সলিল সমাধি - ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া )
ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া )
রাজীব বরা
রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে নাজিরা মহাবিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।রাজীব বরা সাহিত্যের বিভিন্ন বিভাগে নিজ প্রতিভার পরিচয় দানে সমর্থ হয়েছেন।তিনি একাধারে কবি,সমালোচক,গল্পকার,ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক।বর্তমান অসমিয়া কবিতার জগতে রাজীব বরা একটি অতি সুপরিচিত নাম।কাব্যগ্রন্থগুলি যথাক্রমে ‘তটিনী তীরর খেলা’,’ঢেউ’,’মানুহ চেরাই বাচি থকা নাযায়’,’মাউরর দিন’,এই ফালেও কবি আছে’।মৌলিক প্রবন্ধ সংকলন ছাড়াও সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘চিন্তা-পরিক্রমা’,’অসমিয়া আরু কথা সাহিত্যর আভাস’ ইত্যাদি।আলোচ্য উপন্যাস ‘সলিল সমাধি’ (‘জলজাহ’)মাখন হাজরিকা স্মৃতি উপন্যাস পান্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়। এছাড়াও শ্রীবরা বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ]
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ – বাসুদেব দাস
১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা পাঁচশত পঞ্চাশটির ও বেশি।সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিয়মিত ভাবে অসমিয়া গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করে চলেছেন।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত সংস্থা NEINADএর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য Distinguished Life Membership এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশটি।হোমেন বরগোহাঞির অসমিয়া উপন্যাস ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়) বাংলা অনুবাদের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন।
| ১৩ |
কলস ভরার শব্দ
প্রথমে নিরুদ্বেগ -নির্বিকার ভাব দেখাতে যাওয়া চম্পার চেহারায় ভয় শংকার মনোভাব ফুটে উঠতে দেখে মা বেশি ভয় পেয়েছিল। দেবতা-মানুষের ভয়ে ভীত না হওয়া, দুঃসাহসী বলে গ্রামে পরিচিত মেয়েটির চিন্তিত মুখ মাকে চিন্তার দিকে ঠেলে দিল।
মেয়েকে স্বাধীন মুক্ত জীবন যাপন করার অধিকার বেশি দেওয়া হয়ে গেল কি? মেয়ে হলে কী হল, কোন কাজে সে ছেলেদের চেয়ে কম। সমবয়সী ছেলেরা তো তাকে ভয়ই করত।
দুটিকে কোনোভাবে মিলিয়ে দিতে পারলে সমস্যা ছিল না; কিন্তু এখন গোবিন্দের তো দেখা পাওয়া দূরের কথা, নাম-গন্ধ পর্যন্ত নেই। উপায়? উপায় নেই। বিব্রত কলা’ইর দুরবস্থা দেখে দামোদর সিদ্ধান্ত নিল–সে একবার লক্ষ্মীরাম পাঠকের কাছে যাবে। সমস্ত কথা খুলে বলবে। ছেলেটির খবর করবে। কোথায় গিয়েছে যদি খুঁজে আনার ব্যবস্থা করা যায়।
