রঞ্জন চক্রবর্ত্তী
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাস্তববাদের পূর্ণ বিকাশের কালে পাশ্চাত্য সাহিত্যের জগতে
প্রকৃতিবাদ বা ন্যাচারালিজম একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য ও শিল্প আন্দোলন হিসাবে গড়ে উঠেছিল।
মানুষের মর্যাদা, জীবনের পূর্ণতা ও প্রগতির প্রতি অনাস্থা থেকেই এই মতবাদের জন্ম। রুশোর
ঘোষণা, ফ্রাঙ্কলিনের বুদ্ধিনির্ভর বিশ্বাস ও জেফারসনের স্বাধীন নাগরিকের আবির্ভাব প্রভৃতি
সব কিছুর বিরুদ্ধেই ন্যাচারালিজম বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। এই আন্দোলনটি দাঁড়িয়ে ছিল
বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ, বিচ্ছিন্নতা এবং নিয়তিবাদী চিন্তাভাবনা এবং বাস্তবতার সত্য চিত্রণের
ওপর। এটি রোমান্টিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং মানুষের অভিজ্ঞতাকে নৈর্ব্যক্তিকভাবে তুলে
ধরে। এই মতবাদের অনুসারীরা প্রকৃতির নিয়ম ও সামাজিক কারণসমূহের প্রভাবে মানুষের জীবন
প্রভাবিত হয় বলে বিশ্বাস করেন। প্রকৃতিবাদী সাহিত্যিক নিরপেক্ষ এবং নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি
বজায় রাখে এবং অনেকটা তথ্যচিত্রের পরিচালকের মতো যা ঘটনাকে উপস্থাপন ও বিশ্লেষণ
করেন। এই মতবাদে বিশ্বাসীদের ধারণায় ঈশ্বর মৃত, কোনও কিছুই ইন্দ্রিয়ের অগোচর নয় এবং
মানুষ হল প্রপঞ্চেরই এক বিশেষ রূপ। তাঁরা যেমন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে জগতকে দেখেছেন,
তেমনই সব কিছুকেই নৈরাশ্যের সঙ্গে বিচার করেছেন।
প্রকৃতিবাদকে আমরা বাস্তববাদের একটি পরিবর্ধিত সংস্করণ হিসেবে ধরতে
পারি। প্রকৃতিবাদীরা সাহিত্যচিন্তায় বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রয়োগে আস্থাশীল ছিলেন। তাঁরা মনে
করতেন যে জগৎকে চালিত করে প্রাকৃতিক নিয়ম এবং মানুষের আচরণ নির্ধারিত হয় পুরোপুরি
জিনগত, পরিবেশগত ও সামাজিক কারণ দ্বারা। সেই সঙ্গে তাঁরা এই ধারণাও পোষণ করতেন যে,
বংশগতি এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থাই মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা-
অনিচ্ছা বা পছন্দ-অপছন্দের চেয়ে প্রকৃতি পরিবেশের প্রভাবকেই তাঁরা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে
করেন। এই ধারণার দ্বারা পরিচালিত হওয়ার ফলে তাঁরা বাস্তবতার প্রকৃত চিত্র ফুটিয়ে তুলতে
গিয়ে সাহিত্যচিন্তার রোমান্টিক বা আদর্শগত দিক বাদ দিয়ে কঠোর বাস্তবতাকে তার নির্মম ও
ঊষর রূপে তুলে ধরে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই দারিদ্র্য, অপরাধ, এবং সামাজিক অবিচারের মতো
বিষয়গুলোকে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপিত হয়।
সাহিত্যে ন্যাচারালিজমের সঙ্গে যাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তিনি হলেন
ফরাসী সাহিত্যিক এমিল জোলা। ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘Therese Raquin’ উপন্যাসে তিনি
এই মতবাদ প্রথম ব্যবহার করেন। তবে তাঁর আগেই রাশিয়ায় কান্টেমির, ক্রাইলোব, গোগোল এবং
অস্ত্রোভস্কি ন্যাচারালিজমের চর্চা করেছিলেন। এঁদের ন্যাচারালিস্ট বলে চিহ্নিত করার কারণ হল
বাস্তবের প্রতি নিবিড় আনুগত্য এবং প্রকৃতি ও মানবজীবনের নানা আপাত-তুচ্ছ দিকগুলির যথাযথ
রূপ রচনার প্রবণতা। এই সাহিত্যিকরা রুশ সাহিত্যের প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে সাহিত্যকে
সাধারণ মানুষের জীবনের খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছিলেন। গোগোলের প্রসঙ্গে সমালোচক বেলিনস্কি
বলেছিলেন — “He reads only the book of nature, studies only the world of realities.”
