কালের প্রহরী

কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ

এক

শীতের এমন ঝাঁক মনে পড়ে না শেষ কবে দেখেছি। এবারের ঠান্ডা বেশ জবুথবু করে দিয়েছে কলকাতা লাগোয়া এই শহরতলিকে। কুয়াশার চাদরে ঢাকা সকাল, আড়মোড়া ভাঙতে বেলা গড়িয়ে যাওয়ার স্মৃতিতো আর কম নেই এ বুকে। বাঘ-কাঁপুনি শীতের রাতও কি আর কম দেখলাম জীবনে? তবে এতদিন হয়ে গেল, এখনো শীতের কামড় কমল না—এমনটা এই শতকে আর কবে-ই বা হল? পারদ পতনের মতো এমন ছোটোখাটো ঘটনার সাল-তারিখ ইদানীং অতটা মনে থাকে না, তবে স্মৃতির পাতায় তেমন কিছু ধুলো পড়েনি আমার। এই টইটম্বুর স্মৃতির ভাণ্ডারই তো এখন আমার একমাত্র সঙ্গী। আর এই সেটাই হয়েছে এখন বড়ো দায়।

কথাটা কানে এসেছে বিকেলেই। কানাঘুষো চলছিল ইয়াসিন আর আলতাফে। ওরা জোগাড়ে। হেডমিস্ত্রি বসিরের কাছে শুনেছে কথাটা। এটাই নাকি আমার শেষ রাত। সূর্য উঠলেই শুরু হবে ধ্বংসপর্ব। শাবল আর গাঁইতির শব্দে তৈরি হবে এক সাংগীতিক ছন্দ। আমার এই একশো এগারো বছরের জীর্ণ শরীরটা মিশে যাবে মাটিতে। ইটের খাঁজে খাঁজে রয়ে যাওয়া চুন-সুরকির শিথিল বাঁধনগুলো পাবে মুক্তি। আর এই স্মৃতির ভাণ্ডারও হারিয়ে যাবে কালের গর্ভে।

এ আমার কালরাত্রি। এ রাতে ঘুমতে নেই। আসলে কাল রাতে ঘুম আসে না। তাই অনন্ত স্মৃতির টুকরো রোমন্থনেই কেটে যাক এ রাত। কোল পেতে বসে আছে যে মহাকাল, সেখানেই জমা থাক আমার স্মৃতির সমুদ্র।

সে অনেক কালের কথা। তখন ব্রিটিশের রাজত্ব। দেশের রাজধানী সদ্য উঠে গেছে কলকাতা থেকে। ভেঙে যাওয়া বাংলা আবার জোড়া লেগেছে। বাঙালির জেদের কাছে বাধ্য হয়েই বাংলা-কে জুড়তে হয়েছিল সাহেবদের। আর সেই রাগেই নাকি রাজধানী উঠে যাওয়া। কলকাতার লাগোয়া গ্রামগুলোতেও একটু চাপ কমল ইংরেজদের। পদ্মপুকুরের পাশে এই সাড়ে পাঁচ বিঘে জমিও আর দরকার পড়ল না তাদের। অগ্রিমের টাকা ফেরত নিয়ে বাংলার পাটতারি গুটোল ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াটসন সাহেব। পাড়ি দিল দিল্লিতে।

সত্যচরণও ভাবল, এ জমিতে এবার নতুন বসতবাড়ি গড়া যাক। ঠাকুরদার আমলের পুরোনো ভিটেতে জায়গার বড়ো টানাটানি। এতগুলো ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভরা সংসারের চাই একটুখানি খোলামেলা দালানকোঠা। মা লক্ষ্মীর কৃপায় তখন সিন্দুকও বেশ টইটম্বুর। চাষাভুষোদের সেলাম, দণ্ডবতেরও অভাব নেই সকাল-সন্ধেয়। তাই তৈরি হল এই ইমারত।

বাড়ির দক্ষিণ দিকে কাটা হল পুকুর। বাকি জমিতে রয়ে গেল সাবেকি বাগানটা। সাফসুতরো করে বাগানের মাঝে ছাউনি দিয়ে তৈরি হল শানবাঁধানো বসার জায়গা। সবশেষে আমি।

