অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা - তৃষ্ণা বসাক
তৃষ্ণা বসাক
সপ্তম পর্ব
অনুবাদ ও লিপির সমস্যা
“যে বুলির লিপি আছে, সে বুলিই লোকে সব্বার আগে শুনতে পায়।”
(শবর গোষ্ঠীর এক যুবক)
ভাষাসুনামি আসছে। চারপাশে একবার সন্ত্রস্ত চোখ বুলিয়ে গলা নামিয়ে কথাটা বলেছিলেন মণিপুরী ভদ্রলোক, কুলমণি সিং।। কী জানি কেন একদম বেখাপ্পাভাবে মনে পড়ে গেছিল ‘পদিপিসির বর্মিবাক্সের’ অবিস্মরণীয় সেই লাইন ‘চোপ ইডিয়ট! দেখছিস না চারদিক থেকে অন্ধকারের মতো বিপদ ঘনিয়ে আসছে? রক্তলোলুপ নিশাচরেরা যাদের পিছু নিয়েছে তাদের কি নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করা শোভা পায়?’ মুহূর্তের মধ্যে গা ছমছমে একটা পরিবেশ তৈরি হয়ে গেছিল ওই একটা কথায়।
কেন এত বিপন্ন বোধ করেছিলেন ভদ্রলোক? আসলে এ বিপন্নতা তাঁর ভাষিক অস্তিত্বের বিপন্নতা। কিন্তু মণিপুরী তো বিপন্ন কোন ভাষা নয়, অষ্টম তফশিল ভুক্ত অন্যতম মণিপুরী, তাতে গল্পগাছা করার, লেখার, সাহিত্য রচনা করার লোক যথেষ্ট। এ তো বিকিয়া ভাষা নয়, যে ভাষায় কথা বলতেন ক্যামেরুনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ফুরুবানার একটিমাত্র নারী। ভাষার ভুবনে কী ভীষণ নিঃসঙ্গ তিনি, তাঁর সামনে ছিল কী ভয়ঙ্কর ভবিষ্যত, যখন তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে গেল বিকিয়া ভাষাটি, ত্রিভুবনে তার কোন অস্তিত্বই থাকল না। আমরা জানি, পৃথিবীতে প্রতিদিনই এরকম কত ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, কত ভাষা এগিয়ে যাচ্ছে বিলুপ্তির পথে। ক্ষমতাবানের ভাষার দাপটে ছটফট করছে আরও কত ভাষা।
আর ভাষিক নিঃসঙ্গতা যখন স্বেচ্ছানির্বাচিত হয়? মনে পড়ে গেছিল সেই কিশোরীকে। স্কটল্যান্ডের স্কুলপড়ুয়া সেই কিশোরী, যাকে ক্লাসটিচার রচনা লিখে আনতে বলেছিলেন গরমের ছুটি কেমন কাটল, এই বিষয়ে। টিচারের কথা মোটেই অমান্য করেনি সেই মেয়ে, রচনা লিখে ঠিক সময়েই সে জমা দিয়েছিল। কিন্তু তা দেখে তো টিচারের আক্কেল গুড়ুম! কারণ আগাগোড়া রচনাই সে লিখেছিল এস এম এস সঙ্কেতে। টিচারের বিমূঢ় প্রশ্নের জবাবে সে বলেছিল মাতৃভাষা গেলিক বা ইংরেজির চেয়ে এই সংকেতেই সে বেশি স্বচ্ছন্দ।
এ কথা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই, এখন তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশই যে দেশের অধিবাসী, তার নাম সাইবারস্পেস, সেখানে তারা সিটিজেন নয়, নেটিজেন। তাদের নতুন ভাষার নাম ইমোটোকন বা স্মাইলি। এসবই তাদের মাতৃভাষার জায়গা নিচ্ছে। এই বৈদ্যুতিন বিস্ফোরণের ধাক্কায় ভাষা বিপন্ন কিনা সেটা অবশ্য অন্য আলোচনার বিষয়। মণিপুরী ভাষার মূল সমস্যা কিন্তু তা নয়।
