২ : অনুবাদের অপযশ

২ : অনুবাদের অপযশ

অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা - তৃষ্ণা বসাক

১ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

২ : অনুবাদের অপযশ

৩ : অনুবাদ- ও  সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা

৪ : শাসকের ভাষা, শাসিতের ভাষা এবং অনুবাদকের অবস্থান

৫ : অনুবাদকের সংকট

তৃষ্ণা বসাক

শুধু যে অনুবাদক বিশ্বাসঘাতক তাই নয়, সে সবসময়ই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। তার কাজকে নিচু নজরে দেখা হয়। কিছুতেই তাকে মৌলিক কাজের সম্মান দেওয়া হয় না।

‘The art of translation is a subsidiary art and derivative. On this account it has never been granted the dignity of original work and has suffered too much in the general judgement of letters..  (Hi Laire Belloc in his lecture on translation)

এইভাবে অনুবাদ কাজের একটা স্বতঃ অবমূল্যায়ন ঘটেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে অনুবাদের মান এবং অনুবাদকদের সম্মানের ওপর। অনুবাদ মৌলিক কাজের থেকে ‘হীন’- সারস্বত সমাজের এই ফতোয়া মাথায় নিয়ে অনুবাদের কাজটি গুরুত্ব পায়নি বলেই যেমন তেমন অনুবাদ করে পার পেয়ে গেছেন অনেকেই, কারণ তাঁরা নিজেদের কাজের ব্যপারে গৌরবানবিত ছিলেন না , আর ছিলেন না এই কারণেই যে তাঁদের কাজের জন্য কোন সম্মান বা স্বীকৃতি তাঁরা কোনদিন পাননি। এবং দেখা গেছে ইতিহাসের কোন কোন পর্বে, এই অসাধারণ শিল্পটির একেবারেই বিলুপ্তি ঘটেছে। শুধু তাই নয়, অনুবাদকের প্রাণসংশয় পর্যন্ত ঘটেছে। বাইবেল লাটিন থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করা বা সংস্কৃত থেকে কোন পবিত্র টেক্সট অনুবাদ করাকে সমাজের রক্ষণশীল অংশ একেবারেই মেনে নিতে পারেনি। এটা ঈশ্বরবিরোধী কাজ, দেবভাষার অপমান মনে করা হয়েছে। যদিও, অনুবাদ ও অনুবাদকের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যে একটা বিরাট ফারাক  আছে।

পশ্চিমে বরাবরই অনুবাদ একটা গৌণ কাজ, যান্ত্রিক কাজ, একেবারেই সৃজনশীল নয়, যেখানে প্রাচ্যে বিশেষ করে আমাদের দেশে অনুবাদ কখনই মূলের আক্ষরিক অনুসারী ছিল না। অনুবাদ ছিল অনুসৃজন, নতুন একটা সৃষ্টি। যার নামও অনুবাদ ছিল না। ছিল ভাষ্য বা টীকা। একটি মৌলিক কাজের ওপর আরেকটি মৌলিক কাজ। আর পরে মধ্যযুগে তো এই অনুসর্জনের চূড়ান্ত সব উদাহরণ আমরা পেলাম। বাঙালি কবি কৃত্তিবাস ওঝা যখন বাল্মিকী প্রণীত সংস্কৃত রামায়ণের অনুবাদ করলেন, তা কিন্তু সংস্কৃত টেক্সটের হুবহু অনুবাদ হল না। তা হয়ে গেল কৃত্তিবাসের এক নতুন সৃজন। বাল্মিকী রচিত উত্তরপ্রদেশীয় কঠোর বীর যোদ্ধা রামের তুলনায় কৃত্তিবাসের রাম যেন বাঙ্গালির ঘরের ছেলে। সীতা যখন বলেন ‘সকল সম্পদ মম দুর্বাদলশ্যাম’ তখন যেন আমরা সবুজ শ্যামল বাংলার মাটির, ঘাসের গন্ধ পাই।