(Selected Philosophical Works : C. G. Belinski)। রুশ সাহিত্যে গোগোল ছিলেন দৈনন্দিন
জীবনে বাস্তবের নিখুঁত বিবৃতিকার। তাঁর হাতে শিল্পের প্রাচীন ধারণা বদলে গিয়ে দাঁড়ায় — শিল্প
হচ্ছে বাস্তবের বিশ্বস্ত প্রতিরূপ। তবে যে অর্থে জোলা ও তাঁর অনুগামীদের ন্যাচারালিস্ট বলা হয়
গোগোল ঠিক সে অর্থে ন্যাচারালিস্ট নন।
যে নিষ্ঠুরতা জীবনে ও সমাজে সত্য তার জন্য লেখক সামাজিক ও অর্থনৈতিক
ব্যবস্থাকে ঘৃণা করতে পারেন, যেমন করেছেন গী দ্য মোপাসাঁ। কিন্তু ভোগ ও সুখের কামনা বা
অন্যের উপর প্রভুত্ব বিস্তারের ইচ্ছা সমালোচনার যোগ্য হলেও মানুষ সম্পর্কে কোনও আশার
কথা না শোনালে লেখক একদেশদর্শী হতে বাধ্য। অর্থনৈতিক শোষণ, যান্ত্রিকতার বিস্তার,
ধনতন্ত্রের অপ্রতিহত বিকাশ প্রভৃতি ঊনবিংশ শতকের শেষ দিক থেকে ফ্রান্স ও আমেরিকার
ব্যক্তিজীবনে যে সংকট সৃষ্টি করেছিল তার অন্যতম প্রকাশ-মাধ্যম ছিল ন্যাচারালিজম। এই
মতবাদের প্রধান সমর্থকদের ছিলেন গুস্তাভ ফ্লব্যের, গোঁকুর ভ্রাতৃদ্বয়, এমিল জোলা, গী দ্য
মোপাসাঁ, জর্জ মূর, থিওডোর ড্রেইসার, জন স্টেইনব্যাক, নোরিস প্রমুখরা। জোলার আগে ফ্লব্যের
বলেছিলেন শিল্পী হবেন ঈশ্বরের মতোই সর্বতোগামী এবং সর্বজ্ঞ। আবার জর্জ স্যাণ্ডকে লেখা
একটি চিঠিতে তিনি জানালেন — ‘I believe great art is scientific and impersonal’। গোঁকুর
ভাইয়েরা তাঁদের ‘জুর্নাল’-এ (১৮৬৫) বলেছিলেন ইতিহাস যেমন কোনও ঘটনার দলিল থেকে লেখা হয়,
তেমনই একালের উপন্যাসও ঘটনা অবলম্বনে বা প্রকৃতিকে অনুসরণ করে লেখা হয়। এই বক্তব্য
খেয়াল রেখে তাঁরা তদনুযায়ী উপন্যাস লেখা শুরু করেছিলেন। কিন্তু ‘scientific naturalism’-এর
যথার্থ প্রবক্তা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন এমিল জোলা। তিনি গোঁকুর ভাইদের নাটক ‘Germinie
Lacertaeux’ বিচার করে বলেছিলেন মনস্তত্ব ও শারীরবৃত্তের মূল সমস্যা সম্বলিত এই নাটকের
কাহিনির সত্যতা মনে রাখার মতো বলেই এটি অসাধারণ।
জোলা যে ন্যাচারালিজমের কথা বলেছিলেন তার আদর্শের সন্ধান তিনি পেয়েছিলেন পল
সেজান প্রমুখ চিত্রশিল্পীদের কাছ থেকে। সেজান ও তাঁর সহযোগীরা ছবির জগতে ইম্প্রেশনিজম্
নামক নতুন আদর্শের সূত্রপাত করেন। সেজানের কথায় ইম্প্রেশনিজমের মূল বক্তব্য হল — “The
artist is merely a recording apparatus for sensory perceptions . . .” (The Necessity of
Art : Ernst Fischer)। চিত্রশিল্পের জগতে সেজান প্রভৃতিরা যে নতুন পথের খোঁজ দিলেন তার
স্বপক্ষে জোলা কয়েকটি সমালোচনামূলক প্রবন্ধ নিখেছিলেন, যেখানে তিনি ইম্প্রেশনিস্ট,
রিয়ালিস্ট, অ্যাকচুয়ালিস্ট, ন্যাচারালিস্ট প্রভৃতি শব্দগুলি মোটামুটি অভিন্ন অর্থে ব্যবহার
করেছিলেন।
প্রকৃতিবাদ বা ন্যাচারালিজম হল বাস্তববাদ বা রিয়ালিজমের একটি সম্প্রসারিত