বাহন ছাড়া যেমন দেবদেবীদের চেনা যায় না, তেমনি ভাষাকে চেনার অভিজ্ঞান হল লিপি। এই লিপি যেমন ভাষার লিখ্য, মুদ্রিত মাধ্যমে চলাচলের পথ সুগম করে, আবার অন্য ভাষাভাষীর প্রবেশের পথে সঙ্গিন উঁচিয়ে পেয়াদার মতো দাঁড়ায়, সেই পেয়াদাকে এড়িয়ে ভাষার অন্দরমহল তো দূরের কথা, বারদালানে ঢোকারও জো নেই। কারণ মুখে মুখে শুনে শুনে অচেনা কোন ভাষায় বেশ কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়, তাতে মাছের বাজারে দরদস্তুর করা চলে, প্রেম নিবেদন করা যায় কিংবা আচ্ছা করে কাউকে দুকথা শুনিয়ে দেওয়াও যায়, কিন্তু লিপি না জানলে লেখাও যায় না, পড়াও যায় না। যেমন ওড়িয়া ভাষা শুনলে মোটামুটি বোঝা যায় কী বিষয়ে কথা হচ্ছে, কিন্তু ওড়িয়া লিপি আমাদের কাছে দু র্ভেদ্য। এর ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটে মণিপুরীর বেলায়। মণিপুরী ভাষার একবর্ণ না বুঝতে পারলেও, এর লিপি আমরা (অর্থ না বুঝেই অবশ্য) গড়গড় করে পড়ে যেতে পারব। কারণ মণিপুরী লেখা হয় বাংলা লিপিতে। অর্থাৎ ভাষা মণিপুরী কিন্তু লিপি বাংলা। বরাবর কিন্তু তা ছিল না।
মোটামুটিভাবে বলা যায় খ্রিস্টিয় অষ্টাদশ শতক থেকে মণিপুরী ভাষার বাহন হয়ে এল বাংলা। তার মূল কারণ মহারাজ ভাগ্যচন্দ্রের রাজত্বকালে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রসার, যা বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলা লিপিকেও আত্মীকরণ করল, বাংলা লিপির আরও রমরমা হল উনিশ শতকের শেষ দিকে , ব্রিটিশ রাজত্বকালে।ব্রিটিশের হাতে স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে নিজের লিপির অধিকারও হারাল মণিপুর। সাহেবরা স্বচ্ছন্দ বোধ করল ইতিমধ্যেই পরিচিত বাংলা লিপির মাধ্যমে শাসনকাজ চালাতে। তাছাড়া শ্রীরামপুর মিশনে বাংলা হরফের নির্মাণ নিশ্চয় এই উদ্যমে ইন্ধন জুগিয়েছিল। যার ফলশ্রুতি হিসেবে এল বাংলা লিপি, পেছনে পড়ে গেল এ যাবত প্রচলিত লিপি মৈতৈ। আর তার দু শতকেরও পরে মণিপুর সরকারের ঘোষণা- মণিপুরে পুনঃপ্রবর্তিত হবে মৈতৈ বাংলার বদলে। আর সেখানেই কুলমণি সিং-র বিপন্নতার শুরু।
এই মৈতৈ লিপির উৎস খুঁজে পেতে আমাদের একটু পুরাণ আর একটু ইতিহাসের দ্বারস্থ হতে হবে। রাধাকৃষ্ণের রাসনৃত্য দেখে পার্বতীর সাধ হয় তিনিও শিবের সঙ্গে ওইরকম যুগলে নাচবেন। কিন্তু তাণ্ডবে অভ্যস্ত নটরাজের প্রলয়নাচন সহ্য করার ক্ষমতা কোন সমতলের আছে? তাই অনেক খুঁজে পেতে উত্তর-পূর্ব ভারতে হিমালয়ের দক্ষিণে একটি জলাশয় পছন্দ করলেন মহাদেব। তাঁর ত্রিশূলের এক খোঁচায় নালা দিয়ে সব জল বেরিয়ে তৈরি হল বিশাল সমতলভূমি, কেবল একপাশে রইল একটি হ্রদ। হরগৌরীর সেই নাচের মঞ্চ নাকি আজকের ইম্ফল (মণিপুরের রাজধানী) আর সেই হ্রদটি লোকতাক হ্রদ। এই পুরাণকথা আমাদের মনে করিয়ে দ্যায় মণিপুরের ইতিহাস বড় কম প্রাচীন নয়। আর মণিপুর নামটিও তো হালের। এর আদত নাম সনাপুং, মতান্তরে সুবর্ণভূ যার মানে সোনার দেশ। যে দেশের জাতি, ভাষা ও লিপি মৈতৈ নামেই পরিচিত। কেউ বলেন মৈতৈ মানে তাদের থেকে মানে অন্যান্য পার্বত্য উপজাতি থেকে, আবার কারো মতে শব্দটি এসেছে মইনা তইরপ্পা থেকে যার মানে সূর্য থেকে অবতরণ।
