সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি - ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া )

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে নাজিরা মহাবিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।রাজীব বরা সাহিত্যের বিভিন্ন বিভাগে নিজ প্রতিভার পরিচয় দানে সমর্থ হয়েছেন।তিনি একাধারে কবি,সমালোচক,গল্পকার,ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক।বর্তমান অসমিয়া কবিতার জগতে রাজীব বরা একটি অতি সুপরিচিত নাম।কাব্যগ্রন্থগুলি যথাক্রমে ‘তটিনী তীরর খেলা’,’ঢেউ’,’মানুহ চেরাই বাচি থকা নাযায়’,’মাউরর দিন’,এই ফালেও কবি আছে’।মৌলিক প্রবন্ধ সংকলন ছাড়াও সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘চিন্তা-পরিক্রমা’,’অসমিয়া আরু কথা সাহিত্যর আভাস’ ইত্যাদি।আলোচ্য উপন্যাস ‘সলিল সমাধি’ (‘জলজাহ’)মাখন হাজরিকা স্মৃতি উপন্যাস পান্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়। এছাড়াও শ্রীবরা বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ]

১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা পাঁচশত পঞ্চাশটির ও বেশি।সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিয়মিত ভাবে অসমিয়া গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করে চলেছেন।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত সংস্থা NEINADএর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য Distinguished Life Membership এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশটি।হোমেন বরগোহাঞির অসমিয়া উপন্যাস ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়) বাংলা অনুবাদের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন।

| ১৫ |


জলশাই! মেয়েটি কোথায় ?


