রঞ্জন চক্রবর্ত্তী
তৃতীয় পর্ব
সাহিত্যের জগতে ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা’ বা ‘socialist realism’ কথাটা প্রথম ব্যবহার করেছিলেন ম্যাক্সিম গোর্কি। তাঁর মতে বাস্তবতা বা ‘realism’-এর দুটি ভাগ — ‘critical realism’ ও ‘socialist realism’। তিনি বালজাক, স্তাঁদাল প্রভৃতি ফরাসি সাহিত্যিকের রচনায় ‘critical realism’-এর দৃষ্টান্ত খুঁজেছিলেন। গোর্কি মনে করতেন এই সাহিত্যিকেরা সমাজের ধনতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হলেও সমাজে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। তাই তাঁরা যে সমাজব্যবস্থার সমালোচক তার উচ্ছেদ ঘটে নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হোক, এই কামনা তাঁদের ছিল না। যদি তাঁরা সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের কথা বলে থাকেনও, তা হলেও এমন কোনও সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেননি যে সেই পরিবর্তন শোষিত নিপীড়িত জনগণের কাছ থেকেই আসা উচিত। সুতরাং এই লেখকেরা বিশেষ সামাজিক অবস্থার সমালোচকের বেশি কিছু নন।
নীতির দিক থেকে দেখলে ‘critical realist’-রা অবশ্যই মানবপ্রেমিক এবং নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সওয়াল করেছেন। কিন্তু তাঁদের মানবপ্রেমের ভিত্তি যতই বাস্তবতার উপর প্রতিষ্ঠিত হোক, মূলগতভাবে তা মানবপ্রগতির ইতিহাসের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। যদি তা হত তাহলে ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার চাপে নিষ্পেষিত মানুষের জাগরণের সম্ভাবনা তাঁদের চোখে পড়তই। যেহেতু তা হয়নি, তাই তাঁরা সাহিত্যে বাস্তবের রূপকার এবং মানুষের দুঃখ-দুর্দশার আলেখ্য রচয়িতা — তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। বালজাক-এর মতো বাস্তববাদীদের এই ধরণের সমাজচেতনার দিকে লক্ষ্য রেখে গোর্কি তাঁদের ‘critical realist’ বলে চিহ্নিত করেছেন।
গোর্কি আরও যে এক ধরণের বাস্তবতার কথা বলেছেন তা হল সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা বা ‘socialist realism’। নাম থেকেই প্রাথমিক ভাবে বোঝা যায় যে এই সাহিত্য বাস্তবতা-প্রধান এবং সমাজবাদের প্রচারই এর উদ্দেশ্য। গোর্কি বলেছেন তিনি সাহিত্যে এরকম বাস্তবতার কথা ভাবতে পেরেছিলেন এঙ্গেলস্-এর এই মন্তব্য থেকে যে, জীবন হচ্ছে অবিচ্ছিন্ন এক নিরন্তর গতি ও বিবর্তন। জীবনে যেমন কোনও স্থির-সত্য নেই, তেমনই সাহিত্যেও অপরিবর্তনীয় স্থির-বাস্তব বলে কিছু নেই। ইতিহাস নিত্য বিবর্তনশীল, মানবজীবন এবং সাহিত্যও তা-ই। দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে ইতিহাস এগিয়ে চলে। ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়ম যদি এই হয় যে প্রাচীন ও নবীন প্রথার মধ্যে দ্বন্দ্বের অবসানে নবীনের প্রতিষ্ঠা, তাহলে পৃথিবীতে চিরন্তন সত্য বলে কিছু নেই। একই যুক্তিতে এটাও বলা যায় যে পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যা ধ্রুব, বা যার কোনও পরিবর্তন সম্ভব নয়। গোর্কি বাস্তবকে ঠিক এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছিলেন। সেই জন্যই তিনি বলেছিলেন সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার লক্ষ্য হচ্ছে ‘old world’-এর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং সেই প্রভাবকে সমূলে উৎপাটিত করা। এ. এস. শ্চেরবাকভ-কে লেখা ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি তারিখের চিঠিতে গোর্কি বলেছিলেন সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার মূল ভূমিকা হবে সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং বিল্পবের সম্ভাবনার উন্নতিসাধন। এই মন্তব্য থেকে এটা পরিস্কার যে তিনি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ক্ষেত্রে সাহিত্যিককে সুস্পষ্ট ভূমিকা পালন করতে পরামর্শ দিচ্ছেন।
কলাকৈবল্যবাদীদের (অর্থাৎ যাঁরা ‘art for art’s sake’ নীতিতে বিশ্বাসী) একটি চরম ধারণা হল সাহিত্যকে শিল্প হিসেবে সফল হলেই চলবে। গোর্কি এই ধারণাকে মূল থেকে উপড়ে ফেলতে চেয়েছেন, যুক্তি দ্বারা পুরোপুরি খণ্ডন করতে চেয়েছেন। শুধু তাই নয়, শিল্প-সাহিত্য হল বাস্তবের নিরপেক্ষ ও যথাযথ উপস্থাপন — ন্যাচারালিস্টদের এই বিশ্বাসের প্রতিও তিনি অনাস্থা জ্ঞাপন করেছেন। আসলে গোর্কি যাকে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা বলেছেন তা অচল বস্তুর প্রতিচ্ছবি নয়, আবার নিছক কলাবিলাসও নয়; বরং তাতে ইতিহাস-চেতনা সব থেকে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। গোর্কির কাছে বাস্তব হল একটি গতিশীল সত্য। তিনি মনে করতেন ইতিহাস যেমন অতীত থেকে বর্তমানের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের দিকে প্রবাহিত হয়, তেমনই সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদীর জীবন সম্পর্কিত দৃষ্টিও ভবিষ্যতের দিকে প্রসারিত হবে। তাঁরা ‘critical realist’-দের মতো শুধুমাত্র ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সমালোচক নন, তাঁদের সেই ভবিষ্যৎ দেখতে চান যেখানে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত। একজন সত্যিকারের ‘social realist’ হলেন ভবিষ্যত-দ্রষ্টা প্রফেট এবং তাঁর সেই দৃষ্টি ইতিহাস চেতনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাই শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্যতম শক্তি যে শ্রমিক শ্রেণী, তার নিরন্তর জীবনসংগ্রামের চেহারা তিনি সাহিত্যে ফুটিয়ে তুলবেন এটাই স্বাভাবিক।
সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদীরা কেবলমাত্র ধনতন্ত্রের সমালোচনাই করেন না, এই ব্যবস্থার অবসানে শ্রমিক শ্রেণীর লড়াই এবং পরিশেষে জয়ের সম্ভাবনাও ফুটিয়ে তোলেন। এখানেই ন্যাচারালিস্টদের সঙ্গে তাঁদের মূল পার্থক্য। ন্যাচারালিস্টরা ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার নগ্নরূপ এবং তার কুফলের বর্ণনা দিয়েছেন, কিন্তু যেভাবে দিয়েছেন পাঠকের মনে তার প্রতিক্রিয়ায় অবধারিতভাবে নৈরাশ্য জাগে। তাঁরা মানবসমাজে বিজ্ঞানের বিভীষিকাময় দিকের প্রভাব লক্ষ্য করেছেন, কিন্তু বিজ্ঞানকে মানবসেবায় ব্যবহারের ব্যাপারে সমাজতন্ত্রের সাফল্যের দিকটি লক্ষ্য করেননি। সুতরাং এ দিক থেকে বিচার করলে তাঁদের নৈরাশ্যবাদী বলা চলে। পক্ষান্তরে সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদীরা হলেন আশাবাদী। কিন্তু তাঁদের সেই আশাবাদ মোটেই রোমান্টিকসুলভ নয়, বরং ইতিহাসের বস্তুভিত্তির উপর তার প্রতিষ্ঠা।
