ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ

This entry is part 8 of 8 in the series ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ

১ : ঊর্ণনাভ

২ : উর্ণনাভ

৩ : ঊর্ণনাভ

৪ : ঊর্ণনাভ

৫ : ঊর্ণনাভ

৬ : ঊর্ণনাভ

৭ : ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ

অষ্টম পর্ব 

দক্ষিণের ব্যালকনিতে বসেছিল তুষার। দূরের আকাশের দিকে নিস্পলক তাকিয়েছিল সে। চোখের পাতা স্থির। তুষার তাকিয়েছিল আকাশের দিকে ঠিক কথাই, কিন্তু মিতা স্পষ্ট বুঝতে পারছিল বাইরের পৃথিবীর কোনো প্রতিচ্ছবি তার চোখের তারায় ধরা দিচ্ছে না! সে নিজের গভীরে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিচ্ছে যেন। বৃক্ষ যেমন করে ছড়িয়ে দেয় তার শিকড়, গভীর থেকে আরো গভীরে বিস্তার করে তার অস্তিত্বের অণু-পরমাণু, তেমনি করে তুষারের মন মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে ক্রমশ নিজের বুকের অতল গভীর মানবজমিনে প্রবেশ করছে যেন! 

এখন এই নিমগ্ন সময়ে ওর মুখে চোখে পরাবাস্তবের আলো। যে আলোর ঝলকানি যেন জোনাকির মৃদু আলোর মতো। গভীর অনন্ত অন্ধকারে জ্বলতে থাকা সেই মৃদু আলোর স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করে যখন মিতার, তখন অদ্ভুত এক শূন্যতায় বুকের প্লেট কেঁপে ওঠে ভূমিকম্পের মতো! রিখটার স্কেলে তাকে মাপলেও তার কম্পাঙ্কের পরিমাপ ধরা সম্ভব নয়! যে কম্পাঙ্ক আসলে হয়তো মন্থন। নিজের মনন আর বুদ্ধির সঙ্গে বিবেকের মন্থন। সেখানে প্রবেশের ক্ষমতা বা সাহস মিতার হবে না। কেননা মিতার বুকের গভীরে সুপ্ত থাকা কঙ্কাল দেখে মিতা নিজেই আতঙ্কিত হয়। বাস্তবের মাটি স্পর্শ করে পরাবাস্তবের আলোয় স্নান করার সৌভাগ্য কি সবার থাকে! যেখানে খেলে বেড়ালে মানুষের ভেতরকার ‘আমি’টা শতকষ্টেও, শতসহস্র যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হয়েও, নিজের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখতে পারে তার আনন্দময় সত্তাকে! যা কোনোভাবেই বাইরের বিপক্ষতা দিয়ে নাড়ানো যায় না কোনোদিন। আর সেখানেই মিতার পরাজয়। এই হেরে যাওয়ার ব্যথা তাকে তিলে তিলে শাস্তি দেয় অহরাত্র। 

এখন এই মুহূর্তে কোন সুদূরে তার দৃষ্টিক্ষেপণ তা বাইরে থেকে উপলব্ধি করা কারুর পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু মিতা অনুমান করতে পারে তুষারের এই ডুবে থাকা আসলে জলের মাছ জলে থাকার মুহূর্ত। স্বচ্ছ সাবলীল তার গতাগতি। 

রান্নাঘরে টুকটাক কাজ সারছিল আর আড়চোখে দেখছিল তুষারের এই মগ্নতা। তুষারকে দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন খাঁ খাঁ করছিল। সে জানে তুষার তার নিজের মধ্যে একটা বড়ো কষ্টকে বহন করে নিয়ে সংসারের বোঝা টানছে। ক্রমশ বয়স যত বাড়ছে তার কষ্ট ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাঝে মাঝে মিতার কেমন অপরাধবোধ হয়। কোনো রকমের অন্যায়, দুর্নীতি থেকে দূরে থাকা মানুষটা! ওকে এইভাবে সংকীর্ণতার মধ্যে বেঁধে রাখা ঠিক হয়নি তার। শুধু শুধু জেদের মাথায় পড়ে তখন তুষারকে পাবার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছিল সে। জোর করে নিজেদের আধিপত্য খাটিয়ে গড়া সম্পর্ক কখনো সুন্দর হয় না, সারাটা জীবন ধরে তার মাশুল গুনতে হয়েছে তাকে। 

