৭ : ভারতে বসন্ত 

৭ : ভারতে বসন্ত 

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস

১ : সিন্ধু–সরস্বতী থেকে গঙ্গা

২ : সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার সমকালীন সর্বভারতীয় স্রোতধারা

৩ : বেদের বাণী থেকে পৌরাণিক ভারত

৪ : আরণ্যক থেকে বেদান্ত  : অন্তর্জগতের অভিযাত্রা

৫ : মৌর্য–গুপ্ত যুগ : ভারতীয় সভ্যতার আত্ম-অনুসন্ধান

৬ : গুপ্তোত্তর ভারত

৭ : ভারতে বসন্ত 

৮ : অশোক ও ধর্মরাজনীতি

৮ : অশোক ও ধর্মরাজনীতি

নবকুমার দাস 

II ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ II

ভারতবর্ষে ঋতুচক্র কেবল জলবায়ুর পরিবর্তন নয়, এ এক মহাকাব্যিক অভ্যন্তরীণ সঞ্চরণ। শীতের অন্তরালে দীর্ঘ নির্জনতার পরে যখন আলো একটু নরম হয়, বাতাসে মধুমঞ্জরীর গন্ধ ভেসে আসে, পলাশের ডালে আগুনের রঙ লাগে, কৃষ্ণচূড়া নীরবে রক্তিম স্বাক্ষর রাখে – তখন আসমুদ্রহিমাচল – ভারতবর্ষ বুঝে নেয়, বসন্ত এসে গেছে। এই আগমন কেবল প্রকৃতির নয়, সংস্কৃতিরও; কেবল ফুলের নয়, দর্শনেরও; কেবল উৎসবের নয়, আত্ম-উদ্ভাসেরও।

বসন্ত ভারতীয় চেতনার সেই এক সন্ধিক্ষণ, যখন মাটি ও মন, কৃষি ও কাব্য, ধর্ম ও দেহ, শাস্ত্র ও লোকসংস্কার বা লোকায়ত ভাবনা একত্রে এক অনির্বচনীয় সমবেত সঙ্গীতের সুরে মিশে যায়। ঋগ্বৈদিক যুগে ঋতুর ধারণা ছিল কেবল প্রাকৃতিক পর্যায়ের চিহ্ন নয়; তা ছিল জগৎ সংসারের সার্বজনীন নিয়মের প্রকাশ—“ঋত”। ঋগ্বেদ-এ ‘ঋত’ শব্দটি বিশ্বব্যবস্থার সেই অন্তর্নিহিত সত্যকে নির্দেশ করে, যার মধ্যেই ঋতুচক্রের পুনরাবৃত্তি।

ঋগ্বেদের এক স্থানে উচ্চারিত— ঋতেন ঋতম্ অপিহিতং ধ্রুবং বাং সূর্যস্য যত্র বিমুচন্তি অশ্বাঃ। অর্থাৎ ঋতের দ্বারা ঋতই আবৃত; সূর্যের অশ্বগণ যেখান থেকে মুক্তি পায়—সেই নিয়মেই বিশ্বচক্র। ঋতু-চেতনার এই দর্শন পরবর্তী কালে উপনিষদে আরও অন্তর্মুখী হয়। ছান্দোগ্য উপনিষদ-এ প্রকৃতি ও প্রাণের সম্বন্ধকে একাত্ম করে বলা হয়েছে-  সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম। এই সমস্তই ব্রহ্ম। অতএব বসন্তের আগমন মানে কেবল বাহ্যিক রূপবদল নয়—এ ব্রহ্মের রূপান্তরিত প্রকাশ।

বৈদিক যজ্ঞকালে বসন্ত ছিল নবযাত্রার সূচনা-সময়। অগ্নিহোত্র, সোমযজ্ঞ—সবই এক নবীনতার প্রতীক। বসন্তকে বলা হয়েছে “মধুমাস”—যার অর্থ মধুর ঋতু। যজুর্বেদ-এ উচ্চারিত—  মধু বাতাঋতায়তে, মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ। অর্থাৎ, বায়ু মধুর, নদী মধুক্ষরিত—এই মধুত্বই বসন্তের রসতত্ত্ব।