ভারতীয় অনুবাদের ধারণা আসলে পশ্চিমের থেকে একদম আলাদা। চিরায়ত ভারতীয় অনুবাদ বলতে বোঝা  হয় শিথিল অভিযোজন (loose adaptation) এবং সৃজনাত্মকভাবে নতুন করে বলা (creative re-telling) কখনই হুবহু অনুবাদ নয়।  সংস্কৃত থেকে ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষায় যে অনুবাদ গুলি হয়েছে তা আসলে সমালোচনা মূলক ভাষ্য , সারানুবাদ বা আংশিক অনুবাদ (critical commentaries, summaries and partial translations ) যাদের বলা হয় ভাষ্য বা টীকা। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা সোর্স টেক্সট কে একটা টেক অফ পয়েন্ট ছাড়া বেশি কিছু ভাবতেন না, এখান থেকে উড়তে শুরু করে তাঁদের কল্পনা স্বাধীনভাবে পাখা ঝাপটাত মুক্তচিন্তার আকাশে। এখন আমরা যে অনুবাদকের স্বাধীনতা টাধীনতা নিয়ে সেমিনার করি, সেসব তাঁরা থোড়াই কেয়ার করতেন। তাঁরা এমনিতেই ছিলেন সম্পূর্ণ স্বাধীন। সম্ভবত ভারতবর্ষের মতো বহুভাষিক দেশে এই প্রবণতা খুবই স্বাভাবিক। আধুনিক যানবাহন আসার অনেক আগে থেকেই এ দেশের মানুষ পায়ে হেঁটে বা নদীপথে তীর্থ করে বেড়াতেন। আর সেই সময় অন্য ভাষার পুথি বা মৌখিক সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটত, তাঁরা যখন নিজের গ্রামে ফিরে আসতেন, তখন তীর্থের প্রসাদের সঙ্গে সেইসব সাহিত্য নিয়ে আসতেন, যা তাঁরা নিজের ভাষায় নিজের মতো করে বলতেন, পশ্চিমের মতো মূল থেকে বিচ্যুতির কিছুমাত্র পরোয়া না করেই । রামায়ণ মহাভারত ভাগবতের ক্ষেত্রে এসব বারবার ঘটেছে। আমরা যদি ব্যাসদেব কৃত মহাভারতের পাশাপাশি ভীল মহাভারত (অনুবাদ- জয়া মিত্র , প্রকাশক-  সাহিত্য অকাদেমি) কে রাখি, তবে আশ্চর্য হয়ে দেখব দুটো কী ভীষণ আলাদা টেক্সট। ভীল মহাভারতে আছে নাগরাজ বিশাকু  দিনের প্র দিন ধরে ধর্ষণ করছেন দ্রৌপদীকে, অর্জুনের হাত পা বেঁধে রেখে, তাঁরই  চোখের সামনে।  একইভাবে বাল্মিকী রামায়ণ থেকে কন্নড় রামায়ণ আলাদা। 

সত্যি বলতে কি ভারতীয় ভাষায় ট্রান্সলেশনের সঠিক অনুবাদ বলতেও কিছু নেই। Translation – এই ইংরেজি শব্দটির মূলে রয়েছে দুটি লাটিন বীজ – trans (which means across)  আর    lation(which means bring)। তার  ভারতীয় সংস্করণ যে শব্দটি অনুবাদ – তার মানে আবার speaking after. এই শব্দটির ঘাটতি ঢাকতে আরবি থেকে নেওয়া হল তর্জমা শব্দটি  । এখানে একটা মজার কথা বলি। প্রখ্যাত অনুবাদক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন – অনুবাদের থেকে তর্জমা শব্দটি তাঁর বেশি ভাল লাগে। কারণ অনুবাদে সবই বাদ পড়ে, তর্জমায় তবু কিছু জমা থাকে।

বিখ্যাত মলয়লম কবি ও তাত্ত্বিক  K. Satchidanandan লক্ষ্য করেছেন  “India’s culture of translation dates back to pre-colonial times that had witnessed several kinds of literary translation, though our ancients may not claim to be doing so. … This tendency to transform texts from older languages like Prakrit, Pali, Sanskrit, Tamil or Persian continued almost to the end of the pre-colonial period…..” (Satchidanandan, The Hindu Literary Review).

