সাহিত্যচিন্তায় বৈচিত্র্য : ডাডাবাদ থেকে অধিবাস্তববাদ

সাহিত্যচিন্তায় বৈচিত্র্য : ডাডাবাদ থেকে অধিবাস্তববাদ

রঞ্জন চক্রবর্ত্তী

“Theories are like omnibuses, useful when you want to go in the same direction as they, not otherwise.” – Orlo Williams

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে সারা পৃথিবীতে তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল। তখন একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী জানিয়েছিলেন কেবলমাত্র সামাজিক বা অর্থনৈতিক কারণে যুদ্ধ হয় না, তা হয় মানুষের অন্তর্নিহিত প্রবৃত্তির অন্ধ দাসত্বের ফলে। সভ্য মানুষের অম্তরের গভীরে লুকিয়ে থাকা পাশব-প্রবৃত্তি যুদ্ধের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে। এই ধরণের ব্যাখ্যায় যুদ্ধের কারণ হিসেবে এমন কিছুকে চিহ্নিত করা যায়, যার উপর মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি বা সচেতন সত্তার কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। যে মনস্তত্ত্ববিদেরা মানুষের মনকে সচেতন, অচেতন ও অবচেতন স্তরে বিভক্ত করেছিলেন তাঁদের দেখানো পথেই সেই বুদ্ধিজীবীরা এই ধারণায় পৌঁছেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের কিছু নৈরাশ্য-পীড়িত বুদ্ধিজীবীর মধ্যে সবকিছুকেই অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা যায়, যা তাদের দৃষ্টিভঙ্গীকে উগ্র করে তোলে। এই পটভূমিতে শিল্প-সাহিত্যের জগতে প্রথমে ডাডাবাদ ও পরে অধিবাস্তববাদের জন্ম হয়। আরও কিছু পরে জন্ম নেয় অস্তিত্ববাদ ও অ্যাবসার্ডবাদ।

ডাডাবাদ থেকে অধিবাস্তববাদ পর্যন্ত আন্দোলনগুলির প্রত্যেকটিই চরিত্রগতভাবে ও বিকাশের দিক থেকে আগেরটির থেকে আলাদা। কিন্তু প্রতিটি আন্দোলনের শরিকরাই ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্বের সংকট, পরিবেশের সঙ্গে মানুষের সংগ্রাম, মানবজীবনের সার্থকতা এবং প্রকৃত জীবনসত্যের স্বরূপ নিয়ে কম-বেশি বিচলিত হয়েছেন। জগতের সবকিছুই শিল্পী-সাহিত্যিককে প্রভাবিত করে, তা সে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ইত্যাদি যা-ই হোক। সুতরাং এই সব আন্দোলনের যতই সীমাবদ্ধতা থাক, শিল্পী-সাহিত্যিক যে জাগতিক দায়দায়িত্বহীন ব্যক্তি নয় এর থেকে সেই সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ডাডাবাদ আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় কোনও পূর্ব-প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বের সাহায্যে শিল্প-সাহিত্যের বিকাশ হতে পারে না। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি প্রশ্ন – তাই বলে যে কোনও রকম অনিয়ন্ত্রিত আত্মপ্রকাশ (এমনকি তা মগ্নচৈতন্যের খাতিরে হলেও) কি শিল্প হিসেবে গণ্য হতে পারে? চিরাচরিত ঐতিহ্য ও প্রাচীন ধারা সম্পর্কে আদ্যন্ত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে পাশ্চাত্যের শিল্প-সাহিত্যের জগতে ১৯১৫-১৬ খ্রিস্টাব্দে ডাডাবাদ আত্মপ্রকাশ করেছিল। এই মতবাদের অন্যতম উৎসস্থল জুরিখ ছিল ফ্রয়েডপন্থী মনস্তত্ত্ববিদদের পীঠস্থান। জুরিখে ত্রিস্তান ৎসারা, আমেরিকায় মার্সেল ডুক্যাম্প ও ফ্রান্সিস পিকাবিয়া এবং প্যারিসে ‘লিটারেচার’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে সমবেত একদল শিল্পী ডাডাবাদকে শিল্পজগতের একটি প্রধান আন্দোলন হিসেবে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছিলেন। অধিবাস্তববাদের প্রবক্তা আন্দ্রে ব্রেতোঁ-ও একটা সময় পর্যন্ত এই আন্দোলনের শরিক ছিলেন।