 তার থেকে চার পুরুষ আগে  বাবা ব্রহ্মপুত্র গতিপথ  পরিবর্তন করে  মাজুলীর সৃষ্টি করে। তখন মাজুলী নয় মজালি নামে পরিচিত ছিল। লোকের মুখেমুখে চলে আসা কাহিনিতে সেও শুনেছে এখানে বসতি স্থাপন করার জন্য সেই সময় এটা নাকি শকা–শাকিনী  জল। গদাধর   সিংহ স্বর্গদেউর দিনে হওয়া সেই বন্যায় অন্য জায়গা তো বাদেই হোলোঙ দিয়ে তৈরি বড়ো সিঁড়িরও নাকি পাঁচ ধাপ পর্যন্ত জলে ডুবে গিয়েছিল। বাবা ব্রহ্মপুত্র আগের উপনদী পরিবর্তন করে দিহিঙে মিলিত হয়েছিল। পরে় তার সঙ্গে নাকি  দিখৌ এসে যোগ দেয়। দক্ষিণ থেকে এঘরীয়া হয়ে মজলি নামে একটি বিশাল চরের সৃষ্টি হল। আলোর দিকে চোখ রেখে এগিয়ে যাওয়া বলরামের মনে আগেই শোনা কথাগুলি কেন মনে পড়ে গেল — সে চট করে বুঝে উঠতে পারল না।
  দক্ষিণ দিক থেকে নাড়ী ছেঁড়ার দুঃখ থাকলেও মাজুলী শুকনো চর হল না। কালক্রমে ভোগের ভান্ডার হল। শস্যে মৎস্যে উপচে পড়ল। মা লক্ষ্মীর ভান্ডার হল। তবে সব দিন তো আর একরকম যায় না। ভোগের সময়ে এখন আকাল এল। নদীর কাছ থেকে মার খেয়ে জনগণের অবস্থা খারাপ হল। অবশ্য এরকম দুর্দিন আগেও এসেছে। দুর্দিনের পরে তখন সুদিনও এসেছিল। কিন্তু নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ করার জন্য বাঁধের সৃষ্টি হল। এখন তো মাজুলী নদীর ওপরে নির্ভরশীল হওয়ার চেয়ে বাঁধের ওপরেই বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। জনগণ বলাবলি করে বাঁধ হওয়ার আগেই নাকি ভালো ছিল।  বলরামও একই কথা ভাবল। নদীর বুকে বাঁধ তৈরি করার স্পর্ধা দেখাতে গিয়ে মানুষ নদীর কাছে এমন মার খেল যে  একটা বর্ষার বাঁকা কোমর সোজা করতে না করতেই অন্য একটি আঘাত এসে পিঠে পড়ল। এই বাঁধগুলি যদি না থাকত। নদীটাকে  যদি ইচ্ছে  মতো বয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হত। না এসব তো শুধু ভাবনার কথা। সাধারণ মানুষের করার ক্ষমতা নেই। সরকারের হাতে ক্ষমতা। নেতার হাতে। 
  বাঁধ তৈরি করার ভাঙ্গার নাকি অনেক অংক আছে। নেতা  এবং ঠিকাদারের কিছু কমিশনের গোপন অভিসন্ধি থাকে—গোবিন্দরা বলা কথাগুলি সে খুব বেশি বুঝতে পারে না। কিন্তু ছিন্ন বাঁধটা, ক্ষয় হয়ে যাওয়া নদীর পার বা নতুন করে বাঁধ তৈরি করার কাজটা  গ্রীষ্মকালে না করে বর্ষাকালে করার এক ধরনের ষড়যন্ত্রের কথা  সেও বুঝতে পারে।
 এরাবারী গ্রামের সামনের রাজপথটার গায়ে লাগিয়ে উত্তর মুখ করে পাশ দিয়ে থাকা বাঁধটা নতুন করে তৈরি করার দিনগুলির কথা তার মনে পড়ল। শত শত নুনীয়া কুলি ন–ভাঙা চরের কাছে তাঁবু তৈরি করে মাটি কাটার সেই দিনগুলি। সেটা দেখে উৎসাহ আনন্দে গ্রামের ছেলে– অবিবাহিত যুবকরা মাটিকাটা গর্তগুলিতে লাফিয়ে বেড়ানো দিনগুলি। চরের খেতি– মাটি কাটতে বারণ করায় যোরহাটের ঠিকাদার বিষ্ণুকমল দাস পুলিশের সাহায্য নিয়ে জোড়ায় জোড়ায় গ্রামের মানুষকে ধরে নিয়ে যাওয়া দিনগুলি তার এখনও চোখে ভাসে।
