কালের প্রহরী

কালের প্রহরী

চোদ্দো

অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলেন গান্ধিজি। তাঁর সঙ্গে মতিলাল নেহেরু, চিত্তরঞ্জন দাশদের মতের মিল হল না। তাঁরা তৈরি করলেন স্বরাজ পার্টি। সমস্ত রকমের সমঝোতার রাস্তা ত্যাগ করে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের ডাক দিল স্বরাজ পার্টি। তাঁদের লক্ষ্য পূর্ণ স্বরাজ। আবেদন-নিবেদনে যে দেশের স্বাধীনতা আসতে পারে না, তা জোরের সঙ্গেই ঘোষণা করল সেই দল।

কানাইচরণও যোগ দিল নতুন দলে। আজ কলকাতা হয়ে ঢাকা, তো কাল বরিশাল হয়ে যশোর। দুদিন পরে বর্ধমান থেকে বীরভূম—কানাইচরণ ছুটে বেড়াতে লাগল পার্টির কাজে।

এদিকে শম্ভুচরণ ছিল নিপাট ভদ্রলোক। তাই মেজভাইয়ের রাজনীতি করাতে তার সায় ছিল কি না, ঠিক বোঝা যেত না। তবে মনে হয়, প্রচ্ছন্ন মদত একটা ছিল। তা না হলে যতবার কানাই আইনি ঝামেলায় পড়েছে, ততবারই রক্ষা করেছে ব্যারিস্টার দাদা শম্ভুচরণ। কয়েকবার তো বাবাকে না জানিয়েই ভাইয়ের উদ্ধারে ছুটে গেছে শম্ভুচরণ।

পরে অবশ্য জেনেছিলাম, শম্ভুচরণও ছিলেন ব্যারিস্টার সি. আর. দাশের অনুগামী। তাঁর নির্দেশেই নাকি সে ছুটে যেত দেশের বিভিন্ন আদালতে। স্বাধীনতাসংগ্রামীদের হয়ে মামলা লড়ত বিনা পয়সায়। এসব গোপন তথ্য আমার কাছে ঠিক চলে আসত বিনা আয়াসেই।

সেবার সাতক্ষীরায় গ্রেফতার হল কানাই। তিন দিন পর খবর পেল শম্ভুচরণ। আট দিনের মাথায় জামিন করিয়ে ঘরের ছেলেকে ফিরিয়ে আনল ব্যারিস্টার। সেবার নাকি বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল জামিন করাতে।

প্রতিবার আইন-আদালতের ফাঁদে পড়ে নাকানি-চুবানি খাওয়ার পর দু-চার দিন একটু বিশ্রাম নেয় কানাইচরণ। তখন গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে সমিতির কাজে মন দেয়। মাঝেমধ্যে অল্পবয়সি শিক্ষিত তরুণ-যুবকদের নিয়ে আশপাশের গ্রামে-গঞ্জে বেরিয়ে পড়ে। বলে, জন্মভূমিকে ভালোবাসতে হলে আগে তাকে চিনতে হবে। নিজের বাসভূমির চারপাশকে জানতে হবে। বুঝতে হবে সেই অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর মানুষের জীবনকে। দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা যদি অনুভব করা না যায়, তবে দেশকে ভালোবাসা যাবে না।

এই নবীন প্রজন্মের দেশপ্রেমিকদের কাছে তাই কানাই একজন আদর্শ নেতা। তারা জানে, রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে সব কথা জানার চেষ্টা করতে নেই। যেটুকু তারা বলে, সেটাই জানার বিষয়। বাকিটা নিশ্চয়ই দেশের স্বার্থে গোপনীয়। তাই কানাইয়ের সমস্ত গতিবিধি তাদের অজানা। তবে এটুকু তারা জানে যে, কানাইয়ের রাজনৈতিক কাজের পেছনে নেই কোনো স্বার্থ। তার দেশপ্রেম সম্পূর্ণ নির্ভেজাল। কানাইচরণ একজন নিবেদিতপ্রাণ দেশপ্রেমিক।

বেশ কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেল কানাই গাঁয়েই আছে। পল্লি উন্নয়ন সমিতির কাজেও এসেছে বেশ গতি। সকাল-বিকেল সমিতির ঘরে ভিড় জমছে। গ্রামের মানুষের অভাব-অভিযোগ আর সমস্যায় সমিতির সক্রিয়তাও বেড়েছে।

সেদিন কানাইচরণের প্রস্তাবমতো একদল তরুণ-কিশোর চলল পুজালি পেরিয়ে আছুসাহেবের চিনে বসতি দেখতে। ছেলেছোকরার দল জিজ্ঞেস করল,
“কানাইদা, কী আছে গো সেখানে?”

