তৃষ্ণা বসাক
রবিবারের রোদ্দুর / প্ৰবন্ধমালা-২
পর্ব ৫
“To translate, one must have a style of his own, for otherwise the translation will have no rhythm or nuance, which come from the process of artistically thinking through and molding the sentences; they cannot be reconstituted by piecemeal imitation. The problem of translation is to retreat to a simpler tenor of one’s own style and creatively adjust this to one’s author.” — Paul Goodman
মূল মৈথিলী থেকে বন্ধু কবি অজিত আজাদের কবিতা বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে দুটি একটি কবিতার ক্ষেত্রে এই সমস্যা হল। ‘চম্পা ঋতুস্নান করোনা’ শীর্ষক কবিতায় মেয়েদের ঋতুকালীন নানান বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে। অসাধারণ প্রতিবাদী কবিতাটি শেষ হচ্ছে এইভাবে ‘চম্পা, তুমি সব অনুষ্ঠানে হেগেমুতে দাও’। লেখার মেজাজ ধরে রাখার জন্যে আমি মূলের কোন পরিবর্তন করিনি, কিন্তু কবিতাটি ফেসবুকে পোস্ট করে দেখলাম অনেকেই ঠিক হজম করতে পারলেন না, বাঙালি পাঠকের শালীনতার ধারণায় কোথায় যেন আঘাত করল। আবার কোন তুলনায় অনগ্রসর সমাজের রচিত সাহিত্য বাংলায় অনুবাদের সময় প্রাসঙ্গিকতা মাথায় রাখতে হয়। বাঙালি সমাজ যা ২০০ বছর আগে ফেলে এসেছে, সেই বিষয়ে লেখার বাংলা অনুবাদ কতটা পাঠকপ্রিয় হবে তা ভাবতে হয় বইকি।
আসলে অনুবাদ করতে গেলে নানান বাধা পেরতে হয়, প্রথম অনুচ্ছেদে যে বাধাটির কথা বলেছি, তা হচ্ছে স্ব কিছুই কি অনুবাদ যোগ্য? আক্ষরিক অনুবাদ করলে মূলের মেজাজ থাছে হয়তো, কিন্তু লক্ষ্য ভাষাটি কি সেই ঝাঁঝ সহ্য করতে পারবে? অর্থাৎ শ্যাম রাখি না কুল রাখি- এই উভয় সংকট থাকে। সবচেয়ে বেশি যা থাকে দুটি ভাষার দেশজ কালজ সংস্কৃতি গত স্বাদ আলাদা হওয়ায় যথাযথ অনুবাদ করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। এক অনুবাদক কী ভেবেছেন দেখা যাক-
‘নিজে মৌলিক রচনাও করি বলেই বুঝি, অনুবাদ করা কত কঠিন। সত্যি বলতে কি, যথাযথ অনুবাদ হয় না, করা সম্ভব নয়। কারণ প্রত্যেকটি ভাষার নিজস্ব দেশজ, কালজ, সাংস্কৃতিক স্বাদ আলাদা। প্রত্যেকটি ভাষায় ব্যবহৃত শব্দের, বিম্বের, প্রেক্ষিতের; প্রত্যেক লেখকের দৃষ্টিকোণ ও শৈলীর কিছু একান্ত নিজস্ব ব্যঞ্জনা, মূর্ছনা ( Shade and nuance) আছে যেটির সঙ্গে সম্যক পরিচয় না থাকলে অনুবাদের মাধ্যমে সেটির পরিপূর্ণ রস গ্রহণ করা যায় না। এই কথাটিই ঔপন্যাসিক অমিতাভ ঘোষ তাঁর ‘শ্যাডো লাইন্স’ উপন্যাসে বোঝাতে চেয়েছেন। বাঙালির ‘ইতুর’ আনন্দ আর পঞ্জাবির ‘বৈশাখী’ র উল্লাস- নিতান্তই আঞ্চলিক (topical) সংস্কৃতি। ‘আরন্যক’এর নিবিড় বন্য গন্ধ কিম্বা ওড়িয়া কবি জয়ন্ত মহাপাত্রর ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ’রিলেশনশিপ’-এ বর্ণিত কলিঙ্গের রক্তঝরা বীভৎসতার সাক্ষী ধৌলি নদীর চিত্র, অপর ভাষায় ফুটিয়ে তোলা কি যায়? হিন্দীর ‘নাচ না জানে আঙগন টেড়া’ ইংরেজিতে যদি আক্ষরিক অনুবাদ করা হয়, a bad workman quarrels with his tools’ না করে, কী হাস্যকর হবে সে প্রয়াস’
( অনুবাদিকার ভূমিকা/ নিদা ফাজলির উর্দু কাব্যগ্রন্থ যেন হারানো কিছু-র ভূমিকায় লিখেছেন অরুনা মুখোপাধ্যায়। সাহিত্য অকাদেমি ২০০৭ সালে এটি বার করে। এই বইয়ের ভূমিকাটি ভারতীয় ভাষার অনুবাদকদের পক্ষে একটি অবশ্যপাঠ্য। আঞ্চলিক ভাষার অনুবাদের সমস্যাগুলির এত চমৎকার উদাহরণ তুলে তুলে আলোচনা আর তো চোখে পড়েনি। দু একটা নমুনা দেওয়া যাক।
মূলের মেজাজমর্জি রাখতে নিদা ফাজলী-র ‘বঞ্জারা মিজাজী’ কে অরুণা করেছেন ‘বেদিয়া মেজাজ’ । বাংলায় ‘বেদে’ শব্দটির একটি নিজস্ব নিগূঢ় অর্থ আছে- দুর্দম ভ্রমণ পিয়াসি স্বাধীন সত্তাটিকে সমাজের প্রতিষ্টিত শৃংখলে বাঁধা যাবে না।
সলিকা শব্দটির ঠিক প্রতিশব্দ যদিও নিয়ম, কিন্তু অরুনার মনে হয়েছে ‘যোগ্যতা’ এখানে বেশি উপযুক্ত হবে।
আবার এই অনুবাদকই অন্য জায়গায় সলিকার বাংলা নিয়ম করেছেন- ‘দিন সলিকেসে সে উগা’ র তরজমা করেছেন ‘দিন নিজের নিয়মে আসে’ অর্থাৎ অনুবাদের প্রথম কথা হচ্ছে মূল পাঠের মেজাজ মরজি বোঝা, বাকি সব পরে।
আবার ফিরি আরও কিছু নমুনায়।
এই কাব্যগ্রন্থের নবম দোহার দ্বিতীয় পঙক্তি ‘শায়দ তুঝমেঁ ন হো, তেরী জ্যায়সী বাত…’ হুবহু অনুবাদ না করে ‘চেয়েছি যেভাবে তোমাকে, পারনি দিতে হয়তো’ এভাবে লেখা তাঁর কাছে যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়েছে’ ‘আঁখ কা জাম লিখ, জুলফ কা বরসাত লিখো’ পঙক্তিটি অনুবাদক করেছেন ‘আঁকো চোখের নেশা মেঘ চূর্ণকেশে’ ‘আক্ষরিক অনুবাদ তাতে হয়নি, ভাবানুবাদ হয়েছে। ভাবানুবাদ করা অপরিহার্য বলেই স্বাধীনতাটুকু নিয়েছেন।
আর কবিতা বলেই কাব্যগুণ বজায় রাখা সবচেয়ে জরুরি। তাই ‘জিস্কে আগে মাদ যে, সারে বৈদ্য হাকম’ যা আক্ষরিক অনুবাদে হয় – তার সামনে ফিকে হয়ে যায় সমস্ত বৈদ্য হাকিম, কিন্তু এই অকাব্যিক অনুবাদে মন সায় দেয়নি অনুবাদকের, তিনি করেছেন ‘ কোথায় লাগে তার কাছে বৈদ্য হাকিম?’