  হালধীবারী  পর্যন্ত  বিস্তৃত সেই বাঁধটি উত্তর পারের মাজুলীকে সাময়িক সুরক্ষা না দিয়ে  থাকেনি, কিন্তু টেকেলিফুটা, মাতমরায় বাঁধ ছিন্ন হওয়ায় কয়েক বছর মাজুলীতে হওয়া বন্যার উপদ্রবের কথা সে ভুলে যায়নি। এবারের বন্যার চেয়ে সেগুলি কোন দিকে কম ছিল!
  বাঁধটা কার কী উপকার করেছে সেটা হিসেব করার ইচ্ছা তার কোনোদিনই হয়নি। কিন্তু করতে পারা অপকারটা থেকে পরিত্রাণের জন্য ওরা যে কাজটা করল তার ফলে তার জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বছরের সুখ শান্তি নাই হয়ে গেল। ঢোকে ঢোকে জল খাওয়াল। তার জন্যই জেল হাজতে কাটানো আরও দশ বছর ধরে মামলার নামে অফিস কাছারিতে দৌড়াতে হওয়ায় তাকে কাবু করে ফেলেছে। যোরহাটের কাছারিতে যাওয়া আসা করতে গিয়ে খরচ সামলানোর জন্য চেনেহী বাপের বাড়ি থেকে আনা এন্ডির কাপড় দুটোও বিক্রি করে দিতে হয়েছে। হালের গরুকে ও বিক্রি করতে হয়নি কি?
সেদিন ওদের কাছে আইন আদালতই জীবনের সব বলে ভেবে বাঁধটা কাটতে হয়েছিল। মানে কেটেছিল। বাঁধটা বেঁধে আলির বাইরের , লুইতের বন্যার হাত থেকে চিরকালের জন্য গ্রামটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু এই চেষ্টায় ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়ে মাজুলীর উত্তর দিকে টেকেলিফুটায় নদী বাঁধ ভেঙ্গেছিল। সেই জলধারা বয়ে এসে এরাবারীর গ্রামের সামনের পূর্ত বিভাগের আলি এবং বাঁধের একটা প্রান্ত যে জায়গায় মিলিত হয়েছে সেই কোণটাতে আঘাত পেয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছিল। 
বাঁধটা উঁচু। তাকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেবার মতো শক্তি জল তখনও সংগ্রহ করতে পারেনি। পূর্ত বিভাগের আলিটা নিচু। তাই তার উপর দিয়ে জল গড়িয়ে যাচ্ছে। এটার অবস্থা খুবই খারাপ ।যেকোনো সময় দুর্যোগ ঘনিয়ে আসতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে শুধু এরাবারী নয় তার গায়ে গা লাগিয়ে থাকা দশ বারোটি গ্রামের বাড়ি ঘরের আর অস্তিত্ব থাকবে না। সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। বাঁচার উপায় নেই। রাস্তার বাঁধের উপর দিয়ে জল গড়িয়ে যাচ্ছে। পূর্ত  বিভাগের মুহুরি লোকনাথ ভূঁঞা লোক লাগিয়ে অফিস থেকেই সংগ্রহ করে আনা পাটের বস্তায় বালি ভরিয়ে সেগুলো দিয়ে জল রোধ করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। গ্রাম থেকে এসে আলিতে জমায়েত হওয়া মানুষগুলি হায় হায় করছে। কেউ কেউ নৌকায় করে ঘর থেকে বাছুর,জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাবার জন্য তাড়াহুড়ো করছে। 
কে জানি বলরাম, মুহিরাম,কণপাই,পদ্ম, দীন ওদের কাছে ডেকে বলেছিল–’গ্রামগুলি বাঁচাতে হলে বাঁধটাকে কাটতে হবে। পথ ছিন্ন হয়ে নদীর ধারা এদিক মুখো হলে  প্রথমে আমাদের গ্রামটাই উচ্ছন্নে যাবে।’পরামর্শটা সম্ভবত গ্রাম প্রধান কাকু দিয়েছিল যদিও তাতে সম্মতি দেবার অনেক মানুষ ছিল। 