তবে চম্পা সেই প্রচেষ্টার জন্য অপেক্ষা করল না। সেই রাতেই সে লজ্জা-সম্মান বিসর্জন দিয়ে গোবিন্দের বাড়ির দরজায় উপস্থিত হল। রাত দুপুরে দরজা খুলে একটা পুঁটলি হাতে দরজার সামনে ক’লাইর মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লক্ষীরাম পাঠক আশ্চর্য হয়ে গেলেন। ছেলেকে লুকিয়ে রাখার মূল কারণটিকে চোখের সামনে হাজির হতে দেখে লক্ষীরাম কোনো কিছু না জানার ভান করলেন। স্ত্রী এবং বড়ো ছেলের মাধ্যমে চম্পাকে দরজার সামনে থেকে বাইরে বের করে রেখে আসলেন।
চম্পা গোবিন্দের খোঁজ করেছিল। তাকে কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে সেটা জানার জন্য কাকুতি মিনতি করছিল। গ্রামের বাড়িঘর পাশাপাশি। লক্ষ্মীরামের বাড়ির পাশের প্রতিবেশীরা সেই রাতেই ঘটনাটা জানতে পেরেছিল।বাড়ির দরজার সামনে হাতে হাতে আলো নিয়ে কেউ কেউ সেখানে উপস্থিত হয়েছিল।
খবর পেয়ে বিমলা এবং ক’লাই দৌড়ে এসেছিল। হইচই এবং কথা কাটা কাটিতে অঞ্চলটাতে হুলুস্থুলের সৃষ্টি হয়েছিল। ঘটনাটা অস্পষ্টভাবে ইতিমধ্যে যারা শুনেছিল, তাদের সত্যি মিথ্যার বিবাদ মিটে ছিল। যারা নতুন করে জেনেছিল তারা অবাক হল। বংশ লতিকার সূত্র এবং মান-অভিমানের অজুহাতে লোকেরা দুটো দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। রস পাওয়া, তামাশা দেখা মানুষের যেমন অভাব ছিল না, সমবেদনা প্রকাশ করা মানুষের সংখ্যাও কম ছিল না। একটা গোপন সত্য প্রকাশ্যে এসেছিল। তার বাসি গন্ধ রাতের মধ্যেই সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল।
পরের দিন নামঘরে অনুষ্ঠিত হতে চলা সভায় বিচার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে মোলোকা গ্রামপ্রধান প্রত্যেকের বাড়িতে খবর পাঠিয়েছিল। চম্পার হাত খামচে ধরে বাড়িতে ফিরতে থাকা ক’লাইকে চম্পা বলেছিল-‘কোথাও কিছু একটা হয়েছে।সে এরকম নয়।সে এরকম করতে পারে না।সে নিজে থেকে লুকিয়ে থাকেনি।ওকে তারা নিশ্চয় কোথাও লুকিয়ে রেখেছে।দেখে নেব,আমিও দেখে নেব।কতদিন সে আমার কাছ থেকে দূরে সরে থাকে।’
সিদ্ধান্ত অনুসারে নামঘরে সভার আয়োজন করা হয়েছিল।সভায় চম্পা গোবিন্দের সন্তান তার গর্ভে থাকার কথা অকপটে বলেছিল।গ্রামের লোকজন মাথা নিচু করে শুনেছিল।নামঘরের চিকের বাইরে অন্ধকারে অপেক্ষা করে শুনতে থাকা কয়েকজন মহিলা শ্রীবিষ্ণু,শ্রীবিষ্ণু বলে কপাল চাপড়াচ্ছিল।
সভা চলছিল।পেটে থাকা সন্তানটির পিতা যে গোবিন্দ-সেটা প্রমাণ করার মতো চম্পার হাতে অন্য কোনো প্রমাণ ছিল না।তার ক্ষীণ হয়ে আসা পেটটা সন্তানের আগমন বার্তা জানানোর মতো হতে আরও কয়েকমাস বাকি ছিল।
দুজনের প্রেমের সম্পর্কের প্রেমের প্রমাণ দেবার মতো তার হাতে কোনো চিঠিপত্র ছিল না।একই গ্রামের,দূরত্ব মাত্র চার পাঁচটা বাড়ি,পথে-ঘাটে,বের হতে,আসা-যাওয়ার সময় দেখা হওয়া,প্রতিদিন গোধূলি নিজের বাড়িতে দেখা হওয়া ছেলেটির সঙ্গে চিঠির সম্পর্ক রাখার প্রয়োজনও ছিল না।