গোর্কি মনে করেন সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদে বিশ্বাসী সাহিত্যিকেরা পাঠককে সেই মুক্তির স্বপ্ন দেখাবেন, যা প্রকৃতপক্ষে মানুষের ব্যক্তিত্বের অপমৃত্যু-জনিত লাঞ্ছনার হাত থেকে মুক্তি। কিন্তু এটা তখনই সম্ভব যখন ‘mass’-কে শক্তি হিসাবে গণ্য করা হয়, কারণ তারাই হল সভ্যতার প্রকৃত ধারক ও বাহক। যেখানে ‘mass’ একটি পুঞ্জীভূত শক্তি বলে গণ্য, সেখানে প্রতিটি সংগ্রামই অশেষ সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতি বহন করে। অধিক সংখ্যক মানুষের আশা-আকাঙ্খা যেখানে মূর্ত হয়ে ওঠে সেখানে কিছুতেই নৈরাশ্য থাকতে পারে না। তাই তত্ত্বগতভাবে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা আশাবাদই প্রচার করে। সেই তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে এমনটা মনে করা অসঙ্গত হবে না যে বিপ্লব হল মানবসভ্যতার প্রগতির সহায়ক।
গোর্কির ‘Song of the Falcon’ গল্পটির কথা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করব। এই গল্পের বাজপাখিটি কুণ্ডলীকৃত সাপের জীবনে নিজের জীবনের সার্থকতা খুঁজে না পেয়ে দুর্বল ও মুমূর্ষু অবস্থাতেই শত্রুকে আঘাত করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল। যেহেতু জীবন মানে সংগ্রামের মাধ্যমে ক্ষুদ্র গণ্ডীর দাসত্ব থেকে মুক্তি, তাই সরীসৃপের নিরাপদ জীবনে টিকে থাকার নিশ্চিন্ততা থাকলেও জীবনের স্পন্দন নেই। এই গল্পের রূপকে গোর্কি আসলে গতি ও সংগ্রামকেই জীবন বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। টলস্টয়ের গল্পেও কৃষিজীবীদের জীবনে সংগ্রামের রূপ এবং ধনতন্ত্রের সমালোচনা প্রতিফলিত হয়েছিল বলে লেনিন একদা তাঁর প্রশংসা করেছিলেন। টলস্টয় মনে করতেন মানুষে-মানুষে যোগাযোগ স্থাপনই সাহিত্যের মহৎ লক্ষ্য এবং সেই সাহিত্যই শ্রেষ্ঠ যা মানুষের জীবনের কাছাকাছি চলে যায়। মহাসাহিত্যিক টলস্টয় যে বাস্তববাদী সাহিত্যিক হিসাবে সাধারণ critical realist-দের উর্ধ্বে উঠেছিলেন সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এই কারণেই লেনিন তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন, যদিও তিনি খুব ভাল করেই জানতেন যে টলস্টয় সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার প্রচারক নন।
সমাজতান্ত্রিক বাস্তবাদ তত্ত্বের প্রচারক গোর্কি মনে করেন লেখকের প্রাথমিক কর্তব্য হল দ্বিবিধ — প্রথমত, সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের জীবনের কাছাকাছি নিয়ে আসা এবং দ্বিতীয়ত, জীবনের অপরিসীম সম্ভাবনাকে সাহিত্যের সত্য করে তোলা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে লুই আরাগঁ, পল এলুয়ার, পাবলো নেরুদা বা বের্টোল্ট ব্রেশট্ প্রভৃতিরা সামাজতান্ত্রিক বাস্তববাদী হিসাবে গণ্য হবেন। মার্কসবাদের আদর্শে বিশ্বাসী এই স্রষ্টারা সর্বহারা শ্রেণী ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনের সুপ্রচুর সম্ভাবনাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখেছেন এবং তাঁদের রচনায় রূপ দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁদের সহমর্মিতাবোধ ও জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতার কারণেই সৃষ্ট চরিত্রগুলি এত প্রাণচঞ্চল এবং চরিত্রগুলির মুখের ভাষা যেন তাদের জীবনেরই বাণী। গোর্কির যাপিত জীবনের বৈচিত্র্য ও বিভিন্ন ধরণের মানুষের সঙ্গে নিবিড় ঘনিষ্ঠতাজনিত অভিজ্ঞতা তাঁকে মানবপ্রেমের আদর্শে দীক্ষিত করেছিল। মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তাঁকে সাধারণ মানুষের অসাধারণ সম্ভাবনা সম্পর্কে বিশ্বাসী করে তুলেছিল। আর ব্রেশট্ তো কৃষিজীবীদের জীবন নিয়ে নাটক লেখার সময় তাদের মাঝে চলে যেতেন এবং তাদের পরামর্শে নাটকের কাহিনির পরিবর্তনও করতেন। আসলে জীবনের বৃহত্তর রঙ্গমঞ্চ থেকেই তিনি নাটকের ঘটনা ও চরিত্র নিখুঁতভাবে তুলে আনতে চেয়েছিলেন। বোধহয় এই জন্যই তিনি চেষ্টা করছিলেন কম্যুনিস্ট পার্টির ইস্তেহারকে কাব্যরূপ দিতে।
সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদীরা মনে করেন সমাজব্যবস্থার যথার্থ পরিণতি হল শ্রেণীগত বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সাম্যের প্রতিষ্ঠা। তাই তাঁরা সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজে সাম্যবাদের প্রচার করতে প্রয়াসী হয়েছেন। কিন্তু এখানে প্রশ্ন ওঠে — এর ফলে তো সাহিত্য ও রাজনীতির মধ্যে প্রভেদ লুপ্ত হয়ে যাবে? সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদীরা অবশ্য সে বিষয়ে সচেতন ছিলেন এবং রাজনীতিকে সাহিত্যের বিষয়বস্তু করে তুলতে দ্বিধা করেননি। ব্রেশট্-এর রাজনীতি সচেতনতা প্রসঙ্গে কনস্তানতিন ফেদিন মন্তব্য করেছেন — “He was never frightened of politics in art. On the contrary, he dealt with politics as a normal subject for art.” কিন্তু ব্রেশট্ সাহিত্যে কোন্ ধরণের রাজনীতির স্থান স্বীকার করতেন? একজন সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদী হিসাবে তিনি নিশ্চয়ই সাহিত্যে সাম্যবাদ ছাড়া অন্য রাজনীতির প্রচার চাইতেন না এবং তিনি নিজে যা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন তা ব্যতীত কোনও তাত্ত্বিক ধারণাকে গুরুত্ব দিতেন না।
সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার অনুয়ারী যে সাহিত্যিকরা ধনতন্ত্রের সমালোচক এবং সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা কামনা করেন, সাম্য প্রতিষ্ঠাই তাঁদের সামনে একমাত্র পথ। এই কারণেই সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদীরা সাহিত্যকে সাম্যবাদ প্রচারের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। লেনিন নিজেও সাহিত্যকে জনজীবনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে জড়িত করেছিলেন, ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৩ নভেম্বর তারিখে তিনি বলেছিলেন — “Literature must become a component of organized, planned and integrated Social Democratic Party work.” কিন্তু সাহিত্যকে এইভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে দিলে রচনার সাহিত্যগুণ সম্পর্কে সন্দেহ জাগা অস্বাভাবিক নয়। মাও-সে-তুং তাঁর ইয়েনান ফোরামের বক্তৃতায় এই সন্দেহের নিরসন করেছেন — “Works of art which lack artistic quality have no force, however progressive they are politically.”