কোনো একজন কোথা থেকে কোদাল এনে হাতে তুলে দিয়েছিল সে কথা তার মনে নেই। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে সাতটি কোদালের আঘাতে বাঁধটা খসে পড়তে শুরু করেছিল। আর যখন জলের জিভ চেখে দেখার একটা সুড়ঙ্গের সন্ধান পেল তখন আর নদীকে কে আটকায়! পুরো ঘটনাটাই ঘটেছিল দিনের আলোতে। সেটাও পূর্ত বিভাগের অফিসার এবং মুহুরীর সামনে। কোদাল দিয়ে বাঁধ কাটতে দেখে বাধা দেবার জন্য লোকনাথ ভূঞা দৌড়ে এসেছিলেন–’এই,এটা কী করছেন? এ অন্যায়। আইন বিরুদ্ধ। এটা করবেন না। আপনাদের বিপদ হবে।’
তবে এই অবস্থায় তার কথা শোনার মতো কারও অবসর নেই। সম্ভাব্য বিপদ থেকে পরিত্রাণের জন্য এক হওয়া আলির ভেতর বাইরের মানুষজন তাকে ঘিরে ধরল। তখন আইন আদালতের কথা শোনার সময় নয়। এটা বিপর্যয়ের গ্রাস থেকে পরিত্রান পাওয়ার পথ খোঁজার সময়। ধ্বংস হতে চলা গ্রাম, মাঠ, বাড়ি-ঘর, পিতৃ- ভিটা রক্ষা করার সময়। কেউ তাকে ঠেলতে ঠেলতে এত দূরে নিয়ে গেল যেখান থেকে বাঁধ কাটতে থাকা কাজটা ভালো করে দেখাই যায় না। 
বন্যা বৃষ্টিতে এমনিতেই কোমল মাটি। তার মধ্যে কোদালের প্রচন্ড আঘাতে প্রশস্ত হয়ে উঠা সুড়ঙ্গ দিয়ে জলের স্রোত এদিকের উপনদীতে পড়ল। তারপর অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে রাস্তার পরিসর বাড়িয়ে যেন ক্রোধী নদীটা আলির মধ্য দিয়ে পার হয়ে গেল।এরাবারী সহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রাম বেঁচে গেল।বাঁধের  ভিটায়  ফুলেফেঁপে উঠা  জল বর চাঙ  পর্যন্ত ডুবিয়ে ফেলা গ্রামগুলিতেও জল কমল। তবে সেইসব গ্রামের যে সমস্ত লোক বাঁধ কাটাকাটিতে উৎসাহ দিয়েছিল তাদেরই এখন যাতায়াতের পথ ছিঁড়ে যাওয়ায় অন্য কারও প্ররোচনায় পড়ে দুই একজন গিয়ে থানায় মামলা করল। সাক্ষীরও  অভাব ছিল না। লোকনাথ ভূঞাও  সেখানে উপস্থিত ছিল। তাই বাঁধ কাটার কাজে কোদাল ধরা কয়েকজন কারাগারের ভাত খাওয়াটা নিশ্চিত হল। পরে জনগণ চেষ্টা চরিত্র করে বলরামদের মুক্ত করে আনে যদিও মামলা চলল। যারা উসকে দিয়েছিল তারাই শত্রুতা করল। সাক্ষী দিতে গেল। তবে লোকনাথ ভুইয়া মৃত্যুর আগে সাক্ষীর বচন পরিবর্তন করে ওদেরকে খালাস করে রেখে গেল। মামলাটা তার মতো খেটে খাওয়া মানুষদের কাবু করে ফেলল। যোরহাটের কাছারিতে যাওয়া আসার খরচ মেটাতে গিয়ে  তাকে চেনেহী বাপের বাড়ি থেকে আনা এন্ডি কাপড়  এবং হালের গরু বিক্রি করতে হয়নি কি?
 সেদিন উশকে দেওয়া  জনগণ  পরবর্তীকালে  গা ছেড়ে দিয়েছিল। কথায় বলে –অন্যের জ্বরে  অন্য কে খায় জল’। মামলা থেকে খালাস পেয়ে সে জীবনে কিছুটা অবকাশ পেয়েছিল। মুহুরী ভূইঞার উপকারের জন্য তারা পরিত্রাণ পেল সেটা ভোলা যায় না।
  হঠাৎ বাতাসে ভেসে আসা  দুর্গন্ধটা তিনজনের নাকে লাগল।ডান হাতে কোঁচটা খামচে ধরে নাক নৌকার তুলিতে রেখে সেই হাতে  হ্যাজাক লাইটটা বলরাম খামচে ধরল। মাথায় পাগড়ির মতো বেঁধে নেওয়া গামছাটা বাঁ হাতে টান মেরে নাকে মুখে সেটা চাপা দিয়ে ধরল।একটা বিশ্রী গন্ধ ক’লাই এবং বুধিরামকেও নাকে মুখে কাপড় চাপা দিতে বাধ্য করল। উজান মুখে নৌকার দিকে স্রোত ভাটিয়া আসা শবটা লাইটের আলোতে বলরামের দেখতে ইচ্ছা করল না। সে চোখ বুজে ফেলল।নৌকার পাশ দিয়ে ভেসে যাওয়া শবটা দেখে ক’লাই বলে উঠল –কারও হালের বলদ হবে বোধহয়। আকার দেখে সেরকমই মনে হচ্ছে।’
