৮ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

৮ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা - তৃষ্ণা বসাক

১ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

২ : অনুবাদের অপযশ

৩ : অনুবাদ- ও  সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা

৪ : শাসকের ভাষা, শাসিতের ভাষা এবং অনুবাদকের অবস্থান

৫ : অনুবাদকের সংকট

৬ : সংস্কৃতির অনুবাদ

 ৭ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

৮ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

 পর্ব ৮

ভারত ভূখণ্ডের মানুষজন তীর্থ যাত্রায় কত দূর দূরান্তে যান। কেউ বৈষ্ণোদেবী তো কেউ আজমের শরীফ। যারা অত কষ্ট স্বীকার করতে চান না, তাঁদের ভারতদর্শনের জন্যে অন্যরকম এক তীর্থযাত্রা আছে। কত ভাষা  এ দেশে, কত সম্পন্ন সেই ভাষায় রচিত সাহিত্য। অনুবাদকরা সেই সব অজানা ভাষার রত্নরাজি খুঁজে এনে আমাদের হাতে তুলে না দিলে ভারতদর্শন অসম্ভব ছিল, আমরা জানতেই পারতাম না ঘরের কাছে যে আরশিনগর, তার পড়শিদের সুখদুঃখ, রীতি রেওয়াজ, উৎসব সংস্কৃতির খবর।

ভারতীয় ভাষার অনুবাদকরা বারবার ছুটে বেড়ান কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা, অরুণাচল থেকে আজমের।  পামুক, মার্কেজ, কুন্দেরা লোলুপ বাঙালি পাঠক, যাঁরা হাইপার মেট্রোপিয়ায় ভুগে হাতের কাছে অমৃতা প্রীতম, বিজয়দান দেথা বা নগেন শইকিয়া বা  বশীরকে দেখতেই পাননা, তাঁরা কোন একদিন ভারততীর্থের প্রসাদ গ্রহণ করবেন এই আশায়।

এইরকম একজন দীক্ষিত ও উদ্দীপ্ত অনুবাদক বাসুদেব দাস। ১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা পাঁচশত পঞ্চাশটিরও বেশি।সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিয়মিত ভাবে অসমিয়া গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করে চলেছেন।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত সংস্থা NEINADএর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য Distinguished Life Membership এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঁয়তাল্লিশটি।হোমেন বরগোহাঞির অসমিয়া উপন্যাস ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়) বাংলা অনুবাদের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন। এই পর্বে তাঁর মুখোমুখি হবার সুযোগ ঘটেছে।

উত্তর-আমার জন্ম অসমের যমুনামুখে।কিন্তু শৈশব এবং যৌবন কেটেছে গুয়াহাটি শহরে।শৈশব থেকেই বই পড়তে খুব ভালোবাসতাম।আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তখন আমাদের বিদ্যালয়ের লাইব্ররির প্রায় ছশো বই পড়ে শেষ করেছিলাম।অনেক কিছুই হয়তো তখন বুঝতে পারিনি কিন্তু এই সময়ের পড়াটা আমাকে পরবর্তীকালে ভীষণ সাহায্য করেছে।পরবর্তীকালে কটন কলেজের বিশাল গ্রন্থাগার আমার মনের দিগন্তকে প্রসারিত করেছিল।গুয়াহাটির অনেকগুলি গ্রন্থাগারের সদস্য ছিলাম।বিশেষ ভাবে রামকৃ্ষ্ণ মিশনের সারদেশ্বরী লাইব্রেরির সদস্যরূপে অনেক বইপত্র পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।দেবসাহিত্য কুটিরের হাত ধরে অনুবাদের মাধ্যমে গোটা বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল।এই প্রসঙ্গে একটি কথা বলা প্রয়োজন বইয়ের প্রতি এই বিপুল আকর্ষণ আমি মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি বলা যেতে পারে।আমি মাকে বই হাতে ছাড়া কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না।দেবসাহিত্য কুটিরের অনূদিত বইগুলি পড়ার আনন্দ হয়তো পরোক্ষভাবে আমার মনে অনুবাদের প্রতি একটা মমত্ববোধ গড়ে তুলেছিল।তবে তখনও নিজে একজন অনুবাদক হয়ে উঠব সেরকম কোনো সচেতন ভাবনা আমার ছিল না।     