রূপ। তবে, দুই ধারার মধ্যে কয়েকটি মূলগত পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত — বাস্তববাদ যেখানে
মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ ঘটনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে, সেখানে প্রকৃতিবাদ একই
সঙ্গে বৈজ্ঞানিক নিয়ম, জিনগত কারণ এবং মানুষের উপর সামাজিক পরিবেশের প্রভাবকে বিশ্লেষণ
করে। দ্বিতীয়ত — বাস্তববাদী সাহিত্যের মতোই, প্রকৃতিবাদী সাহিত্যের কাহিনিও প্রায়শই দরিদ্র
ও অনভিজাত চরিত্রদের জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এবং তাদের জীবন ও পরিবেশ সম্পূর্ণ
বাস্তবসম্মতভাবে চিত্রিত হয়। এখানে তফাতটা হল এই যে, বাস্তববাদী উপন্যাসগুলিতে সাধারণত
মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চরিত্রদের দেখানো হয়, যারা প্রায়শই তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে গল্প বলে।
পক্ষান্তরে প্রকৃতিবাদ কেবল দরিদ্র, নিম্নবিত্ত বা শ্রমিক শ্রেণীর চরিত্রগুলিকে কেন্দ্র করে।
তৃতীয়ত — বাস্তববাদী সাহিত্যে, চরিত্রগুলিকে সাধারণত এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে তাদের
নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ আছে এবং তাদের নিজের সমস্যা নিজেদেরই সমাধান করতে হবে। কিন্তু
প্রকৃতিবাদ চরিত্রগুলির থেকে নিয়ন্ত্রণের এই উপাদানটি কেড়ে নেয় এবং তাদের প্রকৃতির দ্বারা
সম্পূর্ণরূপে প্রভাবিত মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করে, অবশ্য সেই সঙ্গে তাদের জীবনের সামাজিক,
নৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থাও চিত্রিত করে। চতুর্থত — যদিও বাস্তববাদ প্রায়শই পরামর্শ
দেয় যে সমাজ উন্নত হতে পারে, কিন্তু প্রকৃতিবাদ এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে না। বরং প্রকৃতিবাদ
বলে চরিত্রগুলির ভাগ্য সম্পূর্ণরূপে তাদের পটভূমি দ্বারা নির্ধারিত হয়, ফলে প্রকৃতিবাদীর
দৃষ্টিভঙ্গিতে কখনও কখনও হতাশাবাদফুটে ওঠে। পঞ্চমত — প্রকৃতিবাদ বাস্তববাদের থেকে
আরও চরম। প্রকৃতিবাদী সাহিত্যে প্রায়শই হিংসা, ক্রুরতা বা শারীরিক আকাঙ্ক্ষার মতো বিষয়গুলি
প্রতিফলিত করা হয় যা সেই সময়ে নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত হত।
গোড়ার দিকে সাহিত্যক্ষেত্রে রিয়ালিজম ও ন্যাচারালিজমের পার্থক্য স্পষ্ট ছিল না,
কারণ উভয় মতবাদেরই বিশ্বাস ছিল শিল্প প্রধানত অনুকৃতিমূলক এবং প্রত্যক্ষ সত্যের রূপায়ণ।
জোলার বন্ধু পল অ্যালেক্সি কথাটাকে বিশদে বোঝাতে গিয়ে বলেন ন্যাচারালিজম কোনও বিশেষ
রচনারীতি নয়, তা হল জীবন সম্পর্কে আলাদা ধরণের চিন্তা-ভাবনা — জীবনকে জানার জন্য তাকে
দেখা, অনুধাবন করা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করা এবং সাহিত্যে তার প্রতিফলন ঘটানো।