  হাতের হ্যাজাক লাইটটা নৌকার পাটাতনে রেখে বলরাম স্তব্ধ  হয়ে বসে রইল। এককালে বন্যায় ভেসে আসা এই ধরনের শব বাওতলি এবং বারী– ঘরে কচুরিপানার সঙ্গে লেগে থাকায় ঠেলে ভাসিয়ে দেওয়ায় সেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেই দুর্ঘটনার পর থেকে জলে ভেসে যাওয়া সব  শব দেখা তো দূরের কথা গন্ধ পেলেও তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। জীবনটা অসার বলে মনে হয়। কখনও জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে মরে যেতে ইচ্ছে করে। কখনও পুরাণের দেবতার মতো এক নিঃশ্বাসে  নদীর জল পান করতে ইচ্ছা করে। অবশ্য সেও জানে দেবতার সঙ্গে লড়াই করে কোনোদিন মানুষ জিততে পারেনি।
  তার বড়ো মেয়েটিকেও দেবতা নিল। জল দেবতা নিল। না, সেটি দুর্ঘটনা। না না তার  অবিবেচকী কাণ্ডের ফল। সেদিন চাইতেই যদি রানুমাইকে সিঁদুরে আম গুলি পেড়ে এনে দিয়ে সে যদি ঘাস কাটতে  যেত। তখন হয়তো যুবতি মেয়েটিকে এভাবে হারাতে হত না। যা ঘটে গেছে তা আর ফিরিয়ে আনা যায় না। মৃতকে ফিরিয়ে আনা যায় না। সেভাবে ভুলে যাই বললেও ভোলা যায় না। তার জন্য সেটা একটা আগুনের দাহ।সান্ত্বনা নেই।আজ পর্যন্ত সে এই শোক থেকে নিস্তার পায় নি।
সারাদিন চর অঞ্চলে খোঁজ-খবর করেও নৌকায় এক বোঝা ঘাস নিয়ে যখন সে বাড়ি পৌছেছিল ততক্ষণে বুক জলে তলিয়ে যাওয়া উঠোনে কয়েকটি নৌকা এবং ভেলায় করে বেশ কিছু লোকজন জমায়েত হয়েছিল।এমনিতেই বন্যার উপদ্রব তার মধ্যে তার বাড়িতে মানুষের সমাগম দেখে দূর থেকেই তাঁর বুকের স্পন্দন বেড়ে গেল।উঠোনে পৌছেই বিবশ স্ত্রীর মুখটা দেখে তার বুঝতে বাকি রইল না যে সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটেছে।কী ঘটতে পারে?
যখন সে জানতে পারল রাণুমাইকে বিকেল থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সেও আকুল হয়ে উঠল।আত্মীয়-স্বজন পরিবার-পরিজনের প্রত্যেকেই সমগ্র গ্রামের ঘর-দুয়ার,জলে ডুবে যাওয়া পথ-ঘাট ,বন-জঙ্গল সবজায়গায় খোঁজ খবর করেও তার কোনো খবর পাওয়া যায়নি জানতে পেরে সেও কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে পড়ল।উঠোন-পথ এক বুক গলা জলেও হাতড়ে হাতড়ে কেউ তার শরীরের খোঁজ করতে লাগল। কে জানে হয়তো ভাঁড়াড়ের পাশে বড়শি বাইতে থাকার সময় তার সলিল সমাধি ঘটেছে। 
সে তো দুপুর থেকে ভাঁড়ারের গাধৈ থেকে বেরিয়ে থাকা বাঁশের ওপর বসেই বরশি দিয়ে মাছ ধরছিল। পায়ের নিচে ছিল কলা গাছের ভেলাটা। ঘরের ভেতরের মাচাঙে উঠে থাকা ভাই-বোনদের সঙ্গে বেড়ার উপরের বাঁশের সিলিঙের ফুটো দিয়ে সে দূর থেকেই কথা বলছিল। ভাঁড়ারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া স্রোতের ধারায় বড়শি ফেলে প্রতিটি ছিপে একটি করে এলেং মাছ উঠিয়ে ওদের দেখিয়ে অর্ধেকটা জলে ভরা টিনের মধ্যে রাখছিল। মা ভেতর থেকে জলখাবার খাওয়ার জন্য ডাকার সময় সে উত্তরও দিয়েছিল–’রেখে দে। কেঁচো ধরা হাতে এখন খাব না। পরে খাব।’
