অনুবাদ- ও  সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা

অনুবাদ- ও  সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা

তৃষ্ণা বসাক

তৃতীয় পর্ব 

‘When we live with savages and speak their languages, learning to represent their experience to ourselves in their way, we come as near to thinking like them as we can without ceasing to be ourselves’ -Godfrey Lienhardt

এইখান থেকেই আমরা, ওরা, অপরায়ন ও সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতার শুরু।  জন টমলিনসন   বলেছেন সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা মানে একটা শক্তিশালী/ প্রভাবশালী বিদেশি সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, আচার আচরণ এবং শব্দার্থ কে একটা দেশজ সংস্কৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া।  কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করতে পারেন এর সঙ্গে অনুবাদের সম্পর্ক কী? আসলে ভাষা তো কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, তা  সংস্কৃতির অনুবাদ, সত্যি বলতে কি সংস্কৃতির একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ  রাজনৈতিক উপাদান হচ্ছে ভাষা ।

 একটা ‘পশ্চাদপর ভাবনার টেক্সট’ কে নিজের ভাষায় এনে ‘আলোকিত’ করার চিন্তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে  দুটি ভাষা এবং দুটি সংস্কৃতিকে নিজেদের বানানো তরাজুতে বসিয়ে  একটার তুলনায় অন্যকে ছোট দেখানোর একটা হায়ারারকি ও বাইনারি বৈষম্যমূলক মানসিকতা। সেখানে একটি সংস্কৃতি আধুনিক, উন্নত,  যৌক্তিক, আলোকপ্রাপ্ত। অন্যটি  আদিম, পশ্চাদপর, অযৌক্তিক এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন।

উত্তর-উপনিবেশবাদী তাত্ত্বিক ফ্রাৎস ফ্রানোন-এর Black Skin White Masks গ্রন্থে বলা হয়েছে : That, in a white society, such an extreme psychological response originates from the unconscious and unnatural training of black people, from early childhood, to associate blackness with wrongness. That such unconscious mental training of black children is effected … which are cultural media that instil and affix, in the mind of the white child, the societys cultural representations of black people as villains.’ 

কালো গাত্রবর্ণের সঙ্গে এইভাবে দুনিয়ার খারাপ জিনিসকে জড়িয়ে নেওয়া শুরু। কালো মানেই হিংস্র, কালো মানেই বিপজ্জনক।

আলজেরিয়া জয়ী কর্নেল মন্টগনাক একবার বলেছিলেন  অনেক সময় একটি বাতিক তাঁকে এমন পেয়ে বসত মনে হত যে, চারদিক থেকে তাঁকে  যেন কারা ঘিরে রেখেছে। তখন পুঁইশাকের ডগার মতো তাঁর চারিদিকে যে মাথাগুলো পেতেন, সব কেটে দিতেন।  মানুষের মাথার কথাই বলা হচ্ছে এখানে!

এই যেখানে মানসিকতা সেখানে ‘নিচু’ ভাষা থেকে ‘উঁচু’ ভাষায় অনুবাদ মানে সেই আদিম পৃথিবীর নতুন করে নির্মাণ, তার প্রতিনিধিত্ব করা, তার হয়ে কথা বলা। ঠিক যেমনটা আমরা বাড়ির কাজের লোককে কোন বিয়েবাড়ি নিয়ে গেলে, তাকে ভাল পোশাক পরিয়ে যতটা সম্ভব সভ্যভব্য করে নিয়ে যাই,  তারপর তার দিকে  কড়া নজর রাখি, কথা বলার সময় সে তার মুখের অশিষ্ট  ভাষা বলে ফেলে কিনা, খাবার গবগব করে খায় কিনা। আসলে একটা সংস্কৃতি যখন মনে করে সে সেরা, সে মালিক,  তার ভাষা সেরা, তারা সভ্য, তারা আলোকিত, অন্যরা হীন অসভ্য, তাদের সভ্য এবং আলোকিত করার অধিকার আমাদের আছে, তখন তারা অনুবাদের নামে আসলে সেই ভাষাকে ছেঁটেকেটে ‘সভ্য পোশাক’ পরিয়ে তাদের সমাজে নিয়ে আসা, সবাইকে জাহির করা কেমন তুলে দিলাম একটা পিছিয়ে পড়া ভাষাকে’ এই হচ্ছে অনুবাদ আর ঔপনিবেশিকতার সম্বন্ধ। এই হচ্ছে ঔপনিবেশিক মানস, যা তথাকথিত অসভ্য জংলিদের শিক্ষিত করে, মানুষ করে তাদের পৃথিবীর আলোর সামনে তুলে ধরতে চায়।

