শুভাশিস ঘোষ
একটি বাড়ির চোখ দিয়ে দেখা দুই শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের জীবন ও সময়ের নির্মম পরিবর্তনের কাহিনি
পর্ব : দুই
| চার |
চৈত্রের মাঝামাঝি। এমন কাঠফাটা রোদ্দুর, জ্যৈষ্ঠের দুপুরকেও হার মানায়। জোড়াবটতলায় এসে ভিড়ল সুবলের নৌকা। চার বস্তা ধান নিয়ে নৌকার একমাত্র যাত্রী পরান। খালের পাড়ে মাটি ধুয়ে ফাঁক হয়ে যাওয়া বটগাছের শক্ত শেকড়ে নৌকা বাঁধে সুবল।
চারদিক খাঁ-খাঁ করছে। গোটা তিনেক কুকুর খালপাড়ে গাছের ছায়ায় শুয়ে আছে রাস্তার মাটির ওপরে। রাস্তার মাটিতে তেহলকা উঠছে। খালি পায়ে ধুলোয় পা ডুবিয়ে হাঁটা দুষ্কর। দুপুরের এমন নিস্তব্ধতা হার মানায় রাতের নৈঃশব্দ্যকেও।
নৌকা পাড়ে ভিড়তে দেখে দু-একবার ডেকে উঠলেও সারমেয় দলের উৎসাহে প্রবল ঘাটতি। হয়ত চেনা মানুষের উপস্থিতিতে সতর্কতার কিছু নেই, তা ভেবে নিস্পৃহতা। কিংবা গরমে কাহিল হয়ে প্রাণশক্তির অভাবে ডাকাডাকিতে অনীহা হতেও পারে।
গামছা দিয়ে কপাল, বুকের ছাতি, ঘাড়, গলার ঘাম মুছতে থাকে সুবল। গলুইয়ে পা ঝুলিয়ে পাটাতনে বসে বিড়ির কৌটো বার করে পরান। একটা বিড়ি সুবলের উদ্দেশ্যে বাড়িয়ে বলে,
— ধর।
সুবলের হাতে বিড়ি দিয়ে আর একটা নিয়ে কানের কাছে এনে হালকা ডলাডলি করে দু-ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে দেয় পরান। দেশলাই জ্বালিয়ে বিড়ি ধরিয়ে আগুন বাড়িয়ে দেয় সুবলকে। বিড়িতে টান দিয়ে সুবল বলে,
— কী করব পরানদা? এই ভরদুপুরে বস্তা মাথায় তোমার বাড়ি পর্যন্ত কে যাবে বলো তো?
— তাই তো ভাবছি রে, ধোঁয়া ছেড়ে উত্তর করে পরান।
— আমি বলি কী, এখন বরং একটু জিরিয়ে নও আমার নাওয়ে। একটু রোদ পড়লে, মাটির তাত কমলে না হয় বস্তা নামিও।
— তাই করতে হবে রে সুবল।
মাঝেমধ্যে আড়াল থেকে কোকিলের ডাক ছাড়া কারও অস্তিত্বের টের পাওয়া যাচ্ছে না। ভরদুপুরে এই গাছতলাতে তাদের সঙ্গে সহাবস্থান করে কুকুরগুলো। তাই নির্বিবাদে তারাও শুয়ে মাটিতে। অলস যাপনে নৌকায় পরান আর সুবল।
তেষ্টায় কাহিল দুজনেই, কিন্তু জলের খোঁজে সুবলকে পাঠাতে সায় দেয় না পরানের মন। তাই গাছের ছায়ায় বাঁধা নৌকাতে বসেই অপেক্ষা করে দুজনে।
ডোঙা বেয়ে এদিক ফিরছে কার্তিক। বছর দশেকের ছেলেটাকে নিয়ে সাতসকালে বেরিয়েছিল মাছ ধরতে। খালের জলে মাছ ধরে বেড়ায় বাপ-ব্যাটাতে। মাঝেমধ্যেই ডোঙা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে এদিক-ওদিক। জোড়াবটের গোড়াতেই ডোঙা বাঁধার জন্য কার্তিককে আসতে দেখে পরান বলে ওঠে,
— আজ কী পেলি রে তো?
— কটাকই মাছ আর জোয়ারের জলে চিংড়ি ঢুকেছিল খালে, তাই ধরলুম বাপ-ব্যাটাতে।
— তুই সিঙি, মাগুর পাসনি?