সেই থেকেই এই বাড়ি, পুকুর আর বাগানের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, শতাব্দীপ্রাচীন এক স্মৃতিধারক। দুটো শতাব্দের যোগসূত্র হয়ে বেঁচে থাকা এক নিশ্চল নীরব সাক্ষী, ঘোষালবাড়ির পাঁচিল।

দুই

আশপাশের পাঁচ গাঁয়ের মধ্যে শম্ভুচরণই প্রথম, যে কলকাতার কলেজে পাস দিয়ে গাঁয়ে ফিরল। তখন সত্যচরণের অহংকারের পারদ হল ঊর্ধ্বগামী। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আড়তে যেতে সত্যচরণের লাগে মিনিট কুড়ি। এই পথটুকু হাঁটতে হাঁটতে যত লোক চোখে পড়ে, সবাইকে ডেকে একটি কথাই শোনাতে লাগল,

“শুনেছিস তো, বড়ো খোকা এবার বিলেত যাচ্ছে রে। শম্ভুকে ব্যারিস্টারি পড়তে পাঠাচ্ছি ও দেশে। এই পোড়া দেশে আর কী হবে বল? এ দেশে তো গোলাম বই আর কিছুই নই আমরা। অথচ সাহেবদের দেশে গেলে কত সম্মান! অবশ্য এসবের আর তোরা কী বুঝবি? চাষার ব্যাটা মুখ্যুর ডিম কোথাকার।”

বিলেতটা যে ঠিক কোন দেশ, জানে না বংশী, বিধু, সুবল, অচিন্ত্য, বিষ্টু আর গাঁয়ের যতসব মূর্খ চাষামজুরদের দল। সেখানে যেতে কতদিন সময় লাগে, কীভাবে যাওয়া যায়, সে দেশের মানুষ কী পরে, কী খায়—কিছুই জানা নেই ওদের।

তারা কি সবাই গোরা সাহেবদের মতো লালমুখো আর বদমেজাজি? নাকি সে দেশেও কালোচামড়ার লোক আছে? চাষির গোলায় ধান উঠলে কি বিলেতের গ্রামে পার্বণ শুরু হয়—জানে না। ওরা জানে শুধু সে অনেক দূরের দেশ। কলের জাহাজ চড়ে, সাত সমুদ্দুর পেরিয়ে যেতে হয়। যার-তার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয় সে দেশে। সেখানে গেলে সবাই খুব গণ্যিমান্যি হয়েই দেশে ফেরে। তবে আগে নাকি বিলেত থেকে ফিরলে প্রায়শ্চিত্তও করতে হত। কালাপানি পেরিয়ে যেতে হয় যে।

এইটুকু জানা নিয়েই ওদের জীবন কাটাতে কোনো সমস্যা হয় না। দিব্যি থাকে বেঁচেবর্তে। বছরভর জল থাকে চড়িয়ালের খালে। জোয়ারে গঙ্গার জল ঢোকে, আবার ভাটায় নেমেও যায়।

আশপাশের গ্রামগুলো থেকে বড়ো বড়ো নৌকাভরে বিচালি, ইঁট, টালি, হাঁড়ি, কলশি, ভাঁড়, মালশা, ধান, চাল—সব চালান হয় কলকাতার নানান ঘাটে। গোপীগঞ্জের কুমোরপাড়ার শিল্পীদের নামডাক খুব। কত দূর-দূরান্ত থেকে ব্যাপারির দল ছুটে আসে ওদের পুতুল, ঘোড়া, হাঁড়ি, কলশি, ভাঁড়ের ফরমাশ দিতে।

অবশ্য আজকাল আর কেউ গোপীগঞ্জ বলে না। সবার মুখেই পুজালি। চিনে সাহেব টং আছু এসে যখন আছিপুরের পত্তন করেছিল, তখন থেকেই নাকি গোপীগঞ্জের নাম হয় পুং-জা-লি। ওই চিনে ভাষা আবার ভেতো বাঙালির জিভে ঠিক খোলতাই হত না। তাই সে হয়ে গেল পুজালি।

সেই পুজালির মাটির জিনিস আর টেরাকোটা, আছিপুর, রায়পুরের ইট আর টালি, বুইতা, চকগোপাল, নিশ্চিন্তপুরের খড়-বিচালি—সব চলে যায় নৌকা চড়ে। ঠাকুরপুকুর, কালীঘাট, টালিগঞ্জের ঘাটে ভেড়ে। আবার কত ডিঙি চলে যায় বেলেঘাটা, চিংড়িহাটা পর্যন্ত।