উত্তর-স্কুল জীবনেই অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে উঠলেও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পর্যন্ত অসমিয়া সাহিত্যের সঙ্গে আমার প্রায় কোনো যোগাযোগই ছিল না।এই সময় আমার কটন কলেজের সহপাঠী পরমানন্দ মজুমদার এবং প্রাতঃভ্রমণের সঙ্গী বন্ধুবর তুষার সাহার মাধ্যমে হোমেন বরগোহাঞির সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হই।বরগোহাঞির সাহিত্য বিশেষ করে প্রবন্ধ আর কিছু উপন্যাস আমার জীবনে একটা টার্নিং পয়েন্ট।কারণ এর পরেই আমি দিন রাত অসমিয়া সাহিত্য পাঠ করতে শুরু করি।তখনই আমার মনে হয় আমার এই ভালোলাগা অনুবাদের মাধ্যমে বাংলার বৃহত্তর পাঠকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।আর সে কাজটা ভালোভাবে করতে হলে আমাকে কলকাতা যেতে হবে।শৈশব থেকেই কলকাতা আমার কাছে ছিল ‘সব পেয়েছির দেশ’।তাই কোনো কিছু না ভেবে ১৯৯৭ সনের ডিসেম্বর মাসে স্বেচ্ছায় কলকাতা বদলি হয়ে আসি।ধীরে ধীরে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে অসমিয়া ছোটো গল্প অনুবাদ করতে থাকি।লি্টল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রয়াত সন্দীপ দত্ত মহাশয় আমাকে অনেকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।এই প্রসঙ্গে একজন মানুষের অবদানের কথা না বললেই নয়,তিনি হলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন গুরুনানক অধ্যাপক হিমাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায়।তিনি আমার প্রতিটি কাজেই নিরন্তর অনুপ্রাণিত করে এসেছেন।নিরুপমা বরগোহাঞি,হীরেন গোঁহাই স্যার,প্রয়াত অমলেন্দু গুহ ,অনিমা গুহ,নগেন শইকীয়া, প্রসে্নজিৎ চৌধুরী,রাজেন শইকীয়া এবং অসমের অগণিত মানুষ আমাকে স্নেহ ভালোবাসায় ভরিয়ে রেখেছেন।অসমের প্রায় সমস্ত কবি-লেখকের সঙ্গে আমার নিবিড় পরিচয় গড়ে উঠেছে।তবে আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন হোমেন বরগোহাঞি।বরগোহাঞির অধ্যয়নের প্রতি তীব্র আগ্রহ আমাকে তাঁর প্রতি আকর্ষণ করার একটি অন্যতম কারণ।আমার জীবনের একটি অন্যতম স্বপ্ন বরগোহাঞির সমস্ত সৃষ্টি সম্ভার অনুবাদের মাধ্যমে বাংলার পাঠকের কাছে তুলে ধরা।শুধু ছোটো গল্প নয় পাঁচশো পঞ্চাশটি অসমিয়া গল্পের অনুবাদের সঙ্গে সঙ্গে আটশোর ও বেশি কবিতার অনুবাদ করেছি।বেশ কিছু উপন্যাসও অনুবাদ করেছি।তবে এই অনুবাদের জন্য আমার নিজের কোনো কৃ্তিত্ব আছে বলে আমি মনে করি না।উন্নত মানের অসমিয়া সাহিত্য আমাকে দিয়ে অনুবাদ করিয়ে নিয়েছে।কাজেই যা কিছু কৃ্তিত্ব তাঁর পুরোটাই প্রাপ্য অসমিয়া কবি সাহিত্যিকদের।       

