পরমার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি
প্রখ্যাত কবি অরণি বসু, একবার তাঁর ‘উলুখড়’, পত্রিকার জন্য শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে গেছেনলেখা আনতে, আর শক্তি ওঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অরণিকে ধরে নিয়ে গেছেন মেট্রো সিনেমার পাশের গলিতে, ছোট ব্রিস্টল বারে। সেখানে এ কথা, সে কথার পরে শক্তি, অরণিকে জিজ্ঞাসা করলেন“সুনীলের কবিতা তোমার কেমন লাগে?” অরণি উত্তর দিয়েছিলেন“ভালো, খুব ভালো।” শক্তি খুশি হয়ে বলেছিলেন “ঠিক বলেছ। সুনীল বড় কবি। অনেকে আমাকে তোষামোদ করার জন্য সুনীলের কবিতা নিয়ে উলটোপালটা বলে, আমার খুব খারাপ লাগে।”
কত বড় কবি ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বাংলা কবিতার আধুনিকমনস্ক পাঠক মাত্রই তার খবর রাখেন। তাঁর প্রবল জনপ্রিয়তাহয়তো কারও কারও মনে ঈর্ষার উদ্রেক করেছে, তারাসুনীলের কবিতাকে লঘু করে দেখাতে চেয়েছেন। জনপ্রিয়তা মানেই সস্তা নয়, সেটাই সেদিন বুঝিয়ে দিয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
কেমন ছিল সুনীলের এই কবিতার যাত্রাপথ? সুনীল এবংকৃত্তিবাস গোষ্ঠীর অন্যান্য কবিদের কবিতায় বার বার এসেছে ভ্রমণ, নেশা, রাত্রিযাপন এবং অবশ্যই যৌনতা ও এইসব কিছুকে ঘিরে স্বীকারোক্তি। সেই স্বীকারোক্তি ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক।কৃত্তিবাসীরা অভিযুক্ত হয়েছেন অশ্লীলতার জন্য, বিতর্ক হয়েছে স্বীকারোক্তিমূলক লেখার জন্য। অভিযোগ উঠেছে কৃত্তিবাসের কবিরা ছন্দ জানেন না।
কৃত্তিবাসের পথ চলা শুরু হয়েছিল ১৯৫৩ সালে, আর সেইপঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতা থেকে সহস্র মাইল দূরে আমেরিকান কবি অ্যালেন গিনসবার্গ, ‘হাউল অ্যান্ড আদার পোয়েমস’, প্রকাশ করে জগৎ মাতিয়ে দিয়েছেন।হাউল কবিতায় অ্যালেন যুদ্ধোত্তর আমেরিকান সমাজের বর্ণনা করেন। উঠে আসে সমকামিতা, পুঁজিবাদ।
অশ্লীলতার অভিযোগ ওঠে অ্যালেনের বিরুদ্ধেও, ১৯৫৭ সালে তাকে এই দায়ে বিচারেরও মুখোমুখি হতে হয়েছিল।ঐতিহাসিক সেই বিচারে অ্যালেন সব দায়মুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৬২ সালে অ্যালেন গিনসবার্গ তাঁর প্রিয় বন্ধু পিটার অরলভক্সির সঙ্গে ভারতে এসে পৌঁছোন।
মণিকর্ণিকার ঘাটে গাঁজা টানছে কয়েকটি সাধু।
অ্যালেন, পিটার, মোহন, রাকেশ আর আমি
যোগ দিয়েছি সেই অর্ধবৃত্তে।
‘ এখানে গঙ্গার জোয়ার-ভাটা খেলে না,
ফিনফিনে জ্যোৎস্নায় নদী যেন
এক অচেনা দেশের স্বপ্নময় রাজপথ।
কাছাকাছি চিতায় যে জ্বলছে,
সে অর্ধ-দগ্ধ অবস্থায় আসা একটি তরুণী।
কে যেন বলল,
তার জীবনের চেয়ে তার মৃত্যুর এই আগুন বেশি সুখের।
অ্যালেন জিজ্ঞেস করল,
আমরা কি আমেরিকা বা ভারতের মানুষ?
না পৃথিবীর?