সেই মেয়েটি কিছুক্ষণ পরেই কোথায় চলে গেল। ভাই বোনের চিৎকার, মায়ের জোরে জোরে  ডাকাডাকি স্পর্শ করতে না পারা, না শোনা দূরত্বে কীভাবে চলে গেল। ভেলাটাও নেই। কারও বাড়িতে গেলে সে মাকে বলে গেল না কেন। প্রশ্ন, কেবলই প্রশ্ন। উত্তর যেমন মায়ের কাছে ছিল না সেভাবে বলরামও কোনোদিন এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর পেল না। 
বিবশ মা-বাবার অবস্থা দেখে ভাই বলা কথাগুলি থেকে বলরাম অনুমান করল–হয়তো ওদের বাগানের প্রান্তে থাকা সিঁদুরে আমগাছটাই তার পক্ষে কাল হয়েছে। ছোটো ছেলেটির কথা থেকে বলরাম জানতে পেরেছিল; বড়শির প্রতিটি ছিপে মাথা তুলতে গিয়ে দিদি দূরে দেখতে পাওয়া সিঁদুরে আমের স্তূপের দিকে অঙ্গুলি  নির্দেশ করে তাকে নাকি বলেছিল–’সিঁদুরে আম খাবি?’
সেদিন বলরামেরও হঠাৎ মনে পড়েছিল–’হ্যাঁ, সত্যিই তো। সেতো গতকাল কয়টি আম পাড়ার কথা বলেছিল। তবে ঢিল দিয়ে পাড়তে গেলে কুটা দিয়ে চেষ্টা করলে আম খসে একেবারে স্রোতের জলে পড়বে। তার মধ্যে আম গাছটা বাগানের এক প্রান্তে হওয়ায় পাশেই একটা গভীর খাল। খরার সময় সেখানে জল থাকে না যদিও নদী পাড় ভেঙ্গে ঢুকলে জলের স্রোতে সেটা নদী সদৃশ্য হয়ে ওঠে। এখন সেখানে অথৈ জল। সেখানে আম খসে পড়লে কুড়িয়ে আনা সম্ভব নয়। তার মধ্যে জলে পড়া আমের বেশিরভাগই তলিয়ে যায়। ওভাবে ভেলায় পড়লে পাওয়া যায়। তাই আম খেতে হলে গাছে উঠে হাত দিয়ে পাড়তে হবে। কয়েকদিন ধরে একনাগারে বৃষ্টি। গাছ, গাছের ডাল গুলি যথেষ্ট পিছল। রোদ উঠলে পেড়ে দেবে বলে বলরাম নিজের দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছিল। 
সেদিন শুধু বলরামের ঘরই নয়, সমস্ত গ্রামের মানুষগুলি–আলিতে চালা বেঁধে কোনোভাবে বসবাস করা ঘরে চাঙ বেঁধে থাকা কারও চোখেই ঘুম এল না। ভোরবেলাতেও নৌকা নিয়ে চার-পাশটা খোঁজা হল। কে জানে সে হয়তো ভেলার সঙ্গে ভেসে গেছে। পেছনের খালে পড়া জলের স্রোত কয়েকটি গ্রাম এবং মাঠ পার হয়ে দরিয়া ঘাট দিয়ে বেরিয়ে গেছে। সেই দিকেও খোঁজ খবর করা হল।নেই। মেয়েটির কোনো খোঁজ খবর নেই। কথাটা চারপাশে জানাজানি হয়ে গেল।
পরের দিন বিকেলে আসা খবরটা বলরামের বুকের স্পন্দন আরও বাড়িয়ে দিল, তাকে উদ্ভ্রান্ত করে তুলল। তিনটি মানুষ বেয়ে যাওয়া নৌকাটির গতিবেগ বাড়ুক বলে সেও একটা বৈঠা তুলে নিল। ভাটিতে নৌকার গতিবেগ বাড়ল। আর তারা যখন কমলপুরের বড়ো বড়ো গাছ থাকা অঞ্চলটাতে পৌঁছাল তখন সেখানে দুজন মানুষ তাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল।নৌকাতা কাছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকদুটির কোনো একজন জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে সিঁথির মতো বয়ে যাওয়া স্রোতের টানে গাছে লেগে থাকা কচুরিপানার দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে দেখাল–হ্যাঁ সেটি একটি ভেলা। ভাসমান ভেলা। কোনো মেয়ের  ভেলা। নিচের দিকে দিয়ে উপুড় হয়ে ভাসছে। গায়ে একটা টিয়া পাখির ছবি থাকা ফ্রক।
