গুপ্তোত্তর ভারত

গুপ্তোত্তর ভারত

ভাঙনের ভিতর জন্ম নেওয়া চেতনার মহাকাব্য

নবকুমার দাস 

ইতিহাস কখনও সরলরেখায় এগোয় না।
প্রতিটি স্বর্ণযুগের পর আসে এক সন্ধিক্ষণ—যেখানে আলো ক্ষীণ হয়, কিন্তু চেতনা নিভে যায় না। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতবর্ষ ঠিক এমনই এক সন্ধিক্ষণে প্রবেশ করেছিল। এই পর্বকে দীর্ঘদিন ধরে ‘অন্ধকার যুগ’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু সেই মূল্যায়নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর ভুল। কারণ গুপ্তোত্তর ভারত আসলে কোনো সভ্যতার অবসান নয়; এ ছিল এক বিস্তৃত পুনর্জন্মের প্রক্রিয়া—যেখানে রাষ্ট্র ভেঙেছে, কিন্তু সংস্কৃতি নিজের নতুন রূপ নির্মাণ করেছে।

গুপ্ত যুগ ভারতীয় ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক স্বর্ণযুগ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং শিল্প-সংস্কৃতির অপূর্ব বিকাশ এই যুগকে অনন্য করে তুলেছিল। কিন্তু ইতিহাস কেবল স্থিতির নয়, পরিবর্তনেরও নাম। পঞ্চম শতকের মধ্যভাগে হূণ আক্রমণ গুপ্ত সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শক্তিকে গুরুতরভাবে আঘাত করে। এই আক্রমণ শুধু সামরিক বিপর্যয় নয়—এ ছিল এক দীর্ঘ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের সূচনা।

হূণ, শক ও কুষাণদের উপস্থিতি ভারতীয় ইতিহাসে এক জটিল বাস্তবতা সৃষ্টি করে। প্রথমে সংঘর্ষ, পরে সহাবস্থান এবং শেষ পর্যন্ত আত্মীকরণ—এই ধারার মধ্য দিয়েই ভারত বহিরাগত শক্তিকে নিজের ভিতরে গ্রহণ করেছে। বিশ্বের বহু সভ্যতায় আক্রমণ মানেই ধ্বংস। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে আক্রমণ প্রায়শই রূপান্তরের পথ খুলে দিয়েছে। এখানেই ভারতীয় সভ্যতার মৌলিক শক্তি—বহুত্বের ভিতর ঐক্য।

গুপ্তোত্তর যুগে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার দুর্বলতার সঙ্গে সঙ্গে সামন্ততন্ত্রের উত্থান ঘটে। ভূমিদান প্রথার বিস্তার রাজকীয় ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীভূত করে তোলে। একদিকে রাষ্ট্রের ঐক্য ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, অন্যদিকে সমাজ নতুন ভিত্তিতে সংগঠিত হতে থাকে। গ্রাম হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক জীবনের প্রধান কেন্দ্র। লোকায়ত বিশ্বাস, আচার ও উৎসব সমাজজীবনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। রাষ্ট্র সংকুচিত হয়, কিন্তু সমাজের সৃজনশীল শক্তি বিস্তৃত হয়।

এই সময় ধর্মীয় চেতনার মধ্যেও এক মৌলিক রূপান্তর লক্ষ্য করা যায়। বৈদিক যুগের যজ্ঞকেন্দ্রিক ধর্ম ক্রমে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে। রামায়ণ, মহাভারত এবং পুরাণসমূহ দেবতাকে মানুষের নৈতিক আদর্শে রূপান্তর করে। রাম হয়ে ওঠেন আদর্শ রাজা ও মানুষ, কৃষ্ণ বন্ধু ও দার্শনিক, শিব একই সঙ্গে তপস্বী ও গৃহস্থ। এই মানবিক দেবভাবনা ভারতীয় ধর্মচেতনার এক গণতান্ত্রিক রূপ।

গুপ্তোত্তর যুগে বৌদ্ধ ধর্ম নতুন মাত্রা লাভ করে। মহাযান ও বজ্রযানের বিকাশ বুদ্ধকে করুণার প্রতিমূর্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে। নালন্দা, বিক্রমশীলা ও সোমপুর মহাবিহার কেবল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছিল না—এগুলি ছিল আন্তর্জাতিক জ্ঞানকেন্দ্র, যেখানে এশিয়ার নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থী ও পণ্ডিতেরা সমবেত হতেন। একই সময়ে জৈন ধর্ম অহিংসা ও নৈতিক সংযমের মাধ্যমে সমাজের ভিতকে দৃঢ় করে তোলে।

এই পর্বের সবচেয়ে গভীর সাংস্কৃতিক ঘটনা নিঃসন্দেহে ভক্তি আন্দোলন। দক্ষিণ ভারতের আলবার ও নায়ানার সাধকেরা ঘোষণা করেন—ঈশ্বর যজ্ঞে নয়, প্রেমে। লোকভাষায় রচিত ভক্তিগীতি ধর্মকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসে। জাতিভেদ প্রশ্নের মুখে পড়ে, নারী ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর গুরুত্ব পায়। ভক্তি আন্দোলন তাই কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্মসংস্কার নয়; এটি ছিল এক নীরব কিন্তু সুদূরপ্রসারী সামাজিক বিপ্লব।

