এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

 The Blind Owl (অবলম্বনে)

  কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত

  বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস

অষ্টম পর্ব

তার কালো পোশাকের প্রান্ত সামান‍্য সরাতেই, জমাট বাঁধা রক্ত আর কিলবিল করা কীটের ভিতর দেখলাম তার দুটি দীর্ঘ কালো চোখ, সম্পূর্ণ অনুভূতিহীন দুটি চোখ, স্থির হয়ে চেয়ে আছে আমার দিকে। আমার জীবন যেন সেই চোখ দুটির অতলে তলিয়ে গেল। আমি তড়িঘড়ি সুটকেস বন্ধ করলাম, তার ওপর মাটি চাপা দিলাম।তারপর মাটির ওপর ততক্ষণ হেঁটে বেড়ালাম যতক্ষণ না সেটা শক্ত হয়ে বসে যায়। তারপর কিছু গন্ধহীন কালো লিলি নিয়ে এসে তার কবরের ওপর রাখলাম। কিছু পাথর আর বালি এনে কবরের ওপর ছড়িয়ে দিলাম, যাতে সমস্ত চিহ্ন মুছে যায়।এতটাই নিখুঁতভাবে যে কেউ এমনকি আমিও আর আলাদা করতে না পারি তার কবর।
কাজ শেষ করে নিজের দিকে তাকালাম। আমার ময়লা, ছেঁড়া পোশাকে জমাট রক্তের একটি কালো দাগ লেগে ছিল। দুটো সোনালি মৌমাছি আমার চারপাশে উড়ছিল,আর ছোট ছোট কৃমি কিলবিল করতে করতে আমার গায়ে লেপ্টে ছিল। আমি জামার শেষ প্রান্ত থেকে রক্তের দাগটা মুছতে চেষ্টা করলাম।কিন্তু যতই লালা দিয়ে হাতাটা ভিজিয়ে দাগের ওপর ঘষছিলাম, ততই দাগটা আরো গাঢ় হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল। কিছুক্ষণের মধ‍্যেই দাগটা আমার পুরো শরীর ঢেকে ফেলল। জমাট রক্তের শীতল শিহরণ অনুভব করলাম।
সূর্য তখন প্রায় অস্তাচলে। হালকা বৃষ্টি পড়ছে। আমি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে হাঁটতে শুরু করলাম। শববাহনের চাকার দাগ অনুসরণ করে যান্ত্রিকভাবে হাঁটছি। কিন্তু অন্ধকার ঘন হতেই সেই দাগও হারিয়ে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে ধীরে ধীরে, উদ্দেশ্যহীন, ভাবনাহীন এবং চেষ্টাবিহীন হাঁটতে থাকলাম কোনো এক অজানা গন্তব‍্যের দিকে।আমি তাকে হারিয়ে ফেলেছি! জমাট রক্তের মধ্যে সেই দীর্ঘ দুটি চোখ আমি দেখেছি। আর এখন আমি হাঁটছি গভীর অন্ধকার রাতে! কারণ যে চোখ দুটো আমার জীবনের দিশা দেখিয়ে ছিল সেগুলো চিরতরে নিভে গিয়ে আমার পুরো জীবনকে ঢেকে দিয়েছে এক গভীর অন্ধকারে। কোথাও পৌঁছানোর ছিল না আমার। ছিল না কোনো আশ্রয়ের প্রয়োজনও। হয়তো আর কখনোই কোনো গন্তব্যে পৌঁছব না।এক নিটোল নীরবতা সবকিছুকে ঢেকে ফেলেছিল। মনে হচ্ছিল সবাই আমাকে পরিত্যাগ করেছে। আমি আশ্রয় নিয়েছি এক নিষ্প্রাণ মহাবিশ্বের মধ্যে।