ন্যাচারালিস্টরা জীবনকে যে বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন তা বুদ্ধি ও
বিজ্ঞান-নির্ভর। সুতরাং বলা যায় তা বিশ্লেষণধর্মী ও অ্যান্টি-রোমান্টিক। তাঁদের জীবন সম্পর্কে
এরকম দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঊনবিংশ শতকের পাশ্চাত্যের অর্থনীতিতে ধনতন্ত্রের
বিকাশ ও বস্তুবাদী দর্শন। তাঁরা বস্তুবাদী দর্শন থেকে এক ধরণের নিরপেক্ষ বিচার-প্রবণতা
নিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল দূর থেকে গবেষকসুলভ নির্মোহ ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জীবনকে
দেখতে হবে ও বিচার করতে হবে।
প্রকৃতিবাদী আন্দোলন চার্লস ডারউইনের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল এবং
লেখকরা ডারউইনের তত্ত্ব সাহিত্যে প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন। এর ফলে প্রকৃতিবাদী সাহিত্যের
চরিত্রগুলি গঠিত হয় জীববিজ্ঞানের তত্ত্ব ও তাদের পরিবেশ দ্বারা এবং সাহিত্যের পাতায় বেঁচে
থাকার লড়াই একটি পুনরাবৃত্ত বিষয় হিসেবে আসে। এর কাহিনিতে কোনও বাহ্যিক অলংকরণ থাকে
না এবং চরিত্রগুলিকে নায়কে রূপান্তরিত করা হয় না। এমিল জোলাকে যাঁরা গভীরভাবে প্রভাবিত
করেছিলেন তাঁদের মধ্যে আছেন দার্শনিক কোঁত, জীববিজ্ঞানী ডারউইন ও ঐতিহাসিক টেইন। ফলে
তিনি নিজেকে ধ্রুববাদী, বিবর্তনবাদী ও বস্তুবাদী হিসাবে ভাবতে শুরু করেছিলেন। ‘দি
এক্সপেরিমেন্টাল নভেল’-এ তিনি বলেছিলেন লেখক হবেন গবেষণাগারের বৈজ্ঞানিকের মতো এবং
তিনি বংশগতি ও সামাজিক পরিবেশের পটভূমিতে মানুষকে দেখবেন। চোখে দেখা পরীক্ষিত সত্যের
উপর জোলার গভীর আস্থা এবং তাকে সাহিত্য হিসাবে খাড়া করার প্রবণতা আসলে ধ্রুববাদী
দর্শনের প্রভাবেরই ফল। পাশাপাশি তিনি টেইন-এর ‘race’, ‘milieu’ এবং ‘momment’ এই ত্রি-
সূত্রের সাহায্যে মানুষকে বিচার করতে এগিয়েছিলেন। তবে তিনি টেইন-এর অভিমতের সংকীর্ণতার
বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, কারণ টেইন সাহিত্যেকের অভিরুচির স্বাতন্ত্র্য স্বীকার
করেননি। শরীরবিজ্ঞানী ক্লদ বার্ণাদও একসসময় জোলাকে প্রভাবিত করেছিলেন। তাই তিনি
ঘোষণা করেছিলেন যে চিকিৎসক ও ঔপন্যাসিকের পদ্ধতি একই রকম হওয়া উচিত।
জোলা বরাবরই সেই ধরণের রচনার প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন যা লেখকের ব্যক্তিত্বের
প্রভায় উজ্জ্বল। তিনি মনে করেন বাস্তব জগত সম্পর্কে সাহিত্যিকের ব্যক্তিগত বোধের যথাযথ
প্রকাশের উপরেই রচনার মৌলিকতা নিহিত আছে। রচনারীতির দিক থেকে জোলা ছিলেন রিয়ালিস্টদের
থেকে ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা। তিনি শ্রমিক, মধ্যবিত্ত এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের পরিবেশ