উত্তর-আমি যাকে বলে পূর্ণতায় বিশ্বাস করি।তাই কোনো জিনিসকে একটা সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে ফেলে দেখতে চাই না।তাই শুধু মাত্র অসমিয়া সাহিত্যের কোনো একটি বিশেষ দিক নিয়ে বা প্রকাশকের পছন্দ অনুসারে বা বাজারে ভালো চলবে সেকথা ভেবে কোনো কাজ করিনি।আমার যা ভালো লেগেছে এবং মনে হয়েছে এর মধ্যে একটা চিরন্তন ব্যাপার রয়েছে -এর ভাষান্তর হওয়া দরকার সেটাই অনুবাদ করেছি।তবে আমার একটা ইচ্ছা রয়েছে অসমের মহিলাদের,শুধুমাত্র মহিলা লেখকদের পঞ্চাশটি ছোটোগল্প নিয়ে    একটি সংকলন করা।প্রায় নব্বই শতাংশ কাজ হয়ে গেছে।পাবলিশারের অভাবে  আটকে আছে।

উত্তর-আজ পর্যন্ত আমার পঁয়তাল্লিশটি বই বেরিয়েছে।আসন্ন কলকাতা বইমেলায় আরও গোটা ছয়েক বই বের হবে বলে আশা রাখছি।সাড়ে পাঁচশোর বেশি অসমিয়া ছোটো গল্প এবং আটশোরও বেশি কবিতা,বেশ কিছু উপন্যাস এবং শুধুমাত্র হোমেন বরগোহাঞিরই ষাট থেকে সত্তরটা প্রবন্ধ বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে,অনলাইন পত্র পত্রিকায় অনুবাদ করেছি।কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি সুবোধ সরকার সম্পাদিত ‘ভাষানগর’ পত্রিকার কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।সুবোধদা শুধুমাত্র আমার অজস্র অনুবাদ কবিতা ছাপেন নি,বেশ কিছু অনূদিত কবিতার বই প্রকাশের সুযোগ করে দেবার সঙ্গে সঙ্গে ভূমিকা পর্যন্ত লিখে দিয়ে আমাকে উৎসাহিত করেছেন। 

উত্তর- প্রতিভাস থেকে প্রকাশিত হোমেন বরগোহাঞির ‘সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়’বইটি ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছে।অবশ্য এর আগে আপনি বইটির একটি সুন্দর আলোচনা করেছিলেন সেকথা আমি কোনোদিন ভুলব না।এছাড়া প্রতিভাস থেকে প্রকাশিত ‘৫১টি অসমিয়া ছোটো গল্পের সংকলন’ এবং হোমেন বরগোহাঞির ‘আত্মানুসন্ধান’ (এর মধ্যে ‘আমার হৃদয় একটি যুদ্ধক্ষেত্র’ও রয়েছে)পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।ভাষা-সংসদ থেকে প্রকাশিত দীপিকা চৌধুরীর ‘টোপ’বইটির ও খুব শীঘ্রই দ্বিতীয় সংস্করণ বের হতে চলেছে। সেতু থেকে প্রকাশিত হোমেন বরগোহাঞির ‘বইয়ের সঙ্গে কথাবার্তা’এবং প্রসে্নজিৎ চৌধুরীর ‘মহারাষ্ট্রীয় নবজাগরণ’বই দুটিও ভালো বাজার পেয়েছে।

উত্তর-না ,আমি আক্ষরিক অনুবাদে বিশ্বাসী নই।আমি অনুসৃজনে বিশ্বাসী।মূল রচনার বিশেষত্ব রক্ষা করে অনুবাদ যাতে সুখপাঠ্য হয়ে উঠে সেই বিষয়ে সচেষ্ট থাকি।জন্মসূত্রে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির সঙ্গে দীর্ঘকালীন পরিচয় থাকায় কাজটা আমার পক্ষে অনেকটাই সহজ হয়ে উঠেছে। 