ঈর্ষা যে কী ভয়ানক হতে পারে তা মিতা নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছে। শ্রীপর্ণা তার খুব ছোটবেলার বন্ধু। খুব বন্ধু ছিল তার, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঈর্ষাও ছিল ওর ওপর। শ্রীপর্ণার সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই তার প্রতিযোগিতায় নামার দরকার ছিল না। কেননা যে সমস্ত বিষয় নিয়ে মেয়েদের মধ্যে জেলাস হয়, সেরকম কিছুই ছিল না শ্রীপর্ণার। তাদের ফ্যামিলি স্ট্যাটাস নিতান্তই নগণ্য। নেহাত একটা কেরানির চাকরি ওর বাবার। ভাড়া বাড়িতে যা হোক করে মাথা গুঁজে দিনগুজরান। কাজেই মিতার সঙ্গে তার সামাজিক স্ট্যাটাসের আকাশ-পাতাল পার্থক্য। সেই অর্থে সো-কল্ড সুন্দরীও নয়। কিন্তু তবু ঈর্ষা হত! কেননা বরাবর শ্রীপর্ণা ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছে। তাতে তার খুব একটা অসুবিধে কিছু ছিল না, কিন্তু এই একটা জায়গায় মিতা মেনে নিতে পারেনি! এখানেও যে তাকে হারিয়ে দেবে এটা সে কিছুতেই মানতে পারেনি। সে একজন বড়োলোক ডাক্তার বাবার মেয়ে, দেখতেও সুন্দর; কিন্তু সেসব অহংকার তার একান্ত নিজস্বই। 

এতদিন সে জানত, সবাই শ্রীপর্ণাকেই ভালোবাসত! সমস্ত বন্ধুরা, টিচাররা সবাই। কিন্তু মেডিকেল কলেজে পড়তে এসে যখন জানতে পারল তুষার তাদের ব্যাচের টপার, তখন কী জানি কেন কী এক অপূর্ব আনন্দে ফুরফুর করে উঠেছিল মিতার মনটা। এই ভেবে শান্তি পেয়েছিল—যাক বাবা, এবার অন্তত মেয়েটার ফার্স্ট হবার অহংকারটা ঘুচবে। কিন্তু তার সেই আত্মসুখ বেশিদিন টিকল না। হঠাৎ করেই একদিন একটা দৃশ্য তার চোখে পড়ল। ক্লাস করতে করতে দেখল, তুষার কেমন একটু অবাক মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শ্রীপর্ণার দিকে! মাথার চাঁদি জ্বলে গেল তার। কলেজে ভর্তি হবার পর থেকে সকলে তার সঙ্গে পরিচয় করার জন্যে লাইন লাগিয়ে দিয়েছিল যখন, সে সময় তুষার আসেনি। এই ঘটনা ভেতরে ভেতরে তাকে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ করে তুলেছিল। তারপরই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মিতা, তুষারকে তার চাই! কোথায় থাকে ওর অহংকার দেখব! তবে মনে মনে এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিলেও বাস্তবে সেটা তেমনভাবে কার্যকরী করতে পারেনি। কেননা তখন সে ভিকটরের সঙ্গে সম্পর্কে আছে। সেটা ভেঙে দিতে পারেনি তখনও। তাই এদিকটায় কিছুটা ভাটা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই দৃশ্য দেখার পর মিতা একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। এই একটা বিষয়ে সে কিছুতেই শ্রীপর্ণাকে জিততে দেবে না। কিছুতেই না! তারপর সব রকমভাবে তার সমস্ত ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আদাজল খেয়ে লেগেছে তুষারকে পাবার জন্যে। তুষারকে দিনরাত ছায়ার মতো ঘিরে রেখেছিল। তারপর একদিন মিশন সাকসেস হল।

কিন্তু মিতা জানে, তাদের সম্পর্কে অদ্ভুত মিহি একটা দূরত্বের সীমারেখা টানা আছে। এই ব্যারিকেড ছুঁয়েই তাদের দাম্পত্যের সুতো বাঁধা আছে। সেই বন্ধন আলগা নয়। কেননা কোনোভাবেই তাকে আলগা হতে দেয়নি মিতা। তার আগ্রাসী শক্তি দিয়ে আচ্ছন্ন করে রেখেছে তুষারকে। তার ভদ্র মার্জিত ব্যবহারের সুযোগ নিয়েছে বরাবর। জীবনের প্রথম দিন থেকে তেলাপোকার মতো তাকে চোখে চোখ লাগিয়ে রেখেছে মিতা। অদ্ভুত চটচটে সেই চাওনি দিয়ে চিটেয় আটকে রেখেছে কাঁচপোকাকে। সে তাকে গিলেও ফেলছে না, আবার তার চিটচিটে দৃষ্টির বাইরে কোথাও যেতেও দিচ্ছে না।