দ্বারা নিয়ন্ত্রিত জীবনের দিকে ঝুঁকেছিলেন এবং চেষ্টা করেছিলেন সাহিত্যের পাতায় তার বিবৃতি
যেন নিখুঁত হয়। কিন্তু তিনি মার্কস বা এঙ্গেলসের সমাজতত্ত্বের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। তাই
তিনি মানুষকে বংশানুক্রম ও পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অসহায় জীব হিসাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
জোলা ধনতন্ত্রের কুফল সম্পর্কে অতিশয় সচেতন ছিলেন, মানুষের অসহায়ত্ব অন্তর
থেকে উপলব্ধি করেছিলেন এবং শ্রমজীবীর জীবনকে নিজের সৃষ্টির বিষয় করেছেন। কিন্তু তাঁকে
এটাও মানতে হয়েছে যে ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় জনগণের মধ্যেই ভবিষ্যতের আশা লুকিয়ে
আছে। আসলে জনগণের ক্ষমতায় বিশ্বাসী হলেও তিনি যে ন্যাচারালিজমের জনক তা প্রকৃতপক্ষে
ঊনবিংশ শতকের নৈরাশ্যপীড়িত সমাজজীবনের ফসল। আসলে যথাস্থিতবাদীরা তাঁদের সাহিত্যে
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার কুফল নানাভাবে বিচার করলেও তাঁদের নায়ক-নায়িকারা এই সমাজে বহিরাগত
ব্যক্তি নয় এবং তারা পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত। সুতরাং তাদের সমাজে প্রচলিত প্রথার কাছে
আত্মসমর্পণ না করে বিদ্রোহ ঘোষণা করার সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু ন্যাচারালিস্টরা সেই সত্য
প্রকাশের দায়িত্ব নেন নি, তা নিয়েছেন সোস্যালিস্টরা। তা ছাড়া বিজ্ঞানের যা কিছু কুফল সমাজ
ভোগ করছে তার জন্য দায়ী সেই ধনতন্ত্রীরা, যারা বিজ্ঞানকে নিজেদের স্বাথসিদ্ধির জন্য
ব্যবহার করতে গিয়ে মানুষকে ক্রমে যন্ত্রের দাসে পরিণত করেছে।
স্বীকৃত ন্যাচারালিস্টরা আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ ও অবজ্ঞাত জীবনের মধ্যে নেমে এসে
অনেক ক্ষেত্রে শিল্প-সাহিত্যের জগতে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা কেউই সারা জীবন এই
মতবাদ আঁকড়ে থাকতে পারেননি। স্বয়ং জোলাই যেন ছিলেন তাঁর তত্ত্বের মূর্ত প্রতিবাদ। তিনি
লেখকের মেজাজ ও রুচির উপর তিনি যে পরিমাণ গুরুত্ব দিয়েছিলেন তা থেকে মনে হয় আদর্শ
ন্যাচারালিস্টের থেকে কাম্য নিরপেক্ষতার আবশ্যকতা এক সময় নিজেই বিস্মৃত হয়েছিলেন।
সম্ভবত এই সব কারণেই সমালোচক মন্তব্য করেছেন — “The purely naturalistic work has
never been written and if written, probably could never be read.” (Background of
American Literary Thought : Rod Horton & Herbart Edwards, 1967 এবং American
Literary Criticism : C. C. Walcult, 1956)।
সীমাহীন নৈরাশ্য, উগ্র বস্তুপ্রিয়তা এবং মনুষ্যত্বের অন্তরালে জান্তব প্রবৃত্তির