কানাইচরণ বলল,
“ইতিহাসের ছোঁয়া পাবি রে, চল ঘুরে আসি।”

নবীন বাহিনী আর প্রশ্ন করল না। নতুন কিছু জানার আগ্রহ আর উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটতে লাগল তারা। বুইতা থেকে কয়েক মাইল দূরেই এমন ইতিহাস লুকিয়ে আছে, কোনো দিন শোনেনি তারা। তাই সকাল-সকাল দল বেঁধে চলল আছুসাহেবের চিনে বসতি দেখতে।

হুগলি নদীর ধারের এই জায়গাটার নাম এখন আছিপুর। একটা বিশেষ আকারের ছোট ঘেরা জায়গার পাশে বটগাছের ছায়ায় বসল সবাই। কানাইচরণকে মাঝখানে রেখে গোল হয়ে বসল ছেলের দল। নদীর ধারে সেই ছোট্ট ঘেরা জায়গাটা দেখিয়ে কানাই বলল,
“ওই যে দেখছিস ঘেরা জায়গাটা, ওটা আছুসাহেবের সমাধি।”

“কিন্তু আছুসাহেব সম্পর্কে তো আমরা কিছুই জানি না। তুমি গোড়া থেকে বলো এই জায়গার ইতিহাস। কে ছিলেন আছুসাহেব, কী তাঁর পরিচয়, কী তাঁর অবদান—সব জানতে চাই,” বলল ছেলেরা।

দুটো গামছায় বেঁধে মুড়ি এনেছে নবীন বাহিনী। গামছা খুলে মাঝখানে রাখা হল। মুঠো ভরে সেই মুড়ি চালান হতে লাগল মুখে। আর কথক ঠাকুরের মতো গোড়া থেকেই শোনাতে শুরু করল কানাইচরণ।


১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে কেবল বাংলার নবাবের পরাজয়ই ঘটেনি। ঘটেছিল গোটা জাতির পরাজয়ের সূত্রপাত। ধীরে ধীরে পরাভূত হল সমগ্র দেশ। শুরু হল ইংরেজের শাসন। বলা ভালো, কোম্পানির শাসন।

সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠতে লাগল প্রতিবেশী দেশ চিনের সঙ্গেও। ওদেশে আফিমের বাজার ছিল বেশ রমরমা। অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে চিনে আফিম রপ্তানি ছিল ওলন্দাজদের নিয়ন্ত্রণে। ধীরে ধীরে তা চলে এল ইংরেজদের দখলে। ভারত থেকে জাহাজে ভরে আফিম যায় চিনে। ওদেশ থেকে ফিরে আসে জাহাজ। জাহাজে যত নাবিক, খালাসি আসে চিন থেকে, তাদের সবাই আর ফিরে যায় না স্বভূমিতে। দু-চারজন থেকে যায় ভালো জীবিকার সন্ধানে। এভাবেই বাড়তে থাকে এদেশে চৈনিকের সংখ্যা। কলকাতার বিভিন্ন উপকণ্ঠেও বাড়তে থাকে চিনা মানুষের ভিড়।

এমনই এক চিনা ব্যবসায়ী ১৭৭৮ সালে ভাগ্যান্বেষণে পাড়ি জমালেন কলকাতায়। নাম তাঁর ইয়াং দাই জাং। ব্রিটিশদের জিভে সম্ভবত এ নামের উচ্চারণ কিছুতেই সঠিক হল না। তাই তিনি হয়ে গেলেন ‘ইয়াং আছু’। আবার বঙ্গভাষীর জিভে সেটা হয়ে গেল ‘টং আছু’। মতান্তরে তাঁর আসল নাম টং মিং আৎছু।

এই আছুসাহেব ছিলেন চিনের ক্যান্টন প্রদেশের এক প্রতিষ্ঠিত চা-ব্যবসায়ী। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং উত্তরাধিকার সূত্রে হয়েছিলেন বেশ বিত্তশালী। এদেশে আসার সময় তিনি বন্ধুবর ইংরেজ ব্যবসায়ী জেমস ফ্লিন্টনের একটি সুপারিশপত্রও আনলেন পকেটে করে।

কলকাতায় এসে সাক্ষাৎ করলেন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের সঙ্গে। সেই সাক্ষাৎ হল ফোর্ট উইলিয়ামের মধ্যে কোনো এক বিলাসবহুল ঘরে। এদেশে থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করার অভিপ্রায় প্রকাশ করলেন হেস্টিংসের কাছে।

এদিকে ইংরেজ শাসকেরও তখন প্রধান লক্ষ্য ছিল কীভাবে রাজস্ব বাড়ানো যায়। সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন জায়গার জলাজঙ্গল সাফ করে বসতি স্থাপনে কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যে উৎসাহীদের জমি ইজারা দিয়ে দেদার আয় করা ছিল তাদের সাধারণ নীতি। আর টং আছুর ইচ্ছে হল, এখানে বেশ কিছু স্বদেশি মানুষ নিয়ে এসে একটি চিনা বসতি গড়ে তুলবেন। যেমনটা কলকাতায় গড়ে উঠছে ফিরিঙ্গি আর ব্রিটিশদের মহল্লা।