ডাডাবাদীরা জীবনের যাবতীয় প্রচলিত মূল্যবোধকে অস্বীকার করেছিলেন এবং শিল্প-সাহিত্যের সনাতন পন্থাকে চরম আঘাত হেনেছিলেন। ডাডাবাদের অন্যতম প্রবক্তা মার্সেল দুক্যাম্প বলেছিলেন – “I have forced myself to contradict myself in order to avoid conforming to my own taste.” তাঁরা যেমন মানবমনের অবচেতন স্তরের গুরুত্বকে সব থেকে উঁচুতে স্থান দিয়েছিলেন, তেমনই ন্যায়শাস্ত্রের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী বিধিবদ্ধ কার্য-কারণ সম্পর্কের নিরর্থকতাকে সোচ্চারে ঘোষণা করেছিলেন। পাশাপাশি তাঁরা মানুষের অন্তর্লোকের স্বৈরাচার, কাব্যভাষার অনিয়ন্ত্রিত স্বতঃস্ফূর্ততা এবং যথেচ্ছ শব্দ-নির্বাচনে কবির স্বাধীনতাকে মেনে নিয়েছিলেন। ত্রিস্তান ৎসারা বলেছিলেন – “I speak only of myself since I do not wish to convince, I have no right to drag others into my river, I oblige no one to follow me and everybody practices his art in his own way.” (Tristan Tzara, ‘Dada Manifesto’, 1918)।

ডাডাবাদীদের মতে কবিতায় সুগঠিত বাক্যের ব্যবহার হল এক ধরণের আরোপিত কৃত্রিমতা, কারণ মানুষের সমস্ত ভাবনা-চিন্তা সুসংলগ্ন নয়। যেহেতু মানুষ ছন্দোবদ্ধ পদে চিন্তা করে না এবং যেহেতু তার প্রতিটি ভাবনা একটি অখণ্ড প্রবাহে আসে না, তাই কবিতার বাহ্যিক গঠন এরকম হয়। তাঁদের মতে যে সব সাহিত্যিক ভাবকে নিয়মিত পংক্তিতে বিন্যস্ত করে বিবিধ অলংকারে সাজানো মূর্তিতে উপস্থিত করেন তাঁরা কাব্য সম্পর্কে প্রাচীন ধারণার দ্বারা পরিচালিত হয়ে এবং অপরের প্রদর্শিত পথে নিশ্চিন্তে পদচারণা করেন। ডাডাবাদীরা কবি-সাহিত্যিকদের এই কাজকে একপ্রকার মিথ্যাচার বলেই মনে করেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা এটাও মনে করেন মহৎ সাহিত্যিক বলে যাঁরা পরিচিত, তাঁরা সকলেই অপরকে অনুকরণ করেন ও কুম্ভীলকের বৃত্তি অবলম্বন করেন।

ডাডাবাদীরা অচেতন বা অবচেতন মনের গুরুত্ব প্রতিষ্টায় এতদূর এগিয়েছিলেন যে কবিতা ছিল তাঁদের কাছে ‘automatic writing’। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী যখনই মনে একটি ভাবনা আসে, তখনই তা একটি প্রতীককে আশ্রয় করে এবং কবিতার জন্ম হয়। ত্রিস্তান ৎসারা কাব্য রচনার একটি সহজ পথ দেখিয়েছিলেন – “Take a newspaper. Take some scissors. Choose from this paper an article of the length you want to make your poem. Cut out the article. Next carefully cut out each of the word that makes up this article and put them all in a bag. Shake gently. Next take out each cutting one after the other. Copy conscientiously in the order in which they left the bag. The poem will resemble you. And there you are – an infinitely original author of charming sensibility, even though unappreciated by the vulgar hard.” (Tristan Tzara, Seven Dada Manifestos and Lamoisteries)।