উদাহরণ দিই শকুন্তলা থেকে।  কালিদাসের অভিজ্ঞানম শকুন্তলম । প্রথম অনুবাদ করেন উইলিয়াম জোন্স, ১৭৮৯ সালে। অনুবাদের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমে সাড়া পড়ে যায়। এই নাটকটি যেন রহস্যময় প্রাচ্যের দরজা গ্রেকো-রোমানের বাস্তববাদী সাহিত্যের সামনে খুলে দিল। রসাস্বাদনের অভিজ্ঞতায় এ জিনিস তো ছিল না তাদের কাছে। এই প্রাচ্য আমরা দেখব পশ্চিম কীভাবে নির্মাণ করছে। সেখানে তাদের পছন্দসই জিনিস রেখে তাদের কাছে আপত্তিকর জিনিসকে বাদ দেওয়া হচ্ছে ইচ্ছেমত। শকুন্তলা অনুবাদের ক্ষেত্রে এটাই হল। প্রাচ্যের একজটিক, ইর‍্যাশনাল ইমোশনাল টেক্সট তাদের কাছে রোমান্টিকতার দরজা খুলে দিল। আর এই অনুবাদ তো হ্যালহেডের ‘আ কোড অব জেন্টু লজ’ কিংবা জোন্সেরই অন্য  কাজ মনুস্মৃতির অনুবাদ ‘ ইন্সটিটিউট অব হিন্দু লজ অর দ্য অর্ডিন্যান্সেস অব মনু’ র মতো নয়, যার সরাসরি রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় অনুষঙ্গ আছে বা ভারতের আইনি ব্যবস্থার সঙ্গে তার কোন সম্বন্ধ আছে।  কিন্তু তা সত্ত্বেও শকুন্তলার মূল টেক্সট ছাঁটা হয়েছিল  তাতে যৌনতা আছে বলে।  প্রথম অংকে দুষ্যন্তর

বর্ণনায় শকুন্তলার গুরুনিতম্ব বা হেভি হিপস- অনুবাদ  জোন্স করেছিলেন   এলিগেন্ট লিম্বস।

জোন্স শকুন্তলা পড়ে মুগ্ধ ছিলেন ঠিকই। কিন্তু তাঁর অনুবাদের পেছনে কয়েকটি প্রণোদনা কাজ করেছিল, সেটা আমাদের বুঝতে হবে। জোন্স চেয়েছিলেন এই অনুবাদ ইউরোপিয়ানরাই করুক, কারণ নিজেদের আইন ও সংস্কৃতির অনুবাদে দেশীয়দের বিশ্বাস করা যায় না। ভারতীয়দের আইনের নির্মাতা ও নিয়ামক হবার বাসনা  আর ভারতীয় সংস্কৃতিকে শুদ্ধ করার তাড়নাও কাজ করেছিল।

জোন্সের মনে এবং সেই সময় থেকে এখনো  অধিকাংশ পশ্চিমী মানসে হিন্দু মানে অনুগত, শান্তিপ্রিয় জাত, যারা নিজেরা নিজেদের শাসন  করতে পারবে না, যারা মূলত গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারক বাহক, বেদপুরাণের মধ্যে, আশ্রমের শান্তিতে বাস করে ।

এখনো দেখা যায় ভারতবর্ষ বলতে  গরিষ্ঠ বিদেশিদের কাছে সাপ, বেদে, সাধু, জাদু এইসব। অনুবাদের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, যখন বাঙালি অনুবাদক বাংলা গল্প উপন্যাস ইংরেজি অনুবাদের জন্যে বাছেন, তাঁদের মাথায় থাকে পশ্চিম কী ধরনের গল্প পছন্দ করবে- সেই বিষয়। খুব জটিল বিষয়, আঞ্চলিক শব্দ –এইসব তাঁরা এড়িয়ে যান সাধারণত। আবার কখনো কখনো সাব অল্টার্ন বিষয় বলেই তাকে বাছেন। দেখা গেল যে একটি  অন্য বিষয় নিয়ে লেখা অনেক ভাল উপন্যাস অনুবাদ হল না, অনুবাদের জন্য বাছা হল নিম্ন বর্গের  বিষয় নিয়ে লেখা সাহিত্য, তা অনেক মধ্যমানের হলেও।