উন্মোচন প্রভৃতি এতগুলি বৈশিষ্ট্য একটি রচনার মধ্যে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তা ছাড়া লেখক যদি
প্রতি মুহূর্তে পাঠককে সতর্ক করে দেন যে মানুষের প্রতিটি কর্মই পূর্বনির্ধারিত এবং তার
ইচ্ছার স্বাধীনতা বলেও কিছু নেই, তাহলে সে অসহায়তায় ভুগতে শুরু করে। সেক্ষেত্রে হেনরিক
ইবসেনের অসওয়াল্ড চরিত্রটির মতো তাকে অসহায় ও নিরপেক্ষভাবে পূর্বপুরুষের কৃতকর্মের
যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। এই চরিত্রটির পরিণতি ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে ইবসেন ন্যাচারালিস্টিক
পদ্ধতিতে বংশগতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কিন্তু এর ফলে চরিত্রগুলির নৈরাশ্য ও আত্মিক যন্ত্রণা
পাঠকের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে। এখানে প্রশ্ন ওঠে — বাস্তব জীবনের সমস্যাকে সাহিত্যে রূপ
দিতে গিয়ে লেখকের কি পাঠককে নৈরাশ্য উপহার দেওয়া উচিত? ন্যাচারালিস্টদের পক্ষে বলা একথা
বলা যায় যে তাঁরা বাস্তবের সঠিক বিবরণ দিচ্ছেন, বাইরে থেকে নিজেদের ইচ্ছা পাঠকের উপর
চাপিয়ে দিচ্ছেন না। তাঁরা বাস্তবের যে সত্য ছবি ফুটিয়ে তুলছেন তার দ্বারা পরোক্ষে সমাজের
কল্যাণ সাধিত হলেও হতে পারে।
সমারসেট মম-এর ‘অব হিউম্যান বন্ডেজ’ উপন্যাসের ফিলিপ কেরী-র মুখে আমরা যেন
ন্যাচারলিস্টের জীবন দর্শন শুনতে পাই — “There was no meaning of life, and man by living
served no end. It was immaterial whether he was born or not born, whether he lived or
ceased to live. Life was insignificant and death without consequence.” আবার জীবন
সম্পর্কে নৈরাশ্যের আর একটি দিক হল জীবনের স্বীকৃতি। তারই প্রকাশ রয়েছে আনল্ড বেনেট
রচিত ‘আনা অব দ্য ফাইভ টাউনস’ উপন্যাসে। ন্যাচারলিস্টরা জীবন সম্পর্কে প্রধানত নিরাশ
হলেও মাঝে-মাঝে তাঁরা প্রকারান্তরে জীবনের সংস্কারও কামনা করেছেন। থিওডোর ডেইসার-এর
‘অ্যান আমেরিকান ট্র্যাজেডি’ উপন্যাসের ক্লাইভ গ্রিফিথস্ চরিত্রটির মধ্য দিয়ে লেখক পরিবেশ
সংস্কারের সম্ভাবনা প্রতিষ্ঠিতকরেছেন। তিনি স্পষ্টভাষায় কিছু না বললেও তাঁর অনুচ্চারিত
সতর্কবাণী ন্যাচারালিজমের আদর্শকেই সংকেতে প্রকাশ করে এবং জগত সম্পর্কে ঘৃণা ঘোষিত
করে।
সাহিত্যে বাস্তববাদ এবং প্রকৃতিবাদ উভয়ই রোমান্টিক আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া
হিসেবে জন্মগ্রহণ করে। রোমান্টিক সাহিত্য সাধারণত যে শৈলীতে লেখা হত, তা পাঠকের আবেগের
উপর প্রভাব ফেলত। এতে প্রায়শই অতিপ্রাকৃত বিষয় জড়িত থাকত এবং পাঠকের নিজস্ব
অভিজ্ঞতাপ্রসূত উপাদানগুলির ভাষাচিত্র আঁকার পরিবর্তে রোমান্টিক কল্পনাকে প্রাধান্য দেওয়া
হত। রোমান্টিক সাহিত্যে বেশিরভাগ চরিত্রই এসেছে সমাজের অভিজাত বা উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়
