১ : ঊর্ণনাভ

১ : ঊর্ণনাভ

This entry is part 1 of 5 in the series ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ

১ : ঊর্ণনাভ

২ : উর্ণনাভ

৩ : ঊর্ণনাভ

৪ : ঊর্ণনাভ

৫ : ঊর্ণনাভ

শ্যামলী রক্ষিত

প্রথম পর্ব

বাড়ির কাজ সেরে বেরোতে আজ দিপালীর বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল। ছেলেমেয়েদের টিফিন বানিয়ে খেতে দিয়ে, নিজে দু’মুঠো কিছু খেয়ে তারপরই তো বেরোনো—সব মিলিয়ে আজ সত্যিই সময়টা গড়িয়ে গিয়েছে। তাই প্রায় ছুটতে ছুটতেই সে রওনা হয়েছিল।

রাস্তাটা অবশ্য খুব দূরের নয়। ঢাকুরিয়ার পঞ্চাননতলা থেকে দিদিদের এই কাকুলিয়া রোডের ফ্ল্যাটে আসতে বড়জোর দশ মিনিট লাগে। এটুকু তো করতেই হবে। একবারে ঘরের ধারে এমন কাজ আর কোথায় পাওয়া যায়! তাছাড়া, এই বাড়িটাই এখন তার সবচেয়ে কাছের কাজের জায়গা। এরপর তো তিন-চারটে বাড়ি, সবই ওই তনুপুকুর ডাঙায়।

হাঁফাতে হাঁফাতে এসে কলিং বেল টিপতেই ঘরের ভেতর থেকে মিষ্টি সুরের সংগীত ভেসে এল। দিপালী বাইরে থেকেই সেই সুর শুনতে পেল। মনটা তার আপনিই ভালো হয়ে গেল। এই সুরটা শুনলেই কেমন যেন মন ফুরফুর করে ওঠে—যত কষ্টই থাকুক না কেন, মনে যেন একটু সুখের হাওয়া ঢুকে পড়ে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা খুলে দিল দিদি। সে ঘরে ঢুকতেই সারা গায়ে স্যানিটাইজার স্প্রে করে দিলেন। দিপালী সোজা বাথরুমে গিয়ে সাবান দিয়ে হাত-পা ভালো করে ধুয়ে বেরিয়ে এসেছে, এমন সময় দিদি বললেন—“আগে মোচাটাকে কেটে দে, দিপালী।”

দিপালীর যেন আকাশ থেকে পড়া অবস্থা। কী কাণ্ড! আজ এমনিতেই তার দেরি হয়ে গেছে, তার ওপর আবার মোচা কাটা! এখন যদি বলে সময় হবে না, তাহলেই তো ঝামেলা। কিন্তু আজ সত্যিই তার পক্ষে সম্ভব নয়।

সে ভেবেছিল, ধড়ফড় করে কাজ সেরে বেরিয়ে যাবে। অথচ ঢুকতেই এই নতুন ফরমায়েশ! দিদির সেই অগ্নিমূর্তি যেন চোখের সামনে জ্বলে উঠল। তবু কিছু বলতেই হবে—না বললে উপায় নেই।

দিপালী গলা ঝেড়ে, চোখ-কান বুজে বলেই ফেলল—
“এখন মোচা কাটা কী করে করব দিদি? এমনিতেই আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে। সকালবেলায় এ কাজ করা সম্ভব নয়।”

বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করছে, তবু কথা না বলে উপায় নেই।

দিদি বিরক্ত স্বরে বললেন—“একটু হাত চালিয়ে তাড়াতাড়ি কেটে দে। আজ রান্না করতে হবে। আজ আমার অফ ডে। ছুটির দিন ছাড়া এসব রাঁধা যায় নাকি?”