অথবা মহাজাগতিক সন্তান?…’
অ্যালেন ভারতে এসে তখন ঘুরে বেড়াচ্ছেন—কলকাতা থেকে বারাণসী।নিমতলা ঘাট থেকে মণিকর্ণিকা ঘাট। একাত্ম হয়ে মিশে গেছেন কৃত্তিবাসের কবিকুলের সঙ্গে।
সেই সময়টায় তিনি সুনীলকে লিখছেন—“যা কিছু তুমি অনুভব করো,তাকে ঠিক-ঠিক বলে যাওয়াটাই হলো কবিতার কাজ; যেখানে থাকবে তোমার সমস্ত রকম স্বীকারোক্তি, সমস্ত রকম অসন্তোষ, সমস্ত রকম উচ্ছলতা। কি তোমার হওয়া উচিত, সে দিকে কিছু মাত্র লক্ষ্য না রেখে কবিতা আজ জানতে চায়— তুমি ঠিক কেমন।”
সুনীলকে লেখা অ্যালেনের এই চিঠি প্রসঙ্গে শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন— “নিজেরই মধ্য থেকে তেমনই এক রাস্তায় হাঁটতে চাইছিলেন সুনীল, তবু এই চিঠিটি বোধহয় সাহায্য করেছিল তাঁর শেষ দ্বিধাটুকু ভেঙে দিতে।
‘একাকী এবং কয়েকজন’-এর কবি তাই এক ঝটকায় এগিয়ে এলেন ‘আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি’-র বৃত্তান্তে। আর, এই বৃত্তান্ত শুধু যে তাঁর ওই একটিমাত্র বইয়ের নাম হয়ে রইল তা নয়, এটাই হয়ে দাঁড়াল তাঁর আদ্যন্ত কবিতার সমস্ত পরিচয়। তাঁর কবিতা, তাঁর বেঁচে থাকার ধারাবিবরণ। এইভাবে আত্মস্বীকারোক্তি দিয়েই সুনীল তৈরি করতে পেরেছিলেন বড় একটা পাঠকসমাজের স্বীকারোক্তি।”
রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার এবং পুনরাবিষ্কার :
সুনীল অভিযুক্ত হয়েছেন রবীন্দ্র বিরোধিতায়। সুনীলকে তলিয়ে না বুঝেইউঠেছে এই অভিযোগ। সুনীলের ‘আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি’ কাব্যগ্রন্থর ‘পাপ ও দুঃখের কথা ছাড়া আর কিছুই থাকে না’কবিতারপঙ্ক্তি, ‘তিনজোড়া লাথির ঘায়ে রবীন্দ্ররচনাবলী লুটোয় পাপোশে’ ঘিরে বহু নিন্দে সহ্য করতে হয়েছে সুনীলকে। আসলে ব্যাপারটি ছিল অন্যরকম। সুনীলের বন্ধু, কৃত্তিবাসের আর এক বিখ্যাত কবি তারাপদ রায় তখনওছিলেন অবিবাহিত এবং প্রায় সব চাল-চুলোহীন বন্ধুদের মধ্যে তিনিই ছিলেন একটি বাড়ির অধীশ্বর।আড্ডায় আড্ডায় রাত হয়ে গেলে সুনীলরা প্রায়ই তারাপদর বাড়িতে থেকে যেতেন।তারাপদর ঘর ভর্তি বই, এমনকি খাটও ব্যতিক্রম নয়। সুনীলদের শুতে খুবই অসুবিধা হতো।এ রকমই একদিন খাটের ওপর ছিল কয়েকখানা বই, ঘটনাচক্রে সেগুলো ছিল রবীন্দ্ররচনাবলি। বিতর্কিতপঙ্ক্তিটির আগের পঙ্ক্তিটি ছিল, ‘শিয়রে, পায়ের কাছে বই বই বই’। ঘুমন্ত তিন বন্ধুর পায়ে লেগে সেই বই পড়ে গিয়েছিল মাটিতে, এটুকুই ছিল ঘটনা।
শঙ্খ ঘোষ এই প্রসঙ্গে সুনীলের সমর্থনে বলেছিলেন “এ ঘটনাকে কবিতায় না আনলে কী ক্ষতি হতো? ক্ষতি কিছুই হতো না, শুধু ঘটনাটা বলা হতো না, পাওয়া যেত না এই ছবিটি।” যারা মনে করেছিলেন, এই লাইন লেখা ঈশ্বরদ্রোহিতার সমান; মনে মনে তীব্র রবীন্দ্রবিদ্বেষ না থাকলে এমন উচ্চারণ করা যায় না। শঙ্খ ঘোষ তাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, সুনীলের আর একটা উচ্চারণ“কয়েকদিন ধরে মনটা ভারী আনন্দে ভরে আছে। শুধু রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ছি।”
সুনীল যদিও নিজেই বিতর্কউসকে দিয়েছেন“পঙ্ক্তিটি কি তা হলে শুধুমাত্র আক্ষরিক?এর মধ্যে রবীন্দ্রপ্রত্যাখানেরও একটা চড়া সুর নেই?”পঙ্ক্তিটি সুনীলের রচনা হলেও, তিন জোড়া পায়ের উল্লেখ থাকাকে, সমবেত কণ্ঠস্বর বলে ধরা যায় বলে সুনীল মনে করেছিলেন।ষাটের দশকের গোড়ায় রচিত হয়েছিল এই পঙ্ক্তিটি। রবীন্দ্রনাথেরতিরোধানের দু’দশক বাদে তখনও বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের প্রবল উপস্থিতি, সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু গোঁড়া রবীন্দ্র-ভক্তরা যেমন সুকুমার সেন ও নীরদচন্দ্র চৌধুরী বলতেন, রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা কবিতা আর পাঠযোগ্য নয়! এতে অন্য পক্ষে রবীন্দ্র-বিমুখতা বেড়ে যেত। রবীন্দ্রত্তোর যুগের সমস্ত আধুনিক রচনাকে বাতিল করার এ হেন মানসিকতাকে বিপজ্জনক মনে করেছিলেন সুনীল। সুনীলের আক্রমণ