ডাডাপন্থীদের কাছে শিল্পে বা সাহিত্যে বাহ্যিক রূপ-রচনার দিকে যত্ন নেওয়ার মানেই হল সজাগ ও সতর্ক মনের একাধিপত্য স্বীকার করে নেওয়া। আসলে ডাডাপন্থীদের বিশ্বাস ও ভরসার জায়গা হল মানব মনের সেই অজ্ঞাত ও অনালোকিত প্রদেশ, মাঝে মাঝে গোপনে স্বপ্নলোকের গভীরে যার আধিপত্য ঘটে। এই মনকে কারও কাছেই জবাবদিহি করতে হয় না, তাই সে সুসংলগ্ন ভাব প্রকাশের জন্য ব্যাকুল নয়। কিন্তু এখানে যে প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই ওঠে সেটা হল – যেখানে কোনও একটি বিশেষ রচনা পছন্দ করার প্রসঙ্গ আসে, সেখানে কবির কাজটা কি চেতন মনের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন যথেচ্ছাচার হতে পারে? তা ছাড়া ত্রিস্তান ৎসারা কবিতাকে যতই সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রয়াস-প্রযত্নহীন ব্যাপার বলে মনে করুন না কেন, ডাডাবাদের অন্যতম শরিক পল এলুয়ার কিন্তু তাত্ত্বিক বিশুদ্ধিকে একেবারে উড়িয়ে দেননি। তিনিও প্রচলিত কাব্যভাষা বর্জন করতে চেয়েছেন, কিন্তু পাশাপাশি এটাও বলেছেন – “Let us reduce it, let us transform it into a charming true language.” এঁদের অন্যতম সদস্য আঁদ্রে জিদও ভাষার পুরনো পদ্ধতির অলংকার বর্জন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তীক্ষ্ণ ও সহজ ধরণের শব্দবিন্যাস ও বাক্যগঠনের জন্য ঔৎসুক্য দেখিয়েছিলেন। সেই জন্যই এই ধরণের কথা বলা হয়েছে – “I dream of new harmonies of an art of words, more subtle without rhetoric, which does not seek to prove anything.”  (Marcel Raymond, From Baudlaire to Surrealism)।

ডাডাবাদীরা লেখকের ব্যক্তিমনের অনিয়ন্ত্রিত বিকাশে এতই আস্থাশীল ছিলেন যে যে-কোনও রকমের পূর্বানুবৃত্তি তাঁদের কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছিল। আসলে ডাডাবাদ ছিল কোনও কিছু না মানার আন্দোলন। কিন্তু বিশ্বের সবকিছুর প্রতিই নঞর্থক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে জীবন ও শিল্প-সাহিত্যকে দেখে এই ডাডাপন্থীরা কোনও দীর্ঘজীবী আন্দোলন গড়ে তুলে পারেননি। বরং এক ধরণের অন্তর্মুখীনতা যেন ব্যধির মতো তাঁদের গ্রাস করেছিল। মোটামুটি ভাবে আন্দ্রে ব্রেতোঁ দ্বারা সুররিয়ালিজম্ সংক্রান্ত প্রথম দলিলটির প্রকাশকাল (অর্থাৎ ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত এই আন্দোলন জীবিত ছিল।