“কিন্তু দিদি, আগে বললে তো হতো। এখন হঠাৎ করে বলা… আজ আমি কিছুতেই মোচা কাটতে পারব না। এত বেলা হয়ে গেছে। চারটে বাড়ির কাজ আছে।”

“পারব না বললেই হলো? রান্নার মেনু ঠিক করা আছে। নারকেল কোরা আছে। নারকেল দিয়ে মোচার  ঘন্ট রাঁধব।”

“সে তুমি কাল রাঁধো দিদি। কাল আমি সকাল সকাল এসে কেটে দেব।”

“না, তা হবে না।এখনই কর ”

দিপালী আর কিছু বলল না। রাগে-অভিমানে তার শরীর কাঁপছিল। স্বার্থপর মানুষের শেষ নেই! এত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে আসে, তবু কোনো সহানুভূতি নেই। এই মহামারির সময় নিজের জীবনের পরোয়া না করে কাজ করছে, শুধু দু’মুঠো ভাতের জন্য। ছেলেমেয়েদের পেট ভরানোর জন্য।

অনেক বাড়িতে কাজের লোক আসতে মানা করেছে, অথচ মাসের মাইনে ঠিকই দিচ্ছে। কেউ কেউ বাইরে থেকে বাজার করে দিচ্ছে। কিন্তু এখানে—মানুষের কোনো দাম নেই। বড়লোকের কাছে গরিবের প্রাণ যেন ড্রেনের পোকা।

এই দিদি ডাক্তার হয়েও মানুষের মতো মানুষ নন। শরীরে মায়া মমতার লেশমাত্র নেই। কী করে এরা মানুষের সেবা করে?

দিপালী মনে মনে গজগজ করতে করতে কাজ করছিল। মাথার ভেতর আগুন জ্বলছে, কিন্তু মুখে কিছু বলার সাহস নেই। পাশের ঘরে দাদা আছেন—দেবতুল্য মানুষ। তাঁর সামনে কোনো অশান্তি সে চায় না।

কাজ প্রায় শেষ। তবু শেষে এসে দিদি নিজেই মোচা আর বঁটি বের করে দিলেন। তখন আর নিজেকে সামলাতে পারল না দিপালী।

ধীরে কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল—“আমি আজ কিছুতেই মোচা কাটতে পারব না। তুমি যা বলো বলো। আজ বেলা হয়ে গেছে। অন্য দিন হলে কেটে দিতাম।”

“এটাও তো তোর কাজ, দিপালী!”

“কাজ বলেই তো আমারও সুবিধে-অসুবিধে আছে দিদি। ঢুকেই এমন কথা বললে কী করে হয়? যদি আজই মোচা রাঁধবে ঠিক করেছিলে, কালই তো কাটাতে পারতে।”

“আমার সংসার কি তোর ইচ্ছেমতো চলবে?”

এরপর আর কিছু বলার নেই। দিপালী জানে, এই মানুষটির সঙ্গে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।

শেষ পর্যন্ত কাজ সেরে সে বসে পড়ল মোচা কাটতে। কিন্তু মনে মনে ঠিক করে ফেলল—এই বাড়িতে আর কাজ করবে না। যত কষ্টই হোক, সবসময় অপমান সহ্য করা যায় না।

বেশি টাকার দরকার নেই। মানুষের মতো ব্যবহার দরকার। যাহোক, এবার সে নিজের পথ নিজেই ঠিক করবে। (চলবে )

ঊর্ণনাভ

২ : উর্ণনাভ

2 Responses

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

২ : আলোর পথযাত্রী

This entry is part 1 of 5 in the series ঊর্ণনাভ

This entry is part 1 of 5 in the series ঊর্ণনাভ আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী জীবনের জলছবি :

Read More »

জিজীবিষা

This entry is part 1 of 5 in the series ঊর্ণনাভ

This entry is part 1 of 5 in the series ঊর্ণনাভ জিজীবিষা ১ : জিজীবিষা ২ : জিজীবিষা ৩ : জিজীবিষা ৪ : জিজীবিষা ৫ :

Read More »