১৭৭৮ সালের ১৯ জুন এই আছুসাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল ওয়ারেন হেস্টিংসের। পেশ করলেন খাঁটি ইংরেজি ভাষায় লেখা একটি দরখাস্ত। কলকাতার উপকণ্ঠে তাঁর জমির প্রয়োজন। সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করবেন, স্থাপন করবেন একটি চিনা মহল্লা।

টং আছুর প্রস্তাব শুনে বেশ উৎসাহই প্রকাশ করলেন হেস্টিংস সাহেব। হেস্টিংসের বেনিয়ামগজে তখন কাজ করেছিল কয়েকটি হিসাব। ব্যবসা-বাণিজ্য যাই করুক না আছু, আসলে তো আসবে রাজস্ব। আবার এই সুযোগে কোম্পানি-চিন মৈত্রীও হবে একটু দৃঢ়। তাই সেই সাক্ষাতেই মঞ্জুর হল দরখাস্ত। আশ্বাস পেয়ে আছুসাহেব ফিরে গেলেন দেশে।

বছর তিনেক পর, ১৭৮১ সালে জাহাজ ভরে শ-খানেক দক্ষ শ্রমিক, কয়েক পেটি চা আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ ফিরে এলেন আছু। সঙ্গে আনলেন বিস্তর ধনরাশি আর মগজভর্তি অসংখ্য ব্যবসায়িক পরিকল্পনা। সঙ্গে ছিল পালিতা কন্যা জু-শি আর চৈনিক বৌদ্ধ রীতির দুটি মূর্তি।

আগেই তিনি পছন্দ করে গিয়েছিলেন জায়গা। কলকাতার উপকণ্ঠে গঙ্গার তীরে ছিল সেই পছন্দের স্থান। আছুসাহেবের উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজদের চোখের বাইরে থাকা। তাই কলকাতা থেকে একটু দূরে তাঁর কর্মযজ্ঞ শুরু করতে চাইছিলেন কৌশলগত কারণে। ইংরেজ বেনিয়াদের যদি চোখে পড়ে যায়, তাহলে ক্ষতি হতে পারে ব্যবসার। তাই একটু আড়ালে থাকার কৌশল।

এবার তাঁর পছন্দের জায়গায় জমি বরাদ্দ করার আর্জি রাখলেন হেস্টিংসের কাছে। আজও কলকাতায় বসবাসকারী চিনাদের মধ্যে প্রচলিত জনশ্রুতি এই রকম যে, হেস্টিংস জানতে চান তাঁর কতটা জমি লাগবে। উত্তরে আছুসাহেব দুহাতের তালু ঘুরিয়ে বলেন, “এই এত্তটা” জমি লাগবে। সেই হাতের মুদ্রায় নাকি মনে হয় তিনি অশ্বক্ষুরাকৃতির একটি জমি চাইছেন। সেইমতো কিছুটা ফসলি, কিছুটা অনাবাদি মিলিয়ে তাঁকে মোট ৬৫০ বিঘা জমির পাট্টা দান করল কোম্পানি। সেই জমির আকারও অনেকটা ঘোড়ার ক্ষুরের মতোই হল বলে জনশ্রুতি।

চড়ামদারিঘাটের কাছে ছিল সেই গ্রাম। নাম ছিল যার চকখাঞ্জা। চকখাঞ্জা গ্রামের জনৈক বেনারসি ঘোষের বিরাট জোত পড়েছিল অনাবাদি অবস্থায়। আছুর আবেদন ছিল, ওই অনাবাদি জমি থেকে তিনশো বিঘার মতো হলেই তাঁর চলে যাবে। কিন্তু তাঁকে দেওয়া হল তাঁর চাহিদার দ্বিগুণেরও বেশি জমি। আছু হলেন মহাখুশি।

ওদিকে চিনা ব্যবসায়ীকে হেস্টিংস জমি দান করেছেন শুনেই বর্ধমানের রাজা ছুটে আসেন কলকাতায়। কারণ ওইসব জমি ছিল বর্ধমান রাজার জমিদারির অংশ। এস্টেটের জমি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ে তড়িঘড়ি নালিশ ঠুকে দিলেন গভর্নর জেনারেলের কাছে।

নালিশ শুনে হেস্টিংস বার্ষিক পঁয়তাল্লিশ টাকা খাজনা ধার্য করলেন আছুর জন্য। আছু ভাবলেন, এই খাজনা দিয়ে জমি নিলেও ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই। নদীর পাশের উর্বর জমিতে ফসল ফলবে ভালো। তারপর পরিকল্পনা আছে সেখানে চিনিকল স্থাপনের। ফলে কোনো দরাদরি না করেই রাজি হয়ে গেলেন আছু।