‘তাৎক্ষণিক কবিতা’ কথাটার মধ্যে নিঃসন্দেহে চমক আছে। পাশাপাশি কবিতায় ইমেজ-এর মূল্যও স্বীকার করতেই হয়। কবিতা রচনার ক্ষেত্রে শিল্পীমনের সচেতনতা ও সক্রিয়তার কোনও মূল্য নেই এমন কথা পল ভালেরী-ও বলেননি, যদিও তিনি ছিলেন ডাডাবাদীদের মুখপত্র ‘লিটারেচার’-এর অন্যতম লেখক। বস্তুজগত থেকে উপাদান ও উপমা সংগ্রহ করে কবি বা সাহিত্যিক তাকে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত করে তোলেন এবং দূরসম্পর্কিত সত্যকে মনের সহায়তায় একটি একটি অভিন্ন ইমেজে রূপান্তরিত করেন। সেই দিকে লক্ষ্য রেখে পল  ভালেরি তাঁর ‘পোয়েট্রি অ্যাণ্ড অ্যাবস্ট্র্যাক্ট থট’ প্রবন্ধে বলেছেন – “The poetic universe offers extensive analogies with what we can postulate of the dream world.” কিন্তু তাই বলে কাব্যের জগত দিবাস্বপ্নের জগত নয়। কবিতার মাধ্যম হল ভাষা এবং সেই ভাষার সহায়তায় কবিতা পাঠকের অন্তরে সঞ্চারিত হয়। সুতরাং ভালেরির মতে কবিতা হচ্ছে ‘art of language’ বা ভাষাশিল্প। কিন্তু কবিতার এই ভাষা প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত ভাষারীতির অনুরূপ নয়, কারণ কবিতার ক্ষমতা আছে খুব অল্পের মধ্যেই পাঠকের মনে গভীর ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার। অতএব কবির মনে ভাষাতীতের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করার জন্য গুপ্ত-রূপান্তরণ প্রক্রিয়া চলে। ডাডাবাদীরা মনে করেন এই রূপান্তরণ প্রক্রিয়ায় মানব মনের গোপনতম স্তরের প্রভাবই সব থেকে বেশি।

সাহিত্যে বাস্তবের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন দেশে যখন আন্দোলন গড়ে উঠছে এবং রাশিয়ার শিল্পী-সাহিত্যিকদের হাতে যখন সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের জন্ম হচ্ছে, তার প্রায় সমকালেই ফ্রান্সে জন্ম নিয়েছিল এক নতুন আন্দোলন, যার নাম সুররিয়ালিজম্ বা অধিবাস্তববাদ। ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সংকটের পটভূমিতে ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণের তত্ত্বের ভিত্তির উপর এই আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। সাহিত্যের ক্ষেত্রে এর পুরোভাগে ছিলেন আঁদ্রে ব্রেতোঁ এবং জাঁ ককত্যু, চিত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন ম্যাক্স আর্নস্ত এবং সালভাদোর দালি। এঁদের মধ্যে আঁদ্রে ব্রেতোঁ ছিলেন আধিবাস্তববাদের দুটি দলিলের রচয়িতা।

আঁদ্রে ব্রেতোঁ ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ডাডাবাদের শরিক ছিলেন। কিন্তু ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে সুররিয়ালিজমের প্রথম দলিলে ব্রেতোঁ লিখলেন তিনি স্বপ্ন ও বাস্তবের বৈপরীত্যের পরিবর্তে এদের মিলনজাত একটি বিশুদ্ধ বাস্তবের সম্ভাব্যতায় বিশ্বাসী। তিনি যে ডাডাবাদীদের থেকে কতটা দূরে সরে এসেছিলেন সুররিয়ালিজমের দ্বিতীয় দলিলে তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। ব্রেতোঁ সরাসরি বললেন সুররিয়ালিস্ট শব্দগত স্বয়ংক্রিয়তায় বিশ্বাসী নন। বরং কবিতার সুগঠিত মূর্তিতে এবং সেই কারণে প্রয়োজনীয় সঠিক নির্দেশে তাঁদের আস্থা আছে। বিশুদ্ধ কবিতার দোহাই দিয়ে অনিয়ন্ত্রিত এবং অসংযত ভাব প্রকাশের কোনও বাসনা তাঁদের নেই।