উত্তর-আসলে অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদে আমি যতটা স্বচ্ছন্দ বাংলা থেকে অসমিয়া অনুবাদে ঠিক ততটা স্বচ্ছন্দ নই।তবে ইতিমধ্যে আমি কিছু বাংলা ছোটো গল্প ,বেশ কিছু কবিতা অসমিয়া ভাষায় অনুবাদ করেছি যার মধ্যে  মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সমুদ্রের স্বাদ’,সমরেশ বসুর ‘আদাব’,শিবরাম চক্রবর্তীর ‘দেবতার জন্ম’বুদ্ধদেব গুহের ‘বনসাাই’,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দময়ন্তীর মুখ’এবং বিভূতি ভূষণের কিছু ছোটো গল্পের উল্লেখ করা যেতে পারে।পঞ্চাশটির মতো বাংলা কবিতাও অসমিয়ায় অনুবাদ করেছি যাদের মধ্যে শঙ্খ ঘোষ,সুভাষ মুখোপাধ্যায়,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়,শক্তি চট্টোপাধ্যায়,নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী,সুকান্ত ভট্টাচার্য,বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,সুবোধ সরকার,বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরও অনেকের কবিতা রয়েছে।এই অনুবাদগুলি অসমের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় এবং ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।এর বাইরে আমি বেশ কিছু অসমি্য়া পত্র পত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধ লেখার চেষ্টা করছি।তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই সামান্য।পাশাপাশি উড়িয়া ভাষা থেকে অনুবাদ করার জন্য আমি কিছুদিন ধরে উড়িয়া শিখছি।আমার ইচ্ছা বাংলা,উড়িয়া এবং অসমিয়া এই তিনটি ভাষাকে আমার ‘বেস ভাষা’হিসেবে তৈ্রি করব।যাতে এই তিনটি ভাষার সাহিত্যের আদান প্রদানে একটা ভূমিকা গ্রহণ করতে পারি।তবে উড়িয়া থেকে অনুবাদের ব্যাপারটা একটু সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।      

উত্তর-হ্যাঁ,মাঝে মাঝে ট্রান্সলেটর্স ব্লকে আমাকেও ভুগতে হয়।তবে নিয়মিত চর্চা এবং অনুশীলনের দ্বারা আমি এটাকে অনেকটাাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছি বলে মনে হয়।আসলে অনুবাদ আমার জীবনে শ্বাস প্রশ্বাসের মতোই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ,তেমনই আমার কাছে যতক্ষণ অনুবাদ ততক্ষণ জীবন।আমার বহুদিনের স্বপ্ন অসমের পঞ্চাশজন মহিলা  লেখকদের ছোটো গল্প নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশ করা।কাজটা অর্থাৎ অনুবাদ তৈরি ,বছর তিনেক আগে সাহিত্য আকাদেমির অনুরোধে আমি এই বিষয়ে একটি প্রস্তাবও জমা দিয়েছিলাম।কিন্তু আজও সেটি ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে।আরও একটি ভাবনা মাথায় রয়েছে।উনবিংশ শতক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত লেখা অসমিয়া প্রবন্ধের একটি অনূদিত সংকলন প্রকাশ করা।এই অনুবাদের কাজটা আমি একাই করতে চাই।আমার শুধু প্রয়োজন একজন মুক্তমনা এবং সাহিত্যপ্রেমী প্রকাশকের।কিন্ত এই পোড়াদেশে যে সেটা একান্তই দুর্লভ তা আমি ইতিমধ্যে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছি।  