জমি পেয়ে স্বদেশি শ্রমিকদের নিয়ে বনজঙ্গল সাফ করে প্রথমে আছু শুরু করলেন আখের চাষ। উর্বর জমিতে হল ভালোই ফলন। বসালেন চিনির কল। কল বলতে হস্তচালিত, শ্রমনির্ভর কল।

এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, আজও একটি মিথ প্রচলিত আছে যে, এই আছুসাহেবের চিনির কলই নাকি এদেশের প্রথম চিনি তৈরির ব্যবস্থা। যদিও পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ কিন্তু এই প্রচলিত গল্পের স্বপক্ষে কথা বলে না। আছুর চিনির কারখানার বহু আগে থেকেই এদেশের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয় আখের চাষ। সেই আখের রস শুকিয়ে দেশীয় পদ্ধতিতে চিনি তৈরির প্রচলনও বহু পুরোনো।

১৬০০ খ্রিস্টাব্দে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর লেখা কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতে পাওয়া যাচ্ছে—

“কিনি নবান্ন ফেনি
বিশাদরে কিনে চিনি
পান কিনে সহস্রের দরে।”

কিংবা ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের দুটি ছত্র—

“সুয়া যদি নিম দেয় সেই হয় চিনি।
দুয়া যদি চিনি দেয় নিম হয় তিনি।”

অর্থাৎ, আছুর চিনিকল তৈরির অনেক আগে থেকেই এদেশের সংস্কৃতিতে চিনি ছিল। তার ব্যবহার এবং উৎপাদনও অজানা ছিল না এদেশের মানুষের। হয়তো আছুসাহেবের চিনি তৈরির পদ্ধতি ছিল একটু আধুনিক। বড়জোর এটুকু ঐতিহাসিক সত্যতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

এদিকে টং আছুর কলে তৈরি চিনি মনে ধরল ইংরেজ সাহেবদের। রমরমিয়ে সেই চিনি বিকোতে থাকল বাজারে। একদিকে আখের চাষ, অন্যদিকে চিনির কল। চিন থেকে আরও কিছু শিক্ষিত, দক্ষ শ্রমিক নিয়ে এসে জাঁকিয়ে বসলেন আছুসাহেব। পত্তন করলেন এদেশের প্রথম সংগঠিত চিনা উপনিবেশ।

বাসস্থান থেকে কারখানায় শ্রমিকদের আসা-যাওয়ার জন্য শুরু করলেন টানা-রিকশার প্রচলন। নতুন চিনা বসতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল আরও কিছু আনুষঙ্গিক দ্রব্যের কুটিরশিল্প। মাটির পাত্রের প্রয়োজনে কুমোরপাড়ায় মৃৎশিল্পসহ এলাকার বিভিন্ন মানুষের মধ্যে বৃদ্ধি পেল অর্থনৈতিক লেনদেন। জনবিরল চকখাঞ্জা, গোপীগঞ্জ ইত্যাদি গ্রামীণ এলাকার চেহারায় এল লক্ষণীয় বদল।

ইংরেজ বেনিয়াদের যে ভয়ে আছু কলকাতা থেকে একটু দূরে তাঁর স্বপ্নের চিনা কলোনি স্থাপন করতে চেয়েছিলেন, সেই বিপদ কিন্তু এল তাঁর স্বদেশিদের থেকেই।

সেসময় চিনের মাকাও ছিল পর্তুগিজদের ইজারা নেওয়া অঞ্চল। সেই মাকাও বন্দর থেকে প্রচুর জাহাজ আসা-যাওয়া করত ভারতে। পর্তুগিজ জাহাজিদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে আছু চিনা শ্রমিকদের তাঁর চিনিকলের জন্য নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু জাহাজের নাবিকদের দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে ওই শ্রমিকদের অনেকে কলকাতায় নোঙর করলেই জাহাজ থেকে পালিয়ে গা-ঢাকা দিত।

তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে কলকাতায় রেখে দিত ফেং শুং-তাও নামের এক আফিমের চোরাকারবারি। শুং-তাও এইসব চিনা শ্রমিকদের কলকাতায় মুচির কাজ, ছুতোরের কাজ, ব্রিটিশ সাহেবদের বাবুর্চি, খানসামার কাজে লাগিয়ে দিতে লাগল। পরে শুং-তাওয়ের লোকেরা আছুর চিনা কলোনিতে গিয়ে কলকাতায় বেশি মজুরির লোভ দেখিয়ে শ্রমিকদের ভাগিয়ে আনতে উঠে-পড়ে লাগল। ফলে সমস্যায় পড়ল টং আছু।

কিছুদিনের মধ্যেই চিনিকলের বহু শ্রমিক ও আখক্ষেতের কৃষক পালিয়ে গেল কলকাতায়। বিপদে পড়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে চিঠি লিখলেন আছু। সরকারও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আশ্বাস দিল।