এই খালের সঙ্গে এদের জীবন জড়িয়ে। জোয়ারের স্রোতে ভেসে আসে গাঙের চিংড়ি, কত রকমের নোনাজলের মাছ। আবার খালের শোল, ল্যাটা, কই, মাগুরও কারুর জীবিকা, কারুর বা পুষ্টির উৎস।

এই খালের জলে দাবিয়ে বেড়ানো চাষামজুরদের দৌড় আর কত দূর হবে? তাই তাদের জানা-বোঝায় বিলেত এমন এক দেশ, যাকে নিয়ে কল্পনার জগত রচনায় কার্পণ্য করতে নেই। অনেকটা স্বপ্নের পোলাওতে ঘি ঢালার মতো। সেই কল্পিত কাহিনির বর্ণনা বটতলার আড্ডায় বসে কেতাবি ঢঙে শুধু বলার অপেক্ষা। হুঁকোর ধোঁয়া আকাশে মিলিয়ে যাবার আগেই তা পাঁচ গাঁয়ে পৌঁছে যায়।

শম্ভুচরণের বিলেত যাওয়ার কথার রটতেও সময় লাগল না খুব বেশি।

“ছেলেকে মানুষ করছ বটে সত্যচরণ! কলেজ থেকে বড়ো পাস দিয়ে সটান বিলেত!”

সুখ্যাতির রটন লাগল গাঁয়ে গাঁয়ে। পাশাপাশি হা-হুতাশ, শাপ-শাপান্তও কিছু কম হল না।

“গরিবের রক্তচোষা পয়সায় ছেলেকে বিলেত পাঠাচ্ছে সত্য। যুদ্ধ লাগার আগ থেকেই কমরা হাজানিতো করল না ঘোষালের পো! মানুষ না খেয়ে মরছে, আর এদিকে বস্তা বস্তা চাল মজুত করে কালোবাজারি করে চলেছে ওই সত্য ঘোষাল।”

হুঁকোয় টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে কথাগুলো বলল সাতকড়ি। মহাজনি কারবারে নিশ্চিন্তপুরে তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও বুইতায় সাতকড়ির পথের কাঁটা এখন সত্যচরণ। তাদের তিন পুরুষের কারবারেই ইদানীং থাবা বসিয়েছে সত্য। বুইতার চাষিরা কাঁচা পয়সার দরকারে আজকাল আর কেউ সাতকড়ির দ্বারস্থ হয় না। ঘরের সোনাদানা, পেতল-কাঁসা, জায়গা-জমি—সব এখন ওই সত্যচরণের দেউড়িমুখী।

সত্যচরণের বাপ-ঠাকুরদারা ছোটোখাটো মহাজনি করলেও এমন রাঘববোয়াল তো হয়ে ওঠেনি। কোন অপরাধে যে মা লক্ষ্মী এমন বিরূপ হলেন, তা বুঝে পায় না সাতকড়ি। শিরায় শিরায় সে রাগ পুষে রেখেছে। তাই এমন একটা অলক্ষুণে খবর শুনে আর স্থির থাকতে পারল না। কথাগুলো বিষ্টুকে শুনিয়েই দিল সাতকড়ি।

সকাল-সকাল বিষ্টু এসেছিল ক্ষৌরী করতে। সাতকড়ির উঠোনে বসে ছেলেপিলেদের চুল ছাঁটার ফাঁকে শম্ভুচরণের বিলেতযাত্রার কথাটা পাড়ল সে। বিষ্টু ভালোই জানে, সে কথায় তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠবে সাতকড়ি। আর তাতে একটু তাল মিলিয়ে দু-চারটে ফোড়ন কাটলেই সকাল-সকাল সিধের থালাটা একটু ভারি হতে পারে।

তাই বলেই ফেলল,

“খুড়ো, শুনো চোতো? বুইতের সত্যচরণের ব্যাটা নাকি বিলেত যাচ্ছে। বিলেত পাঠিয়ে ছেলেকে সাহেব তৈরি করবে ঘোষালের পো।”