সুররিয়ালিস্টরা যেমন বহির্জগত ও মানুষের অন্তর্জগতের সীমারেখা ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন, তেমনই চেতন ও অবচেতনের মধ্যবর্তী সীমারেখাও অতিক্রম করতে চেয়েছিলেন। সেই কারণে শুধু অবচেতনের দোহাই দিয়ে যথেচ্চাচারে তাঁদের আসক্তি ছিল না। তাঁরা সাহিত্যকে সমাজদেহের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন সম্পর্কে যুক্ত করে মার্ক্সীয় দ্বান্দ্বিকতাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের কথাও জানিয়েছিলেন। ডাডাবাদীরা যেখানে নৈরাশ্যতাড়িত হয়ে প্রচলিত সব কিছু অস্বীকারের পথ বেছে নিয়েছিলেন, সুররিয়ালিস্টরা সেখানে স্বপ্ন ও বাস্তব উভয়ের অস্তিত্ব স্বীকার করে রিয়ালিজমের নতুন অর্থ ও তাৎপর্য সৃষ্টি করেছিলেন। ঠিক তেমনভাবেই তাঁরা জীবন বদলে দেওয়াকেই সাহিত্যের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করে ডাডাবাদীদের জগত থেকে দূরে সরে গিয়ে মার্ক্সবাদীদের জগতের দিকে স্পষ্ট উন্মুখতা দেখিয়েছিলেন। তাই সুররিয়ালিস্ট আন্দোলনের অন্যতম শরীক লুই আরাগঁ ক্রমে সাম্যবাদে সম্পূর্ণ আস্থাশীল হয়েছিলেন। আবার পল এলুয়ার মানুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর ঔৎসুক্য প্রকাশ করে ভাববাদ-নির্ভর সাম্যবাদ প্রচার করেছিলেন।

অধিবাস্তববাদীরা সাহিত্য ও শিল্পের ক্ষেত্রে স্বপ্ন ও কর্মজগতের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে বাস্তব শব্দটির অর্থের ব্যাপকতা সৃষ্টি করেছিলেন। ঠিক সেভাবেই তাঁরা গদ্য ও পদ্যের সনাতন বিভাজন পদ্ধতি ভেঙে দিয়েছিলেন এবং সাহিত্যের সাধারণ রূপেও নতুনত্ব এনেছিলেন। আমরা দেখি ম্যাক্স আর্নস্ত ও সালভাদোর দালির হাতে প্রাচীন আদর্শের শিল্প মূর্তি ক্রমে বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। দালি তাঁর সৃষ্টিকর্মে সাপ, ছাগল, আগুন, মদ ও রুটিকে প্রতীক রূপে ব্যবহার করেছেন। আবার তিনি যৌনতাকে সংকেতিত করেছেন জুতোর প্রতীকে। অতি পরিচিত বস্তুর এই ধরণের প্রতীক-মূল্য সৃষ্টি করার ফলে প্রাচীন পদ্ধতির শিল্প-বিচার বিপর্যস্ত হতে বাধ্য, এবং তা হয়েছেও। নাটকেও দেখি জাঁ ককত্যু প্রাচীন নাট্যতত্ত্বকে সরাসরি আঘাত করেছেন। ‘আম্তিগোনে’ (১৯২২), ‘অর্ফি’ (১৯২৬), ‘দি ইনফার্নাল মেসিন’ (১৯৩৪) প্রভৃতি নাটকে তিনি অসঙ্গতি ও অসমঞ্জসের চূড়ান্ত ব্যবহার করেছেন। এগুলির মধ্যে ‘অর্ফি’ নাটকটিতে আনন্দদায়ক ও ভয়ঙ্কর উভয়বিধ ঘটনার সন্নিবেশ ঘটেছে এবং চরিত্রগুলি যুক্তিতর্কের সাধারণ নিয়মকেও অস্বীকার করে গিয়েছে। অন্য দুটি নাটক লেখা হয়েছিল গ্রীক নাটক থেকে সংগৃহীত কাহিনি অবলম্বনে। এই দুটি নাটকে সুররিয়ালিস্টিক পদ্ধতি ও নতুন ধারার ভাষা প্রয়োগ করে তিনি প্রাচীন কাহিনি সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে একেবারে বিপর্যস্ত করে দিয়েছেন। এর পাশাপাশি তিনি কোরাসকে কাহিনির সীমান্তে না রেখে আশ্চর্য দক্ষতায় একেবারে ভিতরে আকর্ষণ করে নিয়েছেন।