সাহিত্য অকাদেমিতে ওড়িয়া কবি রমাকান্ত রথের কবিতা অনুবাদের কর্মশালায় অনুবাদ সম্পাদক ছিলেন মণীন্দ্র গুপ্ত। তাঁর কথাগুলো সমান প্রণিধান যোগ্য।
‘আমাদের একটা প্রারম্ভিক সমস্যা দেখা দিল। অনুবাদকরা লিখতে চান সাবলীল বাংলা, সহায়করাও বিশ্বস্ত থাকতে চান মূলের কাছে- অনুবাদকদের তাঁরা মূল থেকে একচুল নড়তে দেবেন না। তাহলে আমাদের প্রথমেই চিনে নেওয়া দরকার রমাকান্তের নিজস্ব ভাষাটিকে- সে কি প্রাচীনগন্ধী, না কি তাজা মুখের ভাষা? ধ্রুপদী না কি গীতল?….. আমরা ঠিক করলাম আমরা ভাবানুবাদ করব না, স্বচ্ছ স্বাভাবিক বাংলাকেও ছাড়ব না। এই টানাপড়েনের ফল ভালোই হয়েছিল।’
সমস্যা বানান নিয়েও। ‘ উর্দু বানান উচ্চারণ অনুযায়ী। কতকগুলি ধ্বনি আমাদের উচ্চারণে দেবনাগরী ও দেবনাগরী-জাত ভারতীয় অন্যান্য ভাষাগুলির উচ্চারণে নেই বলেই বর্ণমালাতেও নেই। কিন্তু উর্দুতে সেগুলি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উচ্চারিত বলে বর্ণমালাতেও স্থান পেয়েছে। যেমন জ-Z এর মতো যেটির উচ্চারণ। ক, খ, গ ও ফ – আরবি-ফারসি থেকে আসা এই বর্ণগুলির বলিষ্ঠ কণ্ঠনালি থেকে বহির্গত উচ্চারণ দেবনাগরী ব র্ণ্মালার ক,খ,গ ও ফ থেকে স ম্পূর্ণ ভিন্ন।’
এইরকম একটা সমস্যা হয়েছিল অরুণাচল প্রদেশের আও ভাষা থেকে কিছু লোকগল্প অনুবাদের সময়। আও ভাষার কতকগুলো উচ্চারণ বাংলায় নেই যে।
বিদেশি ভাষা থেকে বাংলা করতে গিয়েও এই সমস্যা হতে পারে। লাদিন গীতি লেখা জুদিও-স্প্যানিশ ভাষায়। সেই গীতি বাঙ্গালায় অনুবাদ করতে গিয়ে এক অনুবাদকের মনে হয়েছিল গানের প্রথম লাইন ইংরেজিতে অনুবাদ করা যত সহজ, বাংলাতে করা তত সহজ নয়।
High high is the moon
When it begins to dawn
A lovely girl who has no luck
Should never have been born
অনেক ধস্তাধস্তির পর ইংরেজি হলেও, বাংলা করতে গিয়ে অনুবাদকের মনে হয় বাংলায় উঁচু বা উচ্চ জাতীয় কোন বিশেষণ পদ সে বসাতেই পারছে না। সে যদি সুদূর লেখে তবে তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ হাজির হবেন ব্যাকুল বাঁশরি নিয়ে, ঊর্ধব গগন লিখলে মাদল বেজে উঠবে। অর্থাৎ উপযুক্ত শব্দ খুঁজে পেতে হবে, কিন্তু তা যেন অতীতের ছায়া না হয়। বড় কঠিন এ কাজ।
অনুবাদ শুধু যে সমঝোতা, তা বললে অনুবাদকদের নিষ্ঠা এবং মেধার প্রতি অবিচার করা হবে। মেধাবী অনুবাদককে শুধু অন্য ভাষা নয়, নিজের ভাষাটিকেও সম্যক রূপে আত্মস্থ করতে হয়, তবেই তিনি একটি অন্য ভাষার শব্দের তুল্যমূল্য শব্দ খুঁজে পেতে পারেন। নেপালি অনুবাদক শমীক চক্রবর্তীর কথায় বলি-
