রঞ্জন চক্রবর্ত্তী
“Life has no meaning a priori . . . . It is up to you to give it a meaning, and value is nothing but the meaning you choose.” — Jean-Paul Sartre
ঊনবিংশ শতাব্দীর বাস্তববাদী সাহিত্য দীর্ঘদিন পাঠকের মনে প্রভাব বিস্তার করেছিল। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হল ফরাসি সাহিত্যিক মার্সেল প্রুস্তের উপন্যাস ‘সোয়ান’স ওয়ে’ এবং ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হল আইরিশ সাহিত্যিক জেমস জয়েসের প্রথম উপন্যাস ‘এ পোর্ট্রেট অব দ্য আর্টিস্ট অ্যাজ এ ইয়ং ম্যান’। তারপর সাহিত্যের অঙ্গনে পদার্পণ করলেন ফ্রানৎস কাফকা। ‘দ্য ট্রায়াল’ উপন্যাসে তিনি প্রশ্ন রাখলেন — “Am I to leave this world as a man who shies away from all conclusions?” বস্তুত কাফকার আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই বাস্তববাদী সাহিত্যের অন্তিম লগ্ন সূচিত হয়। লেখকরা যেমন ধীরে ধীরে বাস্তববাদী সাহিত্যের ধারা থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন, তেমনই আধুনিকতা (Modernism) থেকেও দূরে সরে যেতে থাকেন। তার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে আধুনিকতার পরিবর্তে জন্ম নেয় উত্তর-আধুনিকতা (Postmodernism) এবং তার সঙ্গেই চলে আসে মার্টিন হাইডেগার, জাক দেরিদা, মিশেল ফুকো, জাঁ-ফ্রাঁসোয়া লিয়োতার, ফ্রেডেরিক জেমসন, ডগলাস কেলনার, য়ুর্গেন হ্যাবারমাস প্রভৃতি চিন্তাবিদের নাম।
বিংশ শতাব্দীর মধ্য থেকে অন্ত্যভাগ পর্যন্ত সময়কালে সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি, স্থাপত্য, দর্শন, সমালোচনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে যে বৃহত্তর ধারনা এবং নতুন রীতির সৃষ্টি ও প্রসার হয় তাকে উত্তর-আধুনিকতা বলে চিহ্নিত করা যায়। এর ফলে স্পষ্টতই মডার্নিজম থেকে দূরত্ব সূচিত হয়। উত্তর-আধুনিকতার চরিত্রলক্ষণগুলির মধ্যে অন্যতম দু’টি হল — প্রথমত, আত্ম-সচেতনভাবে পূর্ববর্তী রীতি ও প্রথাগুলির ব্যবহার এবং দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন শিল্পরীতি ও মাধ্যমের সংমিশ্রণ এবং তৃতীয়ত সাধারণভাবে তত্ত্বের প্রতি অবিশ্বাস। বিংশ শতাব্দীর আট এবং নয়ের দশকে উত্তর-আধুনিক সমালোচনার ধারার ব্যাপক প্রসার ঘটে। উত্তর-আধুনিকতাকে প্রায়ই ডিকনস্ট্রাকশন এবং পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজমের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রবণতা দেখা যায়। এবিষয়ে প্রখ্যাত গবেষিকা-লেখিকা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পীভাক বলেছেন — “The fall into abyss of deconstruction inspires us with as much pleasure as fear. We are intoxicated with the prospect of never hitting bottom.”