এই সময় ভাষার ক্ষেত্রেও এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটে। সংস্কৃত রাজসভা ও শাস্ত্রের ভাষা হিসেবে তার স্থান বজায় রাখলেও, প্রাকৃত ও অপভ্রংশের মধ্য দিয়ে লোকভাষার বিকাশ ঘটে। এই লোকভাষাগুলির গর্ভ থেকেই পরবর্তী কালে বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, তামিল, কন্নড় ও তেলুগুর মতো ভাষার জন্ম। ভাষার এই বিবর্তন কেবল সাহিত্যিক নয়—এ ছিল সামাজিক ক্ষমতার পুনর্বণ্টন।

গুপ্তোত্তর যুগে মন্দির হয়ে ওঠে সমাজের কেন্দ্রবিন্দু। খাজুরাহো, ভুবনেশ্বর, কাঞ্চিপুরম ও ইলোরার মন্দিরগাত্রে খোদাই করা দৃশ্যাবলি ধর্মের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবন, শ্রম ও মানবসম্পর্কের ইতিহাস বহন করে। মন্দির ছিল উপাসনার স্থান, শিল্পের আশ্রয় এবং সামাজিক সংলাপের পরিসর।

গুপ্তোত্তর ভারত তাই কোনো অন্ধকার যুগ নয়। এটি ছিল রূপান্তরের যুগ—যেখানে রাষ্ট্রের কাঠামো ভেঙে পড়লেও সভ্যতার অন্তঃপ্রবাহ আরও গভীর হয়েছে। এই পর্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাস কেবল রাজাদের উত্থান-পতনের কাহিনি নয়; এটি মানুষের ধীর, বহুমাত্রিক এবং মানবিক অভিযাত্রা। প্রতিটি ভাঙনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নতুন নির্মাণের সম্ভাবনা—আর সেই সম্ভাবনাই গুপ্তোত্তর ভারতের প্রকৃত উত্তরাধিকার।

তথ্যসূত্র (Selected Bibliography) : 1. Romila Thapar, Early India: From the Origins to AD 1300, Penguin. , 2. R.S. Sharma, India’s Ancient Past, Oxford University Press. , 3. D.D. Kosambi, The Culture and Civilisation of Ancient India, Routledge. , Upinder Singh, 4. A History of Ancient and Early Medieval India, Pearson., A.L. Basham, 5. The Wonder That Was India, Rupa. , Wendy Doniger, 6. The Hindus: An Alternative History, Penguin. Patrick Olivelle (ed.), 7. Upanishads, Oxford University Press.

Your thoughts on this Post?

Facebook
Twitter
LinkedIn

Letest Cover Stories

জিজীবিষা 

সুরঞ্জিত সরকার সিন্দুকের দরজাটা আলগোছে ভেজিয়ে দিয়ে সুমন্ত দাদাকে নিয়ে ঘরের এক কোণে থাকা বিশাল সেগুন কাঠের আলমারিটার পেছনে ছায়ার মতো সরে গিয়ে লুকিয়ে গেল।

Read More »

অস্তিত্ববাদ এবং সাহিত্যদর্শনে অভিনবত্ব

রঞ্জন চক্রবর্ত্তী স্বপ্ন ও বাস্তবকে নিয়ে সুররিয়ালিস্টদের যে জগত সেখানে আপাত সত্যের উপরেও ভিন্ন ধরণের সত্যের অস্তিত্ব আছে। তাঁদের কাছে যা দেখছি বা যা করছি

Read More »

Privious Cover Stories

জিজীবিষা 

সুরঞ্জিত সরকার সিন্দুকের দরজাটা আলগোছে ভেজিয়ে দিয়ে সুমন্ত দাদাকে নিয়ে ঘরের এক কোণে থাকা বিশাল সেগুন কাঠের আলমারিটার পেছনে ছায়ার মতো সরে গিয়ে লুকিয়ে গেল।

Read More »

অস্তিত্ববাদ এবং সাহিত্যদর্শনে অভিনবত্ব

রঞ্জন চক্রবর্ত্তী স্বপ্ন ও বাস্তবকে নিয়ে সুররিয়ালিস্টদের যে জগত সেখানে আপাত সত্যের উপরেও ভিন্ন ধরণের সত্যের অস্তিত্ব আছে। তাঁদের কাছে যা দেখছি বা যা করছি

Read More »

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

কাহিনিকার : সাদেঘ হেদায়েত বঙ্গানুবাদ : সুপর্ণা বোস পর্ব : পাঁচ আমার নিজের শরীর থেকে তার শরীরে উত্তাপ সঞ্চারিত করতে হবে। তাকে আমার প্রাণের উত্তাপ

Read More »