জিজীবিষা

জিজীবিষা

ধারাবাহিক উপন্যাস 

সুরঞ্জিত সরকার

নবম পর্ব

সকলকে নিয়ে ইন্দ্র কাকুর গাড়ি কৈপুকুরের কালো পিচের রাস্তা ধরে পূরবী ভবনের দিকে তীব্র গতিতে ছুটছিল। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের আলোয় চারপাশটা আবছা। হঠাৎ একটি বাঁকের মুখে হেডলাইটের তীব্র আলোয় সুমন্তদের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। মাঝরাস্তায় আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে আছে সেই কুখ্যাত নীল রঙের গাড়িটি।

নীল গাড়ি থেকে নেমে এল চারজন দীর্ঘকায় পুরুষ। তাদের প্রত্যেকের বুকে সেই রক্তবর্ণ ত্রিশূল চিহ্ন। মাঝখানে দাঁড়িয়ে সেই কালো কোট পরা লোকটা, যার চোখে এখন প্রতিহিংসার আগুন। সে কর্কশ গলায় চিৎকার করে বলল, “অতীশ বাবু, অনেক চোর-পুলিশ খেলা হয়েছে। এবার ওই ডায়েরি আর মেডেলিনটা আমাদের হাতে তুলে দিন, নইলে জ্যান্ত ফিরবেন না।”

গাড়ির ভেতর থেকে দাদু অতীশ শান্ত গলায় সুমন্তকে বললেন, “ভয় পাস না। মেডেলিনটা শক্ত করে ধরে রাখ।” 

দাদু গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে সেই মরচে ধরা কম্পাস। তিনি লোকটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “সরকার বংশের জিজীবিষা তোমাদের মতো ভাড়াটে গুন্ডাদের জন্য নয়। এটা রক্তের অধিকার।”

ঠিক সেই মুহূর্তেই অন্ধকারের বুক চিরে পুলিশের সাইরেনের শব্দ শোনা গেল। সুমন্ত ফোন কেটে দেওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৌরীশদা তাঁর টিম নিয়ে পৌঁছে গেছেন। নীল গাড়িটি পালানোর চেষ্টা করার আগেই পুলিশ চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল। সুমন্ত সৌরীশদাকে আগেই জানিয়েছিল যে ত্রিশূল সংগঠনের মূল ঘাঁটি এখন পূরবী ভবনের আশেপাশে। সৌরীশদা কৌশলে দুই ভাগে পুলিশ বাহিনীকে ভাগ করলেন। এক দল রাস্তায় অপরাধীদের কবজা করতে শ্যামপুকুর থানার বড়বাবুর নেতৃত্বে রাইফেলের সেফটি ক্যাচ নামিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। আর অন্য একটি বিশেষ দল সৌরীশবাবুর নেতৃত্বে সুমন্ত ও কল্যাণকে নিয়ে সরাসরি হানা দিল পূরবী ভবনের দিকে। 

এমন সময় ত্রিশূল বাহিনীর লোকজন খঞ্জর নিয়ে তেড়ে আসতেই পুলিশের তরফে বড়বাবু আকাশের দিকে এক রাউন্ড গুলি ছুড়লেন এবং তাঁদেরকে আত্মসমর্পণ করার জন্য ঘোষনা করলেন। একটু ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ত্রিশূল বাহিনীর লোকজন থমকে গেল।  চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে রাইফেলের গুলির শব্দে পাখিরা কিচিরমিচির করে উড়ে গেল।

হঠাৎ জঙ্গলের দিক থেকে একটা হিমশীতল হাওয়া বয়ে এল। নীল গাড়ির টায়ারগুলো যেন আপনাআপনি ফুটো হয়ে বসে যেতে লাগল। কালো কোট পরা লোকটা অবাক হয়ে দেখল, তার গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে কুয়াশার মধ্যে একটি নারীমূর্তির হাতের ছাপ ফুটে উঠছে—ঠিক যেমনটা লাইব্রেরি ঘরে হয়েছিল। ঠাকুমা পূরবী দেবী এখানেও ছায়ার মতো তাদের আগলে রেখেছেন।

কালো কোট পরা সেই লোকটি ও তাঁর দলের লোকজন পুলিশের জালে ধরা পড়ল। বড়বাবু তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, “সরকার বংশের সম্পদ হাতানোর চেষ্টা অনেকদিন ধরেই নজরদারিতে ছিল। আজ রাতে তোমাদের খেলা শেষ”। দাদু অতীশ পুলিশের এই তৎপরতা দেখে অভিভূত হলেন।