লেনিন বা মাও-সে-তুং সাহিত্যে রাজনীতির প্রকাশ অবশ্যই চেয়েছেন, কিন্তু তা চাইলেও সাহিত্যকে কল্পনার ছোঁয়া থেকে মুক্ত জীবনের দলিল বলে গণ্য করতে চাননি। তাঁরা এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন যে সাহিত্যের জগতের নিয়মের সঙ্গে রাজনীতির জগতের নিয়মের মূলগত পার্থক্য আছে। এই চেতনা মনে জাগরুক ছিল বলেই মাও-সে-তুং বলেছিলেন — “What we demand is the unity of politics and art, the unity of content and form.” আর লেনিন সাইবেরিয়ার সঙ্গী হিসাবে পুশকিন, লেরমন্তভ ও নেক্রাসভের বই মনোনীত করেছিলেন। তিনি বিপ্লবের তরুণ সাথীদের স্বদেশের রোমাণ্টিক সাহিত্যিকদের রচনার সঙ্গে পরিচিত হতেও অনুরোধ করেছিলেন।
গোর্কি একদা বলেছিলেন মানুষ জীবনযুদ্ধে আত্মরক্ষার তাগিদে দু’টি প্রধান সৃজনধর্মী শক্তির চর্চা করেছিল – কল্পনা ও জ্ঞান। তিনি বলতে চেয়েছিলেন, কল্পনা ছাড়া সাহিত্য বা বিজ্ঞান কোনওটারই প্রসার হয় না। লেনিনও বলেছিলেন কল্পনা ছাড়া সম্ভবত উচ্চতর গণিতের কোনও কিছুরই জন্ম হত না। গোর্কি যে সত্য উপলব্ধি করেছিলেন, অষ্টাদশ শতকের চারের দশকে রাশিয়ার সাহিত্য-সমালোচক ভিসারিওন বেলিনস্কি-ও তা স্বীকার করেছিলেন। বিভিন্ন দিক থেকে বেলিনস্কি সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদীদের পূর্বসূরী ছিলেন। গোর্কির আগেই তিনি বলেছিলেন সাহিত্যিকের মূল লক্ষ্য জনস্বার্থে সাহিত্যকে ব্যবহার করা। বেলিনস্কি বলেছেন — “To deny art the right of serving public interests means debasing it, for that would mean depriving it of its most vital force i.e, idea, making it an object of sybaritic pleasure, the plaything of lazy idlers. (V. G. Belinsky : Selected Philosophical Works)।” তিনি যখন এই ধারণা প্রকাশ করেন তার প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে টলস্টয় লিখলেন ‘হোয়াট ইজ আর্ট’। এই প্রবন্ধ-গ্রন্থে তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তিগুলিকে ধনীদের আমোদ-বিলাসের উপকরণ বলে বর্জন করেছিলেন। তার জায়গায় ‘ক্রিসমাস ক্যারোল’ বা ‘আঙ্কল টম’স কেবিন’-এর মতো কাহিনিকে তিনি সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন।
আমরা দেখতে পাচ্ছি গোর্কির ‘Socialist Realism’ তত্ত্বের জন্ম হওয়ার আগেই বেলিনস্কি-টলস্টয় প্রভৃতিরা তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন। কিন্তু গোর্কির বিচারে টলস্টয় তো ‘social realist’ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ‘critical realist’। তাহলে বলতে হয় ‘critical realism’ ও ‘socialist realism’-এর পার্থক্য মৌলিক নয়, আসলে এ দু’টি হল একই মূল থেকে উদ্ভুত পৃথক আদর্শমাত্র। সেই কারণেই মার্কসবাদী সমালোচক আর্নস্ত ফিশার বলেছেন ‘critical realism’ ও ‘socialist realism’-এর মধ্যে প্রভেদ নির্ণয়ের চেষ্টা হল অতিসরলীকরণের নমুনা। তাঁর মতে ‘socialist realism’ হল এক অর্থে ‘critical realism’। ফিশার মনে করেন গোর্কি প্রমুখ সাহিত্যিকরা সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ বলতে যা বুঝিয়েছেন তা কোনও বিশেষ ‘style’ বা রীতি নয়, আসলে তা একটি ‘attitude’ বা দৃষ্টিভঙ্গীমাত্র।