থেকে। এই চরিত্রগুলিকে উচ্চ আসনে বসানো হত ও তাদের উপর নানাবিধ গুণাবলী আরোপ করা হত,
তাই তারা সামাজিক মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করত না। লেখার আবহ ও পরিবেশ তারই সহায়ক হত
এবং প্রাকৃতিক জগৎকে রোমান্টিকতার রসে জারিত করা হত। লর্ড বায়রন, উইলিয়াম
ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং এডগার অ্যালান পো-এর কবিতা থেকে এমিলি ব্রন্টির ‘ওয়াদারিং হাইটস’ বা
মেরি শেলির ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’, সর্বত্রই এই ব্যাপারটা কোনও না কোনওভাবে আছে।
ন্যাচারালিস্টরা শিল্প-সাহিত্যে যে নিরপেক্ষতার মহিমা প্রচার করেছেন তা কি
যথার্থ? শিল্পী প্রথমে বিষয় নির্বাচন করেন, তার পর রূপায়ন করেন; তবে শিল্পের জন্ম হয়।
সুতরাং কোনও শিল্পীই যে কোনও অবস্থায় পুরোপুরি নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না। যথাস্থিতবাদীরা
বিজ্ঞানের নিরপেক্ষতা সাহিত্যে নিয়ে আসতে চেয়েচেন। কিন্তু বিজ্ঞানের জগতেও গবেষককে
লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কিছু প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বকে সত্য বলে ধরে নিতে হয় এবং কিছু অপ্রাসঙ্গিক
তথ্যকে বর্জন করতে হয়। সুতরাং বিজ্ঞানীকেও আগে তথ্য নির্বাচন করে নিয়ে গবেষণায় অগ্রসর
হতে হয়। নিরপেক্ষ সত্য নিয়ে বিজ্ঞান বা সাহিত্য কোনওটিই হয় না। সায়েন্টিফিক ন্যাচারালিজমের
প্রবক্তা এমিল জোলা নিজেও লেখকের ব্যক্তিত্বের গুরুত্ব স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু যথাযথ
বর্ণনার তাগিদে লেখকের ব্যক্তিত্ব ও নিজস্বতা মাঝে-মাঝে হারিয়ে গিয়েছে। আমেরিকান
সমালোচক টমাস সার্জেন্ট পেরি মন্তব্য করেছেন, জোলা তাঁর পাঠকদের একটি বিশৃঙ্খল ঘরে নিয়ে
গেছেন সেখানে কী ঘটছে তা দেখানোর জন্য।
‘পাপা হ্যামলেট’-এর লেখক আর্নো হোলৎস প্রকৃত অর্থে ন্যাচারালিস্ট হতে চেষ্টা
করেছিলেন এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে জোলাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু খুব কম লেখকই যথার্থ
ন্যাচারালিস্ট ছিলেন, তা বোধহয় বাস্তবে সম্ভবও ছিল না। তাই আমরা দেখি টেইন ও পল বুরগেট
ধর্মের দিকে ঝুঁকেছিলেন, ইবসেন ও হাপ্টম্যান প্রতীকধর্মীতা ও মিস্টিসিজমের দিকে গিয়েছিলেন,
আর স্ট্রিণ্ডবার্গ হয়েছিলেন নয়া-রোমান্টিকতার পোষক। এটা সত্য যে ‘extremist movement’
হিসাবে ন্যাচারালিজম স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। কিন্তু শ্রমজীবীর জীবন রূপায়ণে,
ছলনাপূর্ণ নীতিজ্ঞানের সমালোচনায় এবং জীবন ও শিল্পের মাঝে অবকাশ দূর করার ক্ষেত্রে তাঁরা
সাফল্য লাভ করেছিলেন। সম্ভবত এই কারণেই ন্যাচারালিস্টরা সাহিত্যের জগতে স্থায়ী আসন
পাবেন।