মূলতরবীন্দ্র ভক্তদের বাড়াবাড়ি এবং রবীন্দ্রনাথকেঅচলায়তন বানিয়ে বাংলা কবিতার অগ্রগতি রুদ্ধ করার অসারতার বিরুদ্ধে হলেও, রবীন্দ্র কবিতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন।
কল্লোল যুগের কবিরারবীন্দ্র বিরোধিতায় কখনও তাঁর কবিত্বের আবেদন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেননি, রবীন্দ্র কাব্যে কী কী অনুপস্থিত, যেমন সমসাময়িক বাস্তবতার অভাব ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কৃত্তিবাসীরা মনে করতেন, একজন লেখকের রচনায় কী কী নেই, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবান্তর।
কৃত্তিবাসীরা অনুভব করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতার ভাষা নিষ্প্রভ হয়ে আসছে। কৈশোরে যেসব রবীন্দ্র কবিতা পড়ে সুনীল মুগ্ধ হয়েছেন, প্রথম যৌবনে এসে মনে হয়েছে, সে কবিতা দুর্বল। একাধিক রবীন্দ্র কবিতার আঙ্গিক নিয়ে, ছন্দমিলের ধরন, অনাবশ্যক দৈর্ঘ্য এবং তার ফলে পুনরুক্তি নিয়ে সুনীল প্রশ্ন তুলেছেন। কৈশোরে ‘সঞ্চয়িতা’ ছিল সুনীলের নিত্যসঙ্গী। পরে সে বইতে লাথি না মারলেও, সরিয়ে রেখেছেন। ভালবাসা চলে গেছে।
সুনীলের অত্যন্ত প্রিয় বই ছিল, ‘গীতবিতান’। রবীন্দ্র কবিতার থেকে, রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতিই ছিল ওঁর পক্ষপাত। সুনীল বলেছিলেন, “আমাকে যদি নির্বাসনে যেতে হয়, তবে অবশ্যই ‘গীতবিতান’ সঙ্গে নিতে চাইব।”
নিজের জীবনে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা প্রসঙ্গে সুনীল লিখেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এক সময় বহু বাজে কথা বলতাম। চারদিকে রবীন্দ্রভক্তি দেখে দেখে আর তাঁর নাম শুনে শুনে কান ঝালাপালা হয়ে যেত। বিরক্ত হতাম খুব, ফলে বহু কটূক্তি করেছি। তবে রবীন্দ্রনাথ পড়েছি তন্ন তন্ন করে। অনেকে তাঁর রচনাবলি না পড়েই সমালোচনা করেন।আমি তেমনটা করিনি। বিশ্বসাহিত্য পড়ে আমার যা ধারণা হয়েছে, তাতে বলা যেতে পারে, ইদানীংকালে তাঁর মতো অত উঁচু দরের লেখক আর জন্মাননি।যুগ অতিক্রম করে সাহিত্যের একটা চিরকালীন বিচারও তো আছে। সেই বিচারে রবীন্দ্রনাথ বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ লেখক। বিশ শতকে সারা পৃথিবীতেই বা তাঁর তুল্য আর কে আছেন? তাঁর অনেক কবিতা পড়তে হয়তো তেমন আর ভালো লাগে না আমার, কিন্তু ওঁর গান আছে, আছে ছোটগল্প, প্রবন্ধ; যা আমার আজও খুব ভালো লাগে।পঞ্চাশের দশকে আমরা যখন লেখালেখি শুরু করি, তখনও কিন্তু সাহিত্যের আবহাওয়া রবীন্দ্রনাথের কিরণ ছটাতেই অনেকখানি আচ্ছন্ন। পত্রপত্রিকায় অধিকাংশ প্রবন্ধই রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে। অধ্যাপকরা রবীন্দ্রনাথে আপ্লুত। রাজনৈতিক নেতারাও তাঁদের ভাষণে যখন তখন, অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রাসঙ্গিকভাবে রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি দেন। এমনই তাঁর সর্বব্যাপ্ত প্রভাব, বাংলার প্রায় সব লেখাই রবীন্দ্র-অনুসারী। ‘দেশ’, ‘মাসিক বসুমতী’, ‘শনিবারের চিঠি’ প্রভৃতি প্রভাবশালী পত্রিকায় রবীন্দ্র-অনুসারী কাঁচা কবিতারই প্রাবল্য, নিছক ছন্দ-মিল দেওয়া সেসব অদ্ভুত জিনিস। ‘আধুনিক কবিতা’ তখন শিক্ষিত মহলেও হাসি-ঠাট্টার বিষয়। যেকোনও ভাষায় রবীন্দ্রনাথের মতন এমন বিশাল মাপের প্রতিভাধর লেখকের আবির্ভাব হলে তার খানিকটা বিপদও আছে। তাঁর প্রভাব ও ছায়া থেকে বেরিয়ে আসা খুবই শক্ত, সাহিত্যের অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে যায়। তা হলে আর সাহিত্যবহতা থাকবে কী করে?”
রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে সচেতনভাবেই সুনীল নিজের কবিতায় দূরত্ব তৈরি করেছেন।
অথচ তিনি বলেছিলেন খুব ভালভাবে রবীন্দ্রসাহিত্য পাঠ সম্পন্ন না করে কেউ যেন বাংলা ভাষায় লেখালিখি করতে না আসেন।
সুনীলের ‘কাল রাতের বেলায়’ কবিতাতেই তো আমরা পড়ি
‘কাল রাতের বেলায় গান এলো মোর মনে’
তখন আপনি ছিলেন আমার সঙ্গে, সবগুলি গুনগুন সঙ্গীতের স্রষ্টা
পূজা থেকে বিরহ, প্রকৃতি থেকে আরও দুঃখভরা গান’
এই কবিতারই অন্যপঙ্ক্তিতে সুনীল লিখছেন,
‘রবীন্দ্রনাথকে দেখে হঠাৎ আমার কান্না এলো কেন, আমারও কান্না জমে ছিল?
আঃ, বেঁচে থাকা এত আনন্দের!‘
সুনীলের বিখ্যাত,‘নীরা হারিয়ে যেও না’ কাব্যগ্রন্থর ‘তিনি এবং আমি’ কবিতাটির কিয়দংশ পাঠ এক্ষেত্রেঅতি প্রাসঙ্গিক হবে : ‘বন্ধুরা চাঁদা দিয়েছিল,
তাই নিয়ে ছাপিয়েছি প্রথম কবিতার বই।
প্রেসে এখনও কিছু ধার রয়ে গেছে,
দপ্তরীখানায় দয়া চেয়েছি।
তারপর ছুটতে ছুটতে এসেছি তোমার কাছে,
তোমার করকমলে
প্রথম কপিটা দেবার জন্য।
পাপীয়সী,
তুমি এই সময়ের বীন্দ্রনাথকে
বুকে জড়িয়ে আদর করছো—
আমি কি কেউ না?
আমার ঈর্ষা লকলক করে উঠছে আকাশে,
এখন এক প্রবল বজ্রপাতে
ধ্বংস হয়ে যাক
রবীন্দ্রনাথের মতো সবকিছু—
তারও ওপরে রেখে যাব
আমার দীন-দুঃখী কাব্যগ্রন্থখানি!
রবীন্দ্রনাথের সবকিছু ধ্বংস হলেও
কোনো ক্ষতি নেই।
বাড়ি ফিরে এসে,
সবকিছু মুছে দিয়ে,
তোমাকেও—
নির্মম একাকিত্বে
আমার হাহাকার,
আমার সমস্ত গুপ্তকথার মতো
অনর্গল মুখস্থ বলে যাব
রবীন্দ্রনাথের কবিতা।
একটাও কমা, হসন্ত ভুল হবে না।
রবীন্দ্রনাথকে আমি ভাঙবো,
ছিঁড়বো, যা খুশি করবো—
সে সব আমার নিজস্ব ব্যাপার।
রবীন্দ্রনাথও সে কথা জানতেন,
মৃত্যুর আগে সেই জন্যই
তাঁর ঠোঁটে লেগেছিল
ক্ষীণ কৌতুকের হাসি!’
সুনীল বলেছিলেন, “কোনও নবীন লেখক যদি সূচনাপর্বে রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করে নিজস্ব ভাষা সন্ধানের চেষ্টা না করে, রবীন্দ্রনাথেই আপ্লুত হয়ে থাকে, তবে সে অতি মূর্খ। পরিণত বয়েসেও যদি কোনও লেখক রবীন্দ্রনাথের থেকে দূরে সরে থাকে, তাঁকে জীবনযাপনের সঙ্গী করে না নেয়, তা হলে সে আরও বড় মূর্খ।”
রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সুনীলের সমস্ত গদ্য, কবিতা, ছোটগল্প নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল, ‘রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার এবং পুনরাবিষ্কার’ শিরোনামে একটি সংকলন।
সেই সংকলনের ভূমিকায় সুনীল লিখেছিলেন, “সারাজীবন ধরে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ভেবেছি। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বারবার বদলে গিয়েছে। যৌবনে রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করতেই চেয়েছিলাম। তখন মনে হয়েছিল, এই হিমালয় পর্বতকে অস্বীকার করতে না পারলে মৌলিক কোনও পথের দিশা পাওয়া বোধহয় সম্ভব নয়। পরে ভেবেছি, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কোনও গতি নেই। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ নিজেই একটা ঐতিহ্য। তাঁকে পুনরাবিষ্কার না করে কোনও উত্তরাধিকারের কথা ভাবাই যায় না। উপন্যাসগুলোতেতাঁকে নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে গেছি। আমার জীবনে দীর্ঘকালের রবীন্দ্র-অভিজ্ঞতার স্মারকগ্রন্থ হয়ে রইল এই বই।”