তাতেই রাগে ফুঁসতে থাকে সাতকড়ি। উঠোনের মাঝে কাঠের চেয়ারে বসে তামাক খাচ্ছিল। জোরে জোরে গোটা চারেক টান মারে হুঁকোয়। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সত্যচরণের প্রতি উগরে দেয় একরাশ ঘৃণা। কাশির দমকে কথাগুলো স্পষ্ট বোঝা না গেলেও, চোখেমুখে ঘোষালের পো-র সর্বনাশ কামনার ছাপ স্পষ্ট।

একদিকে ফুলে-ফেঁপে ওঠা ধান-চাল আর বন্ধকি কারবার, অন্যদিকে ছেলেকে বিলেত পাঠানোর কৃতিত্বে মুরুব্বি হিসেবে সত্যচরণের সামাজিক মর্যাদাও বৃদ্ধি পেল কয়েক গুণ। বুইতার চণ্ডীমণ্ডপে যে কোনো শালিসি সভায় প্রেসিডেন্টের পদ বরাদ্দ হতে লাগল সত্যচরণের জন্য। অন্যদিকে নিশ্চিন্তপুরের পঞ্চাননতলায় বড়োসড়ো বিবাদের সালিশিতেও ডাক পড়তে লাগল তার। সত্যচরণের এই বাড়বাড়ন্ত দিনে দিনে অসহ্য হয়ে উঠেছে সাতকড়ির কাছে।

তখন আমার শৈশব। কী যে প্রাণবন্ত ছিলাম তখন! যা দেখিতাতেই দিই মনোযোগ। কারা তেড়ে ঝগড়া করছে, কার গরুতে ধান খেয়ে গেল মাঠে, কার গোয়ালের গরু-বাছুর বিয়োল, কার মেয়ের বিয়েতে ভাঙচি দিল কে—সব খবর ঠিক চলে আসত আমার কানে।

প্রহ্লাদ, গৌরবদ্যির ছেলে, যেদিন দুপুরে কাজলিকে বলল,

“কাল যাত্রাতলায় তোকে দেখলুম একটা প্যান্টুল পরা লোকের সঙ্গে কথা বলছিলি। ওটা কে রে কাজলি?”

“ওমা! তুমি জানুনি? নিতাইমামা আমার ছোটোকাকির ভাই গো, কলকাতায় থাকে, গোষ্টো দেখতে এসেছে। এখন থাকবে কদিন আমাদের বাড়িতে।”

প্রহ্লাদের দিকে একগাল হেসে উত্তর করল কাজলি।

প্রহ্লাদের সঙ্গে কাজলির সেই হাসাহাসি, একটু ফিসফিসিয়ে কথা বলার চেষ্টা—সব তো আমার চোখের সামনেই ঘটত। প্রতিদিন সকালে কাজলি দুধ দিতে যেত পরান মণ্ডলের বাড়িতে। পেতলের ঘটি হাতে গুটিগুটি পায়ে এদিকে আসার সময় দু-দিকে একটু তাকাতো বইকি। কোণ মোড়ে বাবলা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকত প্রহ্লাদ। কাজলিকে দেখে একটু হাসি, কখনো বা পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে দু-চারটে কথা বলা। সেসব স্মৃতি তো এখনো টাটকা।

পরান মণ্ডলের বউ মরেছে বছর চারেক। লক্ষ্মীমন্ত বউ অন্নদা চলে যাবার পর পরানের বছর আটেকের ছেলে গণেশকে নিয়ে গেছে তার বড়ো মামি। গণেশকে নিয়ে বাঁজা বউয়ের মুখে হাসি দেখে ক্ষুদিরামও বেজায় খুশি। সেখানে বাওয়ালির পাঠশালায় ভর্তি করেও দিয়েছে গণেশের বড়ো মামা ক্ষুদিরাম। ছেলের খরচ-খরচা বাবদ ধান, চাল, কাঁচা পয়সা পাঠাতেও কার্পণ্য করেনা পরান।

এখানে তার সংসারে থাকা বলতে বিধবা পিসি আর গণ্ডা দুয়েক বেড়াল। বটতলার আড্ডায় নিত্যচর্চা হয় পরানের বাড়ি আর পোষ্যদের নিয়ে। যে বাড়িতে গণ্ডা গণ্ডা বেড়াল থাকে, সে বাড়িতে কি আর বউ-বাচ্চা থাকে? যদ্দিনও বাড়িতে মা ষষ্ঠীর বাহনের দাপাদাপি থাকবে, তদ্দিন উপোসেই কাটবে পরান মণ্ডলের যৌবন। ওর পয়সা ভূতে খাবে।