এই সুররিয়ালিস্টিক পদ্ধতিই চোখে পড়ে ফ্রাঙ্কো-বেলজিয়ান নাট্যকার ফার্নান্দ ক্রোমলিঙ্কের নাটকে। তিনি নাটকের মধ্যে স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের, হাস্যরসের সঙ্গে ট্র্যাজিকের সুষম মিশ্রন ঘটিয়েছেন। এই সুররিয়ালিস্টিক পদ্ধতিই চোখে পড়ে অ্যাবসার্ডিস্ট নাট্যকার ইউনেস্কোর ‘হাউ টু গেট রিড অব ইট’ নাটকে। তাঁর ‘আমেদে’ নাটকে মৃতদেহের জ্যামিতিক প্রগতিতে বৃদ্ধি পাওয়া বা আকাশমার্গে উড়ে যাওয়া এ-সবই স্বপ্নলোকের সত্য। কিন্তু নাট্যকার এমনভাবে নাটকের ভিতর স্বপ্ন-জগতের সত্যকে বাস্তব-জগতের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন যে পাঠকের কাছে তা এক নতুন জগত বলে মনে হয়। ইওনেস্কোর অপর নাটক ‘রাইনোসেরস’-এ চরিত্রগুলির একে একে সকলেরই গণ্ডার হয়ে যাওয়া অবশ্যই বাস্তব সত্য নয়।

অ্যাবসার্ডিস্ট বলে পরিচিত নাট্যকারেরা প্রচলিত নাটকের ছকের বাইরে গিয়ে স্বপ্ন ও বাস্তবের অদ্ভুত মিশ্রণ ঘটিয়ে তাঁদের পূর্বসূরী সুররিয়ালিস্টদের ঐতিহ্যকেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন। সুররিয়ালিস্টরা এই মনস্তাত্বিক সিদ্ধান্ত স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে মানুষের সজ্ঞান মনের থেকে অচেতন মনের পরিমাণই বেশি। যেভাবে সুররিয়ালিস্টরা তাঁদের শিল্প-সাহিত্যে এর প্রয়োগ করেছিলেন, পরবর্তীকালের অ্যাবসার্ডিস্টরাও সেই একই পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন। সাহিত্যের জগতে চেতনা-প্রবাহধর্মী উপন্যাসের রচয়িতারা (জেমস জয়েস, ভাজিনিয়া উলফ্ প্রভৃতি) যদিও ফ্রয়েডের তত্ত্বের থেকে উইলিয়ম জেমস-এর দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন, তবু উপন্যাসের চরিত্র ও পাঠকের মধ্যে বিভেদ ঘুচিয়ে দিয়ে এবং চরিত্রের গভীরে পাঠককে টেনে নিয়ে গিয়ে উপন্যাস রচনায় যে নতুনত্ব সৃষ্টি করেছিলেন তার সঙ্গে সুররিয়ালিস্টিক পদ্ধতির খুব বেশি দূরত্ব নেই। তবে ব্রেতোঁ ইন্দ্রিয়ের পথে আগত জ্ঞানকে অচেতনের সঙ্গে সমান মর্যাদায় স্বীকার করেছিলেন এবং সমাজ পরিবর্তনের জন্য সমকাল ও পরিবেশের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু তিনি যেভাবে তা করেছিলেন সেটা  অ্যাবসার্ডিস্ট বা চেতনাপ্রবাহে বিশ্বাসীদের লেখায় চোখে পড়েনি।