উত্তর-নিশ্চয় আমাদের মতো বহুভাষিক দেশে অনুবাদ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় গোটা বিশ্বের কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ অনুবাদ গুরুত্ব লাভ করলেও ,মুখে স্বীকার করলেও আমরা অনেকেই অনুবাদককে যথাযোগ্য সম্মান দিতে দ্বিধা বোধ করি।এই বিষয়ে আমার অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে।কলকাতার একটি তথাকথিত নামী প্রকাশক আমার একটি অনূদিত বই প্রকাশ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।কথাবার্তা ফাইন্যাল হয়ে যায়।এমনকি তারা নিজেদের প্রকাশনার নামে বইটির একটি প্রিন্ট আউট ও বের করে নেন।তারপর এই অবস্থায় হঠাৎ একদিন আমাকে বলেন যে বইটি প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ডিসকাাউন্ট দিয়ে পঞ্চাশ কপি বই কিনে নিতে হবে।আমি আকাশ থেকে পড়ি এবং দৃঢ়তার সঙ্গে প্রকাশকের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে ভবিষ্যতে আমার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে নিষেধ করি।আর এক প্রকাশক প্রচ্ছদে অনুবাদকের নাম দিতে অস্বীকার করেন।তাঁর বক্তব্য এটা নাকি তাঁদের নিয়মে নেই।আমি তীব্রভাষায় এর প্রতিবাদ জানাই এবং ভবিষ্যতে তাদের কাছ থেকে কোনো বই করব না বলে জানিয়ে দিই।কিছু পাব্লিশার আবার পাণ্ডুলিপি নিয়ে মাসের পর মাস আটকে রাখেন।তারা মনে করেন যাবার তো আর জায়গা নেই তাই যাবে কোথায় ঘুরে ফিরে সেই তো আমার কাছেই আসতে হবে।অনুবাদককে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই অপমানজনক পথে চলতে হয়।তবে একেবারে যে ভালো লোকজন নেই তা বলা ভুল হবে।সাহিত্য আকাদেমি এবং এনবিটি অনুবাদক নিয়ে প্রচুর কাজ করে থাকেন।সুযোগ সুবিধা ও রয়েছে। তবে একটা কথা বলতেই হবে আমাদের মতো বিশাল দেশে কেবলমাত্র সাহিত্য আকাদেমি এবং এনবিটির পক্ষে সম্পূর্ণ কাজ একক প্রচেষ্টায় করা সম্ভব নয়।বাকি পাবলিশারদের ও এই ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।         

উত্তর-আমি একটা সরকারি অফিসে চাকরি করতাম।সুযোগ সুবিধাও ছিল প্রচুর।কিন্তু যেহেতু এটি ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান ছিল তাই স্বাভাবিক ভাবেই সাহিত্য থেকে তাদের অবস্থান ছিল নিরাপদ দূরত্বে।তাই ২০০৮ সনে আমি যখন স্বেচ্ছা অবসর নিলাম তখন শুধু আত্মীয় স্বজনরাই নয় আমার শুভাকাক্ষ্মী অনেক কবি সাহিত্যিকরাও আমাকে পরিবারের কথা ভেবে নিষেধ করেছিলেন।আমার মেয়ে তখন ক্লাস নাইনের ছাত্রী।সংসারে আমিই শুধু একজন চাকুরীজীবী।পরিবারের ছয়জন সদস্যকে নিয়ে সেই সময় শুধুমাত্র পেনশনের টাকায় সংসারের খরচ চালানো যে কী কঠিন ছিল তা আশা করি বলার প্রয়োজন রাখে না।এক্ষেত্রে আমি পরিবারের কাছে কৃ্তজ্ঞ কারণ আমার স্বাধীন ইচ্ছার কাছে তাঁরা কোনোদিন বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি।জীবন যাপনের ক্ষেত্রে আমাদের চাহিদা খুবই সামান্য ছিল বলে এই লড়াইটা চালিয়ে যেতে পেরেছিলাম। 

উত্তর-এর উত্তরটা আমি আগের একটি প্রশ্নের সূত্রে বলেছি।আবার বলছি।হোমেন বরগোহাঞির ‘সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়’(সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়)উপন্যাসের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হই। 