বৌদ্ধ ধর্মে ঋতুচক্র অনিত্যতার প্রতীক। গৌতম বুদ্ধ প্রকৃতির পরিবর্তনকে দেখেছিলেন জন্ম–জরা–মরণের চক্রের সঙ্গে মিলিয়ে। ধম্মপদ-এ আছে – অনিচ্চা বত সঙ্খারা, উপ্পাদ-বয়-ধম্মিনো। অর্থাৎ , সংসারের সকল সঙ্কার অনিত্য; উৎপন্ন হয়ে বিনষ্ট হয়। বসন্তে যখন গাছের পাতা ঝরে নতুন কুঁড়ি আসে, বৌদ্ধ দৃষ্টিতে তা অনিত্যতার দৃশ্যমান পাঠ। তবু এই অনিত্যতায় আছে সৌন্দর্য। শালবনে, আম্রকুঞ্জে, রাজগৃহের উপত্যকায় বসন্তে সংঘবাসের সময় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা প্রকৃতির পুনর্জন্মকে ধ্যানের বিষয় করেছেন।

বৌদ্ধ শিল্পকলায়—অজন্তার ফ্রেস্কোতে—বসন্তের লতাপাতার নকশা অনিত্যতার মধ্যেও স্থায়ী সৌন্দর্যের আকাঙ্ক্ষা। 

আবার জৈন দর্শনে বসন্তের তাৎপর্য দ্বৈত—একদিকে প্রকৃতির জাগরণ, অন্যদিকে দেহসংযমের সময়। মহাবীর-এর জীবনীতে বসন্তকালীন তপস্যার উল্লেখ আছে। জৈন আগমে বলা হয়েছে –  উপসমেণ হৱৈ সাধু। বা উপশমেই সাধুতা। 

বসন্তের রঙিন উত্তেজনার মধ্যে জৈন তপস্বী সংযমকে বেছে নেন—এ যেন রঙের ভেতর সাদা, উল্লাসের ভেতর নীরবতা।

দাক্ষিণাত্যের সংগম সাহিত্যে ঋতুচক্র প্রেমের ভূগোল। অকনানুরু ও কুরুঞ্জিপ্পাট্টু-এ পাহাড়ি অঞ্চলের ফুল, পাখি ও প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনের সঙ্গে বসন্ত জড়িয়ে আছে। তামিল কবিরা বলেছেন- মুল্লৈ পুক্কুম্ কালাম্ কাধলিন্ নেরাম্। অর্থাৎ মুল্লাই ফুল ফোটার সময়ই প্রেমের সময়। 

দাক্ষিণাত্যের বসন্ত তাই কেবল ঋতু নয়—এ প্রেমময় ভালবাসার সময়। অন্যদিকে উত্তর ভারতে বসন্তের সর্বাধিক উজ্জ্বল উৎসব হোলি। হোলি-র পৌরাণিক উৎস ভাগবত পুরাণ-এ প্রহ্লাদ-হিরণ্যকশিপুর কাহিনিতে। হোলি কেবল পৌরাণিক দহন নয়—এ সামাজিক সমতা ও অবাধ উল্লাসের দিন। ব্রজভূমিতে বৃন্দাবন-এ লাঠিমার হোলি, আবীর-গুলালের উৎসব—সবই কৃষ্ণ-রাধার লীলার স্মারক। কৃষ্ণ-এর রঙখেলা ভারতীয় কল্পনায় প্রেমের আধ্যাত্মিক রূপান্তর। তবে বাংলায় বসন্ত মানেই দোলযাত্রা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্তকে দিয়েছেন আধুনিক নান্দনিক ভাষা। শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব—রঙিন আবীর, নৃত্য, গান—ভারতের আধুনিক সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের প্রতীক। আবার, বাংলা কীর্তনে দোলের দিন- “আজ দোল দোল দোলনচাঁপা…” এই গান কৃষ্ণভক্তির সঙ্গে লোকরসকে মিলিয়ে দেয়।

পাঞ্জাবে বসন্ত মানে বৈশাখী। শস্য কাটার আনন্দে নৃত্য—ভাংড়া। এটি শিখ ইতিহাসেও তাৎপর্যপূর্ণ—গুরু গোবিন্দ সিং ১৬৯৯ সালে খালসা প্রতিষ্ঠা করেন বৈশাখীর দিনে। অতএব বসন্ত এখানে কৃষি ও ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের সমবায়। যেমন, অসমে রঙালি বিহু—বসন্তের আহ্বান। যুবক-যুবতীর নৃত্য, বাঁশির সুর—নদী ও পাহাড়ের মাঝে কৃষিভিত্তিক জীবনচক্রের নবসূচনা।