আর্নস্ত ফিশার ‘socialist realism’ শব্দটি খুব একটা সমর্থনযোগ্য বলে মনে করেননি, যেহেতু সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদধর্মী সাহিত্যকে অনেকে প্রচারধর্মী সাহিত্য ছাড়া অন্য কিছু ভাবেন না। হার্বাট রীড-এর বক্তব্যে এর সত্যতা ধরা পড়ে। ‘আর্ট অ্যাণ্ড সোসাইটি’ গ্রন্থের অন্তর্গত ‘সোস্যালিস্ট রিয়ালিজম’ প্রবন্ধে তিনি মন্তব্য করেছেন — “In effect, then, socialist realism is but one more attempt to impose an intellectual and dogmatic purpose on art.” কাল রোডেক ও নিকোলাই বুখারিনের মতামত বিচার করে তিনি এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন। ‘দ্য নেসেসিটি অব আর্ট’ গ্রন্থে হার্বাট রীড বলেছেন — “The term ‘Socialist Art’ seems to me to be better.”
সমাজের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক বিষয়ে সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদীরা একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গীর বৈশিষ্ট্য হল — প্রথমত, শ্রমজীবী শ্রেণীর উন্নতি এবং তাদের জয়লাভে বিশ্বাস এবং দ্বিতীয়ত, দেশের অতীত ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতের মুক্ত জীবনের সম্ভাবনায় আস্থা রাখা। একজন সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদী হিসাবে মানিক বন্দোপাধ্যায় শ্রমিকের স্বার্থে লেখকের আত্মনিয়োগ করাকে সমর্থন করেছেন। ‘বাংলা প্রগতি সাহিত্যের আত্মসমালোচনা’-তে তিনি বলেছেন — “শ্রমিকশ্রেণীর বন্ধু আছেন, শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ, সংগ্রাম ও চেতনা ষোল আনা নিজের করে নিয়ে শ্রমিকশ্রেণীর একজন হয়ে পড়ুন। দেখবেন কারখানার মারফতে ছাড়া এইভাবেও শ্রমিক হওয়া যায় — শ্রমিকশ্রেণীর একজন হওয়ার যুক্তিতে।” তাঁর এই বক্তব্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সাহিত্যের সাধারণীকৃত সত্য নয়।
সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদীদের দৃষ্টি যদিও ভবিষ্যতের দিকে প্রসারিত, তবুও তাঁরা অতীত সম্পর্কে সচেতন। স্বদেশের গৌরবময় অতীত এবং দেশীয় সাহিত্যের প্রতি শ্রদ্ধা তাঁদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সেই কারণেই পুশকিনের রোমাণ্টিক কাহিনিকে লেনিন সাদরে বরণ করে নিয়েছিলেন। মাও-সে-তুং বলেছিলেন যদি তাঁদের সাহিত্যের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য না থাকত তাহলে তাঁরা বিপ্লবী আন্দোলন চালিয়ে যেতে এবং জয়লাভ করতে পারতেন না। অতীতের সাহিত্যের প্রতি সুগভীর আস্থা থেকেই ব্রেশট্ ও তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণকারীরা দেশের প্রাচীন গল্প-কাহিনির যুগোপযোগী ভাষ্য রচনা করে তাকে নতুনভাবে তাৎপর্যমণ্ডিত করে তুলেছিলেন।