আবার অনুবাদক বিদেশি হলে তিনি কন্টেন্টে গ্রামীণ ভারতকেই খঁজেন। নাগরিক আধুনিক, প্রযুক্তিতে বলীয়ান স্বনির্ভর ভারতের কন্টেন্ট অনুবাদ করতে তাঁদের অনীহা দেখা যায়। এ হচ্ছে  ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিরই উত্তরাধিকার।  

মনে পড়ে যায় ম্যাক্স মুলারের সেই ভারত বর্ণনা-

“consisting of idyllic village communities where people were gentle and passive and spent their time meditating” 

শকুন্তলার মতো আরেকটি প্রাচ্য টেক্সট হচ্ছে ওমর খৈয়ামের পারসি কবিতা রুবাইয়াত। তার অনুবাদ করেন এডয়ার্ড ফিটজেরাল্ড ১৮৫১ সালে।  সেই অনুবাদ আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপে। যুদ্ধের সময় সৈনিকদের পকেটে থাকত এই বই। জীবন যে ক্ষণিকের মায়া, এই উপলব্ধি হত  ওমর খৈয়াম পড়ে। পশ্চিমের মেজাজ মর্জি বুঝে  ফিটজেরাল্ড মাত্র ৭৫ টি কবিতা বাছেন । কখনো একটি রুবাইকে ভেঙ্গে দুটি, কখনো একাধিক রুবাই জুড়ে একটি কবিতা হিসেবে অনুবাদ করেন, তাতে মূল কবিতার ছন্দ , মিল ক্ষুণ্ণ হলেও।

এমনটা কেন তিনি করলেন এর উত্তর পাব তাঁরই একটি কথায়-

‘It is an amusement to me to take what liberties I like with these Persians, who (as I think) are noT poets enough to frighten one from such excursions and who really do really want a little art to shape them’

কৌতুকের কথা হল, ‘যথেষ্ট কবি নয়’  যে ওমর খৈয়াম, তিনি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিলেন এই স্বেচ্ছাচারী অনুবাদের জন্যেই। ইউরোপ ও আমেরিকায় গড়ে উঠেছিল অসংখ্য ওমর খৈয়াম ক্লাব।

Your thoughts on this Post?

Facebook
Twitter
LinkedIn

Letest Cover Stories

দুটি কবিতা 

অভিরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় এক যুদ্ধ কবে ফুরোবে জানা নেই,তবু চাঁদ আকাশে—অথবা নিকষ কালোয় তারা খসা। বারুদ, রক্ত, অভিশাপ বা চিতার আগুন—নেভার খবর না এলেওকখনও স্নিগ্ধতার ছায়ার

Read More »

ঊর্ণনাভ

শ্যামলী রক্ষিত  তৃতীয় পর্ব  মিতা রান্নাঘরেই ছিল।  দিপালীর সঙ্গে কথাকাটাকাটি হওয়ার পর থেকেই তার নিজের ভেতরটা খুব খারাপ লাগছিল। টেনশনও হচ্ছিল ভীষণ। সত্যিই সত্যিই যদি

Read More »

Privious Cover Stories

দুটি কবিতা 

অভিরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় এক যুদ্ধ কবে ফুরোবে জানা নেই,তবু চাঁদ আকাশে—অথবা নিকষ কালোয় তারা খসা। বারুদ, রক্ত, অভিশাপ বা চিতার আগুন—নেভার খবর না এলেওকখনও স্নিগ্ধতার ছায়ার

Read More »

ঊর্ণনাভ

শ্যামলী রক্ষিত  তৃতীয় পর্ব  মিতা রান্নাঘরেই ছিল।  দিপালীর সঙ্গে কথাকাটাকাটি হওয়ার পর থেকেই তার নিজের ভেতরটা খুব খারাপ লাগছিল। টেনশনও হচ্ছিল ভীষণ। সত্যিই সত্যিই যদি

Read More »