প্রাকৃতির চক্রের সঙ্গে একপ্রকার সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল।ঘন অন্ধকার নেমে এসেছিল আত্মার ওপর।এই অন্ধকারের ভাষা মরণশীল প্রাণীদের বোধগম‍্য হওয়ার নয়।নেশার তীব্রতায় শরীর ঝিমঝিম করছে।মনে হচ্ছিল বমি হবে!আমি পায়ে কোনো জোর পাচ্ছিলাম না।ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল।কোনোক্রমে পথের পাশের কবরস্থানটির ভিতর ঢুকে একটি সমাধিপাথরের ওপর বসে পড়লাম।যখন বিমূঢ় হয়ে দু হাতে মাথা চেপে ধরে বসে ছিলাম ঠিক তখনই সেই শুকনো কর্কশ হাসির প্রতিধ্বনি আমাকে ঝাঁকুনি দিয়ে বাস্তবে ফিরিয়ে আনলো।যেদিক থেকে শব্দটা আসছিল সেদিকে ফিরে তাকালাম।একটা অবয়ব যার মুখ ও মাথা একটুকরো কাপড়ে আবৃত। সে এসে আমার পাশে বসল। ন‍্যাকড়া জড়ানো কিছু একটা বগলদাবা করে রেখেছে। আমার দিকে ফিরে বললো,’ আমি নিশ্চিত, তুমি শহরে যেতে গিয়ে পথ হারিয়েছ! হ‍্যাঁ।হয়ত নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করছ,আমি এই গভীর রাতে এই কবর স্থানে কি করছি?চিন্তা কোরো না, মৃতদের নিয়েই আমার কারবার। আমি একজন পেশাদার কবর খননকারী।হ‍্যাঁ?এই চত্বরের কোণাকাঞ্চি আমার নখদর্পণে।এই যেমন ধরো আজই একটি কবর খুঁড়তে গিয়ে এই পাত্রটি খুঁজে পেলাম।ভাবতে পারো?এটা প্রাচীন রে নগরীর একটা প্রত্ন পাত্র!হ‍্যাঁ?বেশ ধরে নাও এটা একটা বেকার জিনিস।আমি তোমায় এটা দিলাম আমার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দিতে। কেমন?’
আমি পকেটে হাত ঢুকিয়ে দুটি কিরাণ এবং একটি আব্বাসি বার করে আনলাম তাকে দেবার উদ্দেশ‍্যে।বৃদ্ধ লোকটি তার কদর্য শুষ্ক হাসি হেসে বললো ‘আরে না না।ছাড়ো তো!আমি তোমায় চিনি।কোথায় থাকো তাও জানি।ওই দেখ, ওই কোণে আমার ঘোড়াগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।আমি তোমায় বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি।কেমন?মাত্র কয়েক পা গেলেই…’
পাত্রটা আমার কোলের ওপর রেখেই সে উঠে পড়ল। কাঁধ ঝাঁকিয়ে এমন ভয়ানক হাসছিল…আমি পাত্রটা হাতে নিয়ে তার হাসির দমকে ফুলে ওঠা অবয়বের পিছু নিলাম।পথের বাঁকে যেখানে একটি লজ্ঝড়ে শববাহী গাড়ি ও দুটি শীর্ণ কালো ঘোড়া দাঁড়িয়ে ছিল।অস্বাভাবিক তৎপরতায় সেই বৃদ্ধ মানুষটি গাড়িতে উঠে চালকের আসনে বসে পড়ল।আর আমি বসলাম কফিনের জন‍্যে নির্দিষ্ট জায়গাটিতে।
পাত্রটা বুকে চেপে ধরে ঘাড় উঁচিয়ে বাইরের দৃশ‍্য দেখতে থাকলাম।
তার হাতের উদ‍্যত চাবুক বাতাসের গায়ে সোঁ সোঁ শব্দ তুলল।আর সেই হেঁপো ঘোড়াদুটি দীর্ঘ কোমল উলম্ফনে চলতে শুরু করল।তাদের ক্ষুর বড় নিঃশব্দ কোমলতায় মাটি স্পর্শ করছিল।সেই সান্দ্র আবহে তাদের কন্ঠে ঝোলানো ঘন্টিগুলি এক অদ্ভুত ধ্বনি সৃষ্টি করছিল।মেঘের আড়াল থেকে কোনো উজ্বল চোখের মণির মত নক্ষত্রেরা জমাট রক্তের ভিতর থেকে ধরণীর ওপর দৃষ্টি রাখছিল।এক মধুর স্বস্তি ছেয়ে যাচ্ছিল আমাতে;কেবলমাত্র সেই পাত্রটি,যেন একটা মৃতদেহের ভার নিয়ে আমার বুকের ওপর বসে রইল।

ভয় হচ্ছিল এই অন্ধকারে তারা পিছলে না পড়ে ,জড়ামড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকা গাছেরা আর তাদের প‍্যাঁচানো শাখা প্রশাখা দেখে মনে হচ্ছিল যেন পরস্পর হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে।রাস্তার দুধারে কিছু অদ্ভুত ভাঙাচোরা জ‍্যামিতিক আকৃতির ঘরবাড়ি আর কয়েকটা কালো জানালা। জোনাকি পোকার দেহ নির্গত এক প্রকার টিমটিমে ঘোলাটে আভার মত কিছু,ঘরগুলির দেয়াল থেকে ঠিকরে পড়ছিল।কেমন একটা অদ্ভুতুড়ে অনুভূতির সৃষ্টি হচ্ছিল।গাছেদের সারিগুলি এভাবে জটপাকিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছিল যেন কালো লিলির লতায় পা জড়িয়ে একে অন‍্যের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে।মৃতদেহের গন্ধ,পচা মাংসের গন্ধ আমার চেতনাকে গিলে ফেলেছিল।গন্ধটা যেন সর্বদাই আমার শরীর ভেদ করে ঢুকে পড়ছে!যেন আমি আজন্ম একটা কালো কফিনের ভিতর জীবন অতিবাহিত করেছি। এখন এই ঘন কুয়াশার ভিতর এক ন‍্যুজ্বদেহ বৃদ্ধের ভাসমান ছায়ার দ্বারা বাহিত হচ্ছি যার মুখ আমি দেখতে পাইনি।
গাড়ি থামতেই আমি পাত্রটা হাতে নিয়ে নেমে পড়লাম আমার বাড়ির দোরগোড়ায়।এক ছুটে ঘরে ঢুকেই পাত্রটা টেবিলের ওপর রাখলাম।আলমারিতে লুকোএ রাখা টিনের কোটো যেটা পয়সা জমানোর ভাড় হিসেবে ব‍্যবহারতাম সেটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলাম সেই বৃদ্ধ গাড়োয়ানকে বখশিস দেব বলে।কিন্তু তিনি ততক্ষণে অদৃশ‍্য হয়েছেন।ঘরে ফিরে এসে আলো জ্বালালাম।রুমাল সরিয়ে পাত্রটাকে আমার জামার হাতায় ধুলো ঝেড়ে সাফ করতে লাগলাম।পাত্রটার পুরনো স্বচ্ছ চকচকে বেগুনি রং ফিরে এলো যেটা ধুলোর আস্তরনে সোনালি মৌমাছির মত রং নিয়ে ছিল।পাত্রটির একপিঠে একটি রম্বসাকৃতির চারপাশে কালো লিলির সীমানা আঁকা।আর সেই রম্বসের মাঝখানে এক দীঘল চোখের নারীর মুখচ্ছবি।যার চোখদুটি দীর্ঘ এবং কালো।স্বাভাবিকের থেকে দীর্ঘ!সেই চোখদুটি আমাকে ভর্ৎসনা করছে অজ্ঞাত কোনো ক্ষমাহীন অপরাধের জন‍্যে।
স্তব্ধ করে দেওয়া চোখ দুটি একইসঙ্গে চিন্তিত ও হতবাক ও আক্রমণাত্মক আবার আশাপ্রদও বটে।সেই ত্রস্ত দুটি চোখের ছিল নেশা ধরানো গভীরতা, বিচ্ছুরিত অলৌকিক আলো।তার সুউচ্চ কপোল,প্রসস্ত ললাট,দুটি বাঁকা জোড়া-ভ্রূ,ভরাট ঈষতোন্মুক্ত ঠোঁট আর নিরাবরণ কেশরাশি যার একটি গুচ্ছ রগের সাথে সেঁটে ছিল।
যে চিত্রটা গত রাতে এঁকে ছিলাম সেটি টিনের কৌটো থেকে বার করে দুটি চিত্রের মধ‍্যে তুলনা করে দেখলাম আমার আঁকা চিত্রটির সঙ্গে ওই কাঁচের জারের ছবিটির কোনো তফাতই নেই।বলা যায় তারা যেন একে অন‍্যের প্রতিচ্ছবি।হুবহু এক এবং কোনো একজন অভাগা কলমের খাপের চিত্রকর তাদেরকে চিত্রিত করেছে।সম্ভবত ছবিটা আঁকার সময় সেই প্রাচীন চিত্রকরের আত্মা আমার হাতের ওপর ভর করেছে।চিত্রদুটি অভিন্ন; শুধুমাত্র আমার আঁকা ছবিটির উপাদান কাগজ অন‍্যদিকে কাঁচের পাত্রের ছবিটিতে একপ্রকার রহস‍্যময় স্বচ্ছ সাবেক জেল্লা ও আশ্চর্য সজীবতা দান করেছিল।তার চোখের গভীরে শয়তানের অশুভ শিখা জ্বলজ্বল করছিল। না,এটা অবিশ্বাস্য! সেই একই ভাবলেশহীন আয়ত চোখ।একাধারে গোপনীয় এবং মুক্তস্বভাবা।কেউই বুঝবে না আমার সেইমুহূর্তের অনুভূতি, আমি নিজেই নিজের থেকে পালাতে চাইছিলাম। সেটা কি সত্যিই সম্ভব? আমার জীবনের সকল দুর্ভাগ্য যেন আমারই চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠলো।একজন মানুষের চোখে কি আমার জীবনে যথেষ্ট ছিল না! যে আরো একজোড়া চোখ আমার দিকে চেয়ে থাকবে?
না এটা একেবারেই অসহ্য। সেই চোখ, যাকে পাহাড়ের কোলে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল, সাইপ্রাস গাছের গোড়ায়, শুকনো নদীর কিনারে, কালো লিলির নিচে পুঁতে দেওয়া সেই চোখ,সেই চোখ,যাকে ইঁদুর ও পতঙ্গের মহা ভোজের জন্য রেখে আসা হয়েছিল! প্রাণ প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ সেই দুটি চোখ, আমার দিকে চেয়ে আছে!

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

Letest Cover Stories

সকল কাঁটা ধন্য করে

সৌপর্ণ পাল      “এক্সকিউজ মি এটা ফাইন আর্টসের লাইন? না মানে ওটার ক্যাম্পাস তো জোড়াসাঁকোতে আর মেনষ্ট্রিম গুলো বি.টি রোডে একটু কনফার্ম হয়ে লাইনে

Read More »

রোদ্দুর : The Sunshine পত্রিকার শারদ ১৪৩৩ (২০২৬) সংখ্যার লেখা আহ্বান 

রোদ্দুর পত্রিকা সাহিত্যের এক বিশ্ব অঙ্গন। মানুষের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও চিন্তার যে অন্তহীন যাত্রা—তারই বহুমাত্রিক প্রতিফলন সাহিত্য। ভাষা, দেশ ও কালের সীমা অতিক্রম করে সাহিত্য

Read More »

Privious Cover Stories

সকল কাঁটা ধন্য করে

সৌপর্ণ পাল      “এক্সকিউজ মি এটা ফাইন আর্টসের লাইন? না মানে ওটার ক্যাম্পাস তো জোড়াসাঁকোতে আর মেনষ্ট্রিম গুলো বি.টি রোডে একটু কনফার্ম হয়ে লাইনে

Read More »

রোদ্দুর : The Sunshine পত্রিকার শারদ ১৪৩৩ (২০২৬) সংখ্যার লেখা আহ্বান 

রোদ্দুর পত্রিকা সাহিত্যের এক বিশ্ব অঙ্গন। মানুষের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও চিন্তার যে অন্তহীন যাত্রা—তারই বহুমাত্রিক প্রতিফলন সাহিত্য। ভাষা, দেশ ও কালের সীমা অতিক্রম করে সাহিত্য

Read More »

ঊর্ণনাভ 

শ্যামলী রক্ষিত  || পঞ্চম পর্ব || ইস্‌, কত বেলা হয়ে গেছে! ঘুম ভাঙার পর জানলা দিয়ে চোখ চলে গিয়েছিল বাইরের দিকে। তুষারের সারা শরীর কেমন রিরিক

Read More »