রোজি সিং
এক প্রখর গ্রীষ্মের দিনে বাংলা – বিহার – উড়িষ্যার নবাব আলিবর্দী খাঁ এন্তেকাল লাভ
করলেন। সময়টা ১৭৫৬ সাল। দৌহিত্র সিরাজ-উদ-দৌল্লার স্থলাভিষেক নিয়ে রাজ্যে নানা
জটিলতা। অন্যদিকে ইংরেজ বণিকদের বাণিজ্য শুল্ক পরিশোধ না করা বা নবাবের অসম্মতিতে
বিভিন্ন অবৈধ বাণিজ্যে লিপ্ত থাকা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে সিরাজের সাথে তাদের সংঘর্ষে
রাজ্য খানিক উত্তাল। ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ এবং কাশিম বাজার কুঠির অধিকর্তা
উইলিয়াম ওয়াটস এর কূটনৈতিক চাল বা রাজনৈতিক দক্ষতার কাছে হার মানছে দেশের শাসন
ব্যবস্থা। তারা সিরাজকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু তাদের চক্রান্ত ধরে
ফেলে সপরিবারে ওয়াটস কে বন্দী করলেন সিরাজ। তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন কলকাতার
দিকে, ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ আক্রমণ করার জন্য। রেখে গেলেন এক দূর্দমনীয় বন্দীকে
একদিন যার হাতে মিজাফর ও তার পুত্র মীরন সকলের অজান্তে, চুপি চুপি তুলে দিয়েছিলেন এক
চুক্তিপত্র। এর জন্য ওয়াটস পেয়েছিলেন অনেক সমৃদ্ধি কিন্তু আমাদের দেশ তলিয়ে গিয়েছিল
এক অতলান্ত আঁধারে।
ওয়াটস কে অন্য রাজবন্দীদের সঙ্গে রাখা হলেও তার স্ত্রী ফ্রান্সেস ও
সন্তানদ্বয় সোফিয়া ও অ্যামিলিয়াকে রাখা হলো সিরাজের মা আমিনা এবং নানীমা শরফুন্নিসা
বেগমের জিম্মায়। ফ্রান্সিসের ভীষণ মিষ্টি ব্যবহার এবং কন্যাদ্বয়ের ফুটফুটে রূপে নানীমার
হৃদয় দ্রুত আদ্র হয়ে উঠলো। একদিন সকলের অলক্ষ্যে অত্যন্ত বিশ্বস্ত রক্ষীদের সাথে
দিয়ে গোপন পথে নানীমা ফ্রান্সেস ও তার মেয়েদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করলেন। বিদায়
বেলায় ফ্রান্সেস কে বুকে টেনে নানীমা ডাকলেন ‘বেগম’। রক্ষীরা তাদের ফরাসি অধিকৃত
চন্দননগরে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে এলো। সেদিন মাতৃ হৃদয়ের কাছে হেরে গিয়েছিল দেশ জাতি বা
শত্রু মিত্র। নানীমার সাহচর্য ও আভিভাবকত্বে কাটানো সময়টুকু চিরকালের জন্য এক
বিদেশীনিকে বেগমের মুকুট পরিয়ে রাখল।
ফ্রান্সেস ছিলেন মাদ্রাজের সেন্ট ডেভিড ফোর্টের ব্রিটিশ গভর্নর মিস্টার
এডওয়ার্ড ক্রক এবং ইসাবেলা বেইজারের কন্যা। ইসাবেলা ছিলেন পর্তুগিজ। ফ্রান্সেসের
যখন তেরো বছর বয়স তখন তার বিয়ে হয় কলকাতার গভর্নর টমাস ব্রডিলের আত্মীয় প্যারি
পারপলার টেম্পলারের সাথে। বিয়ে চার বছরের মধ্যে স্বামী ও দুটি সন্তানের অকাল মৃত্যু
ফ্রান্সেসকে অনেকখানি বড় করে দিল। এর নয় মাস পরে জেমস অল্টহ্যামের এর সাথে
ফ্রান্সেস বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বিয়ের ১০ দিনের
মাথায় গুটি বসন্তে অল্টহ্যামের মৃত্যু হয়। ভেঙ্গে পড়েন ফ্রান্সেস। তা সত্ত্বেও এই সবুজ
বাংলা ত্যাগ করেন না। এর দু বছর পরে উইলিয়াম ওয়াটস কে বিয়ে করে সন্তানাদি নিয়ে সুখে
ঘর সংসার করতে থাকেন। তাছাড়া এদেশ ছিল ফ্রান্সেসের বড় প্রিয়। এখানকার সংস্কৃতি,
শিল্প, লৌকিকতা ও ভাষা খুব সুন্দর ভাবে তিনি রপ্ত করে নিয়েছিলেন। বাংলা ভাষায় কথা
বলতেন এদেশের সকলের সঙ্গে। ব্যবহারও ছিল আন্তরিক।
পলাশীর যুদ্ধে বন্ধুহীন সিরাজের নির্মম হারের উপহার হিসাবে কোম্পানির তরফ
থেকে ওয়াটস কে বিপুল অর্থ দিয়ে পুরস্কৃত করা হয় এবং ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর পদটি
দেওয়া হয়। কিন্তু ওয়াটস দেশে ফিরে যেতে চাইলেন। ফ্রান্সেস এবার সন্তানদের নিয়ে স্বামীর
সঙ্গে ফিরে গেলেন। এভাবে কেটে গেল অনেকগুলো দিন ও বছর। ওয়াটস একদিন পৃথিবী ছেড়ে
অনন্তে বিলীন হলেন। সময়টা ১৭৬৪ সাল। পরবর্তী কিছুদিন ফ্রান্সেস স্বামীর সম্পত্তি
দেখাশোনা এবং সন্তানদের বড় করে তোলা এসবের মধ্যে কাটিয়ে দিলেন। সব দায় দায়িত্ব
পালন করে একদিন সবুজ কোমল বঙ্গভূমির টানে চুয়াল্লিশ বছরের ফ্রান্সেস কলকাতায় ফিরে
এলেন। সময়টা ১৭৬৯ সাল। ইতিমধ্যে তার দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে এবং ছেলে সুপ্রতিষ্ঠিত।
কলকাতায় এসে গঙ্গার ধারে মনোরম পরিবেশে এক অট্টালিকা বানালেন এবং
দেশীয় কায়দায় তা সাজালেন। গঙ্গার শীতল সমীরনে ফেয়ারলি প্লেসের ১২ নম্বর ক্লাইভ
রোডের বাড়ির মালকিন বেগম ফ্রান্সেস শান্তি অনুভব করতেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন রঙিন ও
আমোদ প্রিয়। অনেক পরিচারক, অতিথি, অভ্যাগততে বাড়ি সর্বদা জমজমাট থাকতো। সন্ধ্যে
হতেই জ্বলে উঠতো ঝাড়লন্ঠন তার ছায়া কেঁপে বেড়াতো সর্বত্র। অট্টালিকার সৌন্দর্য,
অন্ধকারে গাছেদের ছায়া, দূর বনান্তে পশু পাখির ডাক পরিবেশকে অলৌকিক করে তুলত।
বৈঠকখানায় পাতা হতো সাদা ফরাস। তাতে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বেগম ফ্রান্সেস একের পর
এক কাহিনী বর্ণনা করে যেতেন। উপস্থিত ইংরেজ রাজপুরুষ বা অন্যান্য সম্ভ্রান্ত নাগরিক,
বিশিষ্ট অতিথিবর্গ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতেন সেই গল্প। আলবোলা, আতর আর তামাকের গন্ধে
বাতাস ভারী হতো। পানের রসে ঠোট রাঙিয়ে ফ্রান্সেস বলতেন তার জীবনের গল্প, অভিজ্ঞতার
গল্প, যুগসন্ধিক্ষণের গল্প। তিনি হয়ে উঠলেন ‘কিস্সাওয়ালী’। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল
সময়কাল। বেগম ফ্রান্সেস হয়ে উঠলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি নাম। সমাজে বহুল চর্চিত
হতে থাকলো তার গল্প গাথা, অভিজ্ঞতার কথা। এছাড়াও আতরের গন্ধে ভারি বাতাস রঙ্গ
ব্যঙ্গ ঠাট্টা তামাশাতেও পরিপূর্ণ হতো কখনো কখনো। ইংরেজ কর্মকর্তা ছাড়াও সেই সময়
বহুবিশিষ্ট মানুষই এই আড্ডায় অংশগ্রহণ করতেন।
একদিন বেগম ফ্রান্সেস কলকাতার সেন্ট জন্স চার্চের যাজক রেভারেন্ড
উইলিয়াম জনসনের দেখা পান। তারা একে অপরের প্রতি গভীর আকর্ষণ বোধ করেন। অচিরেই
এই প্রণয় পরিণয় পরিণত হল এবং বেগম ফ্রান্সেস হলেন বেগম ফ্রান্সেস জনসন। তখন তিনি
ঊনপঞ্চাশ বছরের রঙীন মনের মানুষ। বিধাতা এবারেও ফ্রান্সেসের সুখটুকু কেড়ে নিলেন।
বিয়ের চার বছরের মাথায় ফ্রান্সেসের ধর্মযাজক স্বামী তার বিপুল সম্পত্তির অনেকখানি
নিয়ে চম্পট দিলেন। পড়ে রইলো এক অব্যক্ত বেদনা ও বঞ্চনার ভরা প্রাণ। এক ঘন দুঃখের
আঁধার নেমে এলো তার জীবনে। কিন্তু তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। আবার জ্বলে উঠলো অট্টালিকার
আলো, সম্ভ্রান্ত অতিথিদের সকৌতুক আলাপন, আলবোলা, আতরের মৌতাত, রাতের অন্ধকার
ভেদ করে জুড়িগাড়ির শব্দ আর কলকাতার ঋতু পরিবর্তন বেগম ফ্রান্সেসকে দীর্ঘায়ু করে
তুলল।
কালচক্রে পাতা ঝড়ার সময় হয়। রিক্ত প্রকৃতিতে আবার আসে বসন্ত ঋতু।
মরশুমী ফুলে ফলে ভরে ওঠে চারিদিক। এভাবে সাতাশটি টি বসন্ত কাটিয়ে এক শীতের দিনে
ভারতবর্ষের প্রথম ও শেষ গল্পকথক বেগম ফ্রান্সেস কিস্সাওয়ালী চিরঘুমে নিদ্রিত হলেন।
উষ্ণ, বর্ণময়, চির রঙীন গল্পবলা মানুষটির গল্প ফুরোলো ও নটে গাছটি মুড়লো। সেদিন থেকে
নিভে গেল সব ঝাড়লন্ঠন, গঙ্গার ধারের সুন্দর বাড়িটি ক্রমে হয়ে গেল জনশূন্য। একা সে
দাঁড়িয়ে রইল আগামীর পথ চেয়ে। সময়টা ১৮১২ সাল, ৩ ফেব্রুয়ারি ঠিক সেই বছরই বেগম
ফ্রান্সেস জনসনের নাতি রবার্ট জেনকিনসন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ
করলেন।
কলকাতার এক অলস শীতের দিনে সেন্ট জন্স চার্চ সংলগ্ন সেমেটারিতে তে জব
চার্নকের সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। অদূরেই শায়িত আছেন প্রথম প্রজন্মের এক
ভারতপ্রেমী, একমাত্র ইউরোপীয় নারী যিনি বেগম নামে পরিচিতি লাভ করেন এবং জীবিত
অবস্থাতেই যিনি কিংবদন্তি হন। পায়ে পায়ে তার সমাধির কাছে পৌঁছে যাই। ফলকের গায়ে
খোদাই করা কয়েকটি কথা-
“The oldest British resident in Bengal universally beloved respected and revered.”
তাকে ভালোবেসেছে সবাই। শাসক শ্রেণীর সদস্য হয়েও বঙ্গবাসীর কাছ থেকে তিনি
পেয়েছেন প্রচুর সম্মান ও মর্যাদা। তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় অত্যন্ত রাজকীয়ভাবে।
ফ্রান্সেসের একটি অন্তিম ইচ্ছা ছিল। সেন্ট জনস চার্চে যেন তাকে সমাহিত করা হয়। কিন্তু
তার মৃত্যুর সময় সেন্ট জনস চার্চে সমাধিস্থ করা বন্ধ হয়ে গেছে। তৎকালীন বড়লাট লর্ড
মিন্টো বেগমের এই ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে লর্ড ওয়েলেসলির থেকে অনুমতি চেয়ে নেন এবং
নিজে ছয় ঘোড়া গাড়িতে চেপে ফোর্ট উইলিয়ামের একদল রেজিমেন্ট নিয়ে উপস্থিত থাকেন।
কলকাতা সকল বিশিষ্ট মানুষ, সুপ্রিম কোর্টের জজ, কাউন্সিলের সদস্য সহ অনেক নামি লোক
সেদিন উপস্থিত ছিলেন যা এর আগে কোন নাগরিকের শেষকৃত্যে ঘটে নি। এভাবেই থেকে গেলেন
বেগম ফ্রান্সেস জনসন। জীবন স্মৃতির একটি করে পৃষ্ঠা উল্টে বর্ণনা করে গেছেন প্রাচীনতম
কলকাতার কাহিনী। যা সমৃদ্ধ করেছে আমাদের ইতিহাস। ক্লাইভ – ওয়াটসের কলকাতা থেকে শুরু
করে ভাগ্যবিড়ম্বিত সিরাজ ও নানী বেগমের রূপকথা, বর্গী আক্রমণে বাংলার ঘরে ঘরে
মানুষের কান্নার ইতিহাস, মারাঠাদের পরাজয়, মারহাট্টা ডিচ খনন, মহারাজ নন্দকুমারের এর
ফাঁসির করুন কাহিনী, কলকাতার বাবু কালচার, ফ্রান্সিস – হেস্টিংস ডুয়েল, ছিয়াত্তরের
মন্বন্তর, ছাপাখানা চালু হওয়া, নীলকুঠির পত্তন, ব্যাংক ও ইন্সুরেন্স কোম্পানির ব্যবসা,
ময়দানে নতুন কেল্লার ভিত্তি স্থাপন, ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন, রাজভবন ও টাউন হল তৈরি
ইত্যাদি যা তিনি দেখেছেন সব বর্ণনা করে গেছেন। রবার্ট ক্লাইভ থেকে লর্ড মিন্টোর আমল
পর্যন্ত গল্প ছিল তার ঝুলিতে।
ফেরার পথে, চার্চের নিয়ম, সময়সীমা ইত্যাদি মেনে বের হয়ে ফেরার পথে হাঁটছি
ফেয়ারলি প্লেসের দিকে। মন বলে, একদিন এখানেই প্রাসাদের মতো এক বাড়িতে সন্ধ্যায়
জ্বলে উঠতো ঝাড়বাতি। আতরের গন্ধ ভাসত বাতাসে। মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতাদের সামনে এক
বিদেশীনি অজস্র রঙ্গিন কাহিনীর মালা গাঁথতেন। বিখ্যাত লেখক নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘কাঙাল
মালসাট’ উপন্যাসে একটি চরিত্রের নাম বেগম জনসন, যে এক প্রাচীন প্রেতিনী এবং নানারকম
কাজকর্ম করে বেড়ায়। তাই অনেকে মনে করেন বেগম জনসন প্রেতিনী হয়ে রয়ে গেছেন। তবে
ক্লাইভ স্ট্রিট এখন আর নেই। নেতাজি সুভাষ রোড বলেই চেনা জানা। আর ১২ নম্বর বাড়ি?
আজ যেখানে স্ট্যান্ডারড চার্টার্ড ব্যাংক, বলা হয় একদা সেখানেই ছিল বেগম ফ্রান্সেস
জনসনের বাসস্থান। আজও, ব্যস্ততম কলকাতা মহানগরীর ব্যস্ততম অঞ্চলের অসংখ্য
উজ্জ্বল আলোর নিচে জমে আছে শত শত বছরের ইতিহাস। এই শীতের সন্ধ্যায় তারা ছায়ার
মতো পিছু নেয় তারপর মিলিয়ে যায় বড় বড় ইমারতের দেওয়ালে। অনেক চেষ্টাতেও আর তাদের
ধরা যায় না কখনো।
ঋণ স্বীকারঃ সলিল হোড়।