এই স্বাধীনতা কিন্তু পশ্চিমের অনুবাদকরা কখনোই পাননি। কারণ পশ্চিমে অনুবাদ সবসময়ই একটা সেকেন্ডারি কাজ, সৃজনশীল নয়, বরং মেকানিকাল বা যান্ত্রিক। এবং অনুবাদে এটা দেখা গেছে সবসময়ই মূল্যায়ন করা হয় ল্ভ্য বস্তুটির অর্থাৎ এন্ড প্রডাক্টের, প্রসেসের নয়, অর্থাৎ অনুবাদটি কী দর্শন নিয়ে করা হয়েছে, তার পেছনে কী চিন্তা ভাবনা কাজ করেছে, তা বিবেচনায় আনা হয় না। এই কারণেই হয়তো, গোড়ার  দিকে  অনুবাদের তত্বের কোন গুরুত্বই ছিল না। তা গড়ে উঠেছে ধীরে ধীরে।

আর বিশ্বাসঘাতক, তুচ্ছ বা গৌণ কাজ , যান্ত্রিক কাজ- এছাড়াও অনুবাদের জুটেছে আর একটি অপযশ। তাকে বলা হয়েছে servile activity. To please / serve others.

তা কি সবসময় না বিশেষ কোন পরিস্থিতিতে? আসলে যখন রাজা বা শাসকের ভাষা থেকে প্রজা বা শাসিতের ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে, তখন অনুবাদককে ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকতে হয়েছে যে কোনভাবেই যেন রাজার ভাষার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না হয়। এবং এমন ভাব করতে হয়েছে যেন এই অনুবাদ প্রজার সংস্কৃতিকে আলোকিত করল ধন্য করল। ঔপনিবেশিক প্রেক্ষিতে এটা আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারব। 

অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা - তৃষ্ণা বসাক

১ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা ৩ : অনুবাদ- ও  সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

অনুবাদ ও মৌলিক লেখা আমন্ত্রণ 

বার্ষিক রোদ্দুর দ্য সানসাইন পত্রিকার অনলাইন সংখ্যা সাপ্তাহিক রবিবারের রোদ্দুর -এর জন্য পোর্টালের উপযুক্ত পাণ্ডুলিপি , স্থিরচিত্র ,পেন্টিং ইত্যাদি আহ্বান করা হচ্ছে।

Read More »

সকল কাঁটা ধন্য করে

সৌপর্ণ পাল      “এক্সকিউজ মি এটা ফাইন আর্টসের লাইন? না মানে ওটার ক্যাম্পাস তো জোড়াসাঁকোতে আর মেনষ্ট্রিম গুলো বি.টি রোডে একটু কনফার্ম হয়ে লাইনে

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

অনুবাদ ও মৌলিক লেখা আমন্ত্রণ 

বার্ষিক রোদ্দুর দ্য সানসাইন পত্রিকার অনলাইন সংখ্যা সাপ্তাহিক রবিবারের রোদ্দুর -এর জন্য পোর্টালের উপযুক্ত পাণ্ডুলিপি , স্থিরচিত্র ,পেন্টিং ইত্যাদি আহ্বান করা হচ্ছে।

Read More »

সকল কাঁটা ধন্য করে

সৌপর্ণ পাল      “এক্সকিউজ মি এটা ফাইন আর্টসের লাইন? না মানে ওটার ক্যাম্পাস তো জোড়াসাঁকোতে আর মেনষ্ট্রিম গুলো বি.টি রোডে একটু কনফার্ম হয়ে লাইনে

Read More »

রোদ্দুর : The Sunshine পত্রিকার শারদ ১৪৩৩ (২০২৬) সংখ্যার লেখা আহ্বান 

রোদ্দুর পত্রিকা সাহিত্যের এক বিশ্ব অঙ্গন। মানুষের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও চিন্তার যে অন্তহীন যাত্রা—তারই বহুমাত্রিক প্রতিফলন সাহিত্য। ভাষা, দেশ ও কালের সীমা অতিক্রম করে সাহিত্য

Read More »