সভায় বসা লোকদের হাতে অন্য কোনো উপায় ছিল না।প্রমাণের অভাবে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলির ক্ষেত্রে নামঘরের মণিকূটে জ্বলতে থাকা প্রদীপটাই ছিল মূল।পূজার বেদীটাই ছিল সারথি।সেদিকে তাকিয়ে জনগণের সামনে হাঁটুগেড়ে বসে চম্পা শপথ খেয়েছিল,সত্যি কথা বলেছিল।
অন্য কোনো উপলক্ষ হলে এই শপথেই কাজ হয়ে যেত।এই সভাতেও এর আধারে কথাগুলি মেনে নেবার অবকাশ ছিল যদিও লক্ষ্ণী্রাম পাঠক মানতে রাজি হলেন না।তাকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিতে,ঘরে স্থান দিতে রাজি হলেন না।তারজন্য ছেলেটির মতামতের প্রয়োজন বলে সে বিষয়টা থেকে নিস্তার পাওয়ার একটা অজুহাত দাঁড় করাল।তাই গোবিন্দের অবর্তমানে আয়োজিত সভা সফল হল না,সিদ্ধান্ত হল না।
মোলোকা গ্রামপ্রধান বেশ বিপাকে পড়লেন।কী করা যেতে পারে?ছেলেটিকে জিজ্ঞেস না করে একপক্ষীয় ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।মেয়েটি মিথ্যা কথাও বলতে পারে।তবে এত বড়ো অপবাদ নিয়ে কেউ কি মিথ্যা কথা বলতে পারে?নামঘরের মণিকূটে পয়সা চুরি করে,জনগণের সামনে করিনি বলে মিথ্যা কথা বলে,শপথ খেয়ে ভোগেশ্বরের রক্তবমি করে মৃত্যুবরণ করা এক বছরও হয় নি।তাই কথাগুলি সত্যিই হবে।
কিন্তু তাকে যখন লক্ষ্ণী্রাম বাড়িতে জায়গা দিতে রাজি হচ্ছে না।এরকম ক্ষেত্রে তাদের কিছু করার নেই।মেয়েটিকে লক্ষ্মী্রামের বাড়িতে জোর করে রেখে আসলেও কী করে তার কোনো ঠিক নেই।প্রত্যেকেই জানে এই পরিবারটির মতিগতি খুব একটা সুবিধার নয়।একই গ্রামের প্রভাতের সঙ্গে প্রেমে পড়ার অপরাধে মেয়ে বিনুমাইকে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করতে লক্ষ্মী্রাম কি বাধ্য করেনি?এরকম মানুষ চম্পাকে যে হাতের কাছে পেয়ে বাঁচিয়ে রাখবে তা কল্পনাই করা যায় না।অগ্যতা সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে তাকে গোবিন্দ না আসা পর্যন্ত,গোবিন্দকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত চম্পাকে পিতৃগৃহে থাকার জন্য বলা হল এবং অবৈ্ধ মাতৃ্ত্ব ধারণ করার জন্য ওদের পরিবারকে সমাজে একঘরে করা হল।
সেই দিনগুলির যন্ত্রণার কথা মনে পড়লে এখনও বিমলার চোখে জল চলে আসে।জনগণ ডাকে না।দেখে না।সেরকম দিনে দামোদর এবং বুধিরাম,সোহাগী এবং কাংকান না হলে ওরা কোথায় ভেসে যেত।
কেবল এতটুকুই কি?বুধিরাম দক্ষিণপারের যোরহাটের কোথাও গোবিন্দকে লুকিয়ে রেখেছে বলে জানতে পেরে তাকে তন্ন তন্ন করে খোঁজেনি কি?অবশেষে পতীয়া গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে লুকিয়ে রাখা গোবিন্দকে বুধিরামই খুঁজে বের করেছিল।
কলেজে পড়াশোনা করলে কী হবে,সমাজের নীতি-অনীতির ব্যখ্যা দিতে পারলেও পরিবারের বিরুদ্ধে যাবার মতো গোবিন্দের সৎসাহস ছিল না।অবশ্য চম্পার প্রতি তার ভালোবাসার অন্ত ছিল না।কলেজে পড়ার সুবাদে ঘরোয়া কাজকর্ম থেকে রেহাই পাওয়া গোবিন্দ তার মাথায় রাখা পরিবারের আশীর্বাদের হাত সরে গেলে কী হবে সেটা ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছিল না।