‘কিন্তু শুরুতে পড়তে গিয়ে ঠোক্কর খাচ্ছিলাম। সেটা ২০১৮ সাল নাগাদ হবে। নেপালি পড়া, বা টাইপ করে লেখালেখিতে তখন আমি দিব্যি সড়গড়। বলার গতিও প্রায় সাবলীল হয়ে এসেছে। তবু হোঁচট খাচ্ছিলাম। হিল কার্ট রোডের সর্পিল পাকদণ্ডী বেয়ে জীপ আর টয়ট্রেনের লুকোচুরির প্রথম অনুচ্ছেদের অনবদ্য বর্ণনা অনুবাদ করতেই বোধহয় আমার কয়েক সপ্তাহ লেগেছিল। পাহাড়ের মানুষের আলো-আঁধার-বিস্ময়-একঘেয়েমি-অনিশ্চয়তার পাকদন্ডিগুলোকে গভীর প্রজ্ঞার সঙ্গে এই উপন্যাসে গেঁথেছিলেন ইন্দ্রবহাদুর রাই। দুরুদুরু বুকে অনুবাদ করি। কিন্তু বইটা প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে অসংখ্য পাঠক-বন্ধু-বিদ্বজ্জনের সদর্থক মতামত পেয়ে মনের কুয়াশা সরে গিয়ে উঁকি দিয়েছিল যেন ঝলমলে কাঞ্চনজঙ্ঘা। অনুবাদ সার্থক হওয়ার তৃপ্তিবোধ স্বস্তি দিয়েছে। অপার আনন্দও।
এই উপন্যাসটা (রমিতা ছ) অনুবাদ করতে গিয়েই অনুভব করছিলাম যে বহু শব্দ বা লব্জ আমার কাছে পড়শি-ভাষার মতন সাবলীলতার জন্যই সহজ হয়েছে। উদাহরণ প্রসঙ্গে বলি, স্বনামধন্য প্রবাসী নেপালি অনুবাদকের করা এই উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ ‘দেয়ার ইজ এ কার্নিভাল টুডে’-র প্রথম পৃষ্ঠাতেই ‘চিরৌটা’টা সিগারেট (সম্ভবত চুরুট ভেবে) হয়ে গেছে, কিন্তু বাংলা করার সময় এটা যে তিতো ‘চিরতা’ হবে—তা ভাষার নৈকট্য, আর ছোটবেলার ভোরগুলোয় চিরতার জল খাওয়ার তিক্ত স্মৃতিগুলোর জন্য বুঝতে মোটেই অসুবিধা হয়নি। ওই একই কারণে উপন্যাসের ক্লাইম্যাক্সে এসে ‘এক লৌরা টেক, দুই নানী বুই…’ ছড়ার অদ্ভুত প্রয়োগকে ‘একে চন্দ্র, দুইয়ে পক্ষ…’ করে দিতেও আমায় তেমন বেগ পেতে হয়নি।’
আগাথা ক্রিস্টির বিখ্যাত রহস্য উপন্যাসে উল্লেখ ছিল ‘টেন লিটল নিগার বয়েজ’ ছড়ার।
| TEN LITTLE NIGGERSby Frank Green, 1869 |
Ten little nigger boys went out to dine; One choked his little self, and then there were nine. Nine little nigger boys sat up very late; One overslept himself, and then there were eight. Eight little nigger boys traveling in Devon; One said he’d stay there, and then there were seven. Seven little nigger boys chopping up sticks; One chopped himself in half, and then there were six. Six little nigger boys playing with a hive; A bumble-bee stung one, and then there were five. | Five little nigger boys going in for law; One got in chancery, and then there were four. Four little nigger boys going out to sea; A red herring swallowed one, and then there were three. Three little nigger boys walking in the zoo; A big bear hugged one, and then there were two. Two little nigger boys sitting in the sun; One got frizzled up, and then there was one. One little nigger boys living all alone; He got married, and then there were none. |
সেই ছড়াটির অনুবাদে এক বুদ্ধিমান অনুবাদক বাংলায় দশটি নিগ্রো বালক না করে হারাধনের দশটি ছেলে ব্যবহার করেছিলেন। আর তাতে মেজাজটা দারুণ এসেছিল। তাই ভাল অনুবাদক মানে আমি বুঝি সংবেদনশীল এবং বুদ্ধিমান অনুবাদক।