সুনীল মনে করতেন, “বাংলা কবিতা রবীন্দ্রনাথের পরে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ একা বাংলা কবিতাকে যতখানি এগিয়ে এনেছিলেন, তাঁর পরবর্তী বাংলা কবিতা অনেক বেশি এগিয়ে গিয়েছে। তবে প্রথম যিনি আসেন, তাঁর পক্ষে কাজটা কঠিন থাকে, পরবর্তীদের ক্ষেত্রে সেটা সহজ হয়ে আসে।”
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সুনীলের আত্মার আত্মীয়।
স্পষ্টতই সুনীলের এক সময়ের রবীন্দ্র বিরোধিতার কারণ ছিল, তৎকালীন রবীন্দ্র অনুরাগীদের রবীন্দ্রনাথকে দেবতার আসনে বসিয়ে পুজো করা এবং রবীন্দ্র পরবর্তী কালের লেখকদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা। রবীন্দ্রনাথের অন্ধ অনুকরণে বাংলা সাহিত্য, বিশেষ করে বাংলা কবিতা, বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কাই ছিল এই বিরোধিতার উৎস।
কৃত্তিবাসের সম্পাদনা ও শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে সখ্যতা :
লেখার ধরন ও যাপনগত মিল না থাকা সত্ত্বেও কৃত্তিবাস সম্পাদক হিসেবে সুনীল প্রথম থেকেই আপন করে নিয়েছিলেন শঙ্খ ঘোষকে।
‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যার প্রথম কবিতা হিসেবে মুদ্রিত হয়েছিল শঙ্খ ঘোষের দশ-বারো পাতার দীর্ঘ কবিতা, ‘দিনগুলি রাতগুলি’। পরেসেই একই নামে, প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ।
কৃত্তিবাসের প্রথম দিন থেকে সুনীল ও শঙ্খ ঘোষের সেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালবাসার সম্পর্কটি চিরকাল বজায় ছিল।সুনীল নির্দ্ধিধায় বলেছেন “আমরা যখন ‘কৃত্তিবাস’ নামক কবিতার পত্রিকাটি শুরু করি, তখন শঙ্খ ঘোষই সব চেয়ে প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন তরুণতম কবি।” বুদ্ধদেব বসুর মতন বিদগ্ধ কবিরা যখন, কৃত্তিবাসের কবিরা ছন্দ জানেন না বলে অভিযোগ করছেন, তখন তার জবাব দেওয়ার দায়িত্বও সুনীল দিয়েছিলেন শঙ্খ ঘোষকে।
শঙ্খ ঘোষ আকাদেমি পুরস্কার পাওয়ার পরে সুনীল দেশ পত্রিকায় লেখেন, “‘বাবরের প্রার্থনা’ নামের কাব্যগ্রন্থের জন্য শঙ্খ ঘোষ আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন এটা সত্যিকারের সুসংবাদ। আমাদের দেশে সরকারি পুরস্কারের ব্যাপার নিয়ে এমন কুবিচার হয় যে ওই ব্যাপারটা সম্পর্কেই আমাদের অনাগ্রহ জন্মে গেছে। তবে শঙ্খ ঘোষের প্রতিভাকে স্বীকৃতি জানিয়ে এ বার পুরস্কারদাতারাই পরিচ্ছন্ন হলেন।” একই নিবন্ধে, কৃত্তিবাসে শঙ্খ ঘোষের লেখা কবিতার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সুনীল, কবির প্রথম যুগের কবিতার উদাহরণ দিয়েছেন :
‘হে নিবিড় সুনিবিড় তমসিনী ঘনভার রাত্রি,
আমাকে হানো
ঐ তার আলুলায়িত বেদনার কালো
তারই চুপে দীর্ঘকাল এ আমার স্নান
বন্ধ মোহ গতশ্বাস আলুথালু বাঁচা…’
(দিনগুলি রাতগুলি)
‘যখন যা চাই তখুনি তা চাই।
তা যদি না হবে তা হলে বাঁচাই
মিথ্যে, আমার সকল আশায়
নিয়মেরা যদি নিয়ম শাসায়
দগ্ধ হাওয়ার কৃপণ আঙুলে
তা হলে শুকনো জীবনের মূলে
বিশ্বাস নেই, সে জীবন ছাই!’