শঙ্কা এবং অনুশোচনার আবর্ত থেকে বুধিরাম গোবিন্দকে উদ্ধার করে এনেছিল।এনেছিল বলাটা শুদ্ধ নয়।সে যোরহাটেই থাকল।গড়আলিতে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানে গোবিন্দকে রেখে চম্পাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে বুধিরাম গোবিন্দের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিয়েছিল।
ঘটনার বিপরীত গতিতে লক্ষ্মী্রাম ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল।পরিবারের সমস্ত শক্তি নিয়ে তাকে পুনরায় তার থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল।তবে,ততদিনে গোবিন্দ নিজের বিচার-বুদ্ধি খুঁজে পেয়েছিল।কেবল ত্যাজ্য পুত্র বলে ঘোষণা করাই নয়,গোবিন্দ মারা গেছে বলে ঘোষণা করে জনগণকে ডেকে লক্ষ্মী্রাম শ্রাদ্ধেরও আয়োজন করেছিল।
তবে,প্রথমে গড়আলির একটি দোকানে সহায়ক হিসেবে কাজে যোগদান করলেও মহকুমা প্রশাসনের অফিসে কেরানির চাকরিটা পাওয়ার পরে কেবল তার ভাগ্যের চাকা যে ঘুরে গেল তাই নয়,পরিবারের চিন্তার চাকাও ঘুরে গেল।গোবিন্দ এবং চম্পার প্রথম সন্তানের জন্মের পরে অন্নপ্রাশনে লক্ষ্মী্রাম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে ছেলে-ছেলের বউয়ের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে চোখের জলের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল।
এখনতো বাকি ছেলেদের থেকে গোবিন্দের গুণ গান করেই লক্ষ্মী্রামের দিন যায়-‘আমাদের গোবিন্দ অমুকের এক টুকরো মাটি কিনেছে,সেখানে একটা পাকা ঘর বানাচ্ছে।চম্পা মানে ,আমাদের বৌমাও কম লক্ষ্মী মেয়ে নয়!’
মানবীয় সম্পর্কও পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন ভঙ্গিমায় দেখা দেয়।কখনও দূরের লোক কাছে চলে আসে,কাছের লোক দূরে চলে যায়।দিন-কাল সময় যায় না।তবে উপকারীর উপকার ভোলা উচিত নয়।ক’লাই এবং বিমলা এভাবে ভাবে।
একটা কথা ভাবার মতো সাধারণত মানুষের সময় থাকে না।তবে ভাবতে বাধ্য করার মতো জীবনে কখনও সংঘাত আসে,মানুষ অনুরূপ পরিস্থিতিতে পড়ে।বিমলাও বুধিরামদের দুর্যোগের দিনে পূর্বের উপকার মনে করছে।তার বিশ্বাসও হয়েছে-ক’লাইদের কোনো বিপদ হবে না।ওরা ফিরে আসবে।দামোদর দাদাকে সঙ্গে নিয়ে আসবে।নদী মাঝে মধ্যে মানুষকে বিপদে ফেলে তামাশা দেখে।ঠিক যেন ঈশ্বর কোনো রাজাকে ধর্ম পরীক্ষা করা অভিনয়গুলির মতো।শেষ পর্যন্ত দুঃখ-যন্ত্রণার সমাপ্তি ঘটবেই।সে নিজের জীবনে মুখোমুখি হওয়া সমস্যাগুলি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার মতোই সোহাগীদেরও এই বিপদের অন্ত পড়বে।
কেউ কিছু বললেও,ছটফট করলেও সে মনটাকে শক্ত করে প্রত্যেকেই ফিরে আসার অপেক্ষা করে রইল।টই বাঁকা হয়ে জলে ডুবে থাকা নামঘরটার মণিকূটের উদ্দেশ্যে সে অদৃশ্য দেবতার উদ্দেশ্যে একটা প্রণাম জানাল।
( চলবে )