ভূত না পেতনি? আস্ত একটা জ্যান্ত পেতনি তো পরানের ঘাড়ে চেপে বসেই আছে।

বটতলার এসব কথা কানাঘুষো পৌঁছয় পরানের কানে। তবে ওই বা-উন্ডুলেদের মতো আড্ডাবাজিতে মজতে চায় না সে। তার ধান-চালের চালু কারবার। বুইতা, পার্বতী, মানিক মণ্ডলের হাট, রায়পুর, মল্লিকপুরের গ্রামের চাষিদের থেকে ধান, চাল কিনে নিজের দালানে মজুত করে। বড়ো নৌকায় চাপিয়ে সেসব নিয়ে যায় ঠাকুরপুকুরের হাটে। কখনো বা কালীঘাট, টালিগঞ্জেও ভেড়ায় নৌকা।

তাই বটতলার আড্ডা থেকে যতই ব্যঙ্গবিদ্রুপ ছুটে আসুক না, মা লক্ষ্মীর কৃপার অভাব হয় না পরানের সংসারে।

রাতে পরান খেতে বসলে পিসি পাখা নাড়তে নাড়তে এক কথাই রোজ শোনায়,

“আমি আর সামলাতে পারিনি বাপু তোর সংসার। হয় এবার তুই বউ আন ঘরে, নয়তো আমায় কাশীতে রেখে আয় বাপ।”

প্রতিদিন এক সংলাপের পুনরাবৃত্তি ঘটে রাতে। হৃষ্টপুষ্ট পোষ্যর দল খাবার থেকে মুখ তুলে একবার করে তাকায় মোক্ষদার দিকে। তারা কি অভিশাপ দেয় বুড়িকে? কে জানে। তবে নিত্য এক কথা শুনে শুনে অভ্যস্ত পরানেরও আজকাল কোনো হেলদোল থাকে না পিসির কথায়।

উত্তর না পেয়ে মোক্ষদাও কপাল চাপড়ায় আর বলে,

“পোড়া কপাল আমার। এই মরা সংসারের পিদিম জ্বালাতে আমাকেই কেন বাঁচিয়ে রেখেছ ঠাকুর? এবার তুলে নও।”

দুধের ঘটি হাতে নিয়ে পরান মণ্ডলের উঠোনে এসে দাঁড়ায় কাজলি।

“ওঠাকমা কোথায় গেলে গো? দুধটা নিয়ে নাও।”

কাজলির ডাকে রান্নাঘর থেকে জামবাটি হাতে বারান্দায় আসে মোক্ষদা। নরম গলায় বলে,

“ওমা কাজলা, উঠোনে দাঁড়িয়ে কেন? আয় মা, দালানে উঠে আয়। একটু বস দিকিনি। কাল দুপুরে বসে বসে নারকোলের নাড়ু করিচি। দুখানা খেয়ে দেখ দিকিনি।”

কাজলি বলে,

“না গো ঠাকমা। আমার বসার জোনেই গো। আরো তিন বাড়ি দুধ দিতে যেতে হবে। তুমি বরং তাড়াতাড়ি দুধটা ঢেলে নাও।”

“ওমা! একটুবসতে বলছি, তাও তোর সময় নেই। তুই কি লাটসাহেবের নাতনি নাকি?”

“না গো ঠাকমা, রাগ করো না। তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। নাও, দুধটা ঢেলে নাও।”

জামবাটিতে দুধ ঢেলে ঘটিটা কাজলির হাতে ফেরত দেবার ফাঁকে মিহি সুরে মোক্ষদা বলে,

“ও মা কাজলা, তুই তো মাঝে মধ্যে একটু এসে দুদণ্ড আমার কাছে বসতে পারিস। সারাদিন একা একা থাকি, দুটো কথা বলার লোক পাইনে মাগো।”

“কেন গো ঠাকমা? কুব্জাপিসি তো সারাদিনই থাকে তোমাদের বাড়িতে। ও কি মুখে চাবি এঁটে থাকে নাকি?”