(আড়ালে)
কাব্যধারা নিয়ে তাঁদের মতানৈক্য হয়েছে,সুনীলের জীবনের শেষ কয়েক বছরে রাজনৈতিক কারণে দু’জনের বিরোধ ঘটেছে, তবে তাতে ব্যক্তিগত সম্পর্কে কোনও চিড় ধরেনি। প্রায় ষাট বছরের সেই সখ্যতার প্রতিফলন ধরা আছে পরস্পরকে লেখা চিঠিপত্রেও।
শঙ্খ ঘোষ, সুনীলের মৃত্যুর পরে বলেছিলেন “কিছুমাত্রও লেখেন যাঁরা, তাঁদের সবাইকে নিয়ে গড়ে তুলতে হবে এক বন্ধুজগৎ, কবিতা আর জীবন একাকার হয়ে মিলে থাকবে যেখানে। এ রকম ভাবনার একটা আবেগ ছিল সুনীলের। চিঠিগুলোতে থরথর করছে সেই আবেগ।”
১৯৬৩ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি, শঙ্খবাবুকে লেখা এক চিঠিতে সুনীল বলেন, কৃত্তিবাস সম্পাদনায় তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে, কিন্তু কিছু লেখা জমা পড়ে গেছে, সুতরাং শেষ একটি সংখ্যা প্রকাশ করতেই হবে, তাঁর সম্পাদনায় অবশ্যম্ভাবী শেষ সংখ্যারজন্য শঙ্খবাবু যেন লেখা পাঠিয়ে দেন। সেই সংখ্যায় শঙ্খবাবু লিখেছিলেন ‘এক দশকে সঙ্ঘ ভেঙে যায়’।
নিভৃতে ঘোষণার সেই ‘অবশ্যম্ভাবী শেষ’, সংখ্যাটি হয়ে উঠেছিল কৃত্তিবাসেরসাড়া জাগানো এক সংখ্যা।ফুটপাতের উপর, ছাতার তলায় ঘুমোচ্ছে এক বিকলাঙ্গ কিশোরী, অ্যালেন গিনসবার্গের তোলা এই ছবিটি সেই সংখ্যার প্রচ্ছদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
আলোড়ন তুলে দিলেও সেই সংখ্যা সুনীলের মনের মতন হয়নি। সুতরাং আরও একটা সংখ্যা বার করার জন্য শুরু হলো উদ্যম। শঙ্খ ঘোষকে চিঠিতে লিখলেন “আপনার লেখা অবিলম্বে চাই। এক দশকে সঙ্ঘ ভেঙে যায়, আশ্চর্য তবে কৃত্তিবাস আবার বেরুবে কেন? ঠিক বুঝতে পারছি না। এ সংখ্যাটি দেখা যাক।”
শঙ্খবাবু জবাবে লিখছিলেন“না কৃত্তিবাস কেন বেরুবে না! সঙ্ঘ ভেঙে যায় কিন্তু সমষ্টি তো থাকে।”
সুনীলের সম্পাদনায় তারপর ষাট বছরে পৌঁছে যায় কৃত্তিবাস। অথচ দশ বছরে পৌঁছেই অন্যতম সম্পাদক ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর সম্পাদনায় সেটাই শেষ সংখ্যা। তার কারণ নিয়ে বিস্তারিত লিখে গেছেন শঙ্খ ঘোষ।
বাংলা কবিতার ভুবনে, ছয় দশক ধরে সমৃদ্ধিশালীএকটা স্রোত কৃত্তিবাস পত্রিকার মাধ্যমে প্রবাহিত হয়েছে। সুনীলবাংলা কবিতায় কৃত্তিবাস এবং কৃত্তিবাসীদের অবদান সম্বন্ধেবিচারের ভার পাঠকের উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবে বলেছিলেন “পৃথিবীতে সবচেয়ে পুরনো কবিতা পত্রিকার নাম হচ্ছে ‘পোয়েট্রি’। সেটা আমেরিকার শিকাগো শহর থেকে ১৯১২ সালে প্রথম বের হয়। এর মূল্যায়নের সঙ্গে সমান্তরালভাবে আমাদের পত্রিকার মূল্যায়নও করা যায়। অন্তত এর বিকাশ ধারাবাহিকতার দিক দিয়ে বিবেচনা করলে।”
শঙ্খ ঘোষ মনে করতেন, লিরিকাল ধারা ছেডে দিয়ে বাংলা কবিতাকে গদ্যধর্মিতার দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সুনীলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা পরবর্তীকালে বহু কবিকে প্রভাবিত করেছে। সুনীলের কবিতা স্বতঃস্ফূর্ত, আত্মজৈবনিক এবং গদ্যপন্থী। সুনীল, শঙ্খবাবুকে সাতষট্টি সালের গোড়ার দিকে বলেছিলেন, এখনকার কবিতায় লিরিককে একেবারে বাদ দিতে হবে, আর শঙ্খবাবু পারলে যেন এটা শক্তিকে বুঝিয়ে বলে দেন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘চয়নিকা’, ‘সঞ্চয়িতা’র থেকে অন্য ধরনের একটা সংকলন করতে।
শঙ্খ ঘোষের সম্পাদিত রবীন্দ্র কবিতা সংকলন, ‘সূর্যাবর্ত’ – নিয়ে সুনীলের কিছুটা আপত্তি ছিল।
ওই সংকলনে শঙ্খবাবুর রবীন্দ্র কবিতার ধারাবাহিকতা মেনে চলার সিদ্ধান্ত সুনীলের পছন্দ হয়নি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নিজের লেখা সম্বন্ধে পরিণত বয়সে বলেছিলেন, যে লেখাগুলো সাহিত্যের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়েছে, সেগুলোকেই রক্ষা করা উচিত।
সুনীলের সম্পাদনায়, ২০০৭ সালে ‘রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সংকলনটি প্রকাশিত হয়।
শঙ্খ ঘোষ ‘ব্যক্তিগত কুঠার’ শিরোনামে একটি লেখায় সুনীলের সম্পাদনার ভূয়সী প্রশংসা করলেও, দুটো বিষয়ে গুরুতর আপত্তি জানিয়েছিলেন।কিছুদিন বাদে সুনীল ফোন করে শঙ্খ বাবুকে জানালেন, লেখাটি পড়ে তিনি মুগ্ধ। শঙ্খ তখন সুনীলকে ওঁর আপত্তিগুলোর কথাও মনে করিয়ে দেন। সুনীল বলেন, ওই আপত্তিগুলো নিয়ে তিনি নিশ্চয়ই ভাববেন, কিন্তু শঙ্খ বাবুর লেখাটি অসাধারণ হয়েছে।
নিজের মত প্রকাশে সুনীল যেমন অকুণ্ঠ ছিলেন, তেমন অপরের মতামতের প্রতিও ছিলেন শ্রদ্ধাশীল।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটি সাক্ষাৎকারে, শঙ্খ ঘোষের ‘সূর্যাবর্ত’ সম্পাদনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন“শঙ্খ বাবু নিজে একজন আধুনিক কবি এবং সেই সঙ্গে বর্তমানকালের স্বনামধন্য রবীন্দ্র গবেষক। তাঁর মতো যোগ্য সম্পাদক আর কে!”
মতানৈক্য বাংলা কবিতার দুই মহীরুহর পারস্পরিক প্রীতির সদা প্রবহমান ফল্গুধারায় কখনও অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি।
আত্মজন :
‘আমার দূরত্ব সহ্য হয় না, নীরা ঝড়ের রাত্রির মতো কাছে এসো
যেমন নদীর গর্ভে গুমরে ওঠে নিদাঘের তোপ
প্রতিটি শিমুল বৃক্ষ সর্বাঙ্গে আগুন মেখে যেমন অস্থির
আমি প্রতীক্ষায় আছি…’
নীরা নাম্নী নারীর প্রেমিক হিসেবে কবি সুনীলের জনপ্রিয়তা বোধহয় সর্বাধিক।
তবে সুনীল শুধু নীরা বা নারীর প্রেমিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানব প্রেমিক। বহু মানুষের আশ্রয়স্থল।
বহু নবীন কবিকে তিনি আত্মপ্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছেন।
সুনীল প্রয়াত হওয়ার পরে, শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন “সুনীল সারা জীবন অসংখ্য মানুষের উপকার করেছেন। সর্ব অর্থেই প্রচুর মানুষকে আশ্রয় দিয়েছেন। এঁদের মধ্যে অনেক দুঃস্থ মানুষও আছেন। কাজেই সুনীলের চলে যাওয়ায় বহু মানুষ নানাভাবে নিরাশ্রয় বোধ করবেন। এই আশ্রয়হীনতা কেবল আর্থিক নয়, আত্মিকও। সুনীলের মনের প্রসার, ভালবাসার ক্ষমতার জন্য ওঁর চারপাশের মানুষ মমতা, প্রশ্রয় পেয়েছেন। সুনীল হয়ে উঠেছিলেন তাদের নির্ভরতার জায়গা, তাদের আত্মজন।”
বনগাঁয় ‘পথের পাঁচালি’ নামক এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সভাপতি হিসেবে অনেক জনহিতকর কাজ করেছেন সুনীল।
হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও প্রত্যেক বছরে সস্ত্রীক পৌঁছে যেতেন পথের পাঁচালির নানা অনুষ্ঠানে, মিশে যেতেন সাধারণ গ্রামবাসীদের সঙ্গে। মানুষের জন্য সুনীল এমন অনেক কাজ করে গেছেন নীরবে। অথচ তিনি অভিযুক্ত হয়েছেন ব্যক্তি কেন্দ্রিক মানুষ হিসেবে।
সুনীল আর একটি বিরল গুণের অধিকারী ছিলেন,
তিনি কখনও অপরের নিন্দায় লিপ্ত হতেন না, এমনকি আড্ডার মধ্যেও অন্য কেউ যদি কারো নিন্দা করতেন, সুনীল তাকে থামিয়ে দিতেন।
‘আমার ভালোবাসার কোনো জন্ম হয় না
মৃত্যু হয় না –
কেননা আমি অন্যরকম ভালোবাসার হীরের গয়না
শরীরে নিয়ে জন্মেছিলাম।’
এই উচ্চারণ তাঁকেই মানায়।
‘চিতাটিতে মেয়েটির আলতা পরা দু’টি পায়ের পাতা এখনও বেরিয়ে আছে বাইরে।
অক্ষত, অনির্বচনীয়। কেউ কি ওকে মনে রাখবে?ওর কি একটা অর্ঘ্য প্রাপ্য নয়!