ব্রেশট প্রমুখরা অতীতের সাহিত্যের উপর আস্থা রেখে তাকে যুগোপযোগী করে পাঠকের দরবারে হাজির করার উপর সমধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন, কিন্তু একালের মানুষের কাছে প্রাচীন সাহিত্যের বিষয়বস্তুকে আবেদনসমৃদ্ধ করে তোলার জন্য রূপ-রীতির দিকটি চিন্তা করা প্রয়োজন। মার্কসবাদী বা লেনিনবাদীদের কাছে বিষয়-ভাবনার স্থান সব সময়ই রূপচিন্তার উপরে। কিন্তু ব্রেশট নাটকে রূপ-রীতির কথা গভীরভাবে ভাবনা-চিন্তা করতেন, কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন — “How can artists portray it all with the old means of art.” কলাকৈবল্যবাদীরা রূপের প্রতি অতিমাত্রায় সচেতন ছিলেন, তাঁরা বিষয়বস্তুর গুরুত্ব স্বীকার করতেন না। আবার বাস্তববাদীরা বিষয়ের মাহাত্ম্যে অধিকতর বিশ্বাসী, রূপের ভূমিকা তাঁদের কাছে গৌণ। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদীরা মনে করেন সাহিত্যিকের কাজ হল বেশি সংখ্যক মানুষকে সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার বিষয়ে নিশ্চিত করে তোলা। তাই শুধু বিষয় নির্বাচনেই সাহিত্যিকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, নিজের বক্তব্যকে যথাযথভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাঁকে সাহিত্যের রূপ-রীতির কথাও ভাবতে হয়।
মানিক বন্দোপাধ্যায় ‘সাহিত্য সমালোচনা প্রসঙ্গ’-তে অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, প্রকৃত লেখক হলেন একজন দায়িত্বশীল পিতার মতো, যিনি দেশের মানুষকে সন্তানের মতো জীবনাদর্শ শিখিয়ে পড়িয়ে মানুষ করার ব্রত নিয়েছেন। এ কথা সত্য বলে মনে করলে এটাও মানতে হবে যে শুধুমাত্র বিষয়ের প্রতি নিষ্ঠাই মহৎ শিল্পীর বৈশিষ্ট্য হতে পারে না, কারণ সাহিত্য পাঠ করে আনন্দলাভের অধিকার থেকে কোনও লেখকই পাঠককে বঞ্চিত করতে পারেন না। এই প্রসঙ্গে ব্রেশটের মন্তব্য স্মরণীয় — “The public has a right to be entertained . . . And the artist have a right to be allowed to entertain.” সেই আনন্দদানের জন্যই শিল্পী-সাহিত্যিককে বিষয় ছাড়াও আঙ্গিক ও রূপ-রচনার কৌশলের কথাও ভাবতে হয়। ব্রেশট্ এই সত্য মানতেন বলেই তাঁর প্রায় প্রতিটি নাটকেই নতুন পরীক্ষার ছাপ দেখা যায়।
সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদে বিশ্বাসী লেখকরা সমাজে কৃষক-শ্রমিক শ্রেণীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখলেও তা পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়নি, কেননা ইতিহাসের সাক্ষ্য অনুযায়ী পৃথিবীর সর্বত্র সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ধনতান্ত্রিক শক্তির প্রভাবে প্রতিনিয়ত মানুষে মানুষে অসাম্যজনিত বাধা সৃষ্টি হয়ে চলেছে এবং বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে জন্ম নেওয়া যন্ত্রণাও খেটে-খাওয়া মানুষের হৃদয়ে সতত ক্রিয়াশীল রয়েছে। সেই কারণেই আত্মিক দিক থেকে মৃত ধনতান্ত্রিক দেশগুলির মানুষেরা বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতা থেকে উদ্ভুত যন্ত্রণা মনের গভীরে বহন করে চলেছে। এই বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতার বোধ থেকে বিংশ শতকের প্রথম দিকে কিছু নৈরাশ্য পীড়িত বুদ্ধিজীবীর মধ্যে সবকিছুকেই অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা দেয়। এই পটভূমিতেই শিল্প-সাহিত্যের জগতে ডাডাবাদ, অধিবাস্তববাদ, অস্তিত্ববাদ, অ্যাবসার্ডবাদ প্রভৃতি আন্দোলনের জন্ম হয়।