এই প্রসঙ্গে আধুনিক সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করা দরকার। এর প্রধান লক্ষণগুলি হল —
ক) যুক্তির পারম্পর্যকে ভাঙার সক্রিয় প্রয়াস।
খ) নগরকেন্দ্রিকতার প্রতি স্বাভাবিক ঝোঁক।
গ) ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার প্রতি গুরুত্ব আরোপ। বেশীর ভাগ রচনাতেই কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলি চিন্তাশীল বা ভাবুক প্রকৃতির।
ঘ) বহির্জগৎ অপেক্ষা মানুষের মনোজগৎকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা।
মানুষের মনোজগৎকে বাইরের জগৎ থেকে বেশী গুরুত্ব দেওয়ার জন্য জেমস জয়েস চেতনাপ্রবাহের (Stream of Consciousness) আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন ভার্জিনিয়া উলফ। তাঁদের মতে মানুষ বলতে কেবল বহিরাকৃতি বা বাহ্যিক অবয়বকে বোঝায় না, প্রকৃতপক্ষে বোঝায় মানুষের মন। মনের মধ্যে যেসব চিন্তাধারা ক্রিয়াশীল হয় সেগুলিকে তুলে ধরার জন্য চেতনাপ্রবাহের ব্যবহার করা হয়।
শিল্পের অন্যান্য ক্ষেত্রেও বাস্তববাদী ধারা বর্জিত হয় এবং নবযুগের সূত্রপাত ঘটে। শিল্পের জগতে যাঁরা পরিবর্তন এনেছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রধান ভূমিকায় ছিলেন মার্সেল দুশাঁ, জন ব্রাক, পাবলো পিকাসো, পল ক্লি প্রমুখ শিল্পীরা। দুশাঁ চেয়েছিলেন শিল্পের প্রথাগত ভাবনাকেই বদলে দিতে, তিনি স্পষ্টভাষায় বলেছিলেন — “I threw the bottle rack and the urinal in their faces as a challenge, and now they admire them for their aesthetic beauty.” সংগীতের জগতে যাঁরা নবযুগের দিশারী ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ক্লড দেবুসি, আর্নল্ড শোয়েনবার্গ এবং ইগর স্ত্রাভিনস্কি।
ভারতবর্ষে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে শিল্প-সাহিত্যে কোনও নতুন ধারার জন্ম হয়নি। ঔপনিবেশিক শাসকের থেকে মুক্তিলাভই ছিল তখন প্রধান লক্ষ্য। যে উপন্যাসগুলির মধ্যে সেই সময়ের রাজনৈতিক সংগ্রামের কথা উঠে এসেছে তার মধ্যে প্রথমেই থাকবে শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’। পরবর্তীকালে তারাশঙ্করের ‘ধাত্রীদেবতা’ বা সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘জাগরী’ উপন্যাসে সেই সময়ের রাজনৈতিক আন্দোলনের কথা আছে। ‘কল্লোল’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে যে লেখকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল তাঁদের মধ্যে আধুনিক হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও তাঁরা জানতেন না প্রকৃত আধুনিকতা বলতে কী বোঝায়। এই লেখকরা জয়েস, প্রুস্ত, কাফকা প্রভৃতির রচনা সম্বন্ধে কতটা অবহিত ছিলেন সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। রাশিয়ার ম্যাক্সিম গোর্কী ও নরওয়ের ন্যুট হ্যামসুনকে গুরু হিসেবে মেনে নিয়ে আধুনিক হওয়ার লক্ষ্যে তাঁরা রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের নিন্দাবাদে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। হ্যামসুনের উপন্যাস হাঙ্গার বা ভ্যাগাবন্ডস অনুসরণ করে যে ধারণা জন্মায়, তার ভিত্তিতে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসকে কাটাছেঁড়া করার প্রবণতা যে কতটা বিপজ্জ্নক তা বলার অপেক্ষা রাখে না!