ওর মুখ দেখিনি, তবু ওর মুখ আমি রচনা করি।
আমি অ্যালেনকে বলি, এসো, ওর পায়ে আমরা চুম্বন দিই।
সঙ্গে সঙ্গে মহাজাগতিক এই ক’জন গাঁজাখোর
উঠে গিয়ে সেই চিত্রটির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে।’
এমন অর্ঘ্যএক প্রেমিক কবি ছাড়া কে বা দিতে পারতেন!
প্রেমিক কবি :
১৯৫১ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলসুনীলের প্রথম কবিতা ‘একটি চিঠি’। সুনীলের মতে সেই কবিতা এত দুর্বল ছিল যে, পরবর্তী সময়ে সুনীলের কোনও বইতে তারস্থান হয়নি।সুনীলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় কবিতা প্রকাশিত হয় ‘অগ্রণী’ ও ‘শতভিষা’ পত্রিকায়। বুদ্ধদের বসুর বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় সুনীলের চতুর্থ কবিতা, ‘তুমি’ প্রকাশিত হয়।পরবর্তীকালে ‘আবু সয়ীদ আইয়ুব’সম্পাদিত ‘পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতা’ কাব্য সংকলনেকবিতাটি স্থান পেয়েছিল। বিজ্ঞাপনে লেখা হতো ‘রবীন্দ্রনাথ থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পর্যন্ত’। সেই বিজ্ঞাপন দেখে সুনীল বেশ আনন্দিত হয়েছিলেন।
১৯৫১ সাল থেকে ২০১২ সাল, আমৃত্যু নিরবচ্ছিন্ন থেকেছে সুনীলের কবিতার পথ চলা। গদ্য লেখার চাপে সেই স্রোত কোনও কোনও সময় কিছুটা স্তিমিত হলেও, কবিতাই ছিল তার প্রথম ভালবাসা।
সুনীল বলেছিলেন “পৃথিবীই তো গদ্যময়। আমার নিজের সময়, কবিতার সময়টুকু বাঁচিয়ে রাখি রাতের বেলার জন্য। যদিও কবিতা মানে নিজেরই কথা, তবু এই আমিটা শুধু নিজেকে নিয়েই ভাবে না। তার দুঃখকষ্ট, ব্যথা-বেদনার মধ্যে তার দিনরাতের রক্তঘামের জগৎটাও জড়িয়ে আছে। রাত্রি আমার পরিবেশ, যখন কবিতা দিয়ে আমার জগৎটাকে পাই, গদ্যের হাত থেকে ছাড়া পাই।’
জীবনের শেষ পনেরো বছরে সুনীল প্রবলভাবে ফিরে এসেছিলেন কবিতা রচনায়, কেন ফিরবেন না!
কবিতাই তো সুনীলের ওষ্ঠ কামড়ে ধরে আদর করা প্রেমিকা।
সুনীলের মতো বিপুল পরিমাণে গদ্য, বাংলা ভাষায় খুব অল্প লেখকই লিখতে পেরেছেন। তবু সুনীল যখন একলা থাকতেন, একান্তভাবেই নিজের মধ্যে নিজে, তখন নিজেকে কবিতা লেখক বলেই মনে করতেন। তিনি বলেছিলেন “আমি নিজেকে কবি বলে মনে করি না। কবিতা লেখক বলে মনে করি। কবি হয়তো এখনও হতে পারিনি।”
শতবর্ষ থেকে এক দশকেরও কম দূরত্বে দাঁড়িয়ে বাংলা সাহিত্যেসুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের হিমালয়সদৃশ উপস্থিতিনিয়ে বহু চর্চা হবে, কিন্তু অন্যান্যসমস্ত সত্তাকে ছাপিয়ে তিনি প্রথমে কবি। তিনি নিজে যাই মনে করুন, আমরা জানি, বাংলা কবিতার ইতিহাসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একজন উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হিসেবেই চির অম্লান থেকে যাবেন।
অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেল, ২০১২ সালের ২৩শে অক্টোবর তাঁর নশ্বর দেহ পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেছে, অথচ কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রাসঙ্গিকতা এতটুকু কমেনি।তিনি কবিতাকাতর এক প্রেমিক, যিনি কবিতার জন্য অমরত্বকে তাচ্ছিল্য করেছিলেন;সেই কবিতাই তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।
তথ্য ঋণ :
‘কৃত্তিবাস’-এর টানাপোড়েন – শঙ্খ ঘোষ
শক্তিসঙ্গ– অরণি বসু
পাগল ও ভবঘুরে ভাইরাস – যশোধরা রায়চৌধুরী
আকাডেমি পুরস্কার : শঙ্খ ঘোষ – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার এবং পুনরাবিষ্কার – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
ইতি কলেজস্ট্রিট – সুধাংশুশেখর দে
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার
পঙ্ক্তিঋণ : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ


