২ : উর্ণনাভ

২ : উর্ণনাভ

This entry is part 2 of 5 in the series ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ

১ : ঊর্ণনাভ

২ : উর্ণনাভ

৩ : ঊর্ণনাভ

৪ : ঊর্ণনাভ

৫ : ঊর্ণনাভ

শ্যামলী রক্ষিত 

দ্বিতীয় পর্ব 

ঘাড় গুঁজে একটার পর একটা করে মোচার খোসা ছাড়িয়ে, বেছে বেছে শক্ত কাঠি আর পেটের আঁশ ফেলে মোচা কাটছিল দিপালী। তারপর থেকে আর একটাও কথা বলেনি সে। মুখ বুঁজে নিজের মতো করে কাজ করে যাচ্ছিল। মনটা আজ তার ভীষণ খারাপ। এমনিতেই ক’দিন ধরে মনের ভেতর অশান্তির আগুন জ্বলছে—খেয়ে-ঘুমিয়ে কিছুতেই শান্তি নেই। ওই ঘটনার পর থেকেই রাতের ঘুম উধাও হয়েছে তার। মনটা যেন তুঁসের আগুনের মতো সারাক্ষণ ধিকধিক করে জ্বলছে। অথচ লোকসমাজে দাঁত বের করে হাসতে হচ্ছে, কথা বলতে হচ্ছে। মনটা ভারী হয়ে আছে গরমের বিকেলের মতো। তার ওপর আবার এই উটকো ঝামেলা! এমন নিষ্ঠুর মানুষ সে আর দু’টো দেখেনি।

রাগে, অভিমানে, ক্রোধে দিপালীর চোখে মেঘ জমে উঠছিল। কিন্তু সে কাঁদবে না। লোকের সামনে কাঁদতে তার একেবারেই ইচ্ছে করে না। চোখের জল দেখে কেউ তাকে সান্ত্বনা দিক—এটাও দিপালী সহ্য করতে পারে না। তাই সমস্ত কান্না ঢোঁক গিলে হজম করছিল।

নিজের মনে মনে ভাবছিল—কতদিন ধরে সে দিদির বাড়িতে কাজ করছে। যখন যা বলা হয়, তাই করে দেয়। কোনোদিন কোনো কাজ করতে বিরক্ত হয় না। শুধু এই ডাক্তারদিদির বাড়িতেই নয়—সবার জন্যই সে এমন। কাউকেই ‘না’ বলতে পারে না। আসলে তার কাছে কাজের বাড়িগুলো শুধু বাবুর বাড়ি নয়। একেকটা বাড়িতে দশ-বারো বছর ধরে সে কাজ করেছে। তাই সবাইকেই খুব আপন বলে মনে হয় তার। কিন্তু সে ভালো করেই জানে—সে যাদের আপন মনে করে, তারা সবাই তাকে আপন মনে করে না। তাদের কাছে সে কেবল কাজের লোক।

একজনই আলাদা—মালবিকাদি। দিদি সত্যিই তাকে ভালোবাসে। দিপালী ওনার সঙ্গেই সুখ-দুঃখের সব কথা বলে। দিদিও নিজের জীবনের কথা নির্দ্বিধায় বলে তাকে। খুব আন্তরিক। তাই নিয়ে অনেকের মনে হিংসাও আছে—দিপালী তা অনেক আগেই বুঝে গেছে। তাই কথা বলার সময় সে সবসময় সাবধান থাকে। কিন্তু ভালোবাসা বড় অদ্ভুত জিনিস—কোনো না কোনোভাবে তা প্রকাশ পেয়েই যায়। ওই দিদির সঙ্গে যে সম্পর্ক, তা আর কারও সঙ্গে হওয়া মুশকিল।

আড়চোখে একবার তাকিয়ে দেখল—দিদি বেসিনে কিছু করছে। সে নিজের কাজে মন দিল। ডাক্তারদিদি তাকে অনেক সাহায্যও করে—দায়ে-বিপদে পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজের লোক ছাড়া আর কিছুই ভাবে না—আজ আবার সেটাই প্রমাণ হয়ে গেল। মনটা আজ সত্যিই ভীষণ খারাপ।

ভাবছিল—এবার সত্যি সত্যিই এই বাড়ির কাজ ছেড়ে দেবে। এত মুখঝামটা আর সহ্য করা যায় না। কাজের অভাব হবে না। মাইনে একটু কম হলেও চলবে। এত মন দিয়ে আর চলা সম্ভব নয়। দরকার নেই বেশি মাইনের। এমনিতেই নিজের মনের শান্তি নেই। দুশ্চিন্তায় চোখের ঘুম উড়ে গেছে। কী করে ছেলেটাকে বাগে আনবে—এই ভেবেই অস্থির হয়ে উঠছে দিপালী। ক’দিন ধরে কী যে অশান্তি! লজ্জায়, অপমানে গলায় দড়ি দিয়ে মরতে ইচ্ছে করছে তার। কপালে যে এমন লেখা ছিল, সে স্বপ্নেও ভাবেনি।

ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কত আশা ছিল তার! কত স্বপ্ন দেখেছিল! ছেলে বড় হলে এই করবে, সেই করবে—তার সব দুঃখ দূর করবে। জন্ম থেকে যত না-পাওয়া, যত আশা-আকাঙ্ক্ষা জমে ছিল বুকে—সব মিটিয়ে দেবে ছেলে। রাজু যেন নিজে হাতে এনে মায়ের হাতে তুলে দেবে এক অপার সুখের রাজত্ব। সেই স্বপ্ন ভেবে কী কষ্টই না করেছে সে জীবনে! নিজের সব সখ-সাধ বিসর্জন দিয়ে মুখ বুঁজে শুধু পরিশ্রম করেছে। না খেয়ে, না ঘুমিয়ে পড়ে থেকেছে। তবু ছেলেমেয়ের জন্য কারও কাছে হাত পাতেনি। শুধু এই ভেবেই—ভবিষ্যতে ওরা তাকে সুখে, শান্তিতে রাখবে। সেই প্রত্যাশায় কোনো কষ্টই গায়ে লাগেনি।

সময় যেন হুহুক করে ছুটে গেছে। দিন-রাত কখন যে পার হয়ে গেল, টেরই পায়নি। শীত-বর্ষা-গরম—কিছুই খেয়াল করেনি। সব যেন ঘোরের মধ্যে দিয়ে কেটে গেছে। কে জানত, হঠাৎ এমন হবে! এই করোনা পৃথিবীটাই ওলটপালট করে দিল। এমন অসুখ এল, যা গরিব মানুষগুলোকে একেবারে শেষ করে দিল।

ছেলেমেয়েরা ভালোই পড়াশোনা করছিল। বছর বছর ভালো রেজাল্ট করে নতুন ক্লাসে উঠছিল। অভাব ছিল, কিন্তু এমন অশান্তি ছিল না। ওরা দু’জনেই হোস্টেলে থেকে পড়ত। ছেলে তো পরীক্ষা না দিয়েই মাধ্যমিক পাশ করে গেল। মেয়েটা কোনওমতে সামলে যাবে বলেই মনে হয়। পরশুদিন খুব কেঁদেছে সে—বলেছে, “মা, ভুল করে ফেলেছি। বুঝতে পারিনি। এবারের মতো আমাকে ক্ষমা করে দাও।” আঁখির কথা শুনে দিপালীর মনে হয়েছে—ওর সত্যিই তেমন দোষ ছিল না। রাজুই সব নষ্টের গোড়া।

ভয়ে বুক ধুকপুক করছে তার। অসাক্ষাতে ছেলেটা কীভাবে শয়তানি করেছে ভাবলেই শরীর কেঁপে ওঠে। সেই দৃশ্যটা এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারে না দিপালী। কী সর্বনাশ হতে পারত! শেষ পর্যন্ত ঠাকুরই রক্ষা করেছেন। মনে পড়লেই রাগে, ঘেন্নায়, আতঙ্কে শরীর শিউরে ওঠে। নিজের ছেলে হয়ে এমন কাজ—কিছুতেই মানতে পারে না সে।

মাথাটা ঝাঁঝা করছে দিপালীর। রাজুর এই অধঃপতন কী করে হল—এই প্রশ্নটাই শুধু ঘুরছে তার মাথায়। কী অপরাধ করেছিল সে? কী ভুল করেছিল?

শেষে শুধু এই প্রশ্নটাই অসহায় হয়ে ঝুলে থাকে—


ঊর্ণনাভ

১ : ঊর্ণনাভ ৩ : ঊর্ণনাভ

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

২ : আলোর পথযাত্রী

This entry is part 2 of 5 in the series ঊর্ণনাভ

This entry is part 2 of 5 in the series ঊর্ণনাভ আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী জীবনের জলছবি :

Read More »

জিজীবিষা

This entry is part 2 of 5 in the series ঊর্ণনাভ

This entry is part 2 of 5 in the series ঊর্ণনাভ জিজীবিষা ১ : জিজীবিষা ২ : জিজীবিষা ৩ : জিজীবিষা ৪ : জিজীবিষা ৫ :

Read More »