বলরামের চিৎকারে সঙ্গে থাকা প্রত্যেকটি মানুষ চমকে উঠল। কেউ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছিল–’উপুড় হয়ে থাকা শবটা রাণুমাইর নাও হতে পারে। ধৈর্য ধরুন।’কিন্তু বলরামের বুঝতে কিছুই বাকি ছিল না। ফুলে উঠা শরীরটাতে টাইট হয়ে লেগে থাকা সেই ফ্রকটা সেই কিছুদিন আগে গাঁটের ধন খরচ করে কিনে এনেছিল।
কেউ একজন ভেলাটা উল্টে দেওয়ায় জ্বলজ্বল করে উঠা রাণুমাইর মুখটা তার আর দেখতে  সাহস হল না। তবু মনে জোর এনে সে তার দেহটা নৌকায় তুলেছিল। ফুলে উঠলেও দেহে তখনও পচন ধরে নি। একটা বাজে গন্ধ বের হচ্ছিল। সে লক্ষ্য করেছিল তার কপালে আগে না থাকা দাগটা। সেটা মাছ বা অন্য কোনো জন্তুর কামড়ের দাগ নয়। সেটা মনে হচ্ছে জলে ডুবে যাওয়ার আগে কিছু একটার সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার ফলে হয়েছে।
‘আমার জন্যই ওর মৃত্যু হল। আমার জন্যই ওর মৃত্যু হল।–বলরাম হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।’আমি কেন ওকে আমগুলি পেড়ে না দিয়ে গেলাম। সে বোধ হয় গাছে উঠে আম পাড়তে গিয়ে ডাল থেকে পিছন খেয়ে পড়ে গিয়ে অন্য ডালে ধাক্কা খেয়ে জলে পড়েছে। নাাহলে গ্রামের সামনের দিকের খারজান উপনদী সাঁতরে পার হতে পারা মেয়েটি জলে ডুবে মরে। সে নির্ঘাত কপালে পাওয়া আঘাতে অজ্ঞান হয়ে গিয়ে জলে পড়েছিল। আমি মেয়েটার মরণের কারণ হলাম। যুবতি হয়ে উঠার পর থেকে তাকে গাছে চড়া, ডাংগুটি খেলা, সমবয়সীদের সঙ্গে এখানে সেখানে ঘুরে না বেড়ানোর কত পরামর্শ দিলাম। সমস্ত বৃথা হয়ে গেল। আমার মা, তোর মাকে গিয়ে আমি কী বলব? ভাই বোনকেই  বা কীভাবে সান্ত্বনা দেব?’
বলরাম বুকে চাপড় মেরে মেরে চিৎকার করায় মানুষগুলির তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা ছিল না। প্রত্যেকেই নির্বাক। প্রত্যেকের চোখেই জল।

টীকা :
জলশাই-জলে থাকা ভূত
শকা-শাকিনী-আহোম রাজার দিনে হওয়া দুটো বন্যা।
হোলোঙ-খাল
গাধৈ-বাঁশ বেত দিয়ে প্রস্তুত মাচাঙ।

( চলবে )

সলিল সমাধি - ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া )

সলিল সমাধি

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

৩ : কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ একটি বাড়ির চোখ দিয়ে দেখা দুই শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের জীবন ও সময়ের নির্মম পরিবর্তনের কাহিনি পর্ব : দুই | চার | চৈত্রের মাঝামাঝি।

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

৩ : কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ একটি বাড়ির চোখ দিয়ে দেখা দুই শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের জীবন ও সময়ের নির্মম পরিবর্তনের কাহিনি পর্ব : দুই | চার | চৈত্রের মাঝামাঝি।

Read More »

সলিল সমাধি

This entry is part 8 of 8 in the series সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) সলিল সমাধি – ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস

Read More »