উত্তর-অসম্মান এবং প্রত্যাখানের কথা আগে বলেছি।এবার বলছি অনুবাদের সূত্রে পাওয়া ভালোবাসার কথা।আমি একজন খুবই সাধারণ অনুবাদক মাত্র।আমার নিজের সেরকম কোনো যোগ্যতা নেই।অথচ এই অনুবাদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়,সাহিত্য সভায় আমন্ত্রণ পেয়েছি।অসম,ত্রিপুরা,অরুণাচল,বাংলাদেশ,উড়িষ্যায় যাবার সুযোগ পেয়েছি।অসংখ্য মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় আপ্লুত হয়েছি।চলার পথে পেয়েছি অনেক বন্ধু এবং পত্র পত্রিকার সাহচর্য যা আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত ও সমৃদ্ধ করে চলেছে।তবে অসমের অগণিত মানুষের ভালোবাসা আমাকে প্রতিদিন ঋণী করে চলেছে। 

উত্তর-আমার সাত আটটি অনূদিত বই আসন্ন কলকাতা বইমেলায় বের হওয়ার কথা আছে।‘এবং অধ্যায় থেকে ‘প্রণয় ফুকনের নির্বাচিত কবিতা’, ‘হাওয়াজান’ থেকে পঁচিশটি অনূদিত অসমিয়া গল্পের সংকলন ‘বাড়ির পাশে আরশি নগর’এবং নীলিম কুমারের আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘একটি বন্য স্বপ্নের অন্ধ যাত্রা’, ‘প্রতিভাস’ থেকে ধ্রুবজ্যোতি বরার ‘রক্তের অন্ধকার’এবং ‘অর্থ’, ‘বরাহনগর দর্পণ’ থেকে সন্তোষ কুমার কর্মকারের ‘হে আমার স্বদেশ’ এবং হোমেন বরগোহাঞির ‘আধুনিক যুগের জন্মকাহিনি’, ‘হ্যালো বুকস’থেকে ‘অসমিয়া কবিতার ভুবন-প্রথম খণ্ড ।

উত্তর-               আমার মনে হয় ভালো অনুবাদক হতে পারলে আমাদের মতো বহু ভাষাভাষী দেশে অনুবাদকে সহজেই পেশা হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।বিশেষ ভাবে দক্ষিণের কোনো একটি ভাষাকে যদি ভালোভাবে আয়ত্ত করা যায় তাহলে সাহিত্য আকাদেমি থেকে অনায়াসে কাজ পাওয়া যেতে পারে।উত্তর পূর্বাঞ্চলের বড়ো এবং মণিপুরী ভাষায় অনুবাদেরও বাংলায় যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে।আমার খুবই দুর্ভাগ্য যে উত্তর পূর্বাঞ্চলের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও এই দুটি ভাষার কোনোটাই আমি জানি না।তবে আমার মনে হয় অনুবাদকের একটি বা দুটি বিদেশি ভাষার সঙ্গে পরিচয় করে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।এতে গোটা পৃ্থিবীর জানালাটা চোখের সামনে খুলে যায়।কাজটা কিন্তু আজকের এই টেকনোলজির যুগে ততটা কঠিন নয় যতটা কঠিন ছিল আমাদের সময়ে অর্থাৎ আজ থেকে চল্লিশ বছর বা তারও আগে।তাই তরুণ প্রজন্মের অনুবাদকের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ পৃ্থিবীতে ঘৃণার চাষ অনেক অনেক হয়েছে বা এখনও হচ্ছে ।আসুন না আমরা সবাই মিলে ভালোবাসার চাষ করি।এই ভালোবাসা বিভিন্ন ভাষার চর্চা করে অনুবাদের মাধ্যমে এক প্রেমের পৃ্থিবী সৃষ্টি করার  প্রয়াস।

১৪ ডিসেম্বর ২০২৫

অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা - তৃষ্ণা বসাক

 ৭ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

পুরাণ ও কাব্য : কল্পনার সাংস্কৃতিক বুনন

This entry is part 8 of 8 in the series অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ১ : সিন্ধু–সরস্বতী

Read More »