ব্রেতোঁর সমাজ-পরিবর্তনের বাসনার দিকে লক্ষ্য রেখে ‘আর্ট অ্যাণ্ড সোসাইটি’ গ্রন্থে হার্বাট রীড মন্তব্য করেছিলেন – “Surrealism, in the form expounded by the animator of the movement, Andre Breton, has been profoundly influenced by the dialectical materialism of Marx.” সুররিয়ালিস্টরা তাঁদের শিল্প-সাহিত্য চিন্তায় মার্ক্সীয় পন্থাতেই তাঁর ‘logic of totality’ তত্ত্বকে (হেগেলের মিস্টিসিজম্ বাদ দিয়ে) গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে ডাডাবাদ ও অধিবাস্তববাদের জন্মের কারণ ছিল ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সংকট। এটাও খেয়াল রাখা দরকার যে সমকালে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ সাহিত্যের জগতে গুরুত্ব লাভ করেছিল, যার সঙ্গে ডাডাবাদের বৈপরীত্যই ছিল প্রধান। অতএব হার্বাট রীডের মন্তব্য যে কতটুকু সমর্থনযোগ্য সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ডাডাবাদের সঙ্গে কোনও কোনও দিক থেকে সম্পর্কযুক্ত অধিবাস্তববাদী আন্দোলনের কয়েকজন শরিক পরবর্তীকালে সাম্যবাদী হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদীদের সঙ্গে অধিবাস্তববাদীরা পুরোপুরি সমগোত্রভুক্ত নয়, তবে উভয় মতবাদে বিশ্বাসীদের মূল বক্তব্যের মধ্যে কোনও কোনও অংশে মিল রয়েছে। সম্ভবত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে সৃষ্ট নৈরাশ্যের মধ্যে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বাস্ততবাদের উজ্জ্বল আলোকরেখা তাঁদের আকৃষ্ট করেছিল। তা হলেও ডাডাবাদ ও অধিবাস্তববাদের মূল ভিত্তি সোস্যালিজম নয়, প্রকৃতপক্ষে এই দুটি মতবাদের ভিত্তি হল ‘অন্তর্গত চিন্ময় সত্য’। এটাও একইরকম সত্য যে মার্ক্সের থেকে ফ্রয়েডের দিকেই তাঁদের ঝোঁকটা বেশি। তবে অধিবাস্তববাদীরা যে ডাডাবাদীদের নৈরাশ্যপীড়িত দৃষ্টিভঙ্গী বর্জন করতে পেরেছিলেন এবং সমাজ-পরিবর্তন কামনা করেছিলেন সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আসলে তাঁরা চেতন ও অবচেতনের গুরুত্ব স্বীকার করে বাস্তব শব্দটির অর্থের তাৎপর্য ব্যাপকতর করে তুলেছিলেন।

Your thoughts on this Post?

Facebook
Twitter
LinkedIn

Letest Cover Stories

দুটি কবিতা 

অভিরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় এক যুদ্ধ কবে ফুরোবে জানা নেই,তবু চাঁদ আকাশে—অথবা নিকষ কালোয় তারা খসা। বারুদ, রক্ত, অভিশাপ বা চিতার আগুন—নেভার খবর না এলেওকখনও স্নিগ্ধতার ছায়ার

Read More »

ঊর্ণনাভ

শ্যামলী রক্ষিত  তৃতীয় পর্ব  মিতা রান্নাঘরেই ছিল।  দিপালীর সঙ্গে কথাকাটাকাটি হওয়ার পর থেকেই তার নিজের ভেতরটা খুব খারাপ লাগছিল। টেনশনও হচ্ছিল ভীষণ। সত্যিই সত্যিই যদি

Read More »

Privious Cover Stories

দুটি কবিতা 

অভিরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় এক যুদ্ধ কবে ফুরোবে জানা নেই,তবু চাঁদ আকাশে—অথবা নিকষ কালোয় তারা খসা। বারুদ, রক্ত, অভিশাপ বা চিতার আগুন—নেভার খবর না এলেওকখনও স্নিগ্ধতার ছায়ার

Read More »

ঊর্ণনাভ

শ্যামলী রক্ষিত  তৃতীয় পর্ব  মিতা রান্নাঘরেই ছিল।  দিপালীর সঙ্গে কথাকাটাকাটি হওয়ার পর থেকেই তার নিজের ভেতরটা খুব খারাপ লাগছিল। টেনশনও হচ্ছিল ভীষণ। সত্যিই সত্যিই যদি

Read More »