— না গো পরানদা, এই জোয়ারের জলে সিঙি, মাগুর ধরা কি আর চাড্ডিখানি ব্যাপার? সে লোভ করলে হয়তো খালি হাতে ফিরতে হতিপারে। তাই যা পাই তাই সই। তবে কোনো ঘোগের ভিতরে বাছাধন বসে আছে টের পেলি কি আর ছাড়ি? আজ পাইনি গো।
— তোকে বলাথাকলকেতো, সিঙি পেলে আমার বাড়িতে দিয়ে আসবি, আমি পিসিকে বলে রাখব। পরে আমার থেকে পয়সা নিয়ে নিস।
— আচ্ছা। তা তোমরা কি এখন জিরোবে না কি পরানদা? বললি আমরা বাপ-ব্যাটাতে তোমার বস্তাগুলো বয়ে দিতে পারি।
— তুই পারবি কেতো? জিজ্ঞেস করে পরান।
— ক্যানো পারবুনি? আমি তো আর বেগার দিচ্ছি নিগো। পয়সা নিয়ে খাটব।
পরান-কার্তিকের কথার মাঝেই খালপাড়ে এসে দাঁড়িয়েছে বিষ্টুর বউ। হাতে এক ঘটি জল নিয়ে।
— বলি, ও ভালোমানুষের পো, গরমে তো গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এবার একটু গলাটা ভেজাও তো দেখি।
— তুমি? এই ঝাঁঝাঁ দুপুরে আবার জল নিয়ে আসতে গেলে কেন নতুনবৌ?
একটু লজ্জা পেয়েই কথাগুলো বলল পরান।
— নও, আর শান্তিপুরী ভদ্দরলোক সাজতে হবে নে।
বলতে বলতে ঘটিটা মাটিতে বসিয়ে আঁচলের গিঁট আলগা করল ললিতা। সবাই তাকিয়ে থাকে তার হাতের দিকে। আঁচলে বাঁধা তালপাটালির টুকরো হাতে নিয়ে বলে,
— নও গো মাঝি, তোমার বাবুকে দাও।
তাড়াতাড়ি সুবল এগিয়ে গিয়ে এক হাতে ঘটি আর অন্য হাতে পাটালি নিয়ে নৌকায় এসে পরানের হাতে দেয়।
পরান বলল,
— এই চারজন লোকে এক ঘটি জলে আর কী হবে গো নতুনবৌ?
— তা আমি কি হাত গুণব না কি? এখানে কজন নারায়ণ আছে? নেহাত বিন্দু খুড়ি বললে, ‘ও বউ, জোড়াবটতলায় যেন কার নৌকা বাঁধা আছে রে। মনে হচ্ছে তেষ্টা পেয়েছে মানুষটার।’ তাই তো এক ঘটি জল আনলুম।
ললিতার কথায় মিষ্টি গোলা ঝাঁঝ থাকে। সে ঝাঁঝ কানে লাগলেও মনে লাগে না পরানের। কেবল মিষ্টিটাই উপভোগ্য।
— ফেরার পথে ঘটিটা বাড়িতে দিয়ে যেয়ো গো ভালোমানুষের পো।
বলেই শাড়ির আঁচলটা বড় করে মাথায় টেনে দিয়ে তপ্ত ধুলোয় পা ডুবিয়ে ফিরে চলে ললিতা। তার পথের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে পরান।
এসব ঘটনা আমার চোখের সামনে না ঘটলেও কানে আসতে সময় লাগত না খুব বেশি। এদিকের পাঁচ গাঁয়ের লোকের তো আর চড়িয়াল ছাড়া গতিই ছিল না। বাজার, হাট, বড় রাস্তা—যেখানেই যাক না কেন, চড়িয়ালে তাদের আসতেই হত। আর এই ঘোষালবাড়ির পাশের রাস্তা ভিন্ন তো আর পথ নেই। কাজেই যেখানে যাই ঘটুক না কেন, সব কাহিনি, সব উপাখ্যানের চলমান বর্ণনাতো এ পথেই। আর সেসব কাহিনির জীবন্ত স্মৃতিধারক একমাত্র এই বান্দা।
শেষ বস্তাটা কার্তিকের মাথায় তুলে দেওয়ার আগে তার পয়সা মিটিয়ে পরান বলল,
— ভালো করে গোলার দাবায় লাট দিয়ে রাখিস কেতো। পিসিকে বলিস আমি একটু পরে আসছি।
ধানের বস্তা মাথায় নিয়ে গরম রাস্তার ধুলোয় পা ডুবিয়ে কার্তিক এগিয়ে চলে পরানের বাড়ির দিকে। মাছের হাঁড়ি আগলে ডোঙায় বসে থাকে কার্তিকের ছেলে নিতাই। বাপটা ফিরে এলে একসঙ্গে বাড়ি ফিরবে।