সেইমতো ১৭৮১ সালের ৫ নভেম্বর ক্যালকাটা গেজেটে ইংরেজ সরকার প্রকাশ করল এক বিজ্ঞপ্তি—

“To grant every encouragement to the colony of Chinese under the direction of At Chew…….and to afford him every support and assistance detecting such persons……”

যেসব বদলোক আছুর শ্রমিক-কৃষকদের ফুসলিয়ে আনছে, তাদের শাস্তি দেওয়ার ভয় দেখানো হল বিজ্ঞপ্তিতে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হল না। শ্রমিকদের ফুসলিয়ে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার ঢল থামল না।

ধীরে ধীরে চিনিকলের অবস্থা হতে থাকল সঙ্গিন। সেই সুযোগে ব্রিটিশ বণিকদের অনেকে জাভা, সুমাত্রা থেকে চিনি আমদানি করে মুনাফার স্বপ্ন দেখতে থাকে। পাশাপাশি কোম্পানির কলকাতা কাউন্সিলে তখন হেস্টিংসের সঙ্গে অন্যান্য সদস্যদের বিভিন্ন বিষয়ে তৈরি হয়েছে বিরোধ। ফলে আছুর চিনিকলের এই সমস্যাটা তাদের কাছে হয়ে যায় নিতান্তই তুচ্ছ।

তাই আশ্বাস দিয়েও শেষ পর্যন্ত এই চিনিকল এবং চিনা কলোনি রক্ষা করতে ইংরেজরা প্রায় কিছুই করল না। তারপর ১৭৮৩ সালের কোনো এক সময় পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যায় এই চিনিকল।

কয়েক বছরের মধ্যেই ধীরে ধীরে সব চিনারা চলে গেল কলকাতার মুরগিহাটা, কসাইটোলা আর ট্যাংরা অঞ্চলে। ভারতের প্রথম চিনা উপনিবেশ স্থানান্তরিত হল কলকাতায়।

চিনিকল বন্ধ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই মারা গেলেন টং আছু। এই নদীর পাড়েই সমাধিস্থ করা হয় তাঁকে। ওই যে সমাধির ওপর সৌধটা দেখছিস, ভালো করে দেখ, ওটার আকৃতি কিন্তু ঘোড়ার ক্ষুরের মতো দেখতে।

এতক্ষণ সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল। বক্তার কথার মাঝে একটা টুঁ শব্দও উচ্চারণ করল না শ্রোতার দল। প্রত্যেকেই গোগ্রাসে গিলেছে এই অজানা ইতিহাস।

এবার দিবাকর বলল,
“আচ্ছা কানাইদা, তুমি এতসব জানলে কীভাবে? এসব কথা তো পাড়ার বয়স্করা গল্প করেন না? আমরা তো কারও মুখেই কোনো দিন শুনিনি?”

কানাইচরণ একটু অন্যমনস্ক হল। বলল,
“আমি জেনেছিলাম আমার মাস্টারমশাই অমিয়বাবুর থেকে। তিনি শুধু আমার স্কুলের শিক্ষকই ছিলেন না রে, আমার রাজনৈতিক শিক্ষাগুরুও ছিলেন।”

কথাগুলো বলে হঠাৎ চুপ করে গেল কানাইচরণ। আদিনাথ জিজ্ঞেস করল,
“তিনি কি আর নেই, কানাইদা?”

“না রে আদি। তিনি আর নেই এই পৃথিবীতে। এই তো গত বছরেই পুলিশ গ্রেফতার করল বাড়ি থেকে। কোনো এক পুরোনো মামলায় নাকি গ্রেফতারি। আমি শুনেছিলাম কয়েক দিন পরে। দাদা তখন ঢাকায় ছিল, তাই আমিও কিছু করতে পারলাম না। পরে শুনলাম নাকি হিজলি জেলে মৃত্যু হয়েছে স্যারের। আমি নিশ্চিত, স্যারকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।”

পরিবেশটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। কারও মুখেই কোনো কথা সরে না। চারদিক নিস্তব্ধ। নদীর বুকে ভেসে চলেছে একের পর এক নৌকা। বেশিরভাগই ইট আর টালিবোঝাই।

কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভাঙল বিপিনের কথায়। জিজ্ঞেস করল,
“কানাইদা, এই নৌকাভর্তি ইট-টালি সব আসছে কোথা থেকে? আর ওরা যাচ্ছেই বা কোথায়?”