সৌরীশবাবু, সুমন্ত ও কল্যাণ—তিনজনে মিলে যখন ‘পূরবী ভবন’-এর ধুলোমাখা তিনতলায় ঠাকুমা পূরবী দেবীর ঠাকুর ঘরে পৌঁছালেন, তখন পরিবেশটা এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ভরা। ঠাকুর ঘরের সিংহাসনের ঠিক পেছনে একটি বড় কাঠের আলমারি সরাতেই বেরিয়ে এল এক গোপন কুঠুরী।

কুঠুরীর ভেতরে ঢুকতেই সৌরীশবাবু টর্চের আলো ফেললেন। সেখানে ধুলোমাখা প্রাচীন সিন্দুকের পাশে রাখা ছিল দ্বিতীয় নীল পাথরটি, যা মেডেলিনের সেই খালি চোখে বসানোর জন্য নিখুঁত। কিন্তু তার পাশেই স্তূপাকার করে রাখা সরকার বংশের সম্পত্তির জাল নথি দেখে সুমন্তর কপালে ভাঁজ পড়ল। 

সৌরীশদা গম্ভীর গলায় বললেন, “ত্রিশূল সংগঠন শুধু তোদের সম্পত্তি হাতাতে চায়নি, তারা এই পবিত্র বাড়িটাকে অপরাধের আখড়া বানিয়ে ফেলেছে।”

ঘরের এক কোণে রাখা কিছু সিল করা কার্টন খুলে সৌরীশদা দেখলেন সেগুলো দামী মাদক ও নিষিদ্ধ ড্রাগ। শুধু তাই নয়, ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কিছু অপরিচিত মহিলাদের অশ্লীল ছবি এবং ডায়েরির সাংকেতিক লিপি দেখে পরিষ্কার বোঝা গেল যে, ওপার বাংলার এই সংগঠনটি এই পরিত্যক্ত বাড়ির নির্জনতাকে কাজে লাগিয়ে একটি আন্তর্জাতিক দেহব্যবসা ও মাদক পাচার চক্র চালাচ্ছিল।

কল্যাণ ঠাকুর ঘরের এই অপবিত্রতা দেখে শিউরে উঠল। সে দেওয়ালে টাঙানো ঠাকুমার ছবির দিকে তাকিয়ে দেখল, সেই শান্ত চাহনি যেন এখন এক গভীর বেদনায় ভরা।

সুমন্ত ফিসফিস করে বলল, “দাদু হয়তো এই নোংরামির আঁচ পেয়েছিল, তাই আমাদের জিজীবিষার নকশা দিয়ে এখানে পাঠিয়েছিল যাতে আমরা আমাদের আদি ভিটে এই নরক থেকে উদ্ধার করি।”

সৌরীশদা ওয়্যারলেসে নির্দেশ দিলেন, “সিল করো এই এরিয়া! ফরেনসিক টিমকে ডাকো। এই বাড়িতে যারা আসা-যাওয়া করত, সেই লিস্ট চাই আমার।” তিনি মেডেলিন আর উদ্ধার হওয়া নীল পাথরটা নিজের হেফাজতে নিলেন।

এদিকে দাদু ও ইন্দ্র কাকুও পূরবী ভবনের নীচে পৌঁছে গেছেন। নীচে নেমে যখন এই নারকীয় ঘটনার কথা দাদুকে জানানো হলো, তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “জিজীবিষার অর্থ হলো বেঁচে থাকার ইচ্ছা, কিন্তু এই পাপীরা সেই ইচ্ছাকেই কলুষিত করেছে।”

এরপর সবাই থানায় পৌছাল। থানায় সৌরীশবাবুর চেম্বারে টেবিলের ওপর রাখা সেই নীল ডায়েরিটা যেন এক জীবন্ত ইতিহাস হয়ে ধরা দিল। সৌরীশবাবু চশমাটা ঠিক করে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ডায়েরির শেষ পাতাগুলো পড়তে শুরু করলেন। সুমন্ত, কল্যাণ ও দাদু অতীশ রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছেন।

ডায়েরির পাতায় স্পষ্টাক্ষরে লেখা আছে ওপার বাংলার ঢাকার মেহেদিপুরের পৈতৃক ভিটের বর্ণনা। সৌরীশবাবু পাঠ করলেন, “সরকার বংশের আদি বসতভিটের নিচের ভূগর্ভস্থ কক্ষে সিন্দুকের মধ্যে সঞ্চিত আছে বংশপরম্পরায় অর্জিত বিপুল স্বর্ণালঙ্কার ও অর্থ।” 

এই জিজীবিষা আসলে সেই হারানো ঐশ্বর্য ফিরে পাওয়ার এক মানচিত্র। ডায়েরির ভেতর থেকে একটি পুরনো সাদা-কালো ছবি বেরিয়ে এল। ছবিতে দাদুর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণকে দেখিয়ে অতীশ আর্তনাদ করে উঠলেন, “শিমুল! আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় অনুজ বন্ধু শিমুল সরকার!” 

সৌরীশবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, “অতীশ বাবু, আপনার এই বন্ধুই আসলে ‘ত্রিশূল’ সংগঠনের প্রধান মস্তিষ্ক। আপনারা চলে আসার পর সে ওপার বাংলার সম্পত্তি তো আগেই হাতিয়ে নিয়েছে, এখন এদিকের পূরবী ভবনকেও সে তার অপরাধের স্বর্গরাজ্য বানিয়ে ফেলেছে। আমার ধারনা আপনার পরিচিত আরও অনেকে জড়িত আছে। আমরা অনেকদিন ধরেই লিংক খোঁজার চেষ্টা করছিলাম। সুমন্ত সেদিন ফোন করে মোবাইল হারানোর কথা বলতেই ওকে আমি সাবধান করে দিয়েছিলাম। তবে যতটুকু তদন্ত হয়েছে তাতে এটুকু বলতে পারি শিমুল সরকার সুকৌশলে সই জাল করে আপনার পূর্বপুরুষের মেহেদিপুরের সম্পত্তি নিজের নামে করে নিয়েছে। ওর তিন রকম ধর্মাবলম্বী নামের খোঁজ পেয়েছি আমরা। কিন্তু সেই গুপ্তধনের সিন্দুক খোলার জন্য প্রয়োজন ছিল এই মেডেলিন আর দ্বিতীয় নীল পাথরটি, যা এই এপার বাংলার পূরবী ভবনে লুকানো ছিল। সেই লোভেই সে ত্রিশূল বাহিনীকে পাঠিয়েছিল সুমন্তদের ওপর হামলা করতে।”

সুমন্ত মুষ্টিবদ্ধ হাতে বলল, “তার মানে দাদু আমাদের জিজীবিষার নকশা দিয়ে আসলে এই বিশ্বাসঘাতকতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলেন।” 

কল্যাণ যোগ করল, “আর দিদা চেয়েছিল আমরা যেন শিমুল কাকার এই নোংরা খেলার অবসান ঘটাই।”

সৌরীশবাবু ইন্টারপোলের মাধ্যমে ওপার বাংলার পুলিশের সাথে যোগাযোগের তোড়জোড় শুরু করলেন। 

তিনি বললেন, “অতীশ বাবু, শিমুল সরকার এখন কোথায় আত্মগোপন করে আছে সেটাই এখন দেখার বিষয়। আমাদের এবার বর্ডার পেরিয়ে সেই মেহেদিপুরের আদি ভিটেতে হানা দিতে হবে।”

মেহেদিপুরের ভিটার কথা শোনামাত্রই অতীশের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল।  কিন্তু বয়সের ভারে তিনি কি যেতে পারবেন?

(… চলবে )

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

Letest Cover Stories

সকল কাঁটা ধন্য করে

সৌপর্ণ পাল      “এক্সকিউজ মি এটা ফাইন আর্টসের লাইন? না মানে ওটার ক্যাম্পাস তো জোড়াসাঁকোতে আর মেনষ্ট্রিম গুলো বি.টি রোডে একটু কনফার্ম হয়ে লাইনে

Read More »

রোদ্দুর : The Sunshine পত্রিকার শারদ ১৪৩৩ (২০২৬) সংখ্যার লেখা আহ্বান 

রোদ্দুর পত্রিকা সাহিত্যের এক বিশ্ব অঙ্গন। মানুষের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও চিন্তার যে অন্তহীন যাত্রা—তারই বহুমাত্রিক প্রতিফলন সাহিত্য। ভাষা, দেশ ও কালের সীমা অতিক্রম করে সাহিত্য

Read More »

Privious Cover Stories

সকল কাঁটা ধন্য করে

সৌপর্ণ পাল      “এক্সকিউজ মি এটা ফাইন আর্টসের লাইন? না মানে ওটার ক্যাম্পাস তো জোড়াসাঁকোতে আর মেনষ্ট্রিম গুলো বি.টি রোডে একটু কনফার্ম হয়ে লাইনে

Read More »

রোদ্দুর : The Sunshine পত্রিকার শারদ ১৪৩৩ (২০২৬) সংখ্যার লেখা আহ্বান 

রোদ্দুর পত্রিকা সাহিত্যের এক বিশ্ব অঙ্গন। মানুষের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও চিন্তার যে অন্তহীন যাত্রা—তারই বহুমাত্রিক প্রতিফলন সাহিত্য। ভাষা, দেশ ও কালের সীমা অতিক্রম করে সাহিত্য

Read More »

ঊর্ণনাভ 

শ্যামলী রক্ষিত  || পঞ্চম পর্ব || ইস্‌, কত বেলা হয়ে গেছে! ঘুম ভাঙার পর জানলা দিয়ে চোখ চলে গিয়েছিল বাইরের দিকে। তুষারের সারা শরীর কেমন রিরিক

Read More »