজায় কোথায় রতনপুরে।
কার কাছ থেকে এটা শিখেছিল দামোদরের মনে নেই।কিন্তু এটা গেয়ে লাফিয়ে বেড়ানোর বয়সে সে বুঝতেই পারে নি জীবনের ধারাপাঠ শেখা এই জায়গাটিতে এককালে রাজা রামচব্দ্র রতনপুর নামের রাজধানী পেতে রাজ্য শাসন করেছিল।জল তখনও মানুষকে নিরাশ্রয় করত।রামচন্দ্রের ভার্যাও ভরা ব্রহ্মপুত্রে নৌকা ডুবে জলে পড়েছিল।পশ্চিমের পাহাড়ের দিকে নীলাচল না কোথায় কোনো ব্রাহ্মণ তাকে জল থেকে উদ্ধার করেছিল।গর্ভবতী রানি সেখানে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছিল।আরি মাছের মতো পিঠে কুঁজ থাকার জন্য বড়ো হয়ে সেই সন্তানের নাম হয়েছিল আরিমত্ত।
আরিমত্তের বিক্রমের কাহিনিও সে শুনেছে। শুনেছে রতনপুরের মুখ থেকে ছড়িয়ে পড়া সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা। ঢোল-খোল বললেই এখনও পুরোনো সমৃদ্ধির কথা মনে করে মানুষের রতনপুরের কথা মনে করার কথা। সেই দিন কালের গর্ভে প্রবেশ করল।রতনপুরও বন্যার গ্রাসে পড়ল।তবে ঢোল-খোল থেকে গেল।
পরিত্যক্ত গ্রাম থেকে কুড়ি মাইল নৌকা বেয়ে ভরাবর্ষা লুইত-খাবলু পার হয়ে লখিমপুরের আত্মীয়ের বাড়িতে যাবার সময় শৈশবে বাবা বলা একটা কথাও দামোদরের মনে আছে–‘স্রোত ঘূর্ণিপাককে খুব একটা ভয় করবি না। নদীই আমাদের মতো মানুষের মাতা পিতা। তোকে আমি শুধু জন্ম দিয়েছি। নদীই লালন-পালন করবে।আমরা ছেড়ে গেলেও তোর সঙ্গে থাকবে নদীটি।’
নদী কীভাবে মানুষকে লালন পালন করে সেটা সে শৈশবে খুব একটা বুঝতে পারেনি ।তবে বড়ো হতে হতে সেটা কীভাবে সম্ভব তাও জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছে। লাঙ্গলের মুঠো ধরে চাষ করার সময় সে জানতে পারল– নদী মাঠকে বলাৎকার করেও গর্ভধারণের জন্য ফেলে যাওয়া পলিরূপ বীর্যের গুরুত্ব বুঝতে পারল।
বুঝতে পারল– দ্রুত বেড়ে চলা শস্যে কীভাবে ধীরে ধীরে জেগে উঠে জীবনের স্বপ্ন।ঘর ভাঙ্গা বন্যাকে গালিগালাজ করলেও নদীর তীরে বসবাস করা মানুষ মাঠের পলিমাটিকে দেহের চাদর বলে গ্রহণ করে। চরের সমৃদ্ধিতে সম্ভবত শুধু মাছ দুধই থাকে না, তার উপরে কিছু বোঝাতে না পারা সম্পর্ক একটাও নদীর সঙ্গে বাঁধা থাকে।
দামোদরের জন্ম বছরটিতে নাকি ঘরের ভিত ডুবে যাওয়া বন্যা হয়েছিল।চেরাশালির চঁচালির নিচে বন্যার জল আলোড়িত হচ্ছিল বলে,মা বলেছিল।তাকে জন্ম দেবার জন্য দুদিন মাকেও জলের চাঙ্গে উঠে যন্ত্রণায় আলোড়িত হওয়ার কথাও সে পরে জেনেছিল।