“ওই যে আমরা আসার পথে পেলাম পুজালি, সেই পুজালি থেকেই আসছে ওরা। ওখানে তো ঘাট আছে। ওই যে দূরে দেখেছিস বড়ো একটা বটগাছ, ওখানে একসময় ছিল খুব নামকরা ঘাট। গোপীগঞ্জের ঘাট। আর এসব যাচ্ছে ওই দক্ষিণ দিকে। ওদিকটা ভাটির দেশ। বলতে পারিস সুন্দরবনের কাছাকাছি। ওদিকের বিভিন্ন ঘাটে ভিড়বে ওই নৌকাগুলো।”

দিবাকর বলল,
“কানাইদা, এই পুজালির একটা কী যেন ইতিহাস আছে, কাল তুমি বলছিলে না? শোনাও না।”

“শোন তবে। আজকের পুজালি ছিল একসময়ের গোপীগঞ্জ। বেশ জমজমাট গঞ্জ। হাট বসত সপ্তাহে একবার। নদী পেরিয়ে হাওড়া, মেদিনীপুর থেকে আসত হাটুরের দল। রমরমিয়ে চলত বেচাকেনা। আশপাশের দশ-বিশটা হাট-গঞ্জের সেরা ছিল এই গোপীগঞ্জ।

“তাই নাকি গোপিনিদেরও ভালো পসার ছিল এ গঞ্জের এলাকায়। এই গোপিনিরা কিন্তু কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর ব্রজগোপীর দল নয়। এরা ছিল পৃথিবীর আদিমতম পেশার উত্তরসূরি।

“লোকশ্রুতি এমন যে, ওই গোপিনিদের নাম অনুসারেই নাকি গ্রামের পুরোনো নামের গায়ে মানুষ ‘গোপীগঞ্জ’-এর চাদর চাপায়। সেই গোপীগঞ্জ ছিল আছিপুরের মাইলখানেক আগে। তাই আছিপুরের থেকে দূরত্ব বোঝাতেই নাকি চৈনিক ভাষায় নাম হল পুংজালি। যার অর্থ মাইলখানেক দূর। সুতরাং, চিনা উপনিবেশ আছিপুর থেকে স্থানান্তরিত হলেও অনেক কিছুর মতোই রেখে গেল তাদের দেওয়া সেই নাম। গোপীগঞ্জ নামের লজ্জা ঢাকতেই মনে হয় পুংজালির সহজ বঙ্গীয় উচ্চারণ হল পুজালি।”

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি চিনের বহু শ্রমিক শ্রম বেচে জীবিকার্জনের আশায় পাড়ি দেয় এদেশে। সেই দলের সঙ্গেই আফিমের চোরাকারবারি ফেং শুং-তাও চলে আসে কলকাতায়। আময় শহরের এই কুখ্যাত গুন্ডাও দেশে খুন করে গা-ঢাকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সিঙ্গাপুর, রেঙ্গুন হয়ে পালিয়ে আসে ভারতে।

প্রখর বুদ্ধির ব্যবসায়ী টং আছু এমন একজন লোকের সন্ধান করেছিলেন। ব্যবসার নিরাপত্তা ও বৃদ্ধির জন্যই অন্ধকার জগতের মানুষ ফেং শুং-তাওকে কাছে টেনে নিলেন আছু। নিরাপদ আশ্রয় দিলেন আছিপুরে। বন্ধুত্বের হাত বাড়ালেন পরস্পরের দিকে।

আছুর এই সিদ্ধান্তই কাল হল আছিপুরের। সেই অষ্টাদশ শতকে টং আছুর প্রতিষ্ঠা করা আছিপুর হয়তো হয়ে উঠত বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। কিন্তু আছুর এই সিদ্ধান্তের ফলে ঘটনাপ্রবাহ বাঁক নিল যে পথে, সেখানেই নেমে এল অন্ধকার। হয়তো ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল আছুর সেই সিদ্ধান্ত।

এবার কিছুটা চুপ থাকল কানাই। পাশেই একটা পাতকুয়োর অস্তিত্ব ওরা দেখছিল প্রথম থেকেই। কিন্তু সে জল আদৌ পানযোগ্য কি না, জানত না ওরা। তাই সাহস করে কুয়োর আশপাশে যায়নি এতক্ষণ।

এবার দেখল, এক কিশোর বাড়ি থেকে দড়ি-বালতি নিয়ে এসে ঘড়া ভরতি করছে। দিবাকর উৎসাহ নিয়ে কাছে গেল। শুনল, এ জল নাকি বেশ সুস্বাদু আর গ্রামের সবাই ব্যবহার করে পানীয় হিসেবে। সবাই চলে এল কুয়োর পাশে। প্রাণভরে ঠান্ডা জল খেয়ে আবার বসল গোল হয়ে।

আছুর সঙ্গে এদেশে এসেছিল তার পালিতা কন্যা জু-শি। চিনের য়া-মেন রাজপরিবারের সন্তান জু-শি। যে কবিতা লেখে, আভিজাত্যের রক্ত যার দেহে প্রবাহিত, সেই জু-শি প্রেমে পড়ল ফেং শুং-তাওয়ের।

এক সন্ধ্যায় বন্ধু আছুকে ফেং প্রস্তাব দিল যে, সে বিয়ে করতে চায় জু-শিকে। পারিবারিক পরিচয়ে এক কসাইয়ের সন্তান ফেং শুং-তাও নিজে একজন ফেরেববাজ, খুনের আসামি। তাই আছুর পক্ষে রাজি হওয়া সম্ভব হয় না সেই প্রস্তাবে।