কত পুরনো এই লিপি? যেকোন ভারতীয় ভাষার থেকে এই ভাষা ও লিপি প্রায় এক থেকে দেড় হাজারেরও বেশি পুরনো, এমন প্রমাণ আছে। প্রথমে এই লিপিতে অক্ষর সংখ্যা ছিল আঠেরটি, স্বরবর্ণ ছিল না। কেমন লেগেছিল মণিপুরীদের, যখন এত পুরনো, এতকালের অভ্যস্ত একটি লিপিকে হঠিয়ে তাঁদের ভাষার বাহন করা হয়েছিল বাংলাকে? এ যেন বহুকালের চেনা রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে একজন দেখলেন সবকিছু আমূল বদলে গেছে। ছোট বাড়ি ভেঙে বহুতল, দোকানের জায়গায় শপিং মল, মোড়ের যে দোকানটা থেকে সিগারেট কিনতেন তার জায়গায় একটা মোবাইল কিয়স্ক। প্রতিপদে হোঁচট খেয়ে, ঠিকানা খুঁজে না পেয়ে ফিরে আসতে হল অগত্যা। মৈতৈ থেকে বাংলা লিপিতে বদলের সময় ঠিক এই ব্যাপারগুলোই ঘটেছিল। তারও বেশি। কারণ লিপি বদলালে ব্যবহারিক সমস্যার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভাষিক অস্তিত্বের সংকটের প্রশ্ন। প্রখ্যাত দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার যাকে বলেছেন যেখানে ভাষা, সেখানেই বিশ্ব, অর্থাৎ ভাষার ভিত্তির ওপর অস্তিত্বের সমগ্র ধারণা দাঁড়িয়ে আছে।
এবার অনুভব করা যাচ্ছে কুলমণি সিংর আতঙ্কের চেহারাটা? তিনি সঠিকভাবেই আঁচ করতে পেরেছিলেন আবার লিপিবদলের আঘাত মণিপুরী ভাষাবিশ্বে কীভাবে নেমে আসবে, ক্রমে তা নেবে সুনামির চেহারা।
হঠাৎ লিপি বদলে গেলে কী হয়? মানে স্কুল কলেজ অফিস আদালতে, লেখা ও প্রকাশনায়, টিভির সাবটাইটেলে সামগ্রিক বদল হলে? প্রথমত পুরনো লিপিতে অভ্যস্ত পুরনো প্রজন্ম আক্ষরিক ভাবেই হয়ে যাবেন নির্জন দ্বীপবাসী, তাঁরা বর্তমান লিখিত মাধ্যমের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলবেন। দ্বিতীয়ত নতুন লিপিতে পঠনপাঠনে অভ্যস্ত তরুণ প্রজন্ম পুরনো লিপিতে লেখা সাহিত্য পড়তে পারবে না, তারা শিকড় থেকে উৎখাত হবে অজান্তেই। যেখানে এখন প্রায় প্রতিটি ভারতীয় শিশুকে মাতৃভাষা ছাড়া ইংরেজি তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে হিন্দীও শিখতে হয়, সেখানে তার ওপর তারই মাতৃভাষার পুরনো লিপি চাপানো অসম্ভব এবং অবাস্তব। তৃতীয়ত পুরনো লিপিতে লেখা বইপত্র ইত্যাদির বৈদ্যুতিন ডেটাবেস তৈরির বিপুল চাপ ঘাড়ে চাপবে। অথচ তা না করা গেলে রাশি রাশি ছাপা বই ও পুঁথিকে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন এবং গবেষক ছাড়া অন্য কারো কাছে তার মূল্যই বা কতটুকু?