গোটা ইউরোপে যখন বাস্তববাদী সাহিত্যের ধারার অবসান ঘটেছে তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সাহিত্যিকরা পিছনপানে হাঁটতে শুরু করেন। ইউরোপের সাহিত্যিকদের রচনা যত নগরকেন্দ্রিক হতে থাকে, বাংলার সাহিত্যিকদের রচনা ততই গ্রামকেন্দ্রিক তথা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। যে সাহিত্যিকরা নগরকেন্দ্রিক গল্প-উপন্যাস লিখেছিলেন তাঁদের অনেকের রচনাতেই নাগরিক চেতনার অভাব দেখা যায়। তাঁরা নগরের গল্প লিখেছেন বটে, কিন্তু তাঁদের মানসিকতায় গ্রাম্যতা প্রোথিত ছিল। আসলে নাগরিক চেতনা বলতে কী বোঝায় সে সম্পর্কে তাঁদের কোনও স্পষ্ট ধারণা ছিল না। বাংলা সাহিত্যে পরবর্তী পর্যায়েও উত্তর-আধুনিকতার সেরকম কোনও বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে না। তবে অল্প কয়েকজন লেখকের রচনায় বাস্তববাদ-বিরোধী সাহিত্যসৃষ্টির প্রবণতা দেখা গিয়েছে। এঁদের অবদান অবশ্যই উল্লেখয়োগ্য, কারণ তাঁরা বাস্তববাদী সাহিত্যের চেনা পথ পরিহার করে নতুন পথের খোঁজে বেরিয়েছেন।
সত্যি কথা বলতে গেলে যে অর্থে ইউরোপের সাহিত্যকে আধুনিক বলে ধরা হয় সেই অর্থে আমাদের সাহিত্য আধুনিক হয়ে ওঠেনি। আধুনিকতার সন্ধানে বেরিয়ে আমাদের লেখকরা এই ধারণায় উপনীত হন যে সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্গের মানুষজনদের নিয়ে লিখলেই রচনা জীবন্ত ও বাস্তব হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের থেকে অধিক বাস্তব চরিত্র খুঁজতে গিয়ে তাঁরা ভিক্ষুক, চোর, বারবণিতা, ধীবর, কৃষক, তাঁতি প্রভৃতির ভিতর থেকে নায়কের অনুসন্ধান করতে শুরু করেন। ফলে বাংলা সাহিত্যে এই ধরণের চরিত্রের আগমন শুরু হয়। এখানে মনে রাখতে হবে বিশ্বসাহিত্যের দিকপাল সাহিত্যিক লিও টলস্টয় অপর দিকপাল ম্যাক্সিম গোর্কীকে একদা বলেছিলেন — ‘. . . don’t look for heroes among thieves and beggars. Heroes are a lie, an invention. There are just people, people — nothing more or less.’
উত্তর-আধুনিক সাহিত্যের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমেই মনে রাখতে হবে এটি কোনও আন্দোলন নয় এবং কোনও বিশেষ লেখকগোষ্ঠী এর জন্ম দেননি। মোটের উপর উত্তর-আধুনিকতার সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি হল —
১. উত্তর-আধুনিক ধারার সাহিত্যিকরা বরাবরই বাস্তববাদী সাহিত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তাঁরা অ্যারিস্টটলের শিল্পবিষয়ক ধারণা (অর্থাৎ শিল্প জীবনের অনুকরণ করে) পরিত্যাগ করেছেন। তাঁরা মনে করেন জীবনের অনুকরণ করার পরিবর্তে শিল্প জীবন সৃষ্টি করে। সেই অর্থে তাঁদের সকলকেই anti-realist বলা যেতে পারে।
২. উত্তর-আধুনিক ধারার সাহিত্যিকরা গল্প বা উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক কাহিনী বর্জন করেছেন। আধুনিক ধারার সাহিত্যিকরা মনে করতেন মানুষের মনের গভীরে ডুব দিতে পারলেই তার সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য জানা যাবে। এই ধারনার বশবর্তী হয়ে তাঁরা মনস্তাত্ত্বিক কাহিনী রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন। কিন্তু এর ফলে তাঁদের রচনা বৈচিত্র্যহীন ও ক্লান্তিকর হয়ে পড়েছিল। উত্তর-আধুনিক সাহিত্যিকরা এই পথ পরিত্যাগ করেছেন।