আছুর বিশ্বাস ছিল, জু-শি নিশ্চয়ই মেনে নেবে না এ প্রস্তাব। কিন্তু আছুকে চমকে দিয়ে একাধিক প্রশ্নে মাথা নেড়ে বিয়ের প্রস্তাবে সম্মতি জানায় জু-শি। এতদসত্ত্বেও সে বিয়েতে রাজি হয় না আছু। সূর্যোদয়ের আগেই ফেং শুং-তাওকে আছিপুর ছেড়ে চলে যাওয়ার হুকুম দেন আছু। হুকুমের সঙ্গে থাকে প্রচ্ছন্ন হুমকি। তাওয়ের অতীত ইতিহাস ইংরেজ প্রভুদের কানে তুলে তার এদেশের পাট চোকানোর ব্যবস্থাও করতে পারে আছু।

পরের দিন সূর্যোদয়ের পর আর ফেং শুং-তাওকে দেখা গেল না আছিপুরে। খোঁজ মিলল না জু-শিরও। এ ঘটনায় যথেষ্ট আঘাত পান আছু। জু-শির এই আচরণে মনের সঙ্গে শরীরও ভাঙতে থাকে আছুর। দুর্বল শরীর নিয়েই প্রয়োজনে কলকাতায় যাওয়া-আসা করতে থাকেন আছু।

ওদিকে জু-শিকে নিয়ে শুং-তাও চলে আসে কলকাতায়। প্রথমে মুরগিহাটায় কিছুদিন গা-ঢাকা দেয়। পরে কসাইটোলার জঙ্গল সাফ করে ঘর বানিয়ে বাস করতে শুরু করে। তার আফিমের চোরাকারবারের জন্য এমন নিরিবিলি জায়গাই ছিল আদর্শ।

মাঝেমধ্যে আছুর কলকাতায় আসার খবর শুনে শুং-তাও থাকে ভয়ে ভয়ে। ভাবে, আছু বুঝি ইংরেজদের কাছে তার অতীত ইতিহাস ফাঁস করে কলকাতার পাটতাড়ি গোটানোর ব্যবস্থা করছে।

অন্যদিকে জু-শির প্রতি স্নেহবৎসল আছু শুং-তাওকে কলকাতা ছাড়ার সংকল্প ত্যাগ করে। কিন্তু ভয় কাটে না শুং-তাওয়ের মন থেকে। তাই আছিপুরের শ্রমিকদের বেশি উপার্জনের লোভ দেখিয়ে ভাগিয়ে এনে কলকাতায় বিভিন্ন কাজে লাগিয়ে তাদের আস্তানার ব্যবস্থাও করতে থাকে শুং-তাও। এভাবে দলে দলে লোক ভাগিয়ে এনে আছুর ব্যবসার ক্ষতি করতে উঠে-পড়ে লাগে।

এই লোক ভাগানোর ঢল ঠেকাতে প্রথমে আছু নিজেই চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। পরে ইংরেজ সরকারের সাহায্য প্রার্থনা করলেন। তারা আশ্বাস দিয়েও তেমন কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিল না।

১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে জু-শি আর শুং-তাওয়ের একটি ফুটফুটে পুত্রসন্তান হয়। শুং-তাও আয়োজন করে বিশাল ভোজসভার। কলকাতার বহু চিনার সঙ্গে আমন্ত্রিত আছুও নাতিকে আশীর্বাদ করে অংশ নেয় ভোজে।

এর কিছুদিন পরেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন আছু। আছুর সেবা করতে আছিপুরে চলে আসে জু-শি। কিন্তু আছু আর সুস্থ হন না। আছুর মৃত্যুসংবাদে দুঃখ পেলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে শুং-তাও। তার কলকাতা ছাড়ার আর ভয় রইল না। কিন্তু আছুর প্রতিহিংসা যে এত সুদূরপ্রসারী হতে পারে, কল্পনাও করতে পারেনি শুং-তাও!

কয়েক দিন পরে নেসফিল্ড নামের এক ইংরেজ সলিসিটারের চিঠি পৌঁছল শুং-তাওয়ের কাছে। সেখানে লেখা, তার মক্কেল টং আছু একটি বড়ো তামার বাক্স তালাবন্ধ করে রেখে গেছেন নেসফিল্ডের কাছে। যেটার মালিক এখন জু-শি। কিন্তু শর্ত হল, শুং-তাওয়ের মৃত্যুর পরেই সে বাক্স জু-শির হাতে তুলে দেওয়া যাবে। এমনটাই আছুর নির্দেশ।

কিছুদিন পর চিনে মহলে টেগেল ওই বাক্সে আছু এক হাজার গিনি রেখে গেছেন জু-শির জন্য। সে কথা শুং-তাওয়ের কানেও এল। কিন্তু জু-শি শুনে মোটেই খুশি হল না। সে বলল,
“চাই না আমার ওই গিনি। আমি শুং-তাওয়ের আগে মরলেই খুশি হব।”

ওদিকে শুং-তাওয়ের কানে অহরহ চলতে লাগল ভয় দেখানো কথা।

“জু-শি যদি খাবারে বিষ মিশিয়ে দেয়!”