ভারী বস্তা মাথায় চাপিয়ে হেঁটে যেতে বিশেষ ভঙ্গিতে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখে কার্তিক। তপ্ত পথে সেই হেঁটে যাওয়ার ছন্দটা লক্ষ্য করে পরান। উদাস দৃষ্টিতে নিষ্পাপ বালক বসে থাকে ডোঙার উপরে।
একবার ডাক ছেড়ে সারমেয়র দল জানিয়ে দেয়, নিতাইকে রক্ষা করতেই তর প্রাণীদের ওপর ভরসা করতে পারে সে। শম্ভু দৃষ্টিপথের বাইরে চলে গেলে ছাতা খোলে পরান। এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে ঘটি নিয়ে একবার নিতাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
— তুই তাহলে বস। আমি এগুই। এক্ষুণি চলে আসবে তোর বাপ।
সেই কাঠফাটা রোদে নির্জন দুপুরে ডোঙার ওপর মাছের হাঁড়ি আগলে বসে থাকে একলা নিতাই। প্রহরায় গোটা তিনেক কুকুর। পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব তাদের কেউ দেয়নি, স্বেচ্ছায় সে দায়িত্ব তারা তুলে নিয়েছে।
ক্লান্ত শরীরটা আর পারে না। মাছের হাঁড়ির ঢাকনার ওপর কচি হাত দুটো ভাঁজ করে তার ওপর মাথা রাখে নিতাই। নিমেষে বুজে আসে দুটো চোখ। ডোঙার ওপরে গাছের ছায়ায় পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে নিতাই।
শীতলাতলার পাশ দিয়ে ছাতা মাথায় এগিয়ে যায় পরান। ষষ্ঠীর বাড়ির কাছে এসে গলা খাঁকারি দেয়। এমন একটা মুহূর্ত, যেন আগেই থেকে জানা ছিল ললিতার। তাই সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়ে এসে বলে,
— ভেতরে এসো গো ভালোমানুষের পো। ভরদুপুরে গেরস্তের বাড়ি থেকে ওমনি ফিরে গেলে যে অকল্যাণ হবে।
ললিতার এমন বাঁকা কথায় কিছু মনে করার কারণ থাকে না পরানের। বলে,
— আমায় বাড়ি ফিরতে হবে যে নতুনবৌ। শুধু তোমার ঘটিটা দেবার জন্যেই এদিক দিয়ে এলুম।
— বাড়ি ফিরবেনা তো আর কী! কে তোমায় বেঁধে রাখছে এখানে?
বলতে বলতে দালানে একটা পিঁড়ে পেতে দিয়ে ললিতা বলে,
— খিদেতে তো পেট জ্বলছে। বলি, গরিবের বাড়িতে দু-মুঠো খেয়ে গেলেই তো হয়।
একটু ইতস্তত করে পরান। বুঝতে পারে না ললিতা ঠিক কী বলতে চায়। জিজ্ঞেস করে,
— ষষ্ঠী, তার ছেলে, ওরা সব কোথায়?
— ও মা! তার ছেলে বুঝি আমার ছেলে নয়? ছেলেকে তার মার চাইতে কিছু কম করিনি গো। তবুও পাড়ার লোকে বলে, ‘সদমা কি আর নিজের মায়ের মতো হয় নাকি?’ শুধু পেটে ধরিনি বলেই যত বদনাম। যাক গে, তারা ক্ষৌরী করতে গেছে গো বেতো বাড়িতে। ঘাটকাজের ক্ষৌরী। সূর্যি ডোবার পর তাদের ঘাটকাজ হয়, ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যাবে।
এক ঘটি জল আর পাটালি নিয়ে এসে পরানের সামনে ধরে ললিতা। মিহি গলায় পরান বলে,
— নতুনবৌ, আজ আর বেশিক্ষণ বসব না। পিসি ভাত রেঁধে বসে আছে গো।
— তা কেন বসবে? নাপতের ঘরে ভাত খেলে যে জাত যাবে কৈবর্তবাবুর।
এরপর আর কোনো কথা চলে না। পাটালি মুখে ফেলে ঘটি ধরে গলায় জল ঢালে পরান। তেলের শিশি আর একটা গামছা নিয়ে পরানের পাশে রাখে ললিতা,
— যাও, পুকুরে গিয়ে দুটো ডুব দিয়ে এসো দিকিনি। আমি ভাত বাড়ছি।
পাঁচ