নতুন পোয়াতিকে জন্মদান করা কার্যে অঞ্চলটিতে বিখ্যাত, দক্ষ বকুলী পিসি পরবর্তীকালে তাকে কখনও কিছুই না জানার ভান করতে দেখে বলে–’খুব বেশি না জানার ভান করিস না। তোর তো বাঁচার আশাই ছিল না, কোনো রকমে নিঃশ্বাসটা থাকা অবস্থায় মায়ের পেট থেকে টেনে বের করেছিলাম। মা শ্বাস নেওয়ার মতো শক্তি হারিয়েছিল। আমি নাড়ি কাটলাম। এখন আমাকে নিয়েই হাসি-ঠাট্টা করিস। বদমা্শ কোথাকার’।তার জন্মের সময় বকুলি পিসি হয়তো বুড়ি ছিল না, হয়তো যুবতী ছিল।
কেন জানি বকুলি পিসির প্রতি তার একটা টান আছে। জন্মের সময় তাকে মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচানোর জন্য? সময়ের গতিতে বুড়ি হলেও পিসি শুধু তাকেই নয়, গ্রামের অনেককে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে। তারই কিছু গুপ্ত আখ্যান, ঢাকনার নিচে।
নরক জীবন থেকে কয়েকটি মেয়েকে বকুলি পিসি ফিরিয়ে এনেছে। কারও সঙ্গে গোপন সম্পর্কের ফলে কুমারী অবস্থায় গর্ভবতী হয়ে পড়ায় কয়েকজন যুবতীকে বাঁচিয়েছে, লজ্জার হাত থেকে বাঁচার জন্য কত যুবতীকে যে বাঁচিয়েছে তার কোনো লেখা জোখা নেই। দামোদরের মেয়েদের জন্মের সময়ও স্ত্রীর দেখাশুনা করেছে! তবে ততদিনে পিসি বুড়ি হয়েছে।
কিন্তু সঙ্গে দেখাশোনা করার কেউ না থাকায় বুড়ি বয়সে অথর্ব দেহে পিসি জলে ডুবে মরেছে। এক সময় একটি পরিপূর্ণ সংসারে সদস্য হয়েও শেষ বয়সে পিসি আশ্রয়হীন হয়ে পড়ল। বুড়িকে দেখাশোনা করার কেউ ছিলনা। রাতে আসা বন্যায় সামান্য কিছু সম্বল নিয়ে নৌকায় উঠে পাশের বাগানটাতে থাকা দেওর এবং তার পরিবার পরিজন নিয়ে পথে আশ্রয় নিয়েছিল।
উদ্ধার করাতো দূরের কথা, নিঃসঙ্গ মানুষটিকে চিৎকার করে কথা একটা জিজ্ঞেস করারও সুযোগ হল না। বকুলি পিসি চাঙেই থেকে গেল। থেকে গেল মানে? পরেরদিন লোকজন এসে পিসিকে পেল না। এক বুক জলে ঘরের ভেতরে শব হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল। পিসির কীভাবে মৃত্যু হল? দেওর কী একটা ব্যাখ্যা দিয়েছিল। সেটা কি সত্যি ছিল? মানুষগুলির পক্ষে সেটা না মেনে উপায় ছিল না। কিছু প্রশ্নের উত্তর রহস্য হয়েই থেকে গেল। বিপর্যয়ের সময় স্বাভাবিক ঘটনাও অস্বাভাবিক হয়।
বন্যায় জন্মগ্রহণ করা দামোদর বন্যার দৌরাত্ম্য সহ্য করে করে, সমস্যার সঙ্গে মোকাবিলা করে বড়ো হয়েছে। কেবল সেই কি? তার পিতামহ,প্রপিতামহ, পিতা, আত্মীয়-স্বজন, তার সমবয়স্ক প্রত্যেকেই। কত পরিবার মাজুলীতে স্থান পরিবর্তন করেছে। বন্যার তাড়া খেয়ে মাজুলীতেই এদিক ওদিক করেছে।তার মামার দিকের দুই দাদাও বন্যায় মৃত্যুবরণ করার দুঃখ নিয়ে অসমের অন্য প্রান্তে স্থান পরিবর্তন করেছে।