লিপি বদলে গেলে অনুবাদের কাজটিও ব্যহত হয়, বিশেষ করে তাঁদের জন্যে, যারা মূল থেকে অনুবাদ করেন। এতদিন যে লিপি থেকে তাঁরা অনুবাদ করছিলেন, আচমকা সেই লিপি বদলে গেলে, আবার নতুন করে একটি লিপি শিখে নেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাঁদের আর উৎস ভাষাটির মধ্যে সঙিন উঁচিয়ে পাহারা দ্যায় একটি স ম্পূর্ণ অচেনা লিপি।
এইরকম রাশি রাশি ধূলিধূসর বই আর পুঁথির দেখা পেয়েছিলাম ললিত নারায়ণ মিথিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের (দ্বারভাঙ্গা) লাইব্রেরিতে। মৈথিলী ভাষার বই, পুঁথি কিন্তু এখন ওই লিপি প্রায় কেউই পড়তে পারেন না। বর্তমানে মৈথিলী লেখা হয় দেবনাগরী বা হিন্দী লিপিতে। আগে তা লেখা হত মিথিলাক্ষর বা তিরহুতিয়া লিপিতে, যা হঠাৎ দেখলে বাংলা বলে ভুল হতে পারে। এতটাই মিল। এই লিপিকে সরিয়ে এল হিন্দী। কেন? অদ্ভুত সেই কাহিনি।
মৈথিলী রাজারা বরাবরই শিল্পসাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক, কিন্তু তাঁদের পক্ষপাত সংস্কৃতের ওপর।রাজদরবারে মৈথিলী চিরকালের উপেক্ষিতা। যখন হাতে লেখা পুঁথির যুগ শেষ হয়ে ছাপাখানা এল, তখন প্রয়োজন হল তিরহুতিয়া বা মিথিলাক্ষরের ধাতব হরফ ঢালাই করার। কিন্তু সেই কাজ করার মতো পরিকাঠামো নাকি তৎকালীন মিথিলার ছিল না। তাই হাতের কাছে পাওয়া দেবনাগরী হরফেই ছাপা হতে লাগল মৈথিলী। তিরহুতিয়া থেকে গেল প্রাচীন পুঁথিপত্রের হলদে হয়ে যাওয়া পাতার আড়ালে, কবে কে এসে ধুলো ঝেড়ে হাতে তুলে নেবে তার অপেক্ষায়। বৈদ্যুতিন ডেটাবেসে সংরক্ষণের অভাবে কত যে অমূল্য সম্পদ হারিয়ে যেতে বসেছে তার ঠিকঠিকানা নেই। তিরহুতিয়া লিপিতে অভ্যস্ত মৈথিলী লেখকরা বাংলা পড়তে পারতেন স্বচ্ছন্দে, মূল থেকে তাঁরা পড়েছেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, পরশুরাম। সেখানে তরুণ প্রজন্ম বাংলার ঘনিষ্ঠ সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন, লিপির বদল ছোট করে দিয়েছে তাঁদের ভাষাবিশ্বকে।
আর একসময় অনেকেই মূল মৈথিলী পড়তে পেরেছেন এবং অনেক অনুবাদও করেছেন, যেহেতু লিপি ছিল তিরহুতিয়া, এখন লিপির পরিবর্তনের কারণে ভাষাটি আচমকা তাঁদের অচেনা হয়ে গেছে, অনুবাদ তাই কমে গেছে অনেক।
ঠিক এই পরিণতির পথেই হাঁটছে মণিপুরী ভাষা এবং ভাষাকেন্দ্রিক সমাজ-সংস্কৃতি। স্মরণকালের মধ্যে দু-দুবার ভাষাবদলের অভিঘাত কি সামলাতে পারবে এই ভাষা? কেমনই বা দাঁড়াবে বাংলা-মণিপুরি অনুবাদের ভবিষ্যৎ?