ঘোষালবাড়ির নিয়মরীতি ঠিক পছন্দ নয় কানাইচরণের। মহাজনি কারবার তাদের পারিবারিক ব্যবসা, কিন্তু পরিচিত মহলে সে পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করে কানাই। বই-টা থেকে সে ছাড়া আর কোনো ছাত্র নেই, যে প্রাণকৃষ্ণ উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয়ে পড়তে আসে। সেজন্য অবশ্য তার কোনো অহংকারের জন্ম হয়নি। দাদা বিলেতে পড়াশোনা করতে গেছে—এ গল্পও কানাই কখনো করেনি কোনো সহপাঠীর কাছে।
কোথাও কোনো অন্যায় হয়েছে শুনলে প্রতিবাদে এগিয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে এই বয়সেই। লালমুখো ইংরেজ সাহেব কিংবা গোরা পুলিশের ওপর তার খুব রাগ। রাগের কারণ অবশ্য সবাই ঠিকমতো জানে না। তবে স্কুলে বেশ ভালো ছাত্র হিসেবেই পরিচিতি লাভ করেছে কানাই।
ইতিহাসের শিক্ষক অমিয়বাবু, অমিয়ভূষণ ভট্টাচার্যের বিশেষ স্নেহের পাত্র কানাইচরণ। মাঝেমধ্যেই আলাদা করে ডেকে কথা বলতেন কানাইয়ের সঙ্গে। এ নিয়ে ছাত্রমহলে বিভিন্ন রকমের কানাঘুষোও চলত। তবে খুব বেশি হইচই হয়নি কখনো।
শোনা যায়, অমিয়বাবু নাকি গোপন বিপ্লবী দলের লোক। তাই বেছে বেছে ছেলে ধরে মগজধোলাইয়ের কাজ করেন। কানাইকেও কি তিনি দলে টানতে চান? ঠিক বোঝা যায় না। তবে মাঝেমধ্যেই স্কুলছুটির পর কিংবা ছুটির দিনে কানাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন এদিক-ওদিক।
সেদিন বজবজ স্টেশনের পাশের মাঠে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা বসেছিলেন দুজনে। অমিয়বাবু শুনিয়েছিলেন কোমাগাতামারুর সেই কাহিনি। বছর তিনেক আগে ঘটে যাওয়া হাড়-হিম-করা ঘটনার বিবরণ তন্ময় হয়ে শোনে কানাই। ঘটনাস্থলে বসে সে কাহিনি শুনতে শুনতে কানাইয়ের চোখ দিয়ে কখনো আগুন ঝরে, আবার কখনো বা চোখের কোণে চিকচিক করে ওঠে জলের ফোঁটা।
— স্যার, গুরদিত্ সিং তাহলে কোথায় গেলেন? ওঁর কি কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি আজ পর্যন্ত? প্রশ্ন করে কানাই।
অমিয়বাবু বললেন,
— যতদূর জানি, সেদিন তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে কাঁধে করে উঠিয়ে প্রথমে ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দেন। অনুগামীদের মত ছিল, দলনেতাকে জীবিত রাখা খুব প্রয়োজন। যাতে পরবর্তী কালে তিনি দেশের মানুষের মধ্যে এই ব্রিটিশ সরকারের কদর্য চেহারাটা তুলে ধরতে পারেন। তাই স্থানীয় মানুষের সাহায্যে একটা বাড়ির পিছনের বাগানে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে লুকিয়েছিলেন সেই রাতে। যদিও পুলিশ আশপাশের সমস্ত বাড়িতে তল্লাশি চালায়, কিন্তু তাঁকে খুঁজে পায়নি। পরে গভীর রাতে ছদ্মবেশে গঙ্গা পেরিয়ে তিনি পৌঁছে যান বাউড়িয়ায়। সেখান থেকে হাওড়া স্টেশন হয়ে কুলির বেশে চলে যান উড়িষ্যায়। পরে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় তিনি আত্মগোপনে আছেন। শুনেছি, গান্ধিজির সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎও করেছেন। গান্ধিজি নাকি পরামর্শ দিয়েছেন পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণের।
— আপনি কী বলেন স্যার, তাঁর কি আত্মসমর্পণ করা উচিত?