তবে, পরিত্যক্ত গ্রামের মানুষগুলিকে এভাবে জায়গা ছেড়ে যেতে হয়নি। মাজুলীর অন্য নদী তীরবর্তী জায়গা থেকে মধ্যমাজুলীতে , ওদের মতো গ্রাম গুলিতে জল হলেও নদীর দুরন্তপনা কম ছিল। তথাপি শৈশবে সে যোগী গ্রামের মামার বাড়িতে থাকা সময়ে বন্যার তাণ্ডব তাকে বেশ ভালো শিক্ষা দিয়েছিল। তাই এরাবাড়ির অন্য সমবয়স্কদের চেয়ে সে বন্যার কথায় নিজেকে বেশি অভিজ্ঞ বলে ভেবেছিল।
সেটা ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পের পরের কথা।যোগীগ্রামে স্থাপিত স্কুলটিতে পড়ানোর জন্য মামারা তাকে নিয়ে যাবার সময়ের কথা। তবে তারই মন দিয়ে পড়াশোনা করা হল না।বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের দুঃখ যন্ত্রণা থেকে তাকে রক্ষা করার জন্য মামারাই তাকে পরিত্যক্ত বাড়িতে ফেরত পাঠাল।
মামার বাড়িতে কাটানো কয়েকটি বছর, শৈশবেই সে বন্যার ভয়ঙ্কর রূপ দেখেছিল।দেখেছিল নদী বাঁধ ভেঙ্গে নিমেষের মধ্যে ধ্বংস করা গ্রামের ছবি। বাড়িঘর হারানো সর্বস্বান্ত মানুষের দুঃখ।তাই সে ফিরে এল তখনকার প্রেক্ষাপটে কিছু পরিমাণে বন্যা থেকে নিরাপদ এরাবাড়িতে। মায়ের স্নেহময় কোলে ।
তার সঙ্গে একই মাঠে গরু চড়িয়ে, খেলাধুলা করে বড়ো হওয়া পাশের গ্রামের দুটো সমবয়সী কোথায় গিয়েছিল। ওরা ফিরে আসতে পারেনি। অবশ্য ওরা মামার বাড়িতেও যায়নি। পরে সে জানতে পেরেছিল ওদেরকে নাকি পাঠানো হয়েছিল উদাসীন সত্রে –ভকত হওয়ার জন্য। মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে ঈশ্বরের স্নেহের খোঁজে ওরা শান্তি পেয়েছিল কি? সেই ভাবনাও কখনও দামোদরের মনে এসেছিল ?পরিণত জীবনে একালের শৈশব-কৈশোরের সঙ্গীদের সঙ্গে কখনও মুখোমুখি হওয়ার সময় ওরা যে বলেছিল তা থেকে বোঝা সম্ভব ছিল না; ওরা কোন জীবনটা ভালোবাসে–উদাসীন না গৃহস্থী।
তার মধ্যে কোনো একজন বাড়িতে আসার সময় রাখালের দিনে গরু গুলোকে উঁকি দিয়ে দেখে সঙ্গীদের শপথ খাইয়ে এরকম কিছু লজ্জাজনক কথা বলেছিল, যেগুলি মুখে আনা যায় না। যুবক হয়ে উদাসীনতা ছেড়ে সত্র থেকে পালিয়ে গিয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে সংসার পাতা দেউকনো তার সমবয়সী ছিল।
যোগী গ্রামের পাশের শালমরার ব্রহ্মপুত্রের তীরে কুমার করা গভীর গর্ত থেকে কুমার মাটি এনে সেও তা দিয়ে হাতি ঘোড়া তৈরি করেছিল। রোদে শুকিয়ে সেই মূর্তিগুলোতে চুন নিল ঘষে ভাঁড়ারের তাকে সাজিয়ে রেখেছিল। ব্রহ্মপুত্রের তীরে ঘুরে বেড়ানোর সময় নদীর খাড়াইতে মাটির কলস বোঝাই করে বেঁধে রাখা নৌকাগুলি সে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখত।শালমরার ঘরে ঘরে শুকিয়ে রাখা ঘট কলস গুলি দেখেছিল। মাজুলিতে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করা মাটির বাসন-পাত্র গর্তে রেখে পোড়ানো হত।