নৃতত্ত্ববিদ ভিক্টর টার্নারের ‘লিমিনালিটি’ তত্ত্ব অনুসারে বসন্ত হল এক সীমানাবর্তী সময়—শীতের সমাপ্তি ও গ্রীষ্মের পূর্বাভাস। এই সময়ে সামাজিক নিয়ম শিথিল; রঙ, নৃত্য, হাসি—সবই সাময়িক উল্টোদিক।ভারতে হোলির দিন জাতপাতের প্রাচীর শিথিল; বিহুর নৃত্যে যৌবনের উন্মুক্তি; দোলে আধ্যাত্মিক রঙ। বসন্ত তাই সমাজের আত্মশুদ্ধির এক অবচেতন রীতি।

আধুনিক শহরে বসন্তের অনুভব বদলেছে। বহুতল, কংক্রিট, দূষণের মাঝে পলাশের আগুন কম দৃশ্যমান। তবু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, সাহিত্যসভায়, শিল্পমেলায় বসন্ত এখনও প্রতীক। বসন্ত মানে পুনর্জন্ম। বসন্ত মানে অনিত্যতার মাঝে নবীনতার সাহস। বসন্ত মানে রঙের আড়ালে আত্মসন্ধান। বৈদিক ঋতু-দর্শন, বৌদ্ধ অনিত্যবাদ, জৈন সংযম, সংগম প্রেম, শিখ আত্মমর্যাদা, বৈষ্ণব রস, রবীন্দ্রনাথের নান্দনিকতা—সব মিলিয়ে বসন্ত ভারতীয় সংস্কৃতির এক সঙ্ঘবদ্ধ প্রতীক। বসন্ত সেই আলো, যা প্রতি বছর ফিরে এসে আমাদের মনে করিয়ে দেয়- ধ্বংসের ভিতরেও জন্ম আছে, শীতের গভীরেও উষ্ণতা আছে, আর মানুষের অন্তরে সর্বদা নবায়নের সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনাই ভারতবর্ষের বসন্ত।

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস

৬ : গুপ্তোত্তর ভারত ৮ : অশোক ও ধর্মরাজনীতি

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

অনুবাদ ও মৌলিক লেখা আমন্ত্রণ 

বার্ষিক রোদ্দুর দ্য সানসাইন পত্রিকার অনলাইন সংখ্যা সাপ্তাহিক রবিবারের রোদ্দুর -এর জন্য পোর্টালের উপযুক্ত পাণ্ডুলিপি , স্থিরচিত্র ,পেন্টিং ইত্যাদি আহ্বান করা হচ্ছে।

Read More »

সকল কাঁটা ধন্য করে

সৌপর্ণ পাল      “এক্সকিউজ মি এটা ফাইন আর্টসের লাইন? না মানে ওটার ক্যাম্পাস তো জোড়াসাঁকোতে আর মেনষ্ট্রিম গুলো বি.টি রোডে একটু কনফার্ম হয়ে লাইনে

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

অনুবাদ ও মৌলিক লেখা আমন্ত্রণ 

বার্ষিক রোদ্দুর দ্য সানসাইন পত্রিকার অনলাইন সংখ্যা সাপ্তাহিক রবিবারের রোদ্দুর -এর জন্য পোর্টালের উপযুক্ত পাণ্ডুলিপি , স্থিরচিত্র ,পেন্টিং ইত্যাদি আহ্বান করা হচ্ছে।

Read More »

সকল কাঁটা ধন্য করে

সৌপর্ণ পাল      “এক্সকিউজ মি এটা ফাইন আর্টসের লাইন? না মানে ওটার ক্যাম্পাস তো জোড়াসাঁকোতে আর মেনষ্ট্রিম গুলো বি.টি রোডে একটু কনফার্ম হয়ে লাইনে

Read More »

রোদ্দুর : The Sunshine পত্রিকার শারদ ১৪৩৩ (২০২৬) সংখ্যার লেখা আহ্বান 

রোদ্দুর পত্রিকা সাহিত্যের এক বিশ্ব অঙ্গন। মানুষের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও চিন্তার যে অন্তহীন যাত্রা—তারই বহুমাত্রিক প্রতিফলন সাহিত্য। ভাষা, দেশ ও কালের সীমা অতিক্রম করে সাহিত্য

Read More »