৩. উত্তর-আধুনিক ধারার সাহিত্যে বিশেষ কোনও রচনারীতির প্রতি ঝোঁক দেখা যায় না। এর ফলে একই রচনায় বিভিন্ন রীতির সুষম মিশ্রণ দেখা যায়।
৪. উত্তর-আধুনিক সাহিত্য জীবনকে অনুকরণ করে না বলে লেখক তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে এখানে পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করতে পারেন। যুক্তিগ্রাহ্য পরম্পরায় আস্থা রাখেন না বলে নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করতে গিয়ে তিনি অনায়াসে অলৌকিক ঘটনার আশ্রয় নেন।
৫. উত্তর-আধুনিক সাহিত্য খুব বেশী করে কৌতুক দেখা যায়, কারণ এই ধারার লেখকরা সবকিছুই কৌতুকোর সাহায্যে বলতে পছন্দ করেন। বস্তুত আধুনিক সাহিত্যিকের কাছে যেগুলি গম্ভীর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্তর-আধুনিক সাহিত্যিকের কাছে সেগুলি কৌতুকের বিষয়। পাশাপাশি উত্তর-আধুনিক সাহিত্যে প্যারোডির প্রতি লেখকদের অনুরাগ অধিকমাত্রায় ফুটে ওঠে।
৬. উত্তর-আধুনিক সাহিত্যে গোয়েন্দা কাহিনি, বিজ্ঞানভিত্তিক কাহিনি বা হালকা চালের কাহিনীকে মোটেই দূরে সরিয়ে রাখা হয় না, বরং তাদের রচনাকৌশলকে ব্যবহার করা হয়। এখানে সিরিয়াস সাহিত্যের সঙ্গে হালকা চালের সাহিত্যের মিশেল চোখে পড়ে। কোথাও কোথাও গল্পের মধ্যে ছবির ব্যবহার দেখা যায়। আবার কোথাও বা হরফকে ছবির মত করে সজ্জিত করার প্রচেষ্টা দেখা যায়।
৭. উত্তর-আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল meta-fiction, অর্থাৎ কীভাবে গল্পের জন্ম হল তা নিয়ে গল্প লেখা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় রামায়ণের জন্মকথা বা কথাসরিৎসাগরের জন্মকথা হল meta-fiction।
৮. উত্তর-আধুনিক ধারায় লিখিত ঐতিহাসিক উপন্যাসে স্বীকৃত ইতিহাসের বদলে অনেক সময়ে স্বীকৃতিবিহীন ইতিহাসকে তুলে ধরা হয়।
৯. উত্তর-আধুনিক ধারার সাহিত্যে গল্পহীনতা যেমন আছে, তেমনই গল্প বলার প্রবণতাও আছে। আবার অনেক উপন্যাসের নির্দিষ্ট কোনও কাহিনী নেই। বরং তার পরিবর্তে আছে একটি বিশেষ বিষয়কে কেন্দ্র করে নানা গল্প। সম্ভবতঃ এই বৈশিষ্ট্যটি এসেছে সঙ্গীতের প্রভাবে।
১০. উত্তর-আধুনিক সাহিত্যে স্বপ্ন ও বাস্তবের বিভাজন রেখা সচেতনভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। বর্তমানের অন্যতম রীতি হল স্বপ্নকে বাস্তবের মত করে পরিবেশন করা এবং বাস্তবকে স্বপ্নের মত করে বর্ণনা করা।
বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গণে বিচরণকারী যে লেখকদের মধ্যে উত্তর আধুনিকতার বৈশিষ্ট্যগুলি দেখা যায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম আর্জেন্টিনার হোর্হে লুই বোর্হেস, মেক্সিকোর কার্লোস ফুয়েন্তেস, কলম্বিয়ার গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, কিউবার রেনাল্ডো অ্যারেনাস এবং ক্যাব্রেরা ইনফ্যান্টে, পেরুর হেনরি ভাগাস ইয়োসা, চেকোশ্লোভাকিয়াজাত ফরাসী লেখক মিলান কুন্দেরা, ইতালির ইতালো ক্যালভিনো এবং উমবার্তো একো, জার্মানির গুন্টার গ্রাস, আমেরিকার জন বার্থ, ক্যুর্ট ভনেগাট এবং ডোনাল্ড বার্থেলম্ প্রমুখ। কীভাবে তাঁদের রচনায় উত্তর-আধুনিকতা লক্ষণগুলি ফুটে উঠেছে সেটা ব্যাখ্যা করার জন্য কয়েকটি উদাহরণ দেব। থিয়োডোর অ্যাডর্নো এক জায়গায় লিখেছেন — “In the end the soul is itself the longing of the soulless for salvation.” এই ধরণের দার্শনিকতাপূর্ণ মন্তব্য বাস্তববাদী লেখকের রচনায় পাওয়া যাবে না। এর কারণ হল উত্তর-আধুনিকতা সাহিত্যের ক্ষেত্রকে অনেক বেশী প্রসারিত করে দিয়েছে। আবার বোর্হেস লিখেছেন — “So my life is a point-counterpoint, a kind of fugue, and a falling away — and everything winds up being lost to me, and everything falls into oblivion, or into the hands of the other man.” এখানে লেখক যা বলতে চাইছেন তা অত্যন্ত স্পষ্ট, কিন্তু তথাকথিত বাস্তববাদী রীতির থেকে তাঁর বলার ভঙ্গী একেবারে আলাদা। ‘If on a Winter’s Night a Traveler’ রচনাটিতে ইতালো ক্যালভিনো লিখেছেন – “Do you believe that every story must have a beginning and an end? In ancient times a story could end only in two ways: having passed all the tests, the hero and the heroine married, or else they died. The ultimate meaning to which all stories refer has two faces: the continuity of life, the inevitability of death.” এই হল উত্তর-আধুনিক ধারার সাহিত্যিকের প্রকাশভঙ্গী।
জেমস জয়েস-এর ‘ফিনেগানস ওয়েক’ থেকে যদি উত্তর-আধুনিকতার আদিপর্বের যাত্রা শুরু বলে ধরি তাহলে পরবতীকালে এই ধারায় লেখা সাহিত্যের আদর্শ উদাহরণ হল স্যামুয়েল বেকেট রচিত ট্রিলজি ‘মলয়’, ‘ম্যালোন ডাইস’ এবং ‘দি আননেমেবল’। দ্বিতীয় পর্বে ডেভিড ফস্টার ওয়েলস রচিত ‘ইনফাইনাইট জেস্ট’, উইলিয়ম এস বারোস রচিত ‘নেকেড লাঞ্চ’, টমাস পিঞ্চন রচিত উপন্যাস ‘গ্র্যাভিটিজ রেইনবো’, জোসেফ হেলার রচিত ‘ক্যাচ-২২’, হোর্হে লুই বোর্হেস রচিত ‘ল্যাবাইরিন্থস’ এবং ক্যুর্ট ভনেগাট রচিত ‘ব্রেকফাস্ট অব চ্যম্পিয়নস’ প্রভৃতি রচনাও উত্তর-আধুনিকতার ধারার প্রতিনিধি। তাছাড়া জন বার্থ-এর গল্প ‘লস্ট ইন দ্য ফানহাউস’ বা টনি কুশনার-এর নাটক ‘অ্যাঞ্জেলস ইন আমেরিকা’ উত্তর-আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য বহন করে।
উপসংহারে উত্তর-আধুনিকতার নিদর্শন হিসেবে উমবার্তো একোর রচনা থেকে একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি — “I think of postmodern attitude as that of a man who loves a very beautiful woman and knows that he cannot say to her ‘I love you madly’ because he knows that she knows (and that she knows he knows) that these words have already been written by Barbara Cartland.” এই পর্যন্ত বলে তিনি থেমে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি এখানেই থেমে গেলেন না, কেননা সেটা উত্তর-আধুনিক ধারার সাহিত্যরীতির চরিত্রলক্ষণ নয়। তিনি যেমন সমস্যা উথ্থাপন করলেন তেমনই আরও একধাপ এগিয়ে তার সমাধানও উপহার দিলেন — “Still there is a solution. He can say ‘As Barbara Cartland would put it, I love you madly.’ At this point, having avoided false innocence, having said clearly it is not possible to talk innocently; he will nevertheless say what he wanted to say to the woman: that he loves her in an age of innocence.”