দাদুদের মুখে দামোদর শুনেছিল– আহোম রাজার রাজত্বকালে দোষীদের শূলে চড়িয়ে হত্যা করার জন্যই নাকি যোগীগাঁও জায়গাটার নাম শালমরা হয়েছিল। সেখানে বসবাস করা বৃত্তিধারী মানুষগুলির জীবনও কষ্টকর ছিল।
ব্রহ্মপুত্রের তীর খসিয়ে এনে পরবর্তীকালে কেবল বাঁধের উপরে তাদের কেন্দ্রীভূত করে রেখেছিল। তার ফলে সে দেখেছিল– পেঘালিতে পুড়িয়ে শক্ত করা কলস এবং মাটির বাসন গুলি, ব্যবসার জন্য নদীতে উজান ভাটায় যাওয়া আসা করা কলসির বোঝাবহন করান নৌকা গুলি বা সেই সব বিক্রি করে ফিরে আসা খালি নৌকাগুলি।
নদীতে ঘর্ঘর করে চলা ফেরির ইঞ্জিন নদীর তীরে তোলা প্রতিধ্বনিও শুনেছিল।
নদীর ওপারে কত বড়ো একটি পৃথিবী আছে তা জানা ছিল না। তবে মামার বাড়িতে হওয়া আলোচনায় কিছু কাহিনি সে শুনেছিল। দক্ষিণ পাড়ে, যোরহাটে বিয়ে দেওয়া মাসি কখনও ফেরিতে উঠে মায়ের কাছে আসত। গ্রীষ্মের সময় ডিঙ্গি নৌকাতেও আসা-যাওয়া করত। ছোটোখাটো দেখতে মেসো তাকে খুব আদর করত।
চর অঞ্চলে গরু চরানোর সময় বা অন্য কাজে নদীর তীরে যাবার সময় দাদু খন্ডিত বাঁধের শীর্ষে উঠে দূরে আঙ্গুল দেখিয়ে তাকে বলতো–‘এই যে পায়ের কাছে বাবা ব্রহ্মপুত্র, কয়েক বছর আগে ওই সেখানে ছিল। এখান থেকে হয়তো ছয় মাইলের মতো দূরত্ব হবে।এই ভাঙা বাঁধটার আগে ঐ ওখানে একটা বাঁধ ছিল।
দেখ এখন সেখানে জল আর জল।এই সমস্ত বাঁধের আগেই ভালো ছিল।জল আসত।চলে যেত।বাগানগুলি পরিষ্কার হয়ে যেত।জমিতে পলি জমা হত।বিল-পুকুর মাছে ভরে উঠত।বন্যায় ডুবে যাওয়া দিনগুলিতে কিছুটা কষ্ট হত যদিও তার ফলে খরালি ভোগ বেশি হত।পরে এই বাঁধটাই কাল হয়ে দাঁড়াল।সেবার ভাঙার সময় গ্রামটা পিষে ফেলল।মাঝখান দিয়ে একটা স্রোতধারা গিয়ে আপদ ঝরণাটা সৃষ্টি করল।ওপারে চরের সৃষ্টি হল।গ্রামটা দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেল।’
স্কুলের বিদ্যার প্রতি দামোদরের খুব একটা আগ্রহ ছিল না।তথাপি যে কারণে সে মামার বাড়িতে আশ্রিত ছিল সেইজন্য সে কয়েকদিন স্কুলে গিয়েছিল।যোগীগ্রামের নামঘরে পাতা স্কুল বালিচরকুহের তীরে সংস্থাপিত হয়েছিল যদিও বন্যার প্রকোপে সেটিও তার থেকে কোথাও দূরে নিয়ে যাবার জন্য সে কথা-বার্তা বলতে শুনেছিল।স্কুল্টা সেখান থেকে উঠিয়ে দূরে নিয়ে যাবার কথাটা নিয়ে তার কোনো চিন্তা ছিল না।