— না, একদমই না।
— আমারও তাই মত। স্যার, সেদিনের পর এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
সংবেদনশীল ছাত্র কানাইচরণের এই প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়েছিল এক নিখাদ দেশপ্রেমিকের আবেগ। কোমাগাতামারু জাহাজের সেই দেশপ্রেমিকদের এমন নির্মম পরিণতির কথা শুনে ভিতরে ভিতরে সে যে যথেষ্ট উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল, তা স্পষ্ট বুঝতে পারলেন অমিয়বাবু।
বললেন,
— চলো কানাই, অনেকক্ষণ আমরা বসে আছি, এবার একটু হাঁটা যাক।
হাঁটতে হাঁটতে দুজনে এলেন গঙ্গার দিকে। সেটা পোর্ট কমিশনের সংরক্ষিত অঞ্চল। যদিও পায়ে হেঁটে গঙ্গার হাওয়া খেতে বাধা নেই, তাই নদীর পাড় ধরে তাঁরা হাঁটতে শুরু করলেন। আর অমিয়বাবু শোনাতে থাকলেন ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯১৪-র সেই রক্তাক্ত দিনের পরবর্তী ঘটনাক্রম।
সেই নৃশংস হত্যালীলার পর শুরু হল ব্যাপক তল্লাশি আর ধরপাকড়। বজবজের বিভিন্ন জায়গা থেকে গ্রেফতার করা হয় প্রায় নব্বই জনকে। তাছাড়া বেহালা, মেটিয়াব্রুজ, গার্ডেনরিচ, একবালপুর, বিষ্ণুপুর, ডায়মন্ডহারবার, এমনকি সুদূর বাঁকুড়া থেকে খুঁজে খুঁজে গ্রেফতার করা হয় মোট দুশো একুশজনকে। যাঁরা ছিলেন সেই জাহাজের যাত্রী।
৩০ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশের বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, মোট ১৩০ রাউন্ড গুলি চালিয়েছিল পুলিশ আর সেনারা। কিন্তু আশপাশের মানুষের কথায় গুলি চলেছিল তার চেয়ে অনেক বেশি। এর প্রতিবাদে ১৫ অক্টোবর লাহোরে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল প্রতিবাদসভা।
উত্তেজনায় ফুটতে থাকা কানাই প্রশ্ন করে,
— স্যার, আমাদের বাংলায় তেমন কোনো প্রতিবাদ হল না?
কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন ইতিহাসের শিক্ষক। তারপর মাথা নেড়ে বললেন,
— একেবারে কিছু হল না, তেমনটা নয়। খবরের কাগজগুলো তো প্রচুর লেখালিখি করল। দু-একটা প্রতিবাদসভাও তো হল। তবে সবচেয়ে জোরালো প্রতিবাদ করলেন স্বয়ং রবিবাবু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করে উঠল কানাইয়ের চোখজোড়া। তার জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে অমিয়বাবু বললেন,
— নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরে অনেক দেশের মতোই কানাডা সরকারও রবিবাবুকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। সেদেশে ভ্রমণের জন্য। কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন সে আমন্ত্রণ। রবিবাবু স্পষ্ট দাবি করেছেন, ব্রিটিশ কলম্বিয়াকে এই ঘটনার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে। এর চেয়ে বড় প্রতিবাদ আর কী বা হতে পারে বলো?
কানাইচরণের চোখ-মুখের সেই অভিব্যক্তি দেখে তার পিঠে স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন অমিয়বাবু। বললেন,
— আজ অনেকটা দেরি হয়ে গেল কানাই। এবার বাড়ি ফেরা উচিত। তোমার বাড়ির লোকেরা নিশ্চয়ই চিন্তা করছেন। আজ যাও, আর একদিন এখানে আসব। সোজা তাকাও কানাই, ওই যে চটকলের পাঁচিল দেখছ, ঠিক ওই জায়গাতেই চাপা পড়ে আছে আর এক লজ্জার ইতিহাস। আমরা কোটি কোটি ভারতবাসী এই যে পরাধীনতার অভিশাপ বহন করে চলেছি এতগুলো বছর ধরে, তার গোড়ার কাহিনি।
— মানে, পলাশির যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত?
— কানাই, পলাশির যুদ্ধটা হয়তো হতোই না, সেদিন যদি…
আগুন জ্বলে উঠল কানাইয়ের চোখে। উত্তেজনায় তার ভেতরটা যে কাঁপছে, বেশ বুঝতে পারেন অমিয়বাবু। হয়তো এমনটাই তিনি চেয়েছিলেন, তাই তিনিও দৃশ্যতই বেশ খুশি। কিন্তু মুখে বললেন,
— উঁহুঁ, আজ নয় কানাই, আজ বাড়ি যাও। অন্য একদিন আসা যাবে।
(চলবে)