“জু-শি যদি রাতে শুং-তাওয়ের গলায় ক্ষুর চালিয়ে দেয়!”

জু-শির বয়স তো মোটে একুশ। শুং-তাও তখন একচল্লিশ!

সারাক্ষণ ভয়ে কুঁকড়ে থাকত শুং-তাও। জু-শির হাতের রান্না খাওয়া বন্ধ করল সে। আলাদা ঘরে শোয়া শুরু করল শুং-তাও। রাতের পর রাত বিনিদ্র কাটিয়ে শরীর ভেঙে গেল তার।

তারপর জানুয়ারি মাসের এক কুয়াশাভরা সকালে সবাই দেখল, জু-শি ঘরের মধ্যে একা মরে পড়ে আছে। শুং-তাও জানাল, সন্ন্যাসরোগে মারা গেছে জু-শি। কলকাতার চিনে মহলে রটে গেল, এটা স্বাভাবিক মৃত্যু নয়।

তার কিছুদিন পর আছুর এক আত্মীয় একটি খামবন্ধ চিঠি নিয়ে এল শুং-তাওয়ের কাছে। মৃত্যুর আগে আছু সেই চিঠি লিখে তার কাছে রেখে গিয়েছেন। জু-শি মারা যাওয়ার পরেই যেন এটা শুং-তাওয়ের হাতে দেওয়া হয়, এমনই নির্দেশ ছিল আছুর।

শুং-তাও ছিল নিরক্ষর। তাই অন্য লোকের সাহায্যে চিঠি পড়ল শুং-তাও।

“ভাই শুং-তাও,

আমি জানি যে, তুমি এমন একজন লোক যার ভীষণ প্রাণের ভয়। আর এও জানি যে, তুমি চাও না তোমার বউ ধনবতী বিধবা হয়ে বেঁচে থাকুক।

তুমি যখন এ চিঠি পাবে, তখন আমার কবরের মধ্যে আমি হয়তো কঙ্কাল হয়ে গেছি। কিন্তু তোমার বউয়ের কবরের মাটি তখন কাঁচা ও নরম, হয়তো তখনও ঘাস জন্মায়নি কবরের উপরে।

তোমায় শুধু এ খবরটা দিই যে, নেসফিল্ডের কাছে যে তোমার বাক্সটা আছে, তাতে এক হাজার কেন, একটাও গিনি নেই। ওটা ফাঁকা। গিনির গুজবটা ছড়ানোর ব্যবস্থা তো আমিই করেছি।

আর একটা কথা বলতে চাই, জু-শি খুব ভালো মেয়ে। ও তোমাকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু তুমিও ওকে বিশ্বাস করতে পারনি।

আশা করি ঈশ্বর তোমায় ক্ষমা করবেন। তোমার মনে তিনি শান্তি দেবেন।”

চিঠির শেষে লেখকের নাম।

এর বছর চারেক পরেই ফেং শুং-তাও বিদায় নেয় এ পৃথিবী থেকে।

সূর্য ঢলে পড়ল পশ্চিমে। নদীর বুকে অস্তগামী সূর্যের সেই অপরূপ ছবি দেখে সকলেই অভিভূত। দু-চোখ ভরে সবাই দেখে চলেছে সে দৃশ্য।

কানাইচরণ বলল,
“চল, উঠতে হবে। অনেকটা পথ যেতে হবে যে।”

(চলবে)

Author

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

 : ঊর্ণনাভ

ধারাবাহিক উপন্যাস শ্যামলী রক্ষিত ঊনবিংশতি অধ্যায়  যেদিন প্রথম তার গালের এই সাদা দাগের ছিটেটা দেখতে পেয়েছিল, সেদিনের কথাটা কোনোদিন ভুলবে না মালবিকা! বিকেলে জবজবে করে

Read More »

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

 : ঊর্ণনাভ

ধারাবাহিক উপন্যাস শ্যামলী রক্ষিত ঊনবিংশতি অধ্যায়  যেদিন প্রথম তার গালের এই সাদা দাগের ছিটেটা দেখতে পেয়েছিল, সেদিনের কথাটা কোনোদিন ভুলবে না মালবিকা! বিকেলে জবজবে করে

Read More »

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ  অষ্টম পর্ব চোদ্দো অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলেন গান্ধিজি। তাঁর সঙ্গে মতিলাল নেহেরু, চিত্তরঞ্জন দাশদের মতের মিল হল না। তাঁরা তৈরি করলেন স্বরাজ

Read More »