যে কয়েকদিন সে পাঠশালায় গিয়েছিল তার বগলের মধ্যে রাখা ছিল আসন। ছিল উপরের শ্রেণীতে পড়া কারও কাছ থেকে চেয়ে আনা মেমদের দেওয়া বর্ণবোধের বইটি। চোঙায় ভরে রাখা পেন্সিল দিয়ে অক্ষর লিখতে শিখেছিল।
পরে স্কুলের চেয়ে তার বেশি আকর্ষণ ছিল গ্রামটির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝরনার তীরের জঙ্গলটি। সময় পেলেই সমবয়সীদের সঙ্গে সেখানে ঘুরে বেরিয়ে ফলমূল যোগাড় করাই নয়, হাতে নিয়ে বেড়ানো গুলতি দিয়ে পাখি শিকারও করত। গ্রামের সামনের দিকে নল-খাগড়ার বন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকত। অবকাশ পেলেই দৌড়ে বিল, নদীর তীরে পৌঁছে যেত।
সে শুনেছিল–ধোঁয়া হাট বেলগুরিতে নাকি শংকর গুরু এবং মাধব গুরুর মিলন হয়েছিল। এখনও অন্য জায়গার মহন্ত বললে নাকি মাজুলীর সঙ্গে বংশ লতা জোড়া দেবার কেউ কেউ চেষ্টা করে। কথায় বলে–’মাজুলীতে ভিটে নেই, তুমি বাপু ধান না পতান?’তবে সেই ভিটে ছেড়ে মানুষকে চলে যেতে হওয়াটা বড়ো পরিতাপের কথা। এককালে শস্যে-মৎস্যে ভরপুর, পরিপূর্ণ লক্ষীর ভাঁড়ার ওদের জীবদ্দশাতেই অনেক পরিবর্তিত হয়ে গেছে। বিশেষ করে বন্যা এবং ভাঙ্গন দ্বীপটির পরিসর ছোটো করে তুলেছে।
দামোদর আগের কথাগুলি শুনেছে, ঠাকুরদা, ঠাকুরমার মুখ থেকে শালমরা মৌজাটির বিপত্তির কথা জেনেছে। যোগীগাঁওয়ের পাশে থাকা লহকর,বরমারী ইত্যাদি ছাড়াও গোপালপুর, দক্ষিণ পাট কৈবর্তগাঁও ,চিনাতলি, কমলপুর ইত্যাদি জায়গা বন্যা আর ভাঙ্গনের ফলে ধ্বংস হওয়ার কথাও শুনেছে। সেই সমস্ত গ্রামের বাসিন্দার নাজেহাল অবস্থার কথা বলে তারা দুঃখ প্রকাশ করে। ভিটে ছেড়ে উঠে যাওয়া সত্রগুলির কথাও জানতে পেরেছে।
পঞ্চাশের প্রবল ভূমিকম্পের দুই বছর পরে ওদের মামাদের গ্রামটিকে নিয়ে, বেচামরা পর্যন্ত তৈরি করা বাঁধটিও বন্যার জলকে বাধা দিতে বসে থেকে গ্রামের ভাঙনে যেন অবদান যোগাল। বাঁধ ভেঙ্গে আসা বন্যা গ্রাম গঞ্জ প্লাবিত করে ফেলল। তারপর থেকে বন্যার প্রকোপ বাড়ল। প্রায় নিয়মিত হল–যেখানেই মানুষের প্রতিরোধ হল, সেখানেই যেন প্রকৃতি স্পর্ধা দেখাতে শুরু করল। আজকের মাজুলীর যে দশা, তাদের জীবনেরও যে বিপর্যয় সেটা তো এই স্পর্ধারই ফল।
কখনও নিজের, কখনও অন্যের, কখনও যুবক কুলের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করা ছাড়া ওরা আর কী করতে পারে। প্রকৃতির বিপক্ষে যুদ্ধ করে আজ পর্যন্ত মানুষ দীর্ঘদিন জয়ী হতে পারেনি। সাময়িকভাবে অবকাশ লাভ করেছে যদিও শেষ পর্যন্ত যেন প্রকৃতিরই জয় হয়েছে।