“ওর কথা আর বলিসনে মা। কথায় কথায় ঝাঁঝিয়ে ওঠে। ওর কথার ঝাঁঝে বুঝতেই পারবি নে কেমন নিব আর কে বাঁদি।”

কলশি কাঁখে উঠোনে এসে দাঁড়ায় কুব্জা। বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতেই শুনেছে মোক্ষদার কথাগুলো। পেতলের কলশি বারান্দায় বসানোর শব্দটা কানে লাগে সবার। গামছা দিয়ে কলশি মুছতে মুছতে কুব্জা বলে,

“বলি, আমার কুন ঝাঁঝে তুমি মল্লে গো পিসি? আমার মতো মেয়ে বলে তোমাদের সংসারে মুখের রক্ত তুলে মরি। অতই যদি খারাপ, তো আমায় বিদেয় দাও না কেন?”

কুব্জা আর মোক্ষদার এই দ্বৈরথ নিত্যদিনের। সেসব দেখে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে পা বাড়ায় কাজলি।

কাজলির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে কুব্জা। বেরিয়ে যাবার পর মোক্ষদার উদ্দেশে বলে,

“বলি, বংশীর মেয়েটাকে এত তোয়াজ করো কেন, আমি বুঝি নে নাকি? তুমি ভাবছ তোমার ওই বউখেকো ভাইপোর ঘরে বংশীর মেয়ে দেবে? তুমি কি গোপিসি? বলি, ওইটুকু কচি মেয়েটাকে তোমার বুড়ো মদ্দ ভাইপোর গলায় ঝুলিয়ে দিতে চাইছ কেন? গণেশ আর কাজলি ক’বছরের ছোট-বড়ো বলো তো? ওরা তো ভাইবোনের মতো। ছিঃ ছিঃ পিসি! ছিঃ!”

“অ্যাই কুব্জে, তোর বড্ড তেল হয়েছে না? দাঁড়া, আজ পরানকে আসতে দে। দেখছি তোকে কে রাখে এ বাড়িতে।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই দেখো। আমার পাওনা-গণ্ডা সব ফেলে দাও তো, আমিও আর এ মুখো হবুনি।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই দেবো। তুই থাকলে তো দেখছি আমার পরানের আর সংসার করা হবে নে। যার খাবি, যার পরবি, তার চালাতেই আগুন দিবি?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই। দেখো পিসি, আমি হলুম গিয়ে স্পষ্ট কথার মানুষ। কতটুকু চেনো তোমার পরানকে? তুমি তো তার সংসার করে দেবার জন্য মাথা কুটে মরছ, আর এদিকে দেখো, বিষ্টুর বউ তাকে আঁচলে বেঁধে রেখেছে। আমি যেন কিছুই জানি নে।”

“অ্যাই কুব্জে, মুখ বন্ধ রাখবি একদম। তা না হলে বেরো এ বাড়ি থেকে। বেরো বলছি।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই যাবখন।”

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ এক শীতের এমন ঝাঁক মনে পড়ে না শেষ কবে দেখেছি। এবারের ঠান্ডা বেশ জবুথবু করে দিয়েছে কলকাতা লাগোয়া এই শহরতলিকে। কুয়াশার চাদরে ঢাকা

Read More »

১৭ : ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ ১ : ঊর্ণনাভ ২ : উর্ণনাভ ৩ : ঊর্ণনাভ ৪ : ঊর্ণনাভ ৫ : ঊর্ণনাভ ৬ : ঊর্ণনাভ ৭ : ঊর্ণনাভ ৮ : ঊর্ণনাভ

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ এক শীতের এমন ঝাঁক মনে পড়ে না শেষ কবে দেখেছি। এবারের ঠান্ডা বেশ জবুথবু করে দিয়েছে কলকাতা লাগোয়া এই শহরতলিকে। কুয়াশার চাদরে ঢাকা

Read More »

১৭ : ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ ১ : ঊর্ণনাভ ২ : উর্ণনাভ ৩ : ঊর্ণনাভ ৪ : ঊর্ণনাভ ৫ : ঊর্ণনাভ ৬ : ঊর্ণনাভ ৭ : ঊর্ণনাভ ৮ : ঊর্ণনাভ

Read More »

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ – শ্যামলকৃষ্ণ বসু ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম চরণ ভজ মন রাম

Read More »