মিতার মনে হয়েছে সে তুষারকে ঠিক বাঁধতে পারেনি। তার এরকমটা মনে হওয়ার কারণ কী, তাও সে জানে। জানে মানে অনুমান করতে পারে। আসলে সে যতই কষে বেঁধেছে, তুষারের সেই বন্ধন হজম করার শক্তিও তত বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্ধন-যন্ত্রণা তুষারের ছিল না। বরং সেখান থেকেই সে তার মুক্তির বাতাস খুঁজে নিয়েছে। ওর সেই প্রশান্ত মুখচোখের ভাব দেখে ভেতরে ভেতরে মিতা আরো বেশি নিষ্ঠুর হয়ে ওঠার উদগ্র নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। কোনোদিন তুষারের ভালো লাগবে কিংবা তুষার ভালোবাসে এমন কোনো কাজ সে নিজের থেকে করেনি। তুষার কোনোদিন সংসারের কোনো দায়িত্ব-কর্তব্য কিছু করেনি। করেনি মানে তাকে কোনো কাজ করতে দেয়নি মিতা। তাদের সংসারের সমস্ত ঝামেলা একা তার। তাদের এই দাম্পত্য সম্পর্কের সব বন্ধন একলা হাতে সেই-ই এতদিন সামলেছে।

কিন্তু করোনা এসে স্তব্ধ করে দিয়েছে সমস্ত ভাবনাচিন্তার স্তর। বারবার মনে হয়েছে কী লাভ হল এইসব করে! প্রতিটা মুহূর্ত একটা মানুষকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলতে বাধ্য করেছে সে। এমনকি নিজের ছেলের ব্যাপারেও কোনোদিন তুষারের কোনো বক্তব্যকে গুরুত্ব দেয়নি। কোনো বিষয়েই তার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে পাত্তা দেয়নি মিতা। এমনকি ছেলের ব্যাপারেও না। ইদানীং এই করোনা আসার পর যখন উপলব্ধি করতে পেরেছে জীবন কত ভঙ্গুর, যেকোনো সময় যেকোনো কাউকে চলে যেতে হতে পারে! নিজের মনকে এমন একটা নিস্পৃহ কঠিন বন্ধনে বেঁধে রেখে মুক্ত থাকার এই যে শক্তি – মিতাকে অবাক করেছে।

এখন খুব খারাপ লাগে মিতার। ইদানীং তাই কোনো বিষয় নিয়েই তুষারের সঙ্গে কোনো তর্কবিতর্কে লাগতে ইচ্ছা করে না তার। চুপ করে থেকে তুষারের কথাকে মান্যতা দেয়। অদ্ভুত একটা ঠান্ডা শীতল দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে জাবর কাটছে তারা।

অনেকদিন পর আবার একটু ক্রুদ্ধ হল তুষার। এই সমস্ত ক্ষেত্রে সে নিজের রাগ ধরে রাখতেই পারে না। গরিব-দুঃখী মানুষের জন্যে খুব দরদ! আগে আগে এই নিয়ে প্রচণ্ড অশান্তি হত। মিতা কিছুতেই এটা ভেবে পেত না, কাজের লোকের জন্যে কেন এত মাথাব্যথা তুষারের! নিজের বউ, ছেলে, আত্মীয়স্বজন কারুর জন্যে ওর কোনো ফিলিংস নেই! অথচ…।

কিন্তু এখন এসব নিয়ে মিতা নিজেও আর তেমন ঝামেলা করে না। সারাক্ষণ তো মনে হচ্ছে এখন সবাই অন্তর্জলি যাত্রায় এসে বসে আছি! কী লাভ আর কোনো ঝঞ্ঝাট বাড়িয়ে…।

 (চলবে )

ঊর্ণনাভ

৭ : ঊর্ণনাভ

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

জিজীবিষা

This entry is part 8 of 8 in the series ঊর্ণনাভ

This entry is part 8 of 8 in the series ঊর্ণনাভ জিজীবিষা ১ : জিজীবিষা ২ : জিজীবিষা ৩ : জিজীবিষা ৪ : জিজীবিষা ৫ :

Read More »

ঊর্ণনাভ

This entry is part 8 of 8 in the series ঊর্ণনাভ

This entry is part 8 of 8 in the series ঊর্ণনাভ ঊর্ণনাভ ১ : ঊর্ণনাভ ২ : উর্ণনাভ ৩ : ঊর্ণনাভ ৪ : ঊর্ণনাভ ৫

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

জিজীবিষা

This entry is part 8 of 8 in the series ঊর্ণনাভ

This entry is part 8 of 8 in the series ঊর্ণনাভ জিজীবিষা ১ : জিজীবিষা ২ : জিজীবিষা ৩ : জিজীবিষা ৪ : জিজীবিষা ৫ :

Read More »

ঊর্ণনাভ

This entry is part 8 of 8 in the series ঊর্ণনাভ

This entry is part 8 of 8 in the series ঊর্ণনাভ ঊর্ণনাভ ১ : ঊর্ণনাভ ২ : উর্ণনাভ ৩ : ঊর্ণনাভ ৪ : ঊর্ণনাভ ৫

Read More »