শ্যামলী রক্ষিত
|| পঞ্চম পর্ব ||
ইস্, কত বেলা হয়ে গেছে! ঘুম ভাঙার পর জানলা দিয়ে চোখ চলে গিয়েছিল বাইরের দিকে। তুষারের সারা শরীর কেমন রিরিক করে উঠেছে। চোখ দুটো সঙ্গে সঙ্গে বুজে ফেলেছে সে। তাকিয়ে থাকতেই পারছে না — রোদের ছটা কি!
মনে পড়ে গেল, মিতার চেঁচামেচির ঠেলায় একবার তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। অন্য সময় হলে তখনই উঠে পড়ত তুষার। ঘুম থেকে বেশ বেলা করেই ওঠে আজকাল। ভোরে বেরোনোর থাকলে তখন আলাদা কথা। রাত জেগে কাজকর্ম করে, তাই দেরি করেও ওঠে। মিতাও ডাকে না তাকে। বেশ অনেকটা বেলা পর্যন্ত ঘুমায় তুষার। বেলা দশটা–সাড়ে দশটার আগে বিছানা ছেড়ে ওঠে না। কিন্তু আজ সাত সকালে ঘুমের বারোটা বেজে গেছে। রাগে বিরক্তিতে গা জ্বলে গেছে তার।
কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে বেঁধে রেখেছে। ভেবেছিল, আগে দিপালী কাজ করে চলে যাক, তারপর যা বলার বলবে। কাজের লোকের সামনে যদি সত্যিটা বলে, তাহলে আগুন লাগিয়ে দেবে সংসারে। মাথা গরম মানুষ। মনটা খারাপ নয়, কিন্তু অদ্ভুত বদমেজাজি। কখন কার ওপর কী কারণে রেগে যাবে তার ঠিক নেই।
আজ যেমন এই সাত সকালেই ইচ্ছে করে লাগল দিপালীর সঙ্গে। মাথায় কিছু নেই তো! এখন একেক কাজের লোক কাজ করতেই চাইছে না। একটা দিন লোক ছাড়া চলবে না তার। তাদের নিজেদের সংসার যেমন তেমন — নিজের মায়ের কথাটা তো ভাববে! একটা দিন দিপালী ছাড়া বুড়ির চলে না। এখনই যদি রেগে গিয়ে কাজটা ছেড়ে দেয়, কী ঝামেলায় যে পড়তে হবে তাদের! তখন ঠেলা বুঝবে!
— কী হল? ওরকম করে কী দেখছ আমার দিকে? ঘুম থেকে উঠেই একেবারে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকাচ্ছ যে!
— ঘুমাতে দিলে কোথায়! সকাল থেকে কাজের লোকের সঙ্গে এমন চেঁচামেচি শুরু করে দিলে যে ঘুমাই কার সাধ্য! কাক-চিল বসতে পারবে না চেঁচামেচির ঠেলায়।
— চেঁচামেচি হবে না তো কী? সবসময় ওর বাহানা! কাঁহাতক সহ্য করব!
— তাই বললে তো হবে না। যে মানুষটাকে না হলে তোমার একদণ্ড চলবে না, তার সুবিধে–অসুবিধের কথাটা একবার ভাববে না, তা তো হয় না। তাছাড়া দিপালী তো অন্যায় কিছু বলেনি। ঠিকই তো — সকালবেলায় মোচা কাটা কী সম্ভব! তাও যদি জানতাম, ওর সঙ্গে হাত লাগিয়ে তুমিও একটু কিছু করে দিতে, তবু একটা কথা ছিল। একটু হাতে হাতে খোসা ছাড়িয়ে দিলে, কী সূঁচ ছাড়িয়ে দিলে, তাহলে তো গায়ে লাগে না! কিন্তু তা তো করবে না! তোমার হাতে ছোপ পড়ে যাবে, নখের শেফ খারাপ হয়ে যাবে!
— আমি করব তো ওকে রেখেছি কী জন্যে! মাস গেলে একগাদা টাকা মাইনে দিই কী এমনি এমনি!
— টাকা দিলেই সব হয়ে যায় না! তুমি টাকা দিয়ে ওর মাথাটা কিনে রেখেছ নাকি? ওর সুবিধে–অসুবিধে তোমাকে বুঝতে হবে না?
— তুমি তো আমারই দোষ দেখবে, আমি জানি! আমি তো তোমার শত্রু! কাজের লোকই আপন!
— আপন–পরের প্রশ্ন পরে হিসেব করো! তখন মাথায় এত রাগ উঠে গিয়েছিল! ওই কাজের লোকের জন্যেই রেহাই পেলে! ভাবলাম আগে দিপালী কাজ করে বেরিয়ে যাক, তারপর যা বলার বলব। সাত সকালে কাজের লোকের সঙ্গে চিৎকার করে ঘুম ভাঙানো বার করছ তুমি!
মনে মনে গজগজ করতে করতে পাশ ফিরে শুয়ে পড়েছিলাম। তারপর আবার ঘুমিয়েও গেছি। তখন যদি বিছানা ছেড়ে উঠতাম, তোমার কপালে খুব দুঃগতি ছিল।
মিতা খুব চিন্তায় পড়ে গেল। ভাবল, দিপালীর সঙ্গে কথাকাটাকাটির সমস্তটাই নিশ্চয়ই কানে গেছে তুষারের। এমনিতেই ঘুম পাতলা। খুট করে শব্দ হলেই ঘুম ভেঙে যায় তুষারের। রীতিমতো গলা উচ্চগ্রামে তুলে চিৎকার করেছে সে আজ। মাথাটা গরম হয়ে গেলে আর কন্ট্রোল করতে পারে না নিজেকে। এই এক দোষ তার!
মা তো প্রায়ই বলে —
“এই তো তোর একটা বড়ো দোষ বুড়ি! অল্পতেই মাথায় আগুন জ্বলে যায় তোর! ঠিক তোর বাবার স্বভাবটা পেয়েছিস! এভাবে কী জীবন চলে? মানুষ সহ্য করবে কেন?”
তুষারের কথা শুনতে শুনতে মিতার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। চায়ে চুমুক দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিয়ে ধীরে বলল—
— বুঝতে পেরেছি, আমার ভুল হয়েছে। ও কাজ করে বাড়ি ফিরুক। তারপর ওকে বুঝিয়ে বলব।
তুষার সংক্ষেপে বলল—
— দেখো, বলে কিছু হয় কিনা